হোম / আহতদের তালিকা / ফজরুল হক
ফজরুল হক

ফজরুল হক

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : রিক্সাচালক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্মপরিচয়
নীলফামারীর বাহালিপাড়া, রামনগর এলাকার এক নিভৃত কোণে বাস করেন মোঃ ফজলুল হক। জন্ম আর বেড়ে ওঠা তার এই মাটিতেই যেখানে ধুলোর সাথে মিশে আছে তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়। পিতা আতিয়ার রহমান ও মাতা ফাতেমা বেগমের সন্তান ফজলুল হক ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন কষ্ট, কিন্তু কখনও হার মানেননি। তার জীবনের প্রতিটি ঘামঝরা মুহূর্ত সাক্ষ্য দেয়, কীভাবে কঠোর পরিশ্রম আর আত্মত্যাগ মিলিয়ে একজন মানুষ হয়ে ওঠেন ইতিহাসের নীরব নায়ক।
তার পরিচয় তিনি একজন রিকশাচালক। কিন্তু এর বাইরেও আছে তার আরও একটি দায়িত্বপূর্ণ পরিচয় তিনি একজন বাবা। তার দুটি ফুটফুটে মেয়ে, ফারজানা আক্তার (ষষ্ঠ শ্রেণি) ও ফরিদা ইয়াসমিন (তৃতীয় শ্রেণি), তার স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন সকালে রিকশা নিয়ে বের হন, বিকেলে নিজের ছোট্ট টি-স্টলে কিছু চা বিক্রি করে মাসিক প্রায় চার হাজার টাকা আয় করেন। এই সামান্য আয়ের মধ্যেই তিনি তার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালান কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, শিক্ষাই পারে তাদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে।

তবে শুধু নিজের সংসার নয় ফজলুল হক হলেন সেই মানুষ, যিনি সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পিছপা হন না। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল নিঃসন্দেহে স্মরণীয়। একজন শ্রমজীবী মানুষ হয়েও তিনি রাস্তায় নেমেছেন, কণ্ঠ তুলেছেন অবিচারের বিরুদ্ধে। তার চোখে চোখ রেখে বলার সাহস আছে “আমি গরিব হতে পারি, কিন্তু ন্যায়ের প্রশ্নে আমি কখনো মাথা নত করিনি।”
তিনি জানেন, এই সমাজে তার অবস্থান নিচে, কিন্তু তার চিন্তা-ভাবনা আর আদর্শ বরাবরই উঁচু। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিবর্তন আনতে শিক্ষার দরকার, প্রতিবাদের দরকার, আর দরকার ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার সাহস।
আজ মোঃ ফজলুল হক একজন সাধারণ রিকশাচালক হলেও, তার গল্প আমাদের শেখায় মাটি থেকে উঠে আসা এক মানুষের জীবনও হতে পারে এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সংগ্রাম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি একদিন তার সন্তানদের পৌঁছে দেবে এক আলোকিত ভবিষ্যতে।
জুলাইয়ে তার অংশগ্রহন
২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উত্তাল সময়। হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা ও শ্রমজীবী মানুষদের মিলিত প্রতিরোধের সময়। সেই জনতার ঢলে ছিলেন ফজলুল হকের মতো হাজারো মুখ যারা ক্ষুধা আর অবিচারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন বুক চিতিয়ে। তার জন্য আন্দোলন মানে ছিল নিজের সন্তানদের ভবিষ্যতের দাবি, সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য আওয়াজ তোলা।
১৮ জুলাই সেদিনও ফজলুল হক রাস্তায় নেমেছিলেন, যেমনটা বলেছিলেন আগেই। কিন্তু সেই দিনটি হয়ে উঠেছিল তার জীবনের এক বিভীষিকাময় মুহূর্ত। হঠাৎই, আন্দোলনের উত্তপ্ত পরিবেশে একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় তার পায়ে। মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। চিৎকার করার আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। চারপাশের মানুষ, ছাত্র-জনতা তাদের কয়েকজন ছুটে আসেন সাহায্যে। হাসপাতালে নেয়া হয়, এক হাসপাতাল থেকে আরেকটিতে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে রাত দুইটার দিকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় তাকে।
চিকিৎসা মেলে, প্রাণ ফিরে পান তিনি। কিন্তু তার পা আর আগের মতো হয় না। শহরের কর্মব্যস্ততা আর ধকল সইতে না পেরে তাকে ফিরতে হয় গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু তার হারানোর মধ্যেও এক অনন্য অর্জন আছে। তার সাহস ও আত্মত্যাগ তাকে করে তুলেছে এলাকার মানুষের চোখে একজন নায়ক।
চিকিৎসা
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যদি হয় বেঁচে থাকার লড়াই, তবে ফজলুল হকের জীবনকে এক অনন্ত সংগ্রামের গল্প বললে ভুল হবে না। জুলাই আন্দোলনের এই সাহসী কর্মী যখন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, তখনই শুরু হয় তাঁর যন্ত্রণাময় জীবনের এক নতুন অধ্যায়। এই অধ্যায়ে আছে কষ্ট, ত্যাগ, অসহায়তা আর অনবরত চিকিৎসার সঙ্গে জীবন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।
গুলিটি তাঁর ডান পায়ের ওপরের অংশে লেগে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর টিভি সেন্টারের পাশে অবস্থিত ডেল লাইফ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি তাঁর হাসপাতালযাত্রা। একে একে আরও চার-পাঁচটি হাসপাতালে ছোটাছুটি করেও স্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়নি। শেষমেশ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করানো হয় তাঁকে, যেখানে জরুরি ভিত্তিতে একটি বড় অপারেশন করতে হয়।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউতে ১০ দিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর, শারীরিক অবস্থার সাময়িক উন্নতি দেখা দিলে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে আবার দেখা যায়, তাঁর শরীরের ভেতরে গুলির অংশ এবং অন্যান্য বিদেশি বস্তু রয়ে গেছে, যা নতুন করে সংক্রমণ সৃষ্টি করছে। ফলে সেখানে তাকে দীর্ঘ এক মাস ভর্তি রেখে দ্বিতীয় দফা বড় অপারেশন করা হয়।
এই দীর্ঘ চিকিৎসা ও হাসপাতালে থাকার পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা একটি সাধারণ পরিবারের পক্ষে বহন করা একেবারেই অসম্ভব। তবু থেমে থাকেননি ফজলুল হক ও তাঁর পরিবার। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সবকিছু নিঃশেষ করে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। জমি বন্ধক, জমি বিক্রি, এবং বিভিন্নজনের কাছ থেকে ঋণ করে আজ পর্যন্ত তাঁরা প্রায় ৩-৪ লক্ষ টাকা ব্যয় করেছেন শুধুমাত্র চিকিৎসার জন্য। অথচ চিকিৎসা এখনো শেষ হয়নি। এখনো তাঁর চিকিৎসা চলছে, এবং প্রতিদিন নতুন করে ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে।
একদিকে গুলির ক্ষত, অন্যদিকে আর্থিক অনটন এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ফজলুল হক যেন এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন এই সমাজে একজন সংগ্রামী মানুষের। তিনি শুধু একজন রোগী নন; তিনি একজন যোদ্ধা, যিনি নিজের শরীরে আন্দোলনের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর চিকিৎসার এই করুণ ইতিহাস শুধু একটি ব্যক্তির নয়, বরং এটি আমাদের সমাজের, রাষ্ট্রের এবং মানবতার এক নিরব আর্তনাদ।
ফজলুল হকের চিকিৎসা যেন আজ আর শুধু তাঁর পরিবারের দায় নয় এটি আমাদের সকলের দায়িত্ব। কারণ, তাঁর জীবনের এই যুদ্ধ তিনি লড়েছেন আমাদের সকলের অধিকারের জন্য এবং আজ তিনি নিজেই একটি জীবন্ত সাহায্যের আবেদন হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
চিকিৎসা ও প্রস্তাবনা
তার পা থেকে গুলি বের করা হয় বর্তমানে ডান পায়ের ভেইন ছিড়ে যাওয়ায় অনেক সময় অবশ হয়ে আসে। ভার বহন করা তার পক্ষে আর সম্ভব নয় উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
কর্মসংস্থান ও বাজেট প্রস্তাবনা
ব্যবসার জন্য মূলধন দিলে পরিবারের জন্য জীবন চালানো সম্ভব। এক্ষেত্রে তিন লক্ষ টাকার প্রয়োজন।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : ফজরুল হক
জন্ম তারিখ : ১১/০৩/১৯৯২
জন্মস্থান : বাহালীপাড়া, রামনগর, নীলফামারী
পেশা : রিক্সাচালক
নিজ জেলা : নীলফামারী
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: বাহালীপাড়া, ইউনিয়ন: বাহালীপাড়া, জেলা: নীলফামারী
স্থায়ী ঠিকানা : নীলফামারী
পরিবারের তথ্য
পিতার নাম : মৃত আতিয়ার রহমান
মায়ের নাম : মৃত ফাতেমা বেগম
পারিবারিক অবস্থা : মধ্যবিত্ত
আয়ের উৎস : ক্ষুদ্র ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন। ফারজানা আক্তার, ১২ (মেয়ে), ফারিদা আক্তার, ১০ (মেয়ে)

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍