মো: হান্নান বেপারী
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
১৯৯৪ সালে বরিশালের টুমচর গ্রামে জন্মগ্রহন করে দারিদ্র্যের মাঝেই বড় হওয়া হান্নান বেপারী ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় এসে কারখানা শ্রমিকের কঠিন জীবনে নিজেকে সঁপে দেন। মাসে ১৫ হাজার টাকায় ছয় সদস্যের পরিবার চালানোই ছিল তাঁর নিত্য লড়াই, কিন্তু তবুও ন্যায়ের ডাকে তিনি পিছিয়ে যাননি। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সাধারণ মানুষটি পুলিশের লাঠির আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েন। মাথায় গুরুতর আঘাত তাকে আজ দুর্বল, স্মৃতিভ্রান্ত, অর্ধেক কর্মক্ষম করে তুলেছে যেন এক জীবন্ত ক্ষত, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে। তবুও সন্তানদের জন্য, ভবিষ্যতের ক্ষীণ আলোর জন্য তিনি প্রতিদিন নিজেকে টেনে তোলেন আকাঙ্ক্ষা করেন আবার একদিন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
প্রতিবাদের মাঠে এক শ্রমজীবী সংগ্রামী
মো: হান্নান বেপারী
ক্রমিক: ০২৬
আইডি: ঢাকা সিটি ০২৬
জন্ম ও পরিচিতি
মো: হান্নান বেপারী ১৯৯৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জেলা বরিশালের সদর থানার অন্তর্গত চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের টুমচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শ্যামল সবুজেঘেরা গ্রামীণ পরিবেশে তার শৈশব অতিবাহিত হয়। কৃষিনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল একটি পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি বেড়ে উঠেছিলেন নিরব কিন্তু লড়াকু মানসিকতা নিয়ে। তার ষাট বছর বয়সী বৃদ্ধ পিতা বজলু ব্যাপারী এবং মাতা রানী বেগম, পঞ্চান্ন বছর বয়সী একজন গৃহিণী। জীবনভর সংসারের হাল ধরেছেন হাতে-চালানো চালুনির মতো: কখনো জ্বালানির জন্য শুকনো ডাল কুড়িয়ে, কখনো গৃহস্থালি কাজ করে। হান্নান ছিলেন তাদের ছয় সদস্যবিশিষ্ট সংসারের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ও সচেতন সন্তান। ঘরে ছোট বাচ্চাদের খাবার তুলে দেয়ার চিন্তা, বৃদ্ধ পিতার ওষুধ কেনার দুশ্চিন্তা: এসব তার কৈশোরেই জীবনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে লেখাপড়ায় বিশেষ সুযোগ না পেলেও সে কখনো সহজে হাল ছাড়েননি।
পেশাগত জীবন ও সংগ্রাম
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব একটা এগিয়ে যেতে পারেননি মো: হান্নান। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও জীবিকার চাপ তাকে সময়ের আগেই বড় করে তোলে। কৈশোরে বিদ্যালয়ের বেঞ্চ ছেড়ে তিনি যখন জীবনের কঠিন বাস্তবতায় পা রাখেন, তখন থেকেই শুরু হয় তাঁর শ্রমজীবনের অধ্যায়। ঢাকায় এসে তিনি থিতু হন রাজধানীর দক্ষিণাংশে অবস্থিত যাত্রাবাড়ি এলাকায়, যেখানে গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা লাখো মানুষের ভিড়ে একেবারেই নিঃশব্দে মিশে যান তিনি। একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সকাল থেকে রাত অবধি নিরলস পরিশ্রম করে মাস শেষে মাত্র ১৫,০০০ টাকা আয় করতেন, যা দিয়ে চালাতে হতো তার ছয় সদস্যের পুরো পরিবার। এই আয়ে দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর পর কখনোই কিছু সঞ্চয়ের সুযোগ থাকত না। বরং মাসশেষে ঋণগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল বেশি। তবুও হান্নান কখনো হাল ছাড়েননি। তিনি জানতেন, "কাজই জীবনের একমাত্র ভরসা।" পরিবারের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ছিল গভীর ও অকুষ্ঠ। তাঁর তিনটি সন্তান রয়েছে, যাদের মধ্যে বড় ছেলে আব্দুল্লাহ (বয়স ৫) পড়ছে প্লে-গ্রুপে। শিশুটি এখনও অক্ষরজ্ঞান শেখার প্রাথমিক ধাপে। ছোট ছেলে রবিউল (বয়স ৪) এখনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি, তবে শীঘ্রই তাকে স্কুলে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। পিতা হিসেবে প্রতিটি সন্তানের জীবন, শিক্ষা,
স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার দায়িত্ব একা হান্নানকেই কাঁধে নিতে হয়েছে। এই অক্লান্ত শ্রমের বিনিময়ে সংসারে কোনো উৎসব আসে না, আসে শুধুই দায় ও দায়িত্ব। প্রত্যেক দিনের কাজ, ঘাম, ট্রাফিক জ্যামে বাস ধরা, অসুস্থ শরীর নিয়েও কারখানায় হাজিরা দেওয়া এসবই ছিল হান্নানের জীবনের চিত্র।
তবে এ চিত্র শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নয়; এ যেন শ্রমজীবী শ্রেণির প্রতিচ্ছবি, যারা দিন-রাত অমানবিক পরিশ্রম করেও বেঁচে থাকে অভাবের চাপে।
ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে এক নজিরবিহীন বৈষম্যবিরোধী গণ আন্দোলন। এ আন্দোলনে ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষও শামিল হয়। এই আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কিংবা ভয়াবহভাবে আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে এক অনন্য নাম মো: হান্নান: একজন কারখানা শ্রমিক, একজন দরিদ্র পিতা, আর এক সাহসী সাধারণ মানুষ, যিনি জীবিকার তাগিদে নীরব ছিলেন, কিন্তু ন্যায়ের ডাকে চুপ থাকতে পারেননি। তার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল ন্যায়ের প্রতি তার অন্তর্নিহিত আনুগত্য। যদিও তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন না কিংবা কোনো সংগঠনের ব্যানারে যুক্ত ছিলেন না, তবুও তাঁর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক অনমনীয় ন্যায়বোধ এবং সামাজিক সচেতনতা: যা সময়মতো জেগে উঠেছিল ইতিহাসের ডাকে।
দারিদ্র্য, জীবনের চাপে টিকে থাকার লড়াই, সন্তানদের মুখে দু'বেলা খাবার তুলে দেয়ার দায়িত্ব এবং কর্মস্থল হারানোর আশঙ্কা এসব বাস্তবতা তাকে বারবার আন্দোলন থেকে দূরে রেখেছে। কারণ তার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল বেঁচে থাকা। দিনশেষে শিশুদের দুধ, বৃদ্ধ বাবার ওষুধ, স্ত্রীর চিন্তিত চোখের দিকে তাকিয়ে হয়তো তিনি নিজেই নিজেকে বলতেন, "এখন প্রতিবাদ করলে কালকে খাবার আসবে কোথেকে।" কিন্তু সময় এসে দাঁড়িয়েছিল এমন এক বাঁকে, যেখানে আর নীরবতা বজায় রাখা সম্ভব ছিল না।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কেবল শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়েই থেমে থাকেনি। এটি রূপ নেয় দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দীর্ঘদিনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি সর্বস্তরের গণআন্দোলনে। ছাত্রদের কন্ঠে উঠে আসে শ্রমিকের হাহাকার, কৃষকের কান্না, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাহীনতা এবং মেহনতি মানুষের অধিকার। এই সময়েই আব্দুল হান্নানের হৃদয়ের ভিতর আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে ন্যায়ের আহ্বান। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন; "শুধু ছাত্রদের দায়িত্ব নয়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব।" সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজের নিরাপত্তা, চাকরি, এমনকি পরিবারের ভবিষ্যত নিয়েও আর চিন্তা করেননি। তিনি উঠে দাঁড়ান কণ্ঠে শ্লোগান নিয়ে, রাস্তায় পা রাখেন হাজারো সাধারণ মানুষের পাশে। গর্জে উঠেছিলেন সেসব মানুষের পক্ষে যাদের কণ্ঠকে সমাজ চিরকাল চেপে রাখতে চেয়েছে। তার এই অংশগ্রহণ ছিল নিতান্ত তাৎক্ষণিক কোনো আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের নীরব যন্ত্রণা ও বঞ্চনার বিপরীতে এক আত্মমর্যাদাপূর্ণ অবস্থান। তিনি জানতেন, এই পথে হেঁটে হয়তো তিনি আহত হবেন, হয়তো আর কারখানার কাজে ফিরতে পারবেন না, কিন্তু তার এ ভূমিকা একটি প্রজন্মকে সাহস দেবে, প্রতিবাদ করতে শিখাবে। তার দাঁড়িয়ে যাওয়ার অর্থ ছিল একজন শ্রমিক যখন আন্দোলনে যোগ দেন, তখন সেটি আর শুধু ছাত্রদের আন্দোলন থাকে না: সেটি হয়ে ওঠে একটি জাতীয় বোধের বিস্ফোরণ।
আহত হওয়ার বেদনাময় ঘটনা
তারিখটি ছিল ৪ আগস্ট ২০২৪, দিনটি ছিল রবিবার, সময়টা বিকাল ৪টা। ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা যাত্রাবাড়ি থানার সামনের সড়ক তখন অস্থির, উত্তাল এবং স্লোগানে মুখর। বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, তরুণ-তরুণী এবং সাধারণ মানুষ মিলিত হয়েছিল একটি শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচিতে।
সেখানে ছিলেন হান্নান বেপারীও সাধারণ পোশাক, ক্লান্ত মুখ, কিন্তু দৃপ্ত চোখে আশা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন; একটি ন্যায্য সমাজের স্বপ্ন নিয়ে। তিনি তখনও ভাবেননি, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে স্বপ্নটি রক্তাক্ত দুঃস্বপ্নে রূপ নেবে।
কোনো রকম পূর্বঘোষণা বা উস্কানি ছাড়াই, হঠাৎ যাত্রাবাড়ি থানা পুলিশের একটি দল সেখানে হামলা চালায়; সাথে যুক্ত হয় ঘাতক আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বর্বর আক্রমণ। শুরু হয় বেপরোয়া লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ এবং ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। হান্নান, যিনি কখনো কোনো সহিংস রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না, শুধু ন্যায়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, সেই মুহূর্তে ওই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির শিকার হন। ধোঁয়ার কুণ্ডলি, হুলস্থুল চিৎকার, হঠাৎ ছুটোছুটি, আর পুলিশের গর্জনের মধ্যে পড়ে যান তিনি। এক পুলিশ সদস্যের লাঠির আঘাত তাঁর মাথায় সজোরে লাগে, যার ফলে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। আশপাশের কেউ তাঁকে ধরতে পারেনি; সবাই তখন নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত। গুরুতর আহত অবস্থায় পথযাত্রী কয়েকজন মানুষ তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে সিটি স্ক্যান করা হয় এবং চিকিৎসকগণ প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে ছেড়ে দেন, যদিও তখনও মাথায় রক্ত জমাট এবং আঘাতজনিত অসারতা ছিল। ডাক্তারদের এই অবহেলা এবং রোগী চাপের কারণে হয়তো তাঁর আভ্যন্তরীণ জটিলতাগুলো তখন পুরোপুরি চিহ্নিত হয়নি। কিন্তু হান্নান নিজে বুঝতে পারছিলেন সবকিছু ঠিক নেই। প্রথমদিকে স্বাভাবিক থাকলেও কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হয় মাথা ঝিমঝিম করা, ভারী অনুভব, বমি বমি ভাব এবং ঘোরের মধ্যে চলে যাওয়া। এই অবস্থায় ১ সপ্তাহ পরে তিনি যান ঢাকার আল-কারীম হাসপাতালে, যেখানে তাঁকে পর্যবেক্ষণে রেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, মাথায় আঘাতের কারণে স্নায়ুবিক চাপ ও হালকা মস্তিষ্কে রক্ত জমাটের লক্ষণ দেখা দেয়। এর ফলে এখন তিনি আগের মতো শ্রম দিতে পারেন না। একটানা কাজ করলে মাথাব্যথা, দুর্বলতা এবং স্মৃতিভ্রষ্টতার মতো সমস্যায় ভোগেন। একজন শ্রমিকের জীবনে কর্মক্ষমতা মানে বেঁচে থাকার অধিকার। হান্নান সেই অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন এক রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নিষ্ঠুর আঘাতে।
পরবর্তী জীবন; পঙ্গু বাস্তবতা
আঘাতটি ছিল চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার অভিঘাত ছিল স্থায়ী ও মর্মান্তিক। হান্নান হয়তো হাত-পা হারাননি, কিন্তু মস্তিষ্কে পাওয়া গভীর আঘাত তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও কাজের সক্ষমতাকে চিরতরে বিপন্ন করে তোলে। আধুনিক চিকিৎসা তাকে "পঙ্গু" বলে না কিন্তু বাস্তবতা হলো, সে আর আগের মানুষটি নেই। অতীতের মতো তিনি আর দিনে ৮-১০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কারখানার কনভেয়ার লাইনে একটানা কাজ করতে পারেন না। হালকা কাজ করলেও মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম ভাব, মস্তিষ্কে ভারী চাপ এবং মাঝে মধ্যে স্মৃতিভ্রান্তির লক্ষণ দেখা দেয়।
যে হান্নান একদিন মেশিনের শব্দের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে - পেতেন, সেই হান্নান আজ ছোট শব্দেই অস্থির হয়ে ওঠেন। ক্লান্তি যেন তাঁর দেহে স্থায়ী আসন গেড়েছে। এর ফলে তাঁর মাসিক আয়
ভয়াবহভাবে কমে আসে। যেখানে আগে তিনি ১৫,০০০ টাকা আয়
করে কোনোমতে সংসার চালাতেন, এখন সেই আয়ের অর্ধেকও
সম্ভব হয় না। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ছয়; তাঁর বৃদ্ধ পিতা, গৃহবধূ
স্ত্রী এবং দু'টি ছোট সন্তান। তাঁদের সকলের মুখে দু'বেলা খাবার
তুলে দেওয়া, ওষুধ কেনা, বাড়িভাড়া মেটানো এবং সন্তানদের
ভবিষ্যতের চিন্তা সবই যেন আজ এক অদৃশ্য দেয়ালের সামনে ধাক্কা
খেয়ে থমকে গেছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে সন্তানদের।
শিক্ষাজীবনে। বড় ছেলে আব্দুল্লাহকে প্লে-গ্রুপে ভর্তি করেছিলেন
স্বপ্ন নিয়ে, ভাবছিলেন পড়ালেখা শিখে সে একদিন পরিবারকে
দারিদ্র্যের বৃত্ত থেকে বের করে আনবে। কিন্তু এখন, আব্দুল্লাহর
স্কুলের ফি, ইউনিফর্ম, বই কেনা; সব কিছুই যেন অতিরিক্ত বোঝা।
আর ছোট ছেলে রবিউলকে এখনও কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি
করানো যায়নি, কারণ বাড়ির ভাত জোটে না, স্কুলের খরচ মেটাবে কীভাবে? আর হান্নান, তিনি প্রতিদিন ভাঙছেন, মুঠোফোনের স্ক্রিনে কাজ খোঁজার আবেদন করছেন, আবার সন্তানকে মুখে বলছেন, "তুই ঠিকমতো পড়াশোনা কর, বাবা ঠিক হয়ে যাবে।"
এই "ঠিক হয়ে যাওয়া" আজ আর শরীরের সুস্থতার প্রতিশ্রুতি নয়; এটি যেন এক ক্ষীণ আশার রেখা, যা প্রতিদিন নিভে যেতে যেতে টিকে আছে একজন পিতার ভেতরের আত্মত্যাগে।
প্রস্তাবনা
১. আঘাতের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যতদিন প্রয়োজন তা বিনামূল্যে চালু রাখতে হবে।
২. সন্তানদের পড়াশুনার ব্যবস্থা করা।
৩. নিজস্ব একটি ছোট দোকান দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
৪. পরিবারের আয়ের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এবং পুনর্বাসনের জন্য একটি ক্ষুদ্র অনুদান বরাদ্দ দিতে হবে।
এক নজরে মো: হান্নান বেপারী
নাম: মো: হান্নান বেপারী
জন্ম তারিখ: ০৯-০২-১৯৯৪
জন্যস্থান: বরিশাল
পেশা: কারখানা শ্রমিক
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: টুমচর, ইউনিয়ন: চন্দ্রমোহন, থানা: সদর, জেলা: বরিশাল
বর্তমান ঠিকানা: এলাকা: ধলপুর, থানা: যাত্রাবাড়ি, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: বজলু বেপারী
মায়ের নাম: রানী বেগম
পিতার পেশা ও বয়স
বৃদ্ধ, ৬০
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিনী, ৫৫
মাসিক আয়: ১৫,০০০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৬
সন্ধানদের বিবরণ
১. আব্দুল্লাহ, বয়স: ৫, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: প্লে, সম্পর্ক: ছেলে
২. রবিউল, বয়স: ৪, পেশা, শ্রেণিঃ, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান: যাত্রাবাড়ি থানার সামনে
আহত হওয়ার সময়: ৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪টা
আক্রমণকারী: পুলিশ
মো: হান্নান বেপারী
ক্রমিক: ০২৬
আইডি: ঢাকা সিটি ০২৬
জন্ম ও পরিচিতি
মো: হান্নান বেপারী ১৯৯৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জেলা বরিশালের সদর থানার অন্তর্গত চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের টুমচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শ্যামল সবুজেঘেরা গ্রামীণ পরিবেশে তার শৈশব অতিবাহিত হয়। কৃষিনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল একটি পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি বেড়ে উঠেছিলেন নিরব কিন্তু লড়াকু মানসিকতা নিয়ে। তার ষাট বছর বয়সী বৃদ্ধ পিতা বজলু ব্যাপারী এবং মাতা রানী বেগম, পঞ্চান্ন বছর বয়সী একজন গৃহিণী। জীবনভর সংসারের হাল ধরেছেন হাতে-চালানো চালুনির মতো: কখনো জ্বালানির জন্য শুকনো ডাল কুড়িয়ে, কখনো গৃহস্থালি কাজ করে। হান্নান ছিলেন তাদের ছয় সদস্যবিশিষ্ট সংসারের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ও সচেতন সন্তান। ঘরে ছোট বাচ্চাদের খাবার তুলে দেয়ার চিন্তা, বৃদ্ধ পিতার ওষুধ কেনার দুশ্চিন্তা: এসব তার কৈশোরেই জীবনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে লেখাপড়ায় বিশেষ সুযোগ না পেলেও সে কখনো সহজে হাল ছাড়েননি।
পেশাগত জীবন ও সংগ্রাম
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব একটা এগিয়ে যেতে পারেননি মো: হান্নান। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও জীবিকার চাপ তাকে সময়ের আগেই বড় করে তোলে। কৈশোরে বিদ্যালয়ের বেঞ্চ ছেড়ে তিনি যখন জীবনের কঠিন বাস্তবতায় পা রাখেন, তখন থেকেই শুরু হয় তাঁর শ্রমজীবনের অধ্যায়। ঢাকায় এসে তিনি থিতু হন রাজধানীর দক্ষিণাংশে অবস্থিত যাত্রাবাড়ি এলাকায়, যেখানে গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা লাখো মানুষের ভিড়ে একেবারেই নিঃশব্দে মিশে যান তিনি। একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সকাল থেকে রাত অবধি নিরলস পরিশ্রম করে মাস শেষে মাত্র ১৫,০০০ টাকা আয় করতেন, যা দিয়ে চালাতে হতো তার ছয় সদস্যের পুরো পরিবার। এই আয়ে দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর পর কখনোই কিছু সঞ্চয়ের সুযোগ থাকত না। বরং মাসশেষে ঋণগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল বেশি। তবুও হান্নান কখনো হাল ছাড়েননি। তিনি জানতেন, "কাজই জীবনের একমাত্র ভরসা।" পরিবারের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ছিল গভীর ও অকুষ্ঠ। তাঁর তিনটি সন্তান রয়েছে, যাদের মধ্যে বড় ছেলে আব্দুল্লাহ (বয়স ৫) পড়ছে প্লে-গ্রুপে। শিশুটি এখনও অক্ষরজ্ঞান শেখার প্রাথমিক ধাপে। ছোট ছেলে রবিউল (বয়স ৪) এখনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি, তবে শীঘ্রই তাকে স্কুলে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। পিতা হিসেবে প্রতিটি সন্তানের জীবন, শিক্ষা,
স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার দায়িত্ব একা হান্নানকেই কাঁধে নিতে হয়েছে। এই অক্লান্ত শ্রমের বিনিময়ে সংসারে কোনো উৎসব আসে না, আসে শুধুই দায় ও দায়িত্ব। প্রত্যেক দিনের কাজ, ঘাম, ট্রাফিক জ্যামে বাস ধরা, অসুস্থ শরীর নিয়েও কারখানায় হাজিরা দেওয়া এসবই ছিল হান্নানের জীবনের চিত্র।
তবে এ চিত্র শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নয়; এ যেন শ্রমজীবী শ্রেণির প্রতিচ্ছবি, যারা দিন-রাত অমানবিক পরিশ্রম করেও বেঁচে থাকে অভাবের চাপে।
ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে এক নজিরবিহীন বৈষম্যবিরোধী গণ আন্দোলন। এ আন্দোলনে ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষও শামিল হয়। এই আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কিংবা ভয়াবহভাবে আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে এক অনন্য নাম মো: হান্নান: একজন কারখানা শ্রমিক, একজন দরিদ্র পিতা, আর এক সাহসী সাধারণ মানুষ, যিনি জীবিকার তাগিদে নীরব ছিলেন, কিন্তু ন্যায়ের ডাকে চুপ থাকতে পারেননি। তার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল ন্যায়ের প্রতি তার অন্তর্নিহিত আনুগত্য। যদিও তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন না কিংবা কোনো সংগঠনের ব্যানারে যুক্ত ছিলেন না, তবুও তাঁর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক অনমনীয় ন্যায়বোধ এবং সামাজিক সচেতনতা: যা সময়মতো জেগে উঠেছিল ইতিহাসের ডাকে।
দারিদ্র্য, জীবনের চাপে টিকে থাকার লড়াই, সন্তানদের মুখে দু'বেলা খাবার তুলে দেয়ার দায়িত্ব এবং কর্মস্থল হারানোর আশঙ্কা এসব বাস্তবতা তাকে বারবার আন্দোলন থেকে দূরে রেখেছে। কারণ তার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল বেঁচে থাকা। দিনশেষে শিশুদের দুধ, বৃদ্ধ বাবার ওষুধ, স্ত্রীর চিন্তিত চোখের দিকে তাকিয়ে হয়তো তিনি নিজেই নিজেকে বলতেন, "এখন প্রতিবাদ করলে কালকে খাবার আসবে কোথেকে।" কিন্তু সময় এসে দাঁড়িয়েছিল এমন এক বাঁকে, যেখানে আর নীরবতা বজায় রাখা সম্ভব ছিল না।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কেবল শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়েই থেমে থাকেনি। এটি রূপ নেয় দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দীর্ঘদিনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি সর্বস্তরের গণআন্দোলনে। ছাত্রদের কন্ঠে উঠে আসে শ্রমিকের হাহাকার, কৃষকের কান্না, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাহীনতা এবং মেহনতি মানুষের অধিকার। এই সময়েই আব্দুল হান্নানের হৃদয়ের ভিতর আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে ন্যায়ের আহ্বান। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন; "শুধু ছাত্রদের দায়িত্ব নয়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব।" সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজের নিরাপত্তা, চাকরি, এমনকি পরিবারের ভবিষ্যত নিয়েও আর চিন্তা করেননি। তিনি উঠে দাঁড়ান কণ্ঠে শ্লোগান নিয়ে, রাস্তায় পা রাখেন হাজারো সাধারণ মানুষের পাশে। গর্জে উঠেছিলেন সেসব মানুষের পক্ষে যাদের কণ্ঠকে সমাজ চিরকাল চেপে রাখতে চেয়েছে। তার এই অংশগ্রহণ ছিল নিতান্ত তাৎক্ষণিক কোনো আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের নীরব যন্ত্রণা ও বঞ্চনার বিপরীতে এক আত্মমর্যাদাপূর্ণ অবস্থান। তিনি জানতেন, এই পথে হেঁটে হয়তো তিনি আহত হবেন, হয়তো আর কারখানার কাজে ফিরতে পারবেন না, কিন্তু তার এ ভূমিকা একটি প্রজন্মকে সাহস দেবে, প্রতিবাদ করতে শিখাবে। তার দাঁড়িয়ে যাওয়ার অর্থ ছিল একজন শ্রমিক যখন আন্দোলনে যোগ দেন, তখন সেটি আর শুধু ছাত্রদের আন্দোলন থাকে না: সেটি হয়ে ওঠে একটি জাতীয় বোধের বিস্ফোরণ।
আহত হওয়ার বেদনাময় ঘটনা
তারিখটি ছিল ৪ আগস্ট ২০২৪, দিনটি ছিল রবিবার, সময়টা বিকাল ৪টা। ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা যাত্রাবাড়ি থানার সামনের সড়ক তখন অস্থির, উত্তাল এবং স্লোগানে মুখর। বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, তরুণ-তরুণী এবং সাধারণ মানুষ মিলিত হয়েছিল একটি শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচিতে।
সেখানে ছিলেন হান্নান বেপারীও সাধারণ পোশাক, ক্লান্ত মুখ, কিন্তু দৃপ্ত চোখে আশা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন; একটি ন্যায্য সমাজের স্বপ্ন নিয়ে। তিনি তখনও ভাবেননি, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে স্বপ্নটি রক্তাক্ত দুঃস্বপ্নে রূপ নেবে।
কোনো রকম পূর্বঘোষণা বা উস্কানি ছাড়াই, হঠাৎ যাত্রাবাড়ি থানা পুলিশের একটি দল সেখানে হামলা চালায়; সাথে যুক্ত হয় ঘাতক আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বর্বর আক্রমণ। শুরু হয় বেপরোয়া লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ এবং ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। হান্নান, যিনি কখনো কোনো সহিংস রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না, শুধু ন্যায়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, সেই মুহূর্তে ওই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির শিকার হন। ধোঁয়ার কুণ্ডলি, হুলস্থুল চিৎকার, হঠাৎ ছুটোছুটি, আর পুলিশের গর্জনের মধ্যে পড়ে যান তিনি। এক পুলিশ সদস্যের লাঠির আঘাত তাঁর মাথায় সজোরে লাগে, যার ফলে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। আশপাশের কেউ তাঁকে ধরতে পারেনি; সবাই তখন নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত। গুরুতর আহত অবস্থায় পথযাত্রী কয়েকজন মানুষ তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে সিটি স্ক্যান করা হয় এবং চিকিৎসকগণ প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে ছেড়ে দেন, যদিও তখনও মাথায় রক্ত জমাট এবং আঘাতজনিত অসারতা ছিল। ডাক্তারদের এই অবহেলা এবং রোগী চাপের কারণে হয়তো তাঁর আভ্যন্তরীণ জটিলতাগুলো তখন পুরোপুরি চিহ্নিত হয়নি। কিন্তু হান্নান নিজে বুঝতে পারছিলেন সবকিছু ঠিক নেই। প্রথমদিকে স্বাভাবিক থাকলেও কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হয় মাথা ঝিমঝিম করা, ভারী অনুভব, বমি বমি ভাব এবং ঘোরের মধ্যে চলে যাওয়া। এই অবস্থায় ১ সপ্তাহ পরে তিনি যান ঢাকার আল-কারীম হাসপাতালে, যেখানে তাঁকে পর্যবেক্ষণে রেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, মাথায় আঘাতের কারণে স্নায়ুবিক চাপ ও হালকা মস্তিষ্কে রক্ত জমাটের লক্ষণ দেখা দেয়। এর ফলে এখন তিনি আগের মতো শ্রম দিতে পারেন না। একটানা কাজ করলে মাথাব্যথা, দুর্বলতা এবং স্মৃতিভ্রষ্টতার মতো সমস্যায় ভোগেন। একজন শ্রমিকের জীবনে কর্মক্ষমতা মানে বেঁচে থাকার অধিকার। হান্নান সেই অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন এক রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নিষ্ঠুর আঘাতে।
পরবর্তী জীবন; পঙ্গু বাস্তবতা
আঘাতটি ছিল চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার অভিঘাত ছিল স্থায়ী ও মর্মান্তিক। হান্নান হয়তো হাত-পা হারাননি, কিন্তু মস্তিষ্কে পাওয়া গভীর আঘাত তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও কাজের সক্ষমতাকে চিরতরে বিপন্ন করে তোলে। আধুনিক চিকিৎসা তাকে "পঙ্গু" বলে না কিন্তু বাস্তবতা হলো, সে আর আগের মানুষটি নেই। অতীতের মতো তিনি আর দিনে ৮-১০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কারখানার কনভেয়ার লাইনে একটানা কাজ করতে পারেন না। হালকা কাজ করলেও মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম ভাব, মস্তিষ্কে ভারী চাপ এবং মাঝে মধ্যে স্মৃতিভ্রান্তির লক্ষণ দেখা দেয়।
যে হান্নান একদিন মেশিনের শব্দের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে - পেতেন, সেই হান্নান আজ ছোট শব্দেই অস্থির হয়ে ওঠেন। ক্লান্তি যেন তাঁর দেহে স্থায়ী আসন গেড়েছে। এর ফলে তাঁর মাসিক আয়
ভয়াবহভাবে কমে আসে। যেখানে আগে তিনি ১৫,০০০ টাকা আয়
করে কোনোমতে সংসার চালাতেন, এখন সেই আয়ের অর্ধেকও
সম্ভব হয় না। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ছয়; তাঁর বৃদ্ধ পিতা, গৃহবধূ
স্ত্রী এবং দু'টি ছোট সন্তান। তাঁদের সকলের মুখে দু'বেলা খাবার
তুলে দেওয়া, ওষুধ কেনা, বাড়িভাড়া মেটানো এবং সন্তানদের
ভবিষ্যতের চিন্তা সবই যেন আজ এক অদৃশ্য দেয়ালের সামনে ধাক্কা
খেয়ে থমকে গেছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে সন্তানদের।
শিক্ষাজীবনে। বড় ছেলে আব্দুল্লাহকে প্লে-গ্রুপে ভর্তি করেছিলেন
স্বপ্ন নিয়ে, ভাবছিলেন পড়ালেখা শিখে সে একদিন পরিবারকে
দারিদ্র্যের বৃত্ত থেকে বের করে আনবে। কিন্তু এখন, আব্দুল্লাহর
স্কুলের ফি, ইউনিফর্ম, বই কেনা; সব কিছুই যেন অতিরিক্ত বোঝা।
আর ছোট ছেলে রবিউলকে এখনও কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি
করানো যায়নি, কারণ বাড়ির ভাত জোটে না, স্কুলের খরচ মেটাবে কীভাবে? আর হান্নান, তিনি প্রতিদিন ভাঙছেন, মুঠোফোনের স্ক্রিনে কাজ খোঁজার আবেদন করছেন, আবার সন্তানকে মুখে বলছেন, "তুই ঠিকমতো পড়াশোনা কর, বাবা ঠিক হয়ে যাবে।"
এই "ঠিক হয়ে যাওয়া" আজ আর শরীরের সুস্থতার প্রতিশ্রুতি নয়; এটি যেন এক ক্ষীণ আশার রেখা, যা প্রতিদিন নিভে যেতে যেতে টিকে আছে একজন পিতার ভেতরের আত্মত্যাগে।
প্রস্তাবনা
১. আঘাতের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যতদিন প্রয়োজন তা বিনামূল্যে চালু রাখতে হবে।
২. সন্তানদের পড়াশুনার ব্যবস্থা করা।
৩. নিজস্ব একটি ছোট দোকান দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
৪. পরিবারের আয়ের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এবং পুনর্বাসনের জন্য একটি ক্ষুদ্র অনুদান বরাদ্দ দিতে হবে।
এক নজরে মো: হান্নান বেপারী
নাম: মো: হান্নান বেপারী
জন্ম তারিখ: ০৯-০২-১৯৯৪
জন্যস্থান: বরিশাল
পেশা: কারখানা শ্রমিক
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: টুমচর, ইউনিয়ন: চন্দ্রমোহন, থানা: সদর, জেলা: বরিশাল
বর্তমান ঠিকানা: এলাকা: ধলপুর, থানা: যাত্রাবাড়ি, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: বজলু বেপারী
মায়ের নাম: রানী বেগম
পিতার পেশা ও বয়স
বৃদ্ধ, ৬০
মায়ের পেশা ও বয়স: গৃহিনী, ৫৫
মাসিক আয়: ১৫,০০০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৬
সন্ধানদের বিবরণ
১. আব্দুল্লাহ, বয়স: ৫, পেশা: ছাত্র, শ্রেণি: প্লে, সম্পর্ক: ছেলে
২. রবিউল, বয়স: ৪, পেশা, শ্রেণিঃ, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান: যাত্রাবাড়ি থানার সামনে
আহত হওয়ার সময়: ৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৪টা
আক্রমণকারী: পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍