হোম / আহতদের তালিকা / মজাফফর হোসেন
মজাফফর হোসেন

মজাফফর হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : চাকরি

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

ছায়া হয়ে থাকা এক পিতা
মজাফফর হোসেন একজন ষাটোর্ধ্ব পিতা, একজন শ্রমিক, একজন নাগরিক। নীলফামারীর পল্লী থেকে উঠে আসা এই মানুষটি জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন পরিবারের জন্য ঘাম ঝরিয়ে। পিতা ফিরমদ্দিন এবং মাতা আসিয়া বহু আগেই মারা গেছেন, আর সেই অভাব থেকেই জীবনের প্রাথমিক দিনগুলো শুরু হয় এক সংগ্রামী বাস্তবতায়।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় এখন একজন দায়বদ্ধ বাবা। ছয় সন্তানের মধ্যে চারজন এখনো পড়াশোনা করছে, আর সেই খরচ বহন করতে হয় তাঁকেই। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পণ্য ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতেন, নিয়মিত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পৌঁছে দিতেন পণ্য। তাঁর বয়স যতই হোক, কাজের গতিতে তার কোনো ছাড় ছিল না। এ যেন থেমে থাকা জীবনের ভেতরে এক চলমান যুদ্ধ।

ভাঙা হাতে ইতিহাসের সাক্ষী: উত্তরা আন্দোলনের বেদনাবিধুর বিকেল
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, বিকেলের ঠিক তিনটা। উত্তরা এলাকায় তখন উত্তেজনা তুঙ্গে। দেশের নানা প্রান্তে চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। কর্মস্থল থেকে যখন বের হন মজাফফর, তখন তিনি দেখেন তার সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। পুলিশ, সন্ত্রাসী বাহিনী সবাই মিলে দমন করছে সাধারণ মানুষকে।
নিজেকে আর আটকে রাখতে পারেননি তিনি। বয়সের ভার, শরীরের ক্লান্তি, কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। তিনি এগিয়ে যান মিছিলে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ান ছাত্রদের পাশে। কিন্তু এই সাহসিকতার মূল্য তাঁকে দিতে হয় তীব্রভাবে। পুলিশের ছররা গুলি তাঁর বাম হাতে লেগে হাড় ভেঙে দেয় হাড় বের হয়ে আসে, চারপাশ রক্তে ভিজে যায়।
ভাঙা হাত চেপে ধরেই তিনি কেবল একটা চিন্তাই করে যান এই হাতে কি আর কোনোদিন সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সামর্থ্য থাকবে?
কর্মহীন জীবনের চরম বাস্তবতা: নিঃসঙ্গতা, ব্যথা আর অনিশ্চয়তা
এই আঘাতের পর তিনি আর কাজ করতে পারেন না। চাকরি চলে যায়, শহরের বাসা ছেড়ে ফিরে আসেন পল্লীগ্রামের ভাঙাচোরা ঘরে। চিকিৎসা চললেও পরিপূর্ণ আরোগ্য মেলে না। শারীরিকভাবে তিনি এখন দুর্বল, হাতে থাকে ব্যথা, কাজ করতে গেলে অসহ্য যন্ত্রণা হয়।
এখন তিনি নিভৃতে অবস্থান করছেন গ্রামে, যেখানে চিকিৎসা নেই, সহায়তা নেই, আছে শুধু একটি গভীর দুঃখবোধ এই বয়সে সমাজের জন্য কিছু করতে চাওয়ার “অপরাধে” তাঁর এই পরিণতি কেন?
কিন্তু স্বপ্ন এখনো জেগে আছে...
তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। তাঁর দৃষ্টি আজ সন্তানদের দিকে, যাদের তিনি শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চান। তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা এই দেশ হোক ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন। যেখানে তার সন্তানরা মানুষ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে, রক্ত না ঝরিয়েই নিজের অধিকার আদায় করতে পারবে।
মজাফফর হোসেন এখন কেবল একজন আহত শ্রমিক নন, তিনি এই সমাজের প্রতিচ্ছবি যেখানে হাজারো মানুষ চুপচাপ রক্ত দেয়, আর কেউ জানে না সেই রক্ত কবে শুকায়, আর কতটা ব্যথা রেখে যায়।
এক হাত রক্তাক্ত, অন্য হাত খরচের হিসাব চিকিৎসার লড়াইয়ে মজাফফর
আহতের পর পরই মজাফফর হোসেনকে নিয়ে যাওয়া হয় কর্মীটোলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে তাঁকে কেবল সাধারণ একটি ব্যান্ডেজ করে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাঁর গুলিবিদ্ধ, হাড়ভাঙা হাতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এরপর ৫ আগস্ট তিনি ভর্তি হন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে একদিন থেকে বাড়ি ফিরতে হয় চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
অবশেষে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট চিকিৎসার দ্বারস্থ হন মজাফফর। নিজের সঞ্চয় ভেঙে, ধার-দেনা করে চিকিৎসা চালিয়ে যান। তাঁর বা হাতের মাঝখানে গুলি ঢুকে অন্য পাশে বের হয়ে যায় একটি মারাত্মক ক্ষতচিহ্ন রেখে যায় চিরদিনের জন্য।
এই গোটা চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রায় এক লক্ষ টাকার মতো খরচ হয়, যা একজন নিম্নায়ের প্রবীণ মানুষের পক্ষে বহন করা ছিল ভয়াবহরকম কষ্টকর। অথচ এখনো তাঁর হাত পুরোপুরি সুস্থ নয়, ব্যথা রয়ে গেছে, আর সেই সঙ্গে রয়ে গেছে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা।
উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন, নয়তো ব্যথা হবে স্থায়ী
মজাফফর হোসেনের গুলিবিদ্ধ হাত এখনো পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। তার চিকিৎসার পরও বাঁ হাতের হাড় ও স্নায়ুতে স্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা রয়ে গেছে। একাধিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলেও তাতে প্রয়োজনীয় ফল আসেনি। বর্তমানে তিনি নিয়মিত ব্যথায় ভোগেন এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে সক্ষমতা হারিয়েছেন। এই অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, ব্যায়বহুল থেরাপি, এবং নিয়মিত ফলো-আপ জরুরি। কিন্তু চিকিৎসা ব্যয় বহন করা তার একার পক্ষে আর সম্ভব নয়। এজন্য সরকার বা দাতা সংস্থার পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা ও হাসপাতালভিত্তিক বিশেষায়িত চিকিৎসা সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংগ্রামী পিতার গুলিবিদ্ধ নীরবতা
মজাফফর হোসেনের জীবন আমাদের সামনে তুলে ধরে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা যেখানে বয়স, দুঃখ এবং দায়িত্ব একসাথে মিশে এক বৃদ্ধ মানুষকে সংগ্রামের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ষাটের কোঠায় পৌঁছে যাওয়ার পরও তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র ভরসা। সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার দায়ভার কাঁধে নিয়ে তিনি একজন পণ্য ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতেন, যা শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্টসাধ্য হলেও তিনি অবিচল ছিলেন। কিন্তু একটি গুলি তাঁর জীবনকে এক মুহূর্তে পাল্টে দেয়। পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে তাঁর বাম হাতের হাড় ভেঙে বাইরে চলে আসে, এবং সেইসঙ্গে ভেঙে যায় তাঁর জীবনের স্বাভাবিক গতিপথ।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসা, যন্ত্রণা, আর কর্মক্ষমতা হারানোর যে চক্রে তিনি আটকে পড়েছেন, তা শুধু তাঁর একার নয়—তা পুরো পরিবারের ওপর এক গভীর ছায়া ফেলেছে। মজাফফর হোসেন আজ শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, কাজ করতে পারছেন না, এবং দিন কাটছে চিকিৎসার খরচের চিন্তা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায়। কিন্তু এর মধ্যেও তিনি স্বপ্ন দেখেন—দেশ ভালো থাকুক, তাঁর সন্তানেরা বৈষম্যহীন সমাজে বাঁচুক। এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার মানুষদের জীবনে ক্ষত শুধুমাত্র শারীরিক নয়, তা গভীরভাবে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক। মুজাফফরের গল্প সেই সব নিঃশব্দ যোদ্ধাদের স্মরণ করায়, যাঁরা ন্যায়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, আর বিনিময়ে হারিয়েছেন সব।

নাম : মজাফফর হোসেন
জন্ম : ১৩-০৪-১৯৬১
জন্মস্থান : নীলফামারী
নিজ জেলা : নীলফামারী
পেশা : চাকরি
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : প্রাণ কোম্পানির পন্য ডেলিভারি দিত
স্থানীয় ঠিকানা : গ্রাম : উত্তরচান্দ খানা, ইউনিয়ন: কেতকিবাড়ি, থানা: ডেদমার, জেলা: নীলফামারী
বর্তমান ঠিকানা : একই
পিতা : খির মদ্দিন
মাতা : আছিয়া
সন্তানদের পরিচয়
১. সাবু হোসেন, বয়স: ৩৪, পেশা: চাকরি, সম্পক: ছেলে
২. লেবু হোসেন, বয়স: ৩২, পেশা: চাকরি, সম্পক: ছেলে
৩. খোকা হোসেন, বয়স: ২৯, পেশা: চাকরি, সম্পক: ছেলে
৪. মাজেদ ইসলাম, বয়স: ২৫, পেশা: ছাত্র, সম্পর্ক: ছেলে
৫. মমিন ইসলাম, বয়স: ২৫, পেশা: ছাত্র, সম্পর্ক: ছেলে
৬. আসমাউল হুসনা, বয়স: ২০, পেশা: ছাত্র, সম্পক: মেয়ে

আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার সময় : ০২-০৮-২০২৪, শুক্রবার, দুপুর ৩.০০

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍