হোম / আহতদের তালিকা / মোবারক আলী
মোবারক আলী

মোবারক আলী

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : জঅক টেকনিশিয়ান

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আলোর নিচে হারিয়ে যাওয়া একটি চোখ, একটি জীবন
মোবারক আলী একজন সাধারণ টেকনিশিয়ান যিনি শ্রম দিয়ে জীবন গড়েন, ঘাম দিয়ে সন্তানদের মুখে খাবার তোলেন। এসি বা ফ্রিজ নষ্ট হলে কখনো নিজ হাতে, কখনো হেলপারদের সহায়তায় তা ঠিক করেন। এই পেশার জন্য দরকার সূক্ষ্ম দৃষ্টি, ংঃবধফু হাত আর অভিজ্ঞতা। কিন্তু ১৮ জুলাই ২০২৪ সে দিন সব কিছু বদলে দেয়। সৈয়দপুর শহরের ২নং রেলবন্ধী এলাকায় চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশ হঠাৎ ছররা গুলি ও টিয়ারশেল ছুঁড়ে। মোবারক, যিনি সেখানে ছিলেন নির্দোষ একজন প্রত্যক্ষদর্শী, আচমকা তাঁর ডান চোখে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তিনি তখনো জানতেন না, সেই চোখে আর কখনো আলো ফিরবে না।

সুক্ষ্ম কাজের কারিগর আজ অন্যের সহায়তায় বাধ্য
চোখ হারানোর পর মোবারকের জীবনে শুধু আলোই হারায়নি, হারিয়েছে স্বাধীনতা। যে চোখে নির্ভুলভাবে ত্রুটি খুঁজে বের করে একটি যন্ত্র ঠিক করতেন, সেই চোখের অভাবে আজ তিনি অন্যের সহায়তা ছাড়া কাজ করতে পারেন না। সন্তানের মুখ চেয়ে আবার কাজে ফিরেছেন ঠিকই, তবে নিজের ওপর আর আগের মতো ভরসা রাখতে পারেন না। একজন শ্রমজীবী মানুষ যখন শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়ে যান, তখন তার কষ্ট কেবল শারীরিক নয় তা আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং জীবনের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
শ্রমিকের চোখে রক্ত, আর রাষ্ট্র নীরব?
মোবারক আলীর চোখ হারানো কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয় এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনীতির বিবেককে নাড়া দেয়ার মতো এক বাস্তবতা। একজন গরিব শ্রমজীবী মানুষ রাজনীতির বলির পাঠা হয়ে গেলে এবং সেই ব্যথা যদি শাসকের মন ছুঁয়ে না যায় তাহলে এই রাষ্ট্র ফের স্বৈরশাসনের ছায়ায় ঢেকে যেতে বাধ্য। মোবারক আলী সেই হাজারো শ্রমিকের প্রতীক, যাঁরা প্রতিদিন নিপীড়নের শিকার হন, অথচ কারও চোখে পড়েন না। তাঁর চোখে আলো না থাকলেও তাঁর গল্প আলো ফেলতে পারে গোটা জাতির বিবেকে।
চোখের ভেতর গুলি, জীবনের চারপাশে অন্ধকার
আহত হওয়ার পর মোবারক আলীকে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নেয়া হয়। তাঁর ডান চোখের অবস্থান ছিল গুরুতর ছররা গুলির আঘাতে ভেতরের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রক্তক্ষরণ শুরু হয় চোখের ভেতরে। দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার (অপারেশন) করা হয়।
তবে দুঃখজনকভাবে, দীর্ঘ চিকিৎসা ও অপারেশন সত্ত্বেও তাঁর ডান চোখে প্রবেশ করা ছররা গুলিটি বের করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, গুলি এমন একটি স্থানে আটকে আছে যেখানে অপসারণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি যার ফলে একদিকে চোখের আলো হারিয়ে গেছে, অন্যদিকে চোখের মধ্যে থাকা সেই ধাতব অংশ প্রতিনিয়ত ব্যথা, জ্বালা ও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই অবস্থায় মোবারক আলীর জীবনের গতি একপ্রকার থেমে গেছে। যিনি আগে সূক্ষ্ম যন্ত্র মেরামতের কাজ করতেন, তিনি আজ নিজেকে নির্ভরশীল মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করছেন শুধু একটি গুলির জন্য। উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা না হলে ভবিষ্যতে তাঁর অবশিষ্ট দৃষ্টিশক্তিও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এক চোখের ভরসায় আলো টিকিয়ে রাখার লড়াই
মোবারক আলীর ডান চোখে আলো নেই, ছররা গুলির আঘাতে চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছে সে চোখ। এই অবস্থায় চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর বাম চোখটি এখন একমাত্র দৃষ্টির ভরসা। ফলে এই চোখের ওপর প্রতিনিয়ত বাড়তি চাপ পড়ছে যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, মোবারকের বাম চোখটি যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য তাকে নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মাসে অন্তত একবার বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকের অধীনে করাতে হবে। পাশাপাশি তাকে উন্নতমানের চোখের ড্রপ, চশমা ও চোখের বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
এমন একজন আহত শ্রমজীবী মানুষ, যিনি নিজের চোখ হারিয়ে ফেলেছেন, তাঁর জন্য অবশিষ্ট চোখটি বাঁচিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বা সামাজিক তহবিল থেকে মোবারকের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
জীবনের নতুন ভিত্তি নির্মাণে কর্মসংস্থানের প্রয়োজন
মোবারক আলি একজন সংগ্রামী নাগরিক, যিনি আহত হওয়ার পর জীবন ও জীবিকার দিক থেকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আঘাতের পর তাঁর দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পরিবার চালানো তো দূরের কথা, নিজের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াও হয়ে পড়েছে অসম্ভব।
তাঁর মতো একজন আহত মানুষকে শুধুমাত্র সহানুভূতির ভিত্তিতে নয়, বরং স্বনির্ভর জীবনে ফিরিয়ে আনতে একটি টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে মোবারক আলির জন্য একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা, দোকান পরিচালনা অথবা আর্থিক অনুদানে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ উন্মুক্ত করা যেতে পারে।
এর পাশাপাশি, একজন আহত নাগরিক হিসেবে তাঁর জন্য নিয়মিত মাসিক ভাতা নির্ধারণ করা উচিত যা চিকিৎসা, পুষ্টি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে। তাঁর জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল চিকিৎসা নয় নতুন একটি জীবিকা নিশ্চিত করেই পূরণ করা সম্ভব।
একজন আহত মানুষের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট
মোবারক আলির আহত হওয়ার পর তার জীবনে যে আর্থিক সংকট নেমে এসেছে, তা শুধু চিকিৎসা ব্যয়ে সীমাবদ্ধ নয় বরং তার বাসস্থান, জীবিকা ও মানসিক পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা মূলত একটি গভীর সংকট। তাই তাঁর জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক ও মানবিক বাজেট পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হলো।
প্রথমত, তাঁর চলমান চিকিৎসার জন্য ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এবং নিয়মিত ডাক্তারী পরামর্শ বাবদ প্রায় ১,৫০,০০০ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা ও ট্রমা কাটিয়ে উঠতে ফিজিওথেরাপি ও কাউন্সেলিংয়ের মতো পুনর্বাসনমূলক সেবার জন্য প্রায় ৫০,০০০ টাকা বরাদ্দ জরুরি।
আহতের পর তার বসতভিটা কিংবা বাসস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে, এজন্য আনুমানিক ২,০০,০০০ টাকা প্রয়োজন হতে পারে একটি ঘর মেরামত, পুনঃনির্মাণ বা ভাড়া বাবদ। একই সঙ্গে তাঁর আত্মনির্ভরশীল জীবন গড়ার জন্য ছোট পরিসরে একটি দোকান বা ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করতে ১,০০,০০০ টাকার প্রাথমিক পুঁজি বরাদ্দ করা যেতে পারে।
সবশেষে, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানে স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন জীবনযাপনের জন্য প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা হারে এক বছরের জন্য মোট ১,২০,০০০ টাকা ভাতা প্রয়োজন হবে।
এই বিবেচনায় মোবারক আলির চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের জন্য মোট প্রস্তাবিত বাজেট দাঁড়ায় আনুমানিক ৬,২০,০০০ টাকা। এই সহায়তা কেবল একজন আহত নাগরিকের জীবনের দায় মেটাবে না, এটি হবে রাষ্ট্র বা সমাজের পক্ষ থেকে এক ধরনের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব পালনের প্রতীক।

নাম : মোবারক আলী
জন্ম তারিখ : ২৩-০৫-১৯৭৭
জন্মস্থান : নীলফামারী
নিজ জেলা : নীলফামারী
পেশা : জঅক টেকনিশিয়ান
কর্মরত প্রতিষ্ঠান : কন্ট্রাকচুয়াল কাজ করে
স্থানীয় ঠিকানা : গ্রাম: গোলাহাট, ইউনিয়ন: পৌরসভা, থানা: রেনকলনী, জেলা: নীলফামারী
বর্তমান ঠিকানা : ঐ
পিতা : আলী আজগর
মাতা : হাদিসুন্নেছা
মাসিক আয় : ১৫ হাজার
সন্তানদের পরিচয়
১. মেহেরুন্নেছা, বয়স: ১৭, পেশা: শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: মেয়ে
২. হামজা রেজা, বয়স: ৮, পেশা: শিক্ষার্থী, সম্পর্ক: মেয়ে
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার তারিখ ও সময় : ১৮-০৭-২০২৪ দুপুর ২.৩০ মিনিট

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍