হোম / আহতদের তালিকা / হাছান মাহমুদ
হাছান মাহমুদ

হাছান মাহমুদ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

স্বপ্নের বুক চিরে যাওয়া একটি বুলেট

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
আকাশের রঙ যেমন সন্ধ্যায় গাঢ় হয়, তেমনি এক তরুণের জীবনের আলোকছায়া বদলে দেয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসের এক রক্তাক্ত বিকেলে। হাছান মাহমুদ: একজন স্বপ্নচারী ছাত্র, এক সংগ্রামী শ্রমজীবী, এক সন্তান, যে পরিবার নামক ছোট একটি জাহাজকে অভাবের উত্তাল সমুদ্র থেকে টেনে তোলার প্রাণান্ত চেষ্টা করছিল

জন্ম ও পরিচিতি
২০০৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির এক শান্ত সকালে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার ৯নং দেউটি ইউনিয়নের আলিরপার গ্রামে হাসান মাহমুদ জন্মগ্রহণ করেন। সেই গ্রাম যেখানে গ্রীষ্মে গাছের ছায়া দীর্ঘ হয়, বর্ষায় পথঘাট কাদা মাখে, আর সন্ধ্যা নামে মায়াবী আলোয়। সেই মাটির গন্ধ, সেই মানুষদের সরলতা; সব মিলিয়ে এক নৈঃশব্দ্যভরা শৈশব পার করেন হাছান। তাঁর পিতা, মহসিন খান, একজন বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বৃদ্ধ। জীবনের অধিকাংশ সময়ই পাড়ি দিয়েছেন শ্রমের পথ বেয়ে। কখনো কৃষকের পেশায়, কখনো দিনমজুরের বেশে। আর মা রহিমা আক্তার, একটি ঘরের প্রাণ। সংসারের ছেঁড়া জোড়াতালি দেওয়া কাপড়, পাতলা ডাল, আর সন্তানদের স্বপ্নের চাদর বুনে যাওয়া এক নিরলস হাতে গড়া মমতার প্রতীক। এই দম্পতির কাঁধে চেপে ছিল ছয় সদস্যের এক রোজগারে চল্য অভাবগ্রস্ত পরিবার।

শৈশবে হাছানের চোখে ছিল বিস্ময় আর হৃদয়ে ছিল এক অজানা আকুতি। একদিন বড় হয়ে কিছু হবে, মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু দারিদ্রদ্র্য ছিল তার প্রতিটি সকালে ঘুম ভাঙানো এক অভিশপ্ত সঙ্গী। তারপরেও থেমে থাকেনি হাছান। লেখাপড়ার প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। স্কুলশেষে ঝুড়ি হাতে দুধ বিক্রি, সন্ধ্যায় কোনো টেক্সটাইল কারখানায় অতিরিক্ত শ্রম, রাত গভীর হলে বইয়ের পাতায় চোখ রাখা; এভাবেই তার প্রতিদিন গড়ে উঠত। সে জানত, বইয়ের অক্ষর শুধু পাস নম্বর নয়, সেটি মুক্তির হাতিয়ার। কারখানার শব্দের মাঝেও সে খুঁজে নিয়েছিল নিজের ভবিষ্যতের নির্মাণসামগ্রী। হাছান কখনো দুঃখ নিয়ে কথা বলত না, কিন্তু তার চোখে ছিল এক অদৃশ্য যন্ত্রণা; যেখানে স্বপ্ন ছিল

বিশাল, অথচ বান্ধন কমঠো চাল আর পকেটে না থাক টিউশন ফি-র ভয়। যে রেসে অন্যরা কলেজ ক্যাম্পাসে আয়্য দেয়, হাছান তখন কারখানার ভেতর পার্ট বুনত, সুতোর বেলা ঘাম ফেলত। তবুও সে হাল ছাড়েনি। কারণ সে বিশ্বাস করং জীবনের আসল পরাজয় অর্থহীন মৃত্যু নয়, বরং স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেয়া। আর তাই প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত সে গড়েছে নিজের মতো করে, নিঃশব্দে, কিন্তু দৃঢ়তায়।
দ্রোহের দিনগুলো।

একটি বুলেট ও তার ইতিহাস
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ, যেদিন জাতির জড়তাভরা শিরায় শিরায় জেগে উঠেছিল অন্যায়, অবিচার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে জাগরণ। দীর্ঘদিনের ক্ষোয়, বঞ্চনা আর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের আগুন সেদিন দাউ দাউ করে জ্বাল ওঠে। সারা দেশের শহর-নগর, গলি-মহল্লায় উঠতি ছাত্রসময় আর জনতা রাস্তায় নামে। তারা কেউ দলীয় পতাকা বহন করছিল না, তাদের হাতে ছিল না কোনো নেতার ছবি; তাদের হাতে ছিল কেবল দাবি, "আমরা মানুষ, আমাদের অধিকার চাই।"

এই উত্তাল তরঙ্গে হাছান মাহমুদের মতো তরুণের পিছিয়ে থাকেনি। তার রক্তে ছিল প্রতিবাদের রঙ, মনের গভীরে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক দৃঢ় শপথ। দিনে সে ছিল শ্রমিক, রাতে ছাত্র আর ১৬ জুলাইয়ের পর থেকে, সে নতুন জন্মের দিন হয়ে উঠেছিল ১৯ জুলাই। বিকাল তখন প্রায় হয়ে ওঠে এক বিপ্লবী কন্ঠ। তার শেষ দিন ছিল না, কিন্তু এক ৫টা। রায়েরবাগ এলাকার গরম বাতাসে মিশে ছিল শ্লোগনের

সাহার 'বৈষম্য মানি না, অন্যায় সইবো না।" সেই মিছিলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হাছান। স্বপ্ন শোরুমের সামনে নড়িয়ে হাত তুলে দিচ্ছিলেন নির্দেশ: শৃঙ্খলা বজায় রাখার, প্রতিনাদ শান্তিপূর্ণ রাখার। কিন্তু হঠাৎই আকাশ বিদীর্ণ করে আসে লিশের গুলির শব্দ। কোনো পূর্ব সতর্কতা ছিল না, কোনো অলাগ বা অনুরোধ নয়। রক্তপিপাসু হাসিনা সরকারের ঘাতক পুলিশ বাহিনীর সরাসরি প্রাণঘাতী হামলা। আন্দোলনের এক মুহূর্তে একটি বুলেট ছুটে এসে বুকের বাম পাশে বিধে যায়। ধাতব গোলাটি যেন শুধু রক্ত নয়, ইতিহাসও চিরে দেয়।
লিটি শরীরের ভিতর প্রবেশ করে পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গোলও তা চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে তার জীবনে, তার পরিবারে, তব স্বপ্নে। হাঁটু ভেঙে বসে পড়েন হাছান, কিন্তু হৃদয় ভাঙে না।
রকে দিবে তখন ছোটাছুটি, আতঙ্ক, রক্ত, কান্না আর নিস্তব্ধতা। 'কিন্তু সে মুহূর্তেই হাজানের শরীর হয়ে ওঠে একটি বার্তা বহনকারী জমিন যেখানে লেখা থাকে দ্রোহ, সাহস ও সত্যের মহাকাব্য।
একিৎসা ও পুনরুদ্ধারের যুদ্ধ।
যাদাশী গুলিতে রায়েরবাগের রাস্তায় লুটিয়ে পড়ার পর হাছান মাহমুদের জীবন যেন হঠাৎ থমকে যায়। আশেপাশে যারা ছিল

কেউ ছুটে আসে, কেউ ভয় পেয়ে পালায়, কেউ শুধু অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে; যেন মুহূর্তটিকে কেউই ধরতে পারছিল না। শরীর থেকে ঝরে পড়ছিল রক্ত, আর সে রক্ত মাটির উপর আঁকছিল নির্যাতনের এক লাল মানচিত্র।

প্রথমে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় মাতুয়াইল Specialized Medical Care Hospital (SMC) হাসপাতালে। হাসপাতালের করিডোরে চিৎকার, স্যালাইনের নল, রক্তের গন্ধ আর আতঙ্কময় অস্থিরতা: এসবের মাঝেও হাছানের শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার চোখে ছিল স্পষ্ট এক যন্ত্রণা। অল্প কিছু চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালটি দায় এড়িয়ে পাঠিয়ে দেয় ঢাকা মেডিকেলে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সেই 'প্রতীকী মানবিকতা'র সদর দরজায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। উপেক্ষা আর অবহেলার বিরুদ্ধে জীবনের জন্য এক মরিয়া লড়াই।

তিনদিন ধরে হাছান মেডিকেলের বিছানায় পড়ে ছিলেন। মাঝেমধ্যে নার্স আসতেন, কখনও-বা চিকিৎসক এক নজর দেখে চলে যেতেন, কিন্তু যে তৎপরতা থাকা উচিত তা ছিল না। আন্দোলনের দিনগুলোর বিভীষিকায় হাসপাতালগুলোও যেন রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার কারাগারে রূপ নিয়েছিল। তার শরীরে ঢুকেছিল রাষ্ট্রের গুলি, কিন্তু চিকিৎসার বদলে সে পেয়েছিল নিরব প্রতিহিংসা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় হাসানকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার।
বাসায় ফেরার পর শুরু হয় অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা। গুলির ক্ষত থেকে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ, জ্বর, ঘুমহীন রাত। এ যেন শুধু শরীর নয়, আত্মাও কর্কশ এক শোকগাথায় পরিণত হয়েছিল। তিনি যাকে একদিন 'দেহ' বলে চিনতেন, সেই শরীরই এখন তার শত্রু। দিন কাটছে আর্থিক সংকটে, যন্ত্রণা আর উদ্বেগে। পরিবার, যা আগে থেকেই অভাব-অনটনে জর্জরিত ছিল, তাদের উপর নেমে আসে এক বিশাল চিকিৎসা ব্যয়। মা দিনের পর দিন উপোস করে ছেলের জন্য ওষুধ কিনেছেন, বাবা

বয়সের ভারে ন্যুজ হয়েও ছেলের শরীর ঘেঁষে বসে থেকেছেন গভীর রাত পর্যন্ত।
তবে যুদ্ধ এখানেই শেষ হয়নি। হাছান তখন বুঝতে পারেন, শুধু রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, সামাজিক বৈষম্য ও এক নিষ্ঠুর বিচারহীনতার গুলির বিরুদ্ধে নয়, তাকে লড়তে হবে রাষ্ট্রীয় অবহেলা, বিরুদ্ধেও। গুলির চিহ্ন তাঁর শরীরে থেকেও ভেতরে তার স্পর্ধা ছিল অটুট। তিনি জানতেন, এই ক্ষতগুলো একদিন সাক্ষী হয়ে সাঁড়াবে সতোর পক্ষে।

স্বপ্ন এখনও জ্যোৎস্ত্রার মতো ঝাপসা
বুলেটের আঘাতে তিনি আগের মতো শ্রম দিতে পারেন না। জীবন এখন সীমিত, সীমাবদ্ধ। চোখে আগের মতো আলো নেই, শরীরে আগের মতো বল নেই। পলিটেকনিকের ছাত্রটি এখন নিরুদ্দেশ ভবিষ্যতের কঙ্কালসার পথচারী। তবুও হাসান হার

মানেননি। তাঁর চোখে এখা সমাজ যদি তার পাশে দাঁড়া আবার উঠে দাঁড়াবে। পার রেখা আছে, বিশ্বাস আছে। যদি চোখ মেলে চায়, তবে সে
হাজারো নিপীড়িত তরুণের কন্ঠস্বর। যাদের স্বপ্ন রক্তে রিয়ে এই জীবনী কেবল হায়ান মদের নয়, এটি ২০২৪ স গিয়েছিল, কিন্তু যারা আজও নিঃশব্দে বলে যাচ্ছেড়
"আমরা গুলি খেয়েছিলাম, তবুও মাথা নোয়াইনি।"

প্রস্তাবনা
১। চোখের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও বিশেষায়িত পুনর্বাসন চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করানো।
২। আর্থিক সহায়তা ও এককালীন ক্ষতিপূরণ প্রদান।
৩। শিক্ষাজীবন পুনরারম্ভে রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদান।

এক নজরে হাছান মাহমুদ
নাম : হাছান মাহমুদ
জন্ম তারিখ: ২৭-০২-২০০৩
পেশা : ছাত্র
জন্যস্থান : নোয়াখালী
স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম: আলিরপার, ইউনিয়ন: ৯ নং দেউটি, খানা: সোনাইমুড়ি,
জেলা: নোয়াখালী
বর্তমান ঠিকানা
এলাকা: ৩৮/৪৫ মহসিন দেওনীপুর, আলী মো. খান রোড, আদর্শ বাগ, যাত্রাবাড়ি, জেলা: ঢাকা
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম
মায়ের নাম: মহসিন খান
পিতার পেশা ও বয়স: রহিমা আক্তার
মায়ের পেশা ও বয়স বৃদ্ধ, ৬৫
মাসিক আয় গৃহিণী, ৫০
আয়ের উৎস = ১৫,০০০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : কারখানায় শ্রম
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. রাবেয়া সুলতানা পলি, বয়স: ১৬, পেশাঃ ছাত্রী, শ্রেণি। এস এস সি (২০২৫), সম্পর্ক: বোন
আহত হওয়ার স্থান রায়েরবাগ
আহত হওয়ার সময়কাল: ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৫.০০টা
আক্রমণকারী: পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍