মোস্তফা শাকিল
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শিক্ষার্থী (বিএসসি, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
দিনমজুরের ছেলের স্বপ্নজয়
দিনাজপুর সদর থানার কাশিমপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম মোস্তফা শাকিলের। তার পিতা মো: বাবুল হোসেন পেশায় দিনমজুর। মা মোছা: বেলী আরা একজন গৃহিণী। চরম অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যে বড় হওয়া শাকিল ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শিখেছিল নিজের লড়াই তাকে নিজকেই লড়তে হবে। পরিবারের চার জনের সদস্য সংখ্যা নিয়ে এক চিলতে ঘরের ভেতর তার বড় হওয়া। স্কুল জীবনেই সে সিদ্ধান্ত নেয় অভাবের এই চক্র ভাঙতে হবে। শাকিলের সেই নিষ্ঠা ও মেধা তাকে এনে দেয় সাফল্য।
দিনাজপুর থেকে ঢাকায় এসে ভর্তি হন সিটি ইউনিভার্সিটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ কম নয়, কিন্তু শাকিল জানত সংগ্রাম না করলে কিছুই সম্ভব নয়। কিন্তু ঢাকার ব্যয়বহুল জীবনে টিকে থাকা সহজ ছিল না। বাবার দিনমজুরের আয়ে পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব ছিল না। তাই শাকিল শুরু করেন একটি পার্টটাইম চাকরি। একদিকে পড়াশুনা, অন্যদিকে কাজ এই দ্বৈত চাপে চলছিল তার প্রতিদিন। শিক্ষার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল প্রবল, তবে দেশের পরিস্থিতি দেখে তার মনে জেগে ওঠে দায়িত্ববোধও।
প্রতিবাদের আগুনে ঝাঁপ দেওয়া
২০২৪ সালের জুলাই মাস রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। গোটা দেশ জ্বলতে থাকে ক্ষোভে। রাষ্ট্র যখন জনগণের কণ্ঠরোধে গুলি চালায়, তখন চুপ করে থাকেনি শিক্ষার্থীরা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও রাস্তায় নামে। সেই মিছিলে ছিলেন শাকিলও। সকালে ক্লাস, দুপুরে অফিস, আর বিকেলে রাজপথ এটাই ছিল তার জীবনের রুটিন। ৪ আগস্ট থেকে সরকার অফিস-আদালত বন্ধ করে দেয়, কিন্তু আন্দোলন থামে না। শাকিল তখন পূর্ণ উদ্যমে আন্দোলনে যুক্ত হন। ৫ আগস্ট সকাল থেকে তিনি আশুলিয়া থানার সামনে অবস্থান করছিলেন। সেদিন ছিল ইতিহাসের এক নির্মম দিন। শেখ হাসিনা নিরাপদে দেশ থেকে পালিয়ে গেলেও স্বৈরাচারী সরকারের দোসররা ছিল তৎপর। পুলিশ বাহিনীকে করে তুলেছিল নিজেদের দলীয় বাহিনী। তাইতো শেখ হাসিনা পলায়নের পরেও পুলিশ নির্মমভাবে হত্যা করে ছাত্র-জনতাকে। ছাত্র-জনতার ওপর নেমে আসে ভয়াবহ হামলা। পুলিশের হাতে ছিল অস্ত্র, ছাত্রদের হাতে ছিল শুধু সাহস।
গুলির ঝড়ে লুটিয়ে পড়া শরীর
৫ আগস্ট বিকেল ৫টা।
আশুলিয়া থানার সামনে বিশাল ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ। স্বৈরাচারী সরকারের দোসর বাহিনী এবং পুলিশ ও ডিবি পূর্ণদ্যমে গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও বিদেশি অস্ত্র দিয়ে গুলি নিক্ষেপ করতে থাকে। এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে পুলিশ এবং ডিবি বাহিনী। আসরের নামাযের সময় হওয়ার কারণে শাকিল নামাজ পড়ার জন্য রাস্তা পার হতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই একটি গুলি এসে বিঁধে শাকিলের কোমরে, বের হয়ে যায় শরীর চিরে। আরেকটি গুলি তার তলপেটে গেঁথে যায়, ভেতরে রয়ে যায় ধাতব মৃত্যুর অস্ত্র। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে মুহূর্তেই অচেতন হয়ে পড়েন শাকিল। তাকে পড়ে থাকতে দেখা যায় রক্তমাখা জামা পরে রাস্তায়, নিঃসাড়।
চারদিকে তখন কান্না, আতঙ্ক, মানুষের আর্তচিৎকার। সহপাঠীরা কেউ চিৎকার করে ডাকছিল, কেউ রক্ত বন্ধের চেষ্টা করছিল কাপড় ছিঁড়ে। কিন্তু পুলিশ তখনও পিছু হটেনি।
একজন বলছিল, “ভাইরে ধর, গুলি খাইছে!”
অন্যজন বলছিল, “ওরে গাড়ি ডাক, হাসপাতালে নেওন লাগবে! এই ভয়াবহতা ছিল মানবতাকে পদদলিত করার একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিচ্ছবি।
হাসপাতালের বিছানায় একটি জাতির স্বপ্ন
শাকিলকে প্রথমে নিকটস্থ আশুলিয়া শিশু ও নারী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে দ্রুত রেফার করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
আইসিইউতে টানা ১২ দিন তার জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চলে। চিকিৎসকরা জানান, তলপেটে গুলিটা শরীরেই রয়ে গেছে। ফলে হজম ও খাদ্যনালীতে জটিলতা শুরু হয়। তাকে চারবার অপারেশন করতে হয়। প্রায় তিন মাস হাসপাতালে ছিল। চিকিৎসার খরচ বহন করতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারকে। প্রায় ৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অন্তত এক বছর তাকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। তিনি এখন কোনো ধরনের কাজ করতে পারেন না। উঠে দাঁড়ানোও কষ্টসাধ্য।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
এখনো তার একটা অপারেশন বাকি আছে। উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
চিকিৎসা করাতে যে ঋণ হয়েছে তা পরিশোধ কর ও তার স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা।
নাম : মোস্তফা শাকিল
জন্ম তারিখ : ১৩ ডিসেম্বর ১৯৯৯
জন্মস্থান : দিনাজপুর
পেশা : শিক্ষার্থী (বিএসসি, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং)
প্রতিষ্ঠান : সিটি ইউনিভার্সিটি
নিজ জেলা : দিনাজপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: কাশিমপুর, ইউনিয়ন: সিকদার হাট, থানা: সদর, জেলা: দিনাজপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: বাবুল হোসেন
মায়ের নাম : মোছা: বেলী আরা
পিতার পেশা ও বয়স : দিনমজুর, ৪৫
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. হালিমাতুস সাদিয়া, বয়স: ২২, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : আশুলিয়া থানার সামনে
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৫টা
আক্রমণকারী : পুলিশ/ডিবি
দিনাজপুর সদর থানার কাশিমপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম মোস্তফা শাকিলের। তার পিতা মো: বাবুল হোসেন পেশায় দিনমজুর। মা মোছা: বেলী আরা একজন গৃহিণী। চরম অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যে বড় হওয়া শাকিল ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শিখেছিল নিজের লড়াই তাকে নিজকেই লড়তে হবে। পরিবারের চার জনের সদস্য সংখ্যা নিয়ে এক চিলতে ঘরের ভেতর তার বড় হওয়া। স্কুল জীবনেই সে সিদ্ধান্ত নেয় অভাবের এই চক্র ভাঙতে হবে। শাকিলের সেই নিষ্ঠা ও মেধা তাকে এনে দেয় সাফল্য।
দিনাজপুর থেকে ঢাকায় এসে ভর্তি হন সিটি ইউনিভার্সিটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ কম নয়, কিন্তু শাকিল জানত সংগ্রাম না করলে কিছুই সম্ভব নয়। কিন্তু ঢাকার ব্যয়বহুল জীবনে টিকে থাকা সহজ ছিল না। বাবার দিনমজুরের আয়ে পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব ছিল না। তাই শাকিল শুরু করেন একটি পার্টটাইম চাকরি। একদিকে পড়াশুনা, অন্যদিকে কাজ এই দ্বৈত চাপে চলছিল তার প্রতিদিন। শিক্ষার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল প্রবল, তবে দেশের পরিস্থিতি দেখে তার মনে জেগে ওঠে দায়িত্ববোধও।
প্রতিবাদের আগুনে ঝাঁপ দেওয়া
২০২৪ সালের জুলাই মাস রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। গোটা দেশ জ্বলতে থাকে ক্ষোভে। রাষ্ট্র যখন জনগণের কণ্ঠরোধে গুলি চালায়, তখন চুপ করে থাকেনি শিক্ষার্থীরা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও রাস্তায় নামে। সেই মিছিলে ছিলেন শাকিলও। সকালে ক্লাস, দুপুরে অফিস, আর বিকেলে রাজপথ এটাই ছিল তার জীবনের রুটিন। ৪ আগস্ট থেকে সরকার অফিস-আদালত বন্ধ করে দেয়, কিন্তু আন্দোলন থামে না। শাকিল তখন পূর্ণ উদ্যমে আন্দোলনে যুক্ত হন। ৫ আগস্ট সকাল থেকে তিনি আশুলিয়া থানার সামনে অবস্থান করছিলেন। সেদিন ছিল ইতিহাসের এক নির্মম দিন। শেখ হাসিনা নিরাপদে দেশ থেকে পালিয়ে গেলেও স্বৈরাচারী সরকারের দোসররা ছিল তৎপর। পুলিশ বাহিনীকে করে তুলেছিল নিজেদের দলীয় বাহিনী। তাইতো শেখ হাসিনা পলায়নের পরেও পুলিশ নির্মমভাবে হত্যা করে ছাত্র-জনতাকে। ছাত্র-জনতার ওপর নেমে আসে ভয়াবহ হামলা। পুলিশের হাতে ছিল অস্ত্র, ছাত্রদের হাতে ছিল শুধু সাহস।
গুলির ঝড়ে লুটিয়ে পড়া শরীর
৫ আগস্ট বিকেল ৫টা।
আশুলিয়া থানার সামনে বিশাল ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ। স্বৈরাচারী সরকারের দোসর বাহিনী এবং পুলিশ ও ডিবি পূর্ণদ্যমে গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও বিদেশি অস্ত্র দিয়ে গুলি নিক্ষেপ করতে থাকে। এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে পুলিশ এবং ডিবি বাহিনী। আসরের নামাযের সময় হওয়ার কারণে শাকিল নামাজ পড়ার জন্য রাস্তা পার হতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই একটি গুলি এসে বিঁধে শাকিলের কোমরে, বের হয়ে যায় শরীর চিরে। আরেকটি গুলি তার তলপেটে গেঁথে যায়, ভেতরে রয়ে যায় ধাতব মৃত্যুর অস্ত্র। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে মুহূর্তেই অচেতন হয়ে পড়েন শাকিল। তাকে পড়ে থাকতে দেখা যায় রক্তমাখা জামা পরে রাস্তায়, নিঃসাড়।
চারদিকে তখন কান্না, আতঙ্ক, মানুষের আর্তচিৎকার। সহপাঠীরা কেউ চিৎকার করে ডাকছিল, কেউ রক্ত বন্ধের চেষ্টা করছিল কাপড় ছিঁড়ে। কিন্তু পুলিশ তখনও পিছু হটেনি।
একজন বলছিল, “ভাইরে ধর, গুলি খাইছে!”
অন্যজন বলছিল, “ওরে গাড়ি ডাক, হাসপাতালে নেওন লাগবে! এই ভয়াবহতা ছিল মানবতাকে পদদলিত করার একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিচ্ছবি।
হাসপাতালের বিছানায় একটি জাতির স্বপ্ন
শাকিলকে প্রথমে নিকটস্থ আশুলিয়া শিশু ও নারী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে দ্রুত রেফার করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
আইসিইউতে টানা ১২ দিন তার জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চলে। চিকিৎসকরা জানান, তলপেটে গুলিটা শরীরেই রয়ে গেছে। ফলে হজম ও খাদ্যনালীতে জটিলতা শুরু হয়। তাকে চারবার অপারেশন করতে হয়। প্রায় তিন মাস হাসপাতালে ছিল। চিকিৎসার খরচ বহন করতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারকে। প্রায় ৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অন্তত এক বছর তাকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। তিনি এখন কোনো ধরনের কাজ করতে পারেন না। উঠে দাঁড়ানোও কষ্টসাধ্য।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
এখনো তার একটা অপারেশন বাকি আছে। উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
চিকিৎসা করাতে যে ঋণ হয়েছে তা পরিশোধ কর ও তার স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা।
নাম : মোস্তফা শাকিল
জন্ম তারিখ : ১৩ ডিসেম্বর ১৯৯৯
জন্মস্থান : দিনাজপুর
পেশা : শিক্ষার্থী (বিএসসি, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং)
প্রতিষ্ঠান : সিটি ইউনিভার্সিটি
নিজ জেলা : দিনাজপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: কাশিমপুর, ইউনিয়ন: সিকদার হাট, থানা: সদর, জেলা: দিনাজপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: বাবুল হোসেন
মায়ের নাম : মোছা: বেলী আরা
পিতার পেশা ও বয়স : দিনমজুর, ৪৫
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. হালিমাতুস সাদিয়া, বয়স: ২২, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : আশুলিয়া থানার সামনে
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৫টা
আক্রমণকারী : পুলিশ/ডিবি
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍