মো: মনিরুজ্জামান মোল্লা
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
১৯৮২ সালে বাগেরহাটের স্নিগ্ধ গ্রামীণ প্রভাতে জন্ম নেওয়া মনিরুজ্জামান শৈশব থেকেই দারিদ্র্য, পরিশ্রম ও দায়িত্বকে নিত্যসাথী করে জীবনকে চিনেছেন নতুনভাবে। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসে পত্রিকা বিক্রির মতো কঠিন পেশায় ঝাঁপিয়ে পড়েন পরিবারকে টিকিয়ে রাখাই ছিল তাঁর একমাত্র স্বপ্ন। কিন্তু ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কাজলায় আকস্মিক গুলিবর্ষণে বিধ্বস্ত হয় তাঁর জীবন; আহত বাম হাতের যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে যায় সংসারের ভবিষ্যৎ। তবুও তিনি থেমে যাননি ব্যথা, দুঃখ আর প্রতিকূলতার মাঝেও সন্তানের মুখের হাসি ধরে রাখতে আজও লড়ে যাচ্ছেন অক্লান্ত হৃদয়ে। এক সাধাসিধে হকারের ক্ষতবিক্ষত শরীর যেন নীরবে উচ্চারণ করে সংগ্রামী মানুষকে কখনো কোনো আঘাত সত্যিকার অর্থে পরাজিত করতে পারে না।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
আঘাতের হাত ধরে ইতিহাসে উঠে যাওয়া এক জীবন
মো: মনিরুজ্জামান মোল্লা
ক্রমিক: ০২৯
আইডি: ঢাকা সিটি ০২৯
জন্ম ও পরিচিতি
১৯৮২ সালের ৯ জুলাই প্রকৃতির কলরবময় এক সকালে, বাংলাদেশের দক্ষিণ জনপদ বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার এক নিভৃত গ্রাম উত্তর বাঁধালে জন্ম নেন মো: মনিরুজ্জামান মোল্লা। তার জন্ম যেন ছিল নিসর্গের কোলে; মাটির ঘ্রাণ, ধানক্ষেতের সবুজ ঢেউ, আর খালের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হালকা বাতাসের মায়াময় আহ্বানের মাঝে। গ্রামটির অলিগলিতে তখনো বিদ্যুৎ ছুঁতে পারেনি, কিন্তু মানুষের মুখে ছিল আন্তরিকতা, আত্মীয়তার অদৃশ্য এক বন্ধন, আর ছিল সংগ্রামে ঘেরা নিঃস্ব কিন্তু আত্মামর্যাদাসম্পন্ন জীবন।
তাঁর পিতা আব্দুর রহমান ছিলেন একজন কৃষক। মাটির সঙ্গে যাঁর আত্মা জড়ানো ছিল, যিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হালচাষ আর ক্ষেতের কাজ করেই জীবনের অর্থ খুঁজে নিয়েছিলেন। আজ তিনি নেই; তাঁর কবর হয়তো এখনও দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের এক কোনায়, বাঁশঝাড় আর শিমুলগাছের পাশে। মা সামবডু বিবি ছিলেন গৃহিণী, কিন্তু তাঁর জীবন ছিল অনন্ত সংগ্রামের প্রতীক। সংসারের শত অভাব, কষ্ট, অনাহার-অর্ধাহারের মধ্যেও ছেলেমেয়েদের মুখে আহার তুলে দিতে তিনি দিনের পর দিন খালি পেটে থেকেছেন, জোড়াতালি দিয়ে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন। তাঁর মুখে এখনও খুঁজে পাওয়া যায় ক্লান্তির ছাপ, অথচ সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় সেই মুখ আজও আলোকিত।
মনিরুজ্জামানের শৈশব কেটেছে প্রচণ্ড অভাব আর দায়িত্বের ভারে। সকালবেলা কাক ডাকা ভোরে উঠে পুকুরে স্নান, তারপর গরু খোঁয়াড়ে বেঁধে মাকে কাজে সাহায্য করা: এই ছিল তাঁর দৈনন্দিন রুটিন। বিদ্যালয়ের প্রতি কিছুটা টান থাকলেও পেটের দায় তাঁকে বইয়ের পাতা থেকে জীবনের পৃষ্ঠায় টেনে এনেছে। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেননি। দারিদ্রদ্র্য তাঁকে বাধ্য করেছিল শিক্ষার চৌকাঠ ডিঙিয়ে জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে পড়তে। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিতেই তিনি গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন রাজধানী ঢাকায়। এখানে এসেও তাঁর স্বপ্নগুলো বড়জোর কাঁচা ইটের গাদার পাশে ঘুমানো এক হকারের। জীবনের কড়চা বদলে যায়, কিন্তু অভাব বদলায় না। তিনি পত্রিকা বিক্রি করা শুরু করেন। ঢাকার রাস্তায়, বাসস্ট্যান্ডে, মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে হাতে হাতে খবর ছড়িয়ে দিতেন। যেসব খবর অনেক সময় তাঁর নিজের জীবনের কষ্টকেই উপেক্ষা করত। ভোরবেলা ঘুম ভাঙত না কোনো পাখির ডাক বা গ্রামের সরলা প্রকৃতির ছোঁয়ায়, বরং বাস-লরির শব্দে, হর্ন এর হাহাকারে। তখন তিনি বেরিয়ে পড়তেন হাতে পুরোনো এক ব্যাগ নিয়ে, যার ভেতরে থাকত দিনের প্রথম কপি খবরের কাগজ। বিকেলের শেষ আলোয় যখন ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরতেন, তখনো অপেক্ষায় থাকত এক অভাবী সংসার, না খেয়ে থাকা মুখ, আর বাচ্চাদের চোখে জমে থাকা প্রশ্ন "আজ খাবার আনছো তো?"
এ ভাবেই গড়ে উঠেছে মো: মনিরুজ্জামান মোল্লার জীবন, ধীরে ধীরে, ইট-পাথরের শহরে, সংগ্রামের কাদায় পা ডুবিয়ে। তাঁর জন্মস্থানের শেকড় আর ঢাকার জীবনের ফল্গুধারার মাঝে তিনিই হয়ে উঠেছেন এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের সেই লাখো-লাখো মানুষের, যাঁরা নামহীন থেকে গিয়েও যুগের পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে ওঠেন।
ঢাকায় সংগ্রামের দিন
ঢাকা শহরের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত যাত্রাবাড়ীর এক কোণায়, গোবিন্দপুর নামের একটি ঘিঞ্জি পাড়ায়, ভাঙাচোরা এক টিনের ঘরে গাদাগাদি করে গড়ে উঠেছিল মো: মনিরুজ্জামান মোল্লার ছোট্ট একটি পৃথিবী: যেখানে ছিল না কোনো আড়ম্বর, ছিল না কোনো অতীতের গর্ব কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। সেই ঘরের চাল দিয়ে যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন যেন প্রতিটি ফোঁটা পরিবারের জীবনে বয়ে আনে নতুন এক উৎকণ্ঠা। অথচ সেই কুয়াশাঢাকা ঘরেই বাস করতেন মনিরুজ্জামান, তাঁর স্ত্রী, তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া একমাত্র কন্যা রাহিমা ও পরিবারের বাকি সদস্যরা। যে ঘরটির দরজা কখনো সুরক্ষিতভাবে বন্ধ হতো না, সে ঘরই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র আশ্রয়। জীবনের বোঝা তাঁর কাঁধে এতটাই ভারী হয়ে উঠেছিল যে, অনেক সময় নিজেকে বিসর্জন দিয়েই টিকিয়ে রাখতে হতো সংসারের চাকা। পত্রিকা বিক্রি করে রোজগার হতো যা, তা দিয়ে ঠিকঠাক তিন বেলার খাবারও নিশ্চিত করা যেত না। সকাল বেলা রাজধানীর কোলাহলময় রাস্তায়, বাসস্ট্যান্ডে, ফুটওভার ব্রিজে কিংবা ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খবরের কাগজ বিক্রি করতেন। এই সংবাদপত্রে ছাপা হতো দেশের দুর্নীতি, বৈষম্য আর অবিচারের চিত্র: আর সেই সংবাদ বেচতে বেচতেই তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন সে অবিচারের এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি।
মনিরুজ্জামান কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলেন না। তাঁর নামে ছিল না কোনো পদ-পদবি কিংবা ব্যানারে ছাপা ছবি। তিনি ছিলেন একেবারে সাধারণ একজন নাগরিক, যিনি প্রতিদিন সকালে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে জীবনযুদ্ধে নামতেন ঠিক যেমন একজন যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে নামেন। তাঁর পরিচয় ছিল না নেতার মতো প্রভাবশালী, বরং ছিল মাটির গন্ধে ভরা, সাধনার ধুলোয় ছাপা এক যাত্রা। যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসটুকু ছিল অন্তর থেকে জন্ম নেয়া।
তিনি অনুভব করতেন; রাষ্ট্র যদি জনসাধারণের কথা না শোনে, যদি তার আইন ও শাসন হয় ক্ষমতার দাস, তাহলে সাধারণ মানুষও একসময় মুখ তুলে দাঁড়ায়। বৈষম্য, অনাচার, দুর্নীতি এসব শব্দ তাঁর জীবনকে ছুঁয়ে যেত না শুধু সংবাদপত্রের শিরোনামে, বরং প্রতিটি অভুক্ত দুপুর, প্রতিটি অন্ধকার রাত ছিল এর বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
এই সংগ্রামী মানুষটি জীবনের প্রতিটি দিন কাটিয়েছেন অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুদ্ধ করে। কখনো বাসায় ফেরার সময় চিন্তা করতেন, "আজ রাহিমার জন্য কিছু আনতে পারবো তো?" আবার কখনো ভেতরে লুকিয়ে রাখা কষ্টকে চাপা দিয়ে মেয়ের স্কুল ফি'র টাকা যোগাড় করতেন নিজে না খেয়ে থেকে। জীবনের এই মধ্যভাগে তাঁর জীবন ছিল যেন এক দীর্ঘ ক্লান্তির পদযাত্রা, যার প্রতিটি ধাপে ছিল অভাব, কিন্তু সেই অভাবের মধ্যেও ছিল সাহস, দৃঢ়তা আর মানবিক এক দায়বোধ।
এভাবেই চলছিল মনিরুজ্জামানের যন্ত্রণামাখা জীবন। একটি ভাঙা ঘর, অসহায় সংসার, আর রাজধানীর প্রতিটি মোড়ে পত্রিকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটি ছিলেন এই দেশের নিঃশব্দ প্রতিবাদী, যিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ভয় পাননি।
আঘাতের বিকেল এক রক্তাক্ত সন্ধ্যা
দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই; একটি তারিখ, যা শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রক্তে লেখা হয়ে গিয়েছিল অনেক নিরীহ মানুষের জীবনে। সেই সন্ধ্যা যেন ঢাকার আকাশেও রেখে গিয়েছিল এক গভীর বিষণ্ণতার ছায়া। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তখন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের ঢেউ ঢাকায় এসে যেন বিস্ফোরিত হচ্ছিল। যাত্রাবাড়ীর রাস্তাগুলো জ্বলছিল ক্ষোভ আর আকাঙ্ক্ষার আগুনে; ছাত্ররা শ্লোগানে মুখরিত করেছিল আকাশ-বাতাস, রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা দাঁড়িয়েছিল বুক উচিয়ে, সাহসের দীপ্তিতে।
সে সময়, মনিরুজ্জামান মোল্লা প্রতিদিনের মতোই পত্রিকা বিলি করে ফিরছিলেন। ক্লান্ত শরীর, ঘামে ভেজা মুখ, কিন্তু মনটা ছিল সজাগ। হঠাৎ চোখে পড়ে বিশাল একটি মিছিল: ছাত্রদের মিছিল। ওদের চেহারায় ছিল প্রতিজ্ঞার দীপ্তি, স্লোগানে ছিল দেশ বদলের অঙ্গীকার। মনিরুজ্জামান দাঁড়িয়ে যান রাস্তার ধারে, অবাক চোখে দেখেন তরুণদের সাহসী উচ্চারণ। একটিবারের জন্যও নিজের ক্লান্তি মনে পড়ে না। বরং বুকের গভীর থেকে এক অদ্ভুত টান অনুভব করেন। ঠিক তখনই আকাশ যেন বিদীর্ণ করে নামে এক ভয়ংকর ঝড়। পুলিশের পোশাকে আর আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা হঠাৎ করেই হামলে পড়ে মিছিলে। টিয়ারশেলের গ্যাসে চোখে অন্ধকার নামে, গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। রাস্তা জুড়ে ছুটোছুটি, চিৎকার, কান্না আর রক্তের গন্ধ। মনিরুজ্জামান চাইলেই পালিয়ে যেতে পারতেন, নিরাপদে সরে যেতে পারতেন ফুটপাতের কোথায়। কিন্তু না, তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন; দাঁড়িয়ে থাকেন সেই তরুণদের পাশে, যাদের গলায় উচ্চারিত প্রতিবাদ তাঁর নিজের বুকেও গুঞ্জন তুলেছিল।
এক মুহূর্তে, এক আকস্মিক বিকট শব্দে থেমে যায় সবকিছু। একটি গুলি ছুটে এসে বিদ্ধ হয় মনিরুজ্জামানের পিঠে। মুহূর্তেই ঝাঁকুনিতে সারা শরীর শূন্য হয়ে যায়, আর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। গুলির তীব্র ব্যথা আর শরীরের অসারতা তাঁর চেতনা ছিনিয়ে নেয়। চারপাশে। তখন শুধু ভয়, আতঙ্ক, ধোঁয়া আর মৃত্যুর গন্ধ। অনেকেই দৌড়ে পালায়, অনেকেই পড়ে থাকে রাস্তায়। কিন্তু কয়েকজন অচেনা ছাত্র ছুটে আসে, তাদের হাত ধরে মনিরুজ্জামানকে ওঠাতে চেষ্টা করে। তাঁরা কোনো আত্মীয় ছিলেন না, ছিলেন না পরিচিত কেউ। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে তারাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে মানবিক। তাঁরা তাঁকে নিয়ে দৌড়াতে থাকেন মুগদা জেনারেল হাসপাতালের দিকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে নতুন আরেক দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হন। রক্তাক্ত শরীর নিয়েও ভর্তি নেয় না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বারবার বলার পরও দরজা বন্ধ থাকে, চোখ ফিরিয়ে রাখা হয়।
অবশেষে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও আর্তনাদের উত্তাপ ততটা জরুরি ছিল না। ভর্তি করা হয় অনেক দেরিতে। প্রায় তিন ঘণ্টা পর। তার আগেই অজ্ঞান হয়ে যান মনিরুজ্জামান। গুলি যে শুধু তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয়েছিল, তা নয় রাষ্ট্রীয় অবহেলা, বৈষম্য আর নিষ্ঠুরতা যে তাঁর আতত্মাকেও ক্ষতবিক্ষত করেছিল, তা তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসার দীর্ঘ যুদ্ধ
যে সন্ধ্যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন মোঃ মনিরুজ্জামান মোল্লা, সে মুহূর্তটি যেন ছিল তাঁর জীবনের এক নিষ্ঠুর মোড়। আন্দোলনকারী কিছু ছাত্রের অকুন্ঠ মানবিকতায় তিনি পৌঁছান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছেও শেষ হয়নি সেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার সংগ্রাম। গুলির কারণে শরীর থেকে দ্রুত রক্ত ঝরে যেতে থাকে; জীবনের প্রতিটি বিন্দু যেন নিঃশেষ হতে থাকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে। চিকিৎসকরা জানান, অবিলম্বে রক্ত দরকার। শুরু হয় রক্ত যোগাড়ের মরিয়া চেষ্টা। আন্দোলনের সহযোদ্ধারাই তখন হন রক্তদাতা। একে একে দিতে হয় চার ব্যাগ রক্ত।
তারপর ধীরে ধীরে ফেরে জ্ঞান। চোখ খোলে, কিন্তু চোখে ছিল না স্বস্তির আলো। কারণ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটি বিপর্যয়; চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তিনি স্ট্রোক করেন। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের জটিলতায় তাঁর শরীরের একাংশ অসার হয়ে আসে। শুধু পিঠের গুলিবিদ্ধ ক্ষতই নয়, সঙ্গে যোগ হয় ভাঙা বাম হাতের অসহনীয় যন্ত্রণা। সে মুহূর্তে তাঁর শরীর যেন হয়ে ওঠে নিপীড়নের প্রতীক, যেখানে প্রতিটি হাড়, প্রতিটি শিরা বহন করে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার চিহ্ন।
টানা চার মাস ভর্তি থাকতে হয় তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে কাটে দিনের পর দিন; কখনো ব্যথায় কাতর, কখনো দৃষ্টিতে শূন্যতা। শরীর যেন ধীরে ধীরে পরিণত হতে থাকে এক নিঃসঙ্গ শূন্যতায়। চিকিৎসকরা একসময় তাঁকে রেফার করেন পিলখানা হাসপাতালে পুনর্বাসনের জন্য। কিন্তু ততদিনে যা হারানোর ছিল, তা হারিয়েছেন তিনি; তার ভাঙা হাত আর ভাঙা জীবনের নিয়তি তখন যেন একে অপরের প্রতিচ্ছবি। আজও তিনি আগের মতো কাজ করতে পারেন না। এক সময় যে হাত পত্রিকা বিলিয়ে সংসার চালাতো, সেই হাত আজ উঠে না সহজে। ভাঙা হাতের সাথে ভেঙে গেছে জীবনের ছন্দ। সংসার চলছে কোনোরকমে, অনাহারের কিনারায় দাঁড়িয়ে। ছোট কন্যা রাহিমার লেখাপড়া, পরিবারের মৌলিক প্রয়োজনগুলো আজ যেন একেকটি অসমাপ্ত প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জীবনের প্রতিটি দিন।
বিচারের বঞ্চনায়, সহানুভূতির অভাবে আর রাষ্ট্রীয় নির্লিপ্ততার ছায়ায় মো: মনিরুজ্জামান আজ কেবল একজন আহত মানুষ নন; তিনি এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে লেখা আছে প্রান্তিক মানুষের উপর চালানো অবিচার আর রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের ঠাণ্ডা নিষ্ঠুরতার অক্ষয় দলিল।
একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ দাঁড়ানো
মনিরুজ্জামান ছিলেন না কোনো মঞ্চের নেতা, ছিলেন না কোনো রাজনৈতিক পোস্টারের মুখ। কিন্তু তিনি দাঁড়িয়েছিলেন সত্যের পাশে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। একজন শ্রমজীবী হকারের হাতে গুলির দাগ, শরীরে যন্ত্রণার ইতিহাস হয়ে আছে আজকের রাষ্ট্রের নির্যাতনের প্রতীক।
তাঁর জীবনের এ অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়; এ দেশ কেবল বড় বড় মানুষদের নয়, এ দেশ গড়ে ওঠে এমন হাজারো সাধারণের বুকের ওপর দিয়ে। যারা রোজ পত্রিকা বিক্রি করে আমাদের খবর দেয়, তারাই একদিন নিজের রক্ত দিয়ে লিখে দেয় নতুন ইতিহাস।
প্রস্তাবনা
১। বাম হাত ও চোখের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বিদেশে নিজে হলেও।
২। আয়ের উৎস হিসেবে মুদী দোকান ব্যবস্থা করে দেয়া।
৪। সন্তানের পড়াশোনা নিশ্চিত করা।
এক নজরে মো: মনিরুজ্জামান মোল্লা
নাম: মো: মনিরুজ্জামান মোল্লা
জন্ম তারিখ: ০৯-০৭-১৯৮২
জন্মস্থান: বাগেরহাট
পেশা: হকার
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: উত্তর বাঁধাল, থানা: শরণখোলা, জেলা: বাগেরহাট
বর্তমান ঠিকানা: এলাকা: গোবিন্দপুর, থানা: যাত্রাবাড়ি, জেলা/সিটি: ঢাকা সিটি দক্ষিণ
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মৃত আব্দুর রহমান
মায়ের নাম: মোসা সামবডু বিবি
আয়ের উৎস: পেপার বিক্রি করেন (হকার)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৪
সন্তানদের বিবরণ
১. রাহিমা, বয়স: ১১, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: তৃতীয়
২. আঃ রহমান বোখারী
আহত হওয়ার স্থান: কাজলা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যা ৬টা
আক্রমণকারী: সন্ত্রাসী যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ
মো: মনিরুজ্জামান মোল্লা
ক্রমিক: ০২৯
আইডি: ঢাকা সিটি ০২৯
জন্ম ও পরিচিতি
১৯৮২ সালের ৯ জুলাই প্রকৃতির কলরবময় এক সকালে, বাংলাদেশের দক্ষিণ জনপদ বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার এক নিভৃত গ্রাম উত্তর বাঁধালে জন্ম নেন মো: মনিরুজ্জামান মোল্লা। তার জন্ম যেন ছিল নিসর্গের কোলে; মাটির ঘ্রাণ, ধানক্ষেতের সবুজ ঢেউ, আর খালের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হালকা বাতাসের মায়াময় আহ্বানের মাঝে। গ্রামটির অলিগলিতে তখনো বিদ্যুৎ ছুঁতে পারেনি, কিন্তু মানুষের মুখে ছিল আন্তরিকতা, আত্মীয়তার অদৃশ্য এক বন্ধন, আর ছিল সংগ্রামে ঘেরা নিঃস্ব কিন্তু আত্মামর্যাদাসম্পন্ন জীবন।
তাঁর পিতা আব্দুর রহমান ছিলেন একজন কৃষক। মাটির সঙ্গে যাঁর আত্মা জড়ানো ছিল, যিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হালচাষ আর ক্ষেতের কাজ করেই জীবনের অর্থ খুঁজে নিয়েছিলেন। আজ তিনি নেই; তাঁর কবর হয়তো এখনও দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের এক কোনায়, বাঁশঝাড় আর শিমুলগাছের পাশে। মা সামবডু বিবি ছিলেন গৃহিণী, কিন্তু তাঁর জীবন ছিল অনন্ত সংগ্রামের প্রতীক। সংসারের শত অভাব, কষ্ট, অনাহার-অর্ধাহারের মধ্যেও ছেলেমেয়েদের মুখে আহার তুলে দিতে তিনি দিনের পর দিন খালি পেটে থেকেছেন, জোড়াতালি দিয়ে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন। তাঁর মুখে এখনও খুঁজে পাওয়া যায় ক্লান্তির ছাপ, অথচ সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় সেই মুখ আজও আলোকিত।
মনিরুজ্জামানের শৈশব কেটেছে প্রচণ্ড অভাব আর দায়িত্বের ভারে। সকালবেলা কাক ডাকা ভোরে উঠে পুকুরে স্নান, তারপর গরু খোঁয়াড়ে বেঁধে মাকে কাজে সাহায্য করা: এই ছিল তাঁর দৈনন্দিন রুটিন। বিদ্যালয়ের প্রতি কিছুটা টান থাকলেও পেটের দায় তাঁকে বইয়ের পাতা থেকে জীবনের পৃষ্ঠায় টেনে এনেছে। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেননি। দারিদ্রদ্র্য তাঁকে বাধ্য করেছিল শিক্ষার চৌকাঠ ডিঙিয়ে জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে পড়তে। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিতেই তিনি গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন রাজধানী ঢাকায়। এখানে এসেও তাঁর স্বপ্নগুলো বড়জোর কাঁচা ইটের গাদার পাশে ঘুমানো এক হকারের। জীবনের কড়চা বদলে যায়, কিন্তু অভাব বদলায় না। তিনি পত্রিকা বিক্রি করা শুরু করেন। ঢাকার রাস্তায়, বাসস্ট্যান্ডে, মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে হাতে হাতে খবর ছড়িয়ে দিতেন। যেসব খবর অনেক সময় তাঁর নিজের জীবনের কষ্টকেই উপেক্ষা করত। ভোরবেলা ঘুম ভাঙত না কোনো পাখির ডাক বা গ্রামের সরলা প্রকৃতির ছোঁয়ায়, বরং বাস-লরির শব্দে, হর্ন এর হাহাকারে। তখন তিনি বেরিয়ে পড়তেন হাতে পুরোনো এক ব্যাগ নিয়ে, যার ভেতরে থাকত দিনের প্রথম কপি খবরের কাগজ। বিকেলের শেষ আলোয় যখন ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরতেন, তখনো অপেক্ষায় থাকত এক অভাবী সংসার, না খেয়ে থাকা মুখ, আর বাচ্চাদের চোখে জমে থাকা প্রশ্ন "আজ খাবার আনছো তো?"
এ ভাবেই গড়ে উঠেছে মো: মনিরুজ্জামান মোল্লার জীবন, ধীরে ধীরে, ইট-পাথরের শহরে, সংগ্রামের কাদায় পা ডুবিয়ে। তাঁর জন্মস্থানের শেকড় আর ঢাকার জীবনের ফল্গুধারার মাঝে তিনিই হয়ে উঠেছেন এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের সেই লাখো-লাখো মানুষের, যাঁরা নামহীন থেকে গিয়েও যুগের পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে ওঠেন।
ঢাকায় সংগ্রামের দিন
ঢাকা শহরের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত যাত্রাবাড়ীর এক কোণায়, গোবিন্দপুর নামের একটি ঘিঞ্জি পাড়ায়, ভাঙাচোরা এক টিনের ঘরে গাদাগাদি করে গড়ে উঠেছিল মো: মনিরুজ্জামান মোল্লার ছোট্ট একটি পৃথিবী: যেখানে ছিল না কোনো আড়ম্বর, ছিল না কোনো অতীতের গর্ব কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। সেই ঘরের চাল দিয়ে যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন যেন প্রতিটি ফোঁটা পরিবারের জীবনে বয়ে আনে নতুন এক উৎকণ্ঠা। অথচ সেই কুয়াশাঢাকা ঘরেই বাস করতেন মনিরুজ্জামান, তাঁর স্ত্রী, তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া একমাত্র কন্যা রাহিমা ও পরিবারের বাকি সদস্যরা। যে ঘরটির দরজা কখনো সুরক্ষিতভাবে বন্ধ হতো না, সে ঘরই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র আশ্রয়। জীবনের বোঝা তাঁর কাঁধে এতটাই ভারী হয়ে উঠেছিল যে, অনেক সময় নিজেকে বিসর্জন দিয়েই টিকিয়ে রাখতে হতো সংসারের চাকা। পত্রিকা বিক্রি করে রোজগার হতো যা, তা দিয়ে ঠিকঠাক তিন বেলার খাবারও নিশ্চিত করা যেত না। সকাল বেলা রাজধানীর কোলাহলময় রাস্তায়, বাসস্ট্যান্ডে, ফুটওভার ব্রিজে কিংবা ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খবরের কাগজ বিক্রি করতেন। এই সংবাদপত্রে ছাপা হতো দেশের দুর্নীতি, বৈষম্য আর অবিচারের চিত্র: আর সেই সংবাদ বেচতে বেচতেই তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন সে অবিচারের এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি।
মনিরুজ্জামান কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলেন না। তাঁর নামে ছিল না কোনো পদ-পদবি কিংবা ব্যানারে ছাপা ছবি। তিনি ছিলেন একেবারে সাধারণ একজন নাগরিক, যিনি প্রতিদিন সকালে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে জীবনযুদ্ধে নামতেন ঠিক যেমন একজন যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে নামেন। তাঁর পরিচয় ছিল না নেতার মতো প্রভাবশালী, বরং ছিল মাটির গন্ধে ভরা, সাধনার ধুলোয় ছাপা এক যাত্রা। যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসটুকু ছিল অন্তর থেকে জন্ম নেয়া।
তিনি অনুভব করতেন; রাষ্ট্র যদি জনসাধারণের কথা না শোনে, যদি তার আইন ও শাসন হয় ক্ষমতার দাস, তাহলে সাধারণ মানুষও একসময় মুখ তুলে দাঁড়ায়। বৈষম্য, অনাচার, দুর্নীতি এসব শব্দ তাঁর জীবনকে ছুঁয়ে যেত না শুধু সংবাদপত্রের শিরোনামে, বরং প্রতিটি অভুক্ত দুপুর, প্রতিটি অন্ধকার রাত ছিল এর বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
এই সংগ্রামী মানুষটি জীবনের প্রতিটি দিন কাটিয়েছেন অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুদ্ধ করে। কখনো বাসায় ফেরার সময় চিন্তা করতেন, "আজ রাহিমার জন্য কিছু আনতে পারবো তো?" আবার কখনো ভেতরে লুকিয়ে রাখা কষ্টকে চাপা দিয়ে মেয়ের স্কুল ফি'র টাকা যোগাড় করতেন নিজে না খেয়ে থেকে। জীবনের এই মধ্যভাগে তাঁর জীবন ছিল যেন এক দীর্ঘ ক্লান্তির পদযাত্রা, যার প্রতিটি ধাপে ছিল অভাব, কিন্তু সেই অভাবের মধ্যেও ছিল সাহস, দৃঢ়তা আর মানবিক এক দায়বোধ।
এভাবেই চলছিল মনিরুজ্জামানের যন্ত্রণামাখা জীবন। একটি ভাঙা ঘর, অসহায় সংসার, আর রাজধানীর প্রতিটি মোড়ে পত্রিকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটি ছিলেন এই দেশের নিঃশব্দ প্রতিবাদী, যিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ভয় পাননি।
আঘাতের বিকেল এক রক্তাক্ত সন্ধ্যা
দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই; একটি তারিখ, যা শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রক্তে লেখা হয়ে গিয়েছিল অনেক নিরীহ মানুষের জীবনে। সেই সন্ধ্যা যেন ঢাকার আকাশেও রেখে গিয়েছিল এক গভীর বিষণ্ণতার ছায়া। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তখন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের ঢেউ ঢাকায় এসে যেন বিস্ফোরিত হচ্ছিল। যাত্রাবাড়ীর রাস্তাগুলো জ্বলছিল ক্ষোভ আর আকাঙ্ক্ষার আগুনে; ছাত্ররা শ্লোগানে মুখরিত করেছিল আকাশ-বাতাস, রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা দাঁড়িয়েছিল বুক উচিয়ে, সাহসের দীপ্তিতে।
সে সময়, মনিরুজ্জামান মোল্লা প্রতিদিনের মতোই পত্রিকা বিলি করে ফিরছিলেন। ক্লান্ত শরীর, ঘামে ভেজা মুখ, কিন্তু মনটা ছিল সজাগ। হঠাৎ চোখে পড়ে বিশাল একটি মিছিল: ছাত্রদের মিছিল। ওদের চেহারায় ছিল প্রতিজ্ঞার দীপ্তি, স্লোগানে ছিল দেশ বদলের অঙ্গীকার। মনিরুজ্জামান দাঁড়িয়ে যান রাস্তার ধারে, অবাক চোখে দেখেন তরুণদের সাহসী উচ্চারণ। একটিবারের জন্যও নিজের ক্লান্তি মনে পড়ে না। বরং বুকের গভীর থেকে এক অদ্ভুত টান অনুভব করেন। ঠিক তখনই আকাশ যেন বিদীর্ণ করে নামে এক ভয়ংকর ঝড়। পুলিশের পোশাকে আর আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা হঠাৎ করেই হামলে পড়ে মিছিলে। টিয়ারশেলের গ্যাসে চোখে অন্ধকার নামে, গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। রাস্তা জুড়ে ছুটোছুটি, চিৎকার, কান্না আর রক্তের গন্ধ। মনিরুজ্জামান চাইলেই পালিয়ে যেতে পারতেন, নিরাপদে সরে যেতে পারতেন ফুটপাতের কোথায়। কিন্তু না, তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন; দাঁড়িয়ে থাকেন সেই তরুণদের পাশে, যাদের গলায় উচ্চারিত প্রতিবাদ তাঁর নিজের বুকেও গুঞ্জন তুলেছিল।
এক মুহূর্তে, এক আকস্মিক বিকট শব্দে থেমে যায় সবকিছু। একটি গুলি ছুটে এসে বিদ্ধ হয় মনিরুজ্জামানের পিঠে। মুহূর্তেই ঝাঁকুনিতে সারা শরীর শূন্য হয়ে যায়, আর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। গুলির তীব্র ব্যথা আর শরীরের অসারতা তাঁর চেতনা ছিনিয়ে নেয়। চারপাশে। তখন শুধু ভয়, আতঙ্ক, ধোঁয়া আর মৃত্যুর গন্ধ। অনেকেই দৌড়ে পালায়, অনেকেই পড়ে থাকে রাস্তায়। কিন্তু কয়েকজন অচেনা ছাত্র ছুটে আসে, তাদের হাত ধরে মনিরুজ্জামানকে ওঠাতে চেষ্টা করে। তাঁরা কোনো আত্মীয় ছিলেন না, ছিলেন না পরিচিত কেউ। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে তারাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে মানবিক। তাঁরা তাঁকে নিয়ে দৌড়াতে থাকেন মুগদা জেনারেল হাসপাতালের দিকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে নতুন আরেক দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হন। রক্তাক্ত শরীর নিয়েও ভর্তি নেয় না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বারবার বলার পরও দরজা বন্ধ থাকে, চোখ ফিরিয়ে রাখা হয়।
অবশেষে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও আর্তনাদের উত্তাপ ততটা জরুরি ছিল না। ভর্তি করা হয় অনেক দেরিতে। প্রায় তিন ঘণ্টা পর। তার আগেই অজ্ঞান হয়ে যান মনিরুজ্জামান। গুলি যে শুধু তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয়েছিল, তা নয় রাষ্ট্রীয় অবহেলা, বৈষম্য আর নিষ্ঠুরতা যে তাঁর আতত্মাকেও ক্ষতবিক্ষত করেছিল, তা তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসার দীর্ঘ যুদ্ধ
যে সন্ধ্যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন মোঃ মনিরুজ্জামান মোল্লা, সে মুহূর্তটি যেন ছিল তাঁর জীবনের এক নিষ্ঠুর মোড়। আন্দোলনকারী কিছু ছাত্রের অকুন্ঠ মানবিকতায় তিনি পৌঁছান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছেও শেষ হয়নি সেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার সংগ্রাম। গুলির কারণে শরীর থেকে দ্রুত রক্ত ঝরে যেতে থাকে; জীবনের প্রতিটি বিন্দু যেন নিঃশেষ হতে থাকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে। চিকিৎসকরা জানান, অবিলম্বে রক্ত দরকার। শুরু হয় রক্ত যোগাড়ের মরিয়া চেষ্টা। আন্দোলনের সহযোদ্ধারাই তখন হন রক্তদাতা। একে একে দিতে হয় চার ব্যাগ রক্ত।
তারপর ধীরে ধীরে ফেরে জ্ঞান। চোখ খোলে, কিন্তু চোখে ছিল না স্বস্তির আলো। কারণ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটি বিপর্যয়; চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তিনি স্ট্রোক করেন। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের জটিলতায় তাঁর শরীরের একাংশ অসার হয়ে আসে। শুধু পিঠের গুলিবিদ্ধ ক্ষতই নয়, সঙ্গে যোগ হয় ভাঙা বাম হাতের অসহনীয় যন্ত্রণা। সে মুহূর্তে তাঁর শরীর যেন হয়ে ওঠে নিপীড়নের প্রতীক, যেখানে প্রতিটি হাড়, প্রতিটি শিরা বহন করে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার চিহ্ন।
টানা চার মাস ভর্তি থাকতে হয় তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে কাটে দিনের পর দিন; কখনো ব্যথায় কাতর, কখনো দৃষ্টিতে শূন্যতা। শরীর যেন ধীরে ধীরে পরিণত হতে থাকে এক নিঃসঙ্গ শূন্যতায়। চিকিৎসকরা একসময় তাঁকে রেফার করেন পিলখানা হাসপাতালে পুনর্বাসনের জন্য। কিন্তু ততদিনে যা হারানোর ছিল, তা হারিয়েছেন তিনি; তার ভাঙা হাত আর ভাঙা জীবনের নিয়তি তখন যেন একে অপরের প্রতিচ্ছবি। আজও তিনি আগের মতো কাজ করতে পারেন না। এক সময় যে হাত পত্রিকা বিলিয়ে সংসার চালাতো, সেই হাত আজ উঠে না সহজে। ভাঙা হাতের সাথে ভেঙে গেছে জীবনের ছন্দ। সংসার চলছে কোনোরকমে, অনাহারের কিনারায় দাঁড়িয়ে। ছোট কন্যা রাহিমার লেখাপড়া, পরিবারের মৌলিক প্রয়োজনগুলো আজ যেন একেকটি অসমাপ্ত প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জীবনের প্রতিটি দিন।
বিচারের বঞ্চনায়, সহানুভূতির অভাবে আর রাষ্ট্রীয় নির্লিপ্ততার ছায়ায় মো: মনিরুজ্জামান আজ কেবল একজন আহত মানুষ নন; তিনি এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে লেখা আছে প্রান্তিক মানুষের উপর চালানো অবিচার আর রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের ঠাণ্ডা নিষ্ঠুরতার অক্ষয় দলিল।
একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ দাঁড়ানো
মনিরুজ্জামান ছিলেন না কোনো মঞ্চের নেতা, ছিলেন না কোনো রাজনৈতিক পোস্টারের মুখ। কিন্তু তিনি দাঁড়িয়েছিলেন সত্যের পাশে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। একজন শ্রমজীবী হকারের হাতে গুলির দাগ, শরীরে যন্ত্রণার ইতিহাস হয়ে আছে আজকের রাষ্ট্রের নির্যাতনের প্রতীক।
তাঁর জীবনের এ অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়; এ দেশ কেবল বড় বড় মানুষদের নয়, এ দেশ গড়ে ওঠে এমন হাজারো সাধারণের বুকের ওপর দিয়ে। যারা রোজ পত্রিকা বিক্রি করে আমাদের খবর দেয়, তারাই একদিন নিজের রক্ত দিয়ে লিখে দেয় নতুন ইতিহাস।
প্রস্তাবনা
১। বাম হাত ও চোখের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বিদেশে নিজে হলেও।
২। আয়ের উৎস হিসেবে মুদী দোকান ব্যবস্থা করে দেয়া।
৪। সন্তানের পড়াশোনা নিশ্চিত করা।
এক নজরে মো: মনিরুজ্জামান মোল্লা
নাম: মো: মনিরুজ্জামান মোল্লা
জন্ম তারিখ: ০৯-০৭-১৯৮২
জন্মস্থান: বাগেরহাট
পেশা: হকার
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: উত্তর বাঁধাল, থানা: শরণখোলা, জেলা: বাগেরহাট
বর্তমান ঠিকানা: এলাকা: গোবিন্দপুর, থানা: যাত্রাবাড়ি, জেলা/সিটি: ঢাকা সিটি দক্ষিণ
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম: মৃত আব্দুর রহমান
মায়ের নাম: মোসা সামবডু বিবি
আয়ের উৎস: পেপার বিক্রি করেন (হকার)
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: ৪
সন্তানদের বিবরণ
১. রাহিমা, বয়স: ১১, পেশা: ছাত্রী, শ্রেণি: তৃতীয়
২. আঃ রহমান বোখারী
আহত হওয়ার স্থান: কাজলা
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যা ৬টা
আক্রমণকারী: সন্ত্রাসী যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍