হোম / আহতদের তালিকা / মো: তানভীর হোসেন ইমরান
মো: তানভীর হোসেন ইমরান

মো: তানভীর হোসেন ইমরান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

গ্রামের ছেলে ইমরানের স্বপ্নে গড়া সংগ্রামী জীবন
পালপাড়া গ্রামের ছোট্ট একটি ঘরে জন্ম নিয়েছিল এক আশাবাদী শিশু তানভীর হোসেন ইমরান। ২০০৩ সালের ২৬ নভেম্বর দিনাজপুর জেলার হাকিমপুর উপজেলায় জন্ম নেওয়া ইমরান খুব সাধারণ এক পরিবারের সন্তান। তার বাবা মো: মানিক মিয়া একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বয়স ৫৫। মা মোছা: তাহমিনা খাতুন একজন স্নেহময়ী গৃহিণী, বয়স ৪৩। চার সদস্যের পরিবারে ছোট ভাই হাসান তানজিম প্রিন্স, বর্তমানে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছেলেবেলা থেকেই ইমরান ছিল শান্ত, ধীরস্থির আর অসম্ভব মেধাবী।

অন্য ছেলেরা যখন খেলাধুলা বা অবাধ্যতায় মত্ত থাকত, তখন ইমরান বইয়ের পাতায় ডুবে থাকত। পড়ালেখার পাশাপাশি প্রযুক্তির প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল। এসএসসি পাস করার পর সে ভর্তি হয় ডিপ্লোমা ইন শিপ বিল্ডিং বিভাগে। বর্তমানে সে ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। দারিদ্র্য, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, আর প্রতিনিয়ত সংগ্রামের মাঝেও সে ছিল অনড়। বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে, ভাইয়ের ভালো ভবিষ্যৎ গড়তে এবং নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সে দিন-রাত এক করে পড়াশুনা করত। কিন্তু শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্য, দেশের জন্য কিছু করার অদম্য বাসনা জন্ম নেয় তার মনে।
কোটা আন্দোলন একজন ছাত্রের বিবেক জাগরণ
২০১৮ সাল। তখন থেকেই বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ জেগে উঠেছিল। চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ। লাখো শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে এসেছিল। “মেধা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে চাকরি চাই” এই ছিল তাদের মূল স্লোগান। সরকার তখন প্রাথমিকভাবে দাবি মেনে নিলেও পরবর্তীতে হাইকোর্টে আবেদনের প্রেক্ষিতে কোটা ব্যবস্থা আবার পুনর্বহাল করা হয়। ২০২৪ সালের আবারও সেই আগুন জ্বলে ওঠে। কারণ, সরকার কোটা পদ্ধতির নামে এক অস্বচ্ছ ও বৈষম্যমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করছিল। ছাত্র-জনতা আবারও রাস্তায় নামে। ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিল। স্বৈরাচারী সরকার তার পুলিশ বাহিনী এবং ছাত্রলীগকে ছাত্র জনতাকে দমন করার নির্দেশ দেয়। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হলে দেশব্যাপী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দিনাজপুরেও এই আন্দোলনের হাওয়া বইতে থাকে। ইমরান তখন ডিপ্লোমার ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। এবার সে আর নীরব দর্শক নয়, নিজে মিছিলে অংশ নেয়, বন্ধুদের সংগঠিত করে, ক্যাম্পাসে সচেতনতা তৈরি করে।
সে বলে বেড়াত, “এই আন্দোলন শুধু আমার চাকরির জন্য নয়, এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।” ইমরানের চোখে তখন শুধুই ন্যায়বিচার। সে বুঝেছিল, একটি স্বচ্ছ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য সাহসের দরকার হয়। আর সে সাহস সে নিজের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল।
যখন ছাত্রদেরকে থামাতে চায় গুলি ও লাঠি দিয়ে
তারিখ ৪ আগস্ট ২০২৪, সময় সকাল ১১:৩০। দিনাজপুর শহরের হাসপাতাল রোডসংলগ্ন চার মাথা মোড়ে চলছিল শান্তিপূর্ণ মিছিল। কোটা সংস্কার, মেধার মূল্যায়ন ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার দাবিতে মিছিল করছিল শিক্ষার্থীরা। হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, মুখে ছিল স্লোগান, কিন্তু মনে ছিল শুধু একটাই চিন্তা: ন্যায় চাই, জুলুম না। ইমরানও সেই মিছিলের সামনে ছিল। হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মী এবং পুলিশের সাঁজোয়া বহর নিয়ে মিছিলে হানা দেয়। শুরু হয় গুমোট উত্তেজনা, তারপর গুলির শব্দ, কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া, লাঠিপেটা। সাধারণ ছাত্রদের এই শান্তিপূর্ণ মিছিলে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র লোকজন। ছাত্রলীগের কিছু ক্যাডার দেশি-বিদেশি অস্ত্র, লোহার রড, হকিস্টিক, পাইপ নিয়ে হামলা চালায়। তাদের লক্ষ্য ছিল, যারা মিছিলে সক্রিয়, যারা প্রতিবাদ করছে ইমরান ছিল তাদের চোখে প্রধান টার্গেট। তারা তাকে ঘিরে ধরে এলোপাথাড়ি পেটাতে থাকে। মাথায় একের পর এক রডের আঘাত, শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত গড়িয়ে পড়ে, ডান হাতটা ভেঙে যায় নির্মমভাবে।
হাসপাতালের বিছানায় যুদ্ধ
ইমরান যখন রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে ছিল, তখন কয়েকজন ছাত্র ও জনতা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে আসে। তারা তাকে নিকটস্থ সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানায়, তার মাথায় আঘাত পেয়েছে, হাত ভেঙে গেছে, শরীরে অসংখ্য ক্ষত। তিনি সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেন। তার হাত প্লাস্টার করা হয়। বাম হাতের গিরায় এখনো ব্যথা আছে। ডাক্তাররা তাকে গজও করার পরামর্শ দিয়েছেন।
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা
স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দেওয়া।

নাম : মো: তানভীর হোসেন ইমরান
জন্ম তারিখ : ২৬ নভেম্বর ২০০৩
জন্মস্থান : দিনাজপুর
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : ডিপ্লোমা ইন শিপ বিল্ডিং (ফাইনাল ইয়ার)
নিজ জেলা : দিনাজপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: পালপাড়া, ইউনিয়ন: হাকিমপুর পৌরসভা, থানা: হাকিমপুর, জেলা: দিনাজপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মানিক মিয়া
মায়ের নাম : মোছা: তাহমিনা খাতুন
পিতার পেশা ও বয়স : ব্যবসা, ৫৫
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৩
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. হাসান তানজিম প্রিন্স, বয়স: ১৬, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: দশম শ্রেণী, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : চার মাথা মোড়, হাসপাতাল রোড
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১:৩০
আক্রমণকারী : পুলিশ ও আওয়ামী লীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍