হোম / আহতদের তালিকা / মো: রেকাদ হোসেন কাজল
মো: রেকাদ হোসেন কাজল

মো: রেকাদ হোসেন কাজল

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : কৃষক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম, জীবন আর জমির সাথে যুদ্ধ
দিনাজপুর জেলার ছোট্ট এক গ্রাম নাওপাড়া। এখানেই ১৯৮১ সালের ১২ আগস্ট জন্ম নেন মো: রেকাদ হোসেন কাজল। বাবা মো: আবুল কালাম সরদার এখন বৃদ্ধ। কোনো কাজকর্ম করতে পারেন না। মা মোছা: রেশমা বিবি ৭২ বছরের বৃদ্ধা। কাজলের জীবনটা কাটে সংগ্রাম করে। তিনি বড় হন ধানক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে, কাস্তে হাতে, জীবনের কষ্ট ছুঁয়ে। ছোটবেলা থেকেই সংসারের বোঝা কাঁধে তুলে নেন। বিদ্যালয়ে যাওয়া তার জন্য বিলাসিতা হয়ে ওঠে। অভাব তাকে গড়েছে এক ‘সহনশীল’ কৃষকে, তবে ‘নীরব’ নয়। সময় যত গড়ায়, তার ভিতরে জমে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

তিন সন্তান নিয়ে ছোট সংসার। মেয়ে কুসুমকে বিবাহ দিয়েছেন, ছেলে কুতুবউদ্দিন কানন দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। নিজের জীবনটা হয়তো ক্ষুদ্র, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা সমতার সমাজ গড়ার স্বপ্ন তার মনে জ্বলতে থাকে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের পুনরুত্থান (২০১৮-২০২৪)
২০১৮ সালে রাজধানী ঢাকার রাজপথে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, তখন দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রথম বুঝতে শুরু করে, তাদের ভবিষ্যৎ একটি পদ্ধতির ভেতর চাপা পড়ে যাচ্ছে। শিক্ষার সুযোগ, চাকরির প্রতিযোগিতা সব কিছুতেই এক শ্রেণির মানুষের ‘সুবিধা’ অন্যদের বঞ্চনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমে আন্দোলনের চাপে সরকার কোটা তুলে নিলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। বরং উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী ২০২৪ সালের শুরুর দিকে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহাল করা হয়। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে তরুণ সমাজ। ২০২৪ সালের জুন মাসে আবার রাজপথে নামে ছাত্র জনতা। এবার আন্দোলনের রূপ ছিল আরও শক্তিশালী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে #Quota Reform Now হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হয়ে ওঠে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর সর্বত্র ছাত্রদের সমন্বয়ে তৈরি হয় SAD (Students Against Discrimination) নামের প্ল্যাটফর্ম। আন্দোলন গতি পায়। সে সময়ে দিনাজপুরেও ছড়িয়ে পড়ে এই দাবির আগুন। কৃষক কাজল বুঝলেন, এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, একজন পিতা হিসেবে তার ছেলের জন্য, সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য তিনিও দায়ী। তাই তিনি নেমে পড়েন বুকে প্রতিবাদের শক্তি নিয়ে।
ঘটনার বিবরণ
জুলাই ১৮ ২০২৪। চারদিকে তখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলে। ছাত্ররা অলিগলি মহাসড়ক অবরোধ করে তাদের দাবি দাওয়া প্রকাশ করে। আন্দোলনকে প্রতিহত করতে তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি ইন্ধন দেয়। দলীয় ছাত্রদের হাতে লাঠিসোঁটা, রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, স্ট্যাম্প, ককটেল, দেশীয় অস্ত্র, রাইফেল প্রভৃতি তুলে নিতে বলে। সরাসরি পুলিশ বাহিনীকে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, ছররা গুলি ও ফায়ারের নির্দেশ দেয়া হয়। যার নেতৃত্বে ছিল তৎকালীন ঘাতক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এসব বাঁধা অতিক্রম করে এগিয়ে যায় ছাত্ররা। ছাত্ররা শহর থেকে শুরু করে গ্রাম, গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন ৪ আগস্ট ২০২৪ দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে। দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার চারমাথা মোড় সেদিন পরিণত হয়েছিল এক মৃত্যুকূপে, যেখানে ছাত্র, কৃষক, নারী, সাংবাদিক কারোরই রক্ষা ছিল না। সকাল ১১:৩০, মো: রেকাদ হোসেন কাজলসহ স্থানীয় ছাত্র-জনতারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলো। অন্যদিকে স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ ও আওয়ামী বাহিনী যুবলীগ, ছাত্রলীগ দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে ছাত্রদের উপর আক্রমণ করে। পুলিশ উপর্যুপরি গুলি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরে বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ছাত্র-জনতাকে ধরে ধরে আক্রমণ করে। তাদের হাতে ছিল, হকিস্টিক, রড, লাঠি-চাপাতি ও রামদা, পুলিশ প্রথমে ছাত্রদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোঁড়ে। তারপর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ছুটে এসে ধাওয়া করে, যাকে পাচ্ছে তাকে মারছে। কাজল তাদের ঘেরের মধ্যে পড়ে যায়। তাকে হকিস্টিক, রড, বাঁশ, চা পাতি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে। তিনি আঘাত প্রতিরোধ করতে থাকেন হাত দিয়ে। তার হাত রক্তাক্ত হয়। সারা শরীর রক্তে রঞ্জিত হয়। পা, মাথা ও চোখের ভ্রু কেটে যায়। তাকে রক্তাক্ত করে হায়েনারা চলে যায়।
চিকিৎসা
রক্তাক্ত অবস্থায় ছাত্র-জনতা তাকে উদ্ধার করে নিকটস্থ সেবা ডায়াগনস্টিকে নিয়ে গেলে সেখানেও বাধা আসে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগরা তার চিকিৎসা করতে দেয় না। নিরুপায় হয়ে তিনি বাসায় চলে যান ও গোপনে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। ৫ আগস্ট যখন শেখ হাসিনা পলায়ন করেন তখন তিনি আবার হসপিটালে ভর্তি হন। সেখানে তার চোখের পাতায় প্রায় সাতটা সেলাই দেওয়া হয়। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষত হয়ে ব্যথার সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন তিনি সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নেন। তার পায়েও গুরুতর রূপে আঘাতপ্রাপ্ত হন। অনেকখানি কেটে যায় যার কারণে পায় ও সেলাই দিতে হয়। তার চিকিৎসা বাবদ প্রায় ২২ হাজার টাকা ঋণ হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।


নাম : মো: রেকাদ হোসেন কাজল
জন্ম তারিখ : ১২ আগস্ট ১৯৮১
জন্মস্থান : দিনাজপুর
পেশা : কৃষক
নিজ জেলা : দিনাজপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: নাওপাড়া, ইউনিয়ন: বোয়ালদাড়, থানা: হাকিমপুর, জেলা: দিনাজপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: আবুল কালাম সরদার
মায়ের নাম : মোছা: রেশমা বিবি
পিতার পেশা ও বয়স : বৃদ্ধ, ৮২
মায়ের পেশা ও বয়স : বৃদ্ধা, ৭২
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. কুতুবউদ্দিন কানন, বয়স: ১৬, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: ছেলে
২. কুসুম, বয়স: ২১, বিবাহিত, সম্পর্ক : মেয়ে
ঘটনার স্থান : চারমাথা মোড়, হাসপাতাল রোড
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১:৩০ মিনিট
আক্রমণকারী : আওয়ামী লীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍