হোম / আহতদের তালিকা / মোহাম্মদ সামি
মোহাম্মদ সামি

মোহাম্মদ সামি

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মোহাম্মদ সামির জীবন এক কঠিন বাস্তবতার গল্প, যেখানে শৈশব থেমে গেছে দারিদ্রতার বোঝায় আর স্বপ্ন মুছে গেছে মহামারির ঝড়ে। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই গেঞ্জির কারখানায় শ্রমিক হয়ে ওঠা এই কিশোর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আহত হয়েছে পুলিশের গুলিতে, তবুও হারায়নি তার মানবিক সাহস। চিকিৎসার ভারে নুয়ে পড়া পরিবারকে দেখেও সামি আজও স্বপ্ন দেখে আবার স্কুলে ফিরবে। তার জীবনের প্রতিটি আঘাত যেন সমাজকে প্রশ্ন করে একটি শিশুর স্বপ্ন রক্ষায় আমরা কতটুকু দায়বদ্ধ? তবুও সামি বেঁচে আছে একটুকরো আলো আঁকড়ে, নতুন করে দাঁড়িয়ে ওঠার দৃঢ় আশা নিয়ে।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আহত হাতগুলো এখনও আঁকছে পরিবর্তনের দৃঢ় প্রতিচ্ছবি
মোহাম্মদ সামি

ক্রমিক: ০৩০
আইডি: ঢাকা সিটি ০৩০
জন্মপরিচয়
মোহাম্মদ সামি একটি সাধারণ নাম কিন্তু তার জীবনের গল্প একেবারেই সাধারণ নয়। ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর, ঢাকার গোবিন্দপুর এলাকায় জন্ম নেয় এই কিশোর। স্বপ্ন ছিল ছোট থেকেই পড়ালেখা করে একজন ভালো মানুষ হবে, পরিবারের পাশে দাঁড়াবে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল তার জন্য নিষ্ঠুর ও কঠিন।
করোনার মহামারির ভয়াবহ ছোবল কেবল দেশকে না, বহু শিশুর
স্বপ্নকেও গিলে ফেলেছে। সামি তারই একজন। সে সময় তার
পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। বাবা রমজান আলী,
যিনি পেশায় একজন চাকরিজীবী, সেই কঠিন সময়ে আয়
রোজগারে হিমশিম খেতে থাকেন। মা শিল্পি আক্তার একজন
গৃহিণী, সংসারের ভার হাতে নিয়েও সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখা ছিল
তখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই কঠিন বাস্তবতায় সামির শিক্ষাজীবন
থমকে দাঁড়ায়।
যে বয়সে তার হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, সেই বয়সে এখন তার হাতে থাকে গেঞ্জির কাপড় আর সেলাই মেশিন। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই সামি ঢাকার একটি গেঞ্জির কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করে। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র হওয়ার কথা থাকলেও আজ সে একজন খেটে খাওয়া শ্রমিক, জীবনের কঠিন পাঠ যে বইয়ের পাতায় লেখা নেই, তা সে বাস্তবে শিখছে। তবুও সামির চোখে এখনও একটি ক্ষীণ আশার আলো ঝলমল করে। কখনো কখনো কারখানার ছুটির ফাঁকে বন্ধুদের পুরনো বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখে, স্বপ্ন দেখে আবার ক্লাসরুমে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু সে স্বপ্ন এখন অনেক দূরে, অনেক অস্পষ্ট।
সামির গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় দারিদ্র্য, বৈষম্য ও মহামারির মতো বৈশ্বিক দুর্যোগ কীভাবে এক সম্ভাবনাময় শিশুকে শৈশব থেকে ছিটকে এনে পরিণতির বোঝা কাঁধে চাপিয়ে দেয়। এই কিশোর যেন এক নীরব প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সমাজের প্রতি আমরা কি পারি না তার মতো শিশুদের স্বপ্ন রক্ষা করতে। একটু সহানুভূতি, একটু সহায়তা হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে সামির মতো হাজারো শিশুর - হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

পারিবারিক প্রেক্ষাপট
ঢাকা শহরের গবিন্দপুর এলাকার একটি ছোট ঘরে বাস করেন মোহাম্মদ সামি ও তার পরিবার। ঠিকানা বাড়ি নং ১৭/১৩২, ওয়ার্ড নং ৬২, যাত্রাবাড়ি থানা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি। করপোরেশন। পরিবারটি চার সদস্যের হলেও প্রতিটি সদস্যের জীবনে রয়েছে আলাদা এক করুণ অধ্যায়।
সামির বাবা রমজান আলী, বয়স ৪৫, পেশায় একজন চাকরিজীবী। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে যা আয় করেন, তা সংসারের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়। মা শিল্পি আক্তার, বয়স ৩২, একজন গৃহিণী হিসেবে সংসারের যাবতীয় কাজ সামলে রাখেন। তাদের দুই সন্তান সামি ও তার বড় বোন মাইশা আক্তার। মাইশা বর্তমানে প্রীতিলতা কিন্ডার গার্টেনে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে, বয়স মাত্র ১২ বছর। মেয়েটি মেধাবী, কিন্তু পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনে তার শিক্ষাজীবনও ঝুঁকির মুখে।
অন্যদিকে, সামির জীবনেও রয়েছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা। বয়স মাত্র ১৪ হলেও এখন সে একটি গেঞ্জির কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। অথচ এই বয়সে তার থাকার কথা ছিল স্কুলের ক্লাসরুমে, বইয়ের জগতে। করোনার সময় আর্থিক সংকটে পড়ার ফলে তার লেখাপড়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়, আর জীবিকার প্রয়োজনে তাকে নামতে হয় কঠিন শ্রমের জগতে। পরিবারের মাসিক আয় মাত্র ২০,০০০ টাকা যার একাংশ আসে সামির খাঁটি শ্রমের ঘাম ঝরানো উপার্জন থেকে। এই অল্প আয়ের ভেতরে চলে তাদের চার সদস্যের জীবিকা, মাইশার পড়াশোনার খরচ এবং সামির স্বাস্থ্যসেবা। প্রায়ই পরিবারটি অর্থকষ্টে ভুগে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও শিক্ষার পেছনে অর্থ-জোগাড় করা হয়ে ওঠে এক দুরূহ চ্যালেঞ্জ।
এই পরিবারটি আজও মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে সীমিত আয় ও সীমাহীন সংকটের মাঝেও। সামি ও তার পরিবারের গল্প কেবল একটি পরিবারের নয় এটি হাজারো নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিচ্ছবি, যারা অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে বেঁচে থাকে, স্বপ্ন দেখে এবং প্রতিদিন সংগ্রাম করে যাচ্ছে একটা একটু ভালো ভবিষ্যতের আশায়। ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, সময় দুপুর ২টা ৩০ মিনিট। ঢাকা শহরের যাত্রাবাড়ি থানার সামনে চলছিল 'জুলাই আন্দোলন'-এর অংশ হিসেবে এক শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ। চারপাশে সাধারণ মানুষ, ছাত্র-যুবাদের কণ্ঠে ছিল ন্যায্য অধিকার ও গণতন্ত্রের দাবি। সামি সেদিনও সেই প্রতিবাদ মিছিলে ছিলেন। কর্মস্থল সাময়িক বন্ধ থাকায় তার মতো একজন কিশোরেরও সুযোগ হয়েছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ মেলানোর।
অল্প বয়সেই সামি বুঝে গেছে, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মানেই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। কিন্তু তবুও ভয় না পেয়ে সাহসিকতার সঙ্গে সে অংশ নেয় এই আন্দোলনে। ঠিক তখনই ঘটে এক মর্মান্তিক ঘটনা, পুলিশ হঠাৎ করেই নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। সামির একদম কাছেই থাকা এক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সে ভাইটিকে রক্ষা করতে সামি যখন ছুটে যান, তখনই তার জীবনের চাকা ঘুরে যায়। সাহায্য করতে গিয়ে সে নিজেও পুলিশি গুলির শিকার হন। গুলি লাগে তার বাম হাতে। হাড় ভেঙে না গেলেও, ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাতের মূল শিরা (ভেইন)। মুহূর্তের মধ্যেই প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়, আর যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সামি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তার ছোট্ট দেহটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। রক্ত আর ঘামে ভিজে যায় তার জামা কাপড়। তখন মাত্র ১৪ বছর বয়সের একটি ছেলের শরীরে এত বড় আঘাত যেন পুরো জাতিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় কেন একজন শিশু, যে জীবিকার তাগিদে ছোটবেলা থেকেই শ্রমিক হয়ে উঠেছে, তাকেও এ বর্বরতার শিকার হতে হলো? তার অপরাধ কি শুধুই প্রতিবাদে অংশ নেয়া?
সেদিনের ঘটনা সামির জীবনে চিরস্থায়ী ক্ষত রেখে গেছে। তবে তার সাহসিকতা এবং মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। সে শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজেই রক্তাক্ত হয়েছে এটাই তার সত্যিকারের পরিচয়, এক সাহসী কিশোর যোদ্ধা।
চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ
আহত হওয়ার পর দ্রুতই মোহাম্মদ সামিকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু হাতের শিরায় গুলির কারণে অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন উন্নত চিকিৎসার, ফলে তাকে স্থানান্তর করা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, থেরাপি ও বিশেষ যত্ন। এরপরও আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় শেষমেশ তাকে ইবনে সিনা হাসপাতালে নেয়া হয় উন্নত চিকিৎসার জন্য। এই তিনটি ধাপের চিকিৎসা সামির পরিবারের উপর ভয়াবহ আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। সীমিত আয়ের পরিবারটি বাধ্য হয় সমস্ত সঞ্চয় খরচ করে দিতে, এমনকি ধার-দেনাও করে সামির জীবন বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে। বাবা রমজান আলী ও মা শিল্পি আক্তার সন্তানের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়ে নিজেরা অনাহারে থেকেও তার চিকিৎসা চালিয়ে যান।
বর্তমানে সামির অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল। বাম হাতের ক্ষত ধীরে ধীরে শুকিয়ে এলেও তা এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক হালকা কাজ সে করতে পারবে, তবে কোনো ভারী কাজ বা কায়িক পরিশ্রম করলে তা তার হাতের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এখনো মাঝে মাঝে সে ব্যথা অনুভব করে এবং হাতের নড়াচড়া সীমিত থাকে। এক সময় যে সামি শ্রমিক হিসেবে পরিবারের সহায়ক ছিল, আজ সে নিজেই শরীরের দুর্বলতা নিয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু তার পরিবার আশা ছাড়েনি, তারা বিশ্বাস করে, একদিন এই কিশোর আবার নতুন করে উঠে দাঁড়াবে। সে বিশ্বাসই তাদের প্রতিদিনের সাহস। সামির পরিবার করোনা-পূর্বেও স্বল্প আয়ের মধ্যেই জীবন চালাত। কিন্তু করোনা-পরবর্তী সংকট, তার লেখাপড়া বন্ধ হওয়া, অল্প বয়সে শ্রমজীবী হওয়া এবং এখন আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে পরিবারটি এখন দারিদ্রদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে।

এক নজরে মোহাম্মদ সামি
নাম: মোহাম্মদ সামি
জন্ম তারিখ: ৩০-১২-২০১০
স্থায়ী ঠিকানা: গোবিন্দপুর, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
পিতা: রমজান আলী, বয়স ৪৫
মাতা: শিল্পী আক্তার, বয়স ৩২
বোন: মাইশা আক্তার, বয়স ১২
পরিবারে সদস্য সংখ্যা
৪ জন
ভাই-বোনের নাম
১. মাইশা আক্তার, বয়স: ১২, ক্লাস: সপ্তম, পীতিলতা স্কুল
আহত হওয়ার সময়: ৫ আগস্ট, ২০২৪
আক্রমণকারী: পুলিশ
আহত হওয়ার স্থান: যাত্রাবাড়ী, ঢাকা
প্রস্তাবনা
১. সামির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য চিকিৎসা সহায়তা করা
২. সামির বয়স ও আঘাতের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তাকে পুনরায় লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনার জন্য শিক্ষা সহায়তা দেওয়া
৩. পরিবারকে স্বনির্ভর করার জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসা বা বিকল্প আয়মুখী কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে সহায়তা করা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍