হোম / আহতদের তালিকা / মো: মাসুদ রানা
মো: মাসুদ রানা

মো: মাসুদ রানা

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সবুজ গ্রামের আশাবাদী এক সন্তান
১৯৯৮ সালের ২৫ মে, দিনাজপুর জেলার এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর গ্রাম উত্তর সাদীপুরে জন্ম নেন মো: মাসুদ রানা। গ্রামের প্রতিটি সকাল যেন নতুন আশার আলো নিয়ে সূর্য উঠত। মাঠে শস্যের দোল, পাখির কুজন আর বটগাছের ছায়ায় খেলাধুলা এসবের মাঝেই বেড়ে ওঠেন মাসুদ। তাঁর পিতা মো: নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন কৃষক, যিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন সংসারের স্বপ্ন বোনার জন্য। কিন্ত এখন সে আর দুনিয়াতে নাই। তাই পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর মা, মোছা: মাহমুদা বেগমের কাঁধে। একসময় ১০ জন সদস্যের বিশাল পরিবারের চালচলন, শিক্ষা, খাওয়া সব কিছুই নির্ভর করত কৃষিকাজ থেকে আসা অল্প আয় আর মায়ের মমতা ও ত্যাগের উপর।

এ পরিবেশেই মাসুদ রানা বেড়ে ওঠেন। দারিদ্র্য কখনোই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং তা তাকে আরও সংগ্রামী করে তোলে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রামের স্কুলেই সম্পন্ন করেন। ফলাফলে সবসময় শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখেন তিনি। তার একাগ্রতা, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস তাকে পৌঁছে দেয় দিনাজপুর শহরে।
বর্তমানে তিনি দিনাজপুর সরকারি কলেজে গণিত বিষয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তাই ভাই আহসান হাবীব এবং আদরের ছোট বোন বিথি সুলতানাও দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। শিক্ষক, বন্ধু, সহপাঠী সবাই মাসুদের মেধা, নেতৃত্ব আর আন্তরিকতাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে।
বৈষম্যবিরোধী আগুনে জ্বলে ওঠা ছাত্র সমাজ
২০২৪ সালের শুরুতে শিক্ষা ও চাকরির জগতে ঘটে এক ভয়াবহ ঘটনা। সরকারি চাকরিতে একটি রায়ের মাধ্যমে কোটা পুনর্বহাল করা হয়, যেখানে মেধাকে অগ্রাহ্য করে কিছু শ্রেণি বিশেষকে অতিরিক্ত সুবিধা দেয়া হয়। এতে হাজারো মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী ক্ষুব্ধ হয়। তাদের মনে জন্ম নেয় অসন্তোষ, প্রতিবাদ আর ঘৃণা। তারা বুঝে যায়, এই সিদ্ধান্ত শুধু অন্যায় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের আইনগত রূপ। এসব ছাত্র-ছাত্রী আবার রাস্তায় নামে, “কোটা সংস্কার চাই, বৈষম্যের অবসান চাই” এই স্লোগান নিয়ে। ধীরে ধীরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সরকার প্রথমে আন্দোলনকে অবহেলা করে, পরে ভয় পেয়ে দমন নীতি গ্রহণ করে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামে পুলিশ ও ছাত্রলীগ। একের পর এক হয়রানি, গুম, হামলা আর এক পর্যায়ে আবু সাঈদ নামক এক ছাত্রনেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আবু সাঈদের রক্ত যেন সারা দেশের ছাত্র সমাজকে জাগিয়ে তোলে। আন্দোলন পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানে। এই আন্দোলনের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সরকারের অহংকার ও আত্মবিশ্বাস। শহর থেকে গ্রাম, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজ, সরকারি থেকে প্রাইভেট প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন জোরদার হয়। মাসুদ রানাও তখন আর শুধু একজন শিক্ষার্থী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিপ্লবের প্রস্তুত এক সৈনিক।
সংগঠক মাসুদ, ভয় আর ধ্বংসের মুখোমুখি
দিনাজপুর শহরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দিনাজপুর সরকারি কলেজ। এখানেই মাসুদ রানা গঠন করেন “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ফোরাম” নামে একটি সংগঠন, যেখানে জেলার বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, কলেজের শিক্ষার্থী এবং সচেতন তরুণদের নিয়ে তিনি প্রতিবাদ গড়ে তোলেন।
তার নেতৃত্বে প্রতিদিন বড় বড় মিছিল হয়, শিক্ষার্থীদের মাঝে পথসভায় উচ্চারিত হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে অগ্নিঝরা ভাষণ। কিন্তু সরকারের চোখে মাসুদ হয়ে ওঠেন একটি “টার্গেট”। ছাত্রলীগ ও পুলিশ বাহিনী তার ওপর নজরদারি বাড়ায়। এক পর্যায়ে তাকে গোপনে অন্যের বাসায় থাকতে হয় প্রায় ২ দিন। বন্ধু, আত্মীয় বা মেস কোথাও তিনি নিরাপদ ছিলেন না।
৪ আগস্ট ২০২৪ দিনাজপুর জেলার জোড়া ব্রিজ এলাকায় ঘটে এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ছাত্র-জনতা, সাধারণ মানুষ এবং কিছু সংগঠিত শিক্ষক সেখানে শান্তিপূর্ণ অবস্থান গ্রহন করছিল। হঠাৎ পুলিশ ও ছাত্রলীগ একত্র হয়ে অতর্কিতে হামলা চালায়। টিয়ারশেল, ছররা গুলি, রাবার বুলেট, হাতুড়ি, রড, দেশি অস্ত্র সব কিছু দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় জনতার আশা। মাসুদ রানা সেই জনসমুদ্রের সামনে ছিলেন। তিনি দিক নির্দেশনা দিচ্ছিলেন সহপাঠীদের। হঠাৎ একটি ছররা গুলি এসে লাগে তার শরীরে এবং সামনেই টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়া লাগে তার চোখে-মুখে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটানা ছোড়া টিয়ারশেলের আঘাতে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
চিকিৎসা
সাথে সাথে তিনি স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যান কিন্তু সেখানেও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা নজরদারিতে রাখে। যার কারণে তাকে গোপনে চিকিৎসা নিতে হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন। মাঝে মাঝে কোমরের ব্যথা হয়।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে দেয়া।

নাম : মো: মাসুদ রানা
জন্ম তারিখ : ২৫ মে ১৯৯৮
জন্মস্থান : দিনাজপুর
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : দিনাজপুর সরকারি কলেজ (মাস্টার্স, গণিত)
নিজ জেলা : দিনাজপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: উত্তর সাদীপুর, ইউনিয়ন: ১ নং চেহেলগারী, থানা: দিনাজপুর সদর, জেলা: দিনাজপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: নজরুল ইসলাম, মৃত
মায়ের নাম : মোছা: মাহমুদা বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৬৫
আয়ের উৎস : কৃষিকাজ
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ১০ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. আহসান হাবিব, বয়স: ২৭, শিক্ষার্থী, শ্রেণি: মাস্টার্স, সম্পর্ক: ভাই
২. বিথি সুলতানা, বয়স : ২১, শিক্ষার্থী, শ্রেণি: অনার্স, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : জোড়া ব্রিজ, সদর
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ, ছাত্রলীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍