হোম / আহতদের তালিকা / সারোয়ার আহমেদ
সারোয়ার আহমেদ

সারোয়ার আহমেদ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

গরিবের ঘরে জন্ম, সংগ্রামে বেড়ে ওঠা
২০০১ সালের ৩১ ডিসেম্বর দিনাজপুর জেলার সদর থানার ২ নম্বর সুন্দরবন ইউনিয়নের বিরগাঁও গ্রামে জন্ম নেন সারোয়ার আহমেদ। তার বাবা সাদিকুল ইসলাম একজন শিক্ষক, বয়স ৪৩ এবং মা খাদিজা বেগম একজন গৃহিণী, বয়স ৩৮। পরিবারে মোট সদস্য সংখ্যা ৫ জন।
তার ছোট দুই ভাই সাইফুল্লাহ দিনাজপুর সরকারি কলেজ (ডিগ্রি প্রথম বর্ষ) এবং ইব্রাহিম ফুলবন ফাজিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সংসারের আয়ের একমাত্র উৎস বাবার বেতন, যা মাসে মাত্র ১২ হাজার টাকা। এই টাকাতেই চলে পুরো পরিবারের ভরণপোষণ ও সন্তানদের লেখাপড়া।
সারোয়ার ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছিল। লেখাপড়ায় ছিল মনোযোগী এবং পরিবারের কষ্ট তাকে বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। দিনাজপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে ইসলামী ইতিহাস বিষয়ে অনার্স শুরু করেন। এখন তিনি চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। বিপুল দারিদ্র্য আর সীমিত সম্পদের মধ্যেও সারোয়ার বিশ্বাস করতেন শিক্ষা, সাহস আর ন্যায়ের পথেই একটা মানুষ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই সে যুক্ত হয় শিক্ষার্থী অধিকার আদায়ের আন্দোলনে।
জুলাই ২০২৪ কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশ জুড়ে আবারও উত্তাল হয়ে ওঠে “কোটা সংস্কার আন্দোলন”। পূর্বে ২০১৮ সালে এ আন্দোলন শুরু হলেও, বাস্তবসম্মত সংস্কার না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আবার পথে নামে। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজে দেখা দেয় ক্ষোভ। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করতে দিতে হবে, অযৌক্তিক কোটাব্যবস্থা তুলে দিতে হবে।
ঢাকায় আন্দোলনের সূচনা হলেও খুব দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য জেলায়, বিশেষ করে দিনাজপুরে। দিনাজপুর সরকারি কলেজ, জেলা স্কুল এবং আশেপাশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেয়। সারোয়ার আহমেদ ছিলেন এ আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় সদস্য। তিনি মিছিল, লিফলেট বিতরণ, ফেসবুক প্রচারণাসহ সকল রকম সাংগঠনিক কাজে অংশগ্রহণ করেন।
আন্দোলনের দিনগুলো ১৪, ১৬, ১৮ ও ৪ আগস্টের বাস্তবতা
দিনাজপুর সরকারি কলেজ এবং জেলা স্কুলের সামনে বড় ব্রিজ এলাকাটি হয়ে ওঠে আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। ছাত্ররা প্রতিদিন সেখানে জড়ো হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি তুলে ধরতে থাকে।
১৬ জুলাই ২০২৪
এই দিনই প্রথম বড় জমায়েত হয়। জেলা স্কুল, সরকারি কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।
শিক্ষার্থীরা সবাই মিলে কলেজ রোড ব্লকেড করে দেয়। তখন পুলিশ এবং আওয়ামী সন্ত্রাসী ও যুবলীগরা এসে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলন বন্ধ করতে বলে। শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর নির্মমভাবে হামলা করে। সারোয়ার আহমেদ অন্যান্য শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গেলে নিজেও আহত হয়। আওয়ামী ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী আক্রমণের ফলে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
১৮ জুলাই ২০২৪
১৬ তারিখে পুলিশ ও ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে তারা রাস্তায় নামে। হামলার প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ মিছিল করে। মিছিলটা দিনাজপুর জেলা স্কুল থেকে মডার্ন মোড় পার হওয়ার সাথে সাথেই হঠাৎ করে পুলিশ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা দেশি ও বিদেশী অস্ত্র নিয়ে ছাত্রদের উপর আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। লাঠিচার্জ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও টিয়ারশেল ছোড়া হয়। ছাত্রদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় অনেকেই হতাহত হয়। সারোয়ার আহমেদ এদিন মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাত পান। তাঁর শরীরে একাধিক জায়গায় রাবার বুলেট ও লাঠির আঘাত লাগে।
৪ আগস্ট ২০২৪
চৌঠা আগস্ট এক দফার দাবিতে দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এর সামনে সবাই জড়ো হতে থাকে। এই দিনটি হয়ে ওঠে দিনাজপুরের ইতিহাসের এক ভয়াবহতম দিন। সকাল থেকেই ছাত্ররা পলিটেকনিক মোড়ে অবস্থান নেয়। তারা সেখানে সবাইকে একত্রিত করে জোড়া ব্রিজের দিকে মিছিল নিয়ে আগাতে থাকলে জোরা ব্রিজ পার হওয়ার সাথে সাথে হঠাৎ করেই পুলিশ, ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের একটি দল হামলা চালায়।
ছাত্রদের উপর ছোঁড়া হয় টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠি, রড এবং রাবার বুলেট। সারোয়ার সেদিন মারাত্মকভাবে আহত হন। গুলিবিদ্ধ হন তার পিঠ ও উরুতে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে।
এই ঘটনাগুলো ছবিতেও স্পষ্ট। ছাত্ররা নিরস্ত্র, কিন্তু তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে একের পর এক তরুণ।
চিকিৎসা
৪ আগস্ট বিকেলে গুরুতর আহত অবস্থায় সারোয়ারকে প্রথমে দিনাজপুর সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে ইসলামী হাসপাতাল দিনাজপুরে স্থানান্তর করা হয়।
ডাক্তাররা বলেন, তার শরীরে বেশ কিছু গুলি ঢুকে যায়। অপারেশনের মাধ্যমে গুলি বের করা হয়। দীর্ঘ কয়েকদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েন সারোয়ার। অবশেষে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
তবে আজও তার শরীরে সেই গুলির দাগ, ব্যথা আর আন্দোলনের স্মৃতি রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমি নিজের জন্য না, দেশের প্রতিটি তরুণের জন্য লড়েছি। অন্যায় দেখে চুপ থাকলে ইতিহাস আমাকেও ক্ষমা করবে না।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে দেয়া।

নাম : সারোয়ার আহমেদ
জন্ম তারিখ : ৩১ ডিসেম্বর ২০০১
জন্মস্থান : দিনাজপুর
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : দিনাজপুর সরকারি কলেজ (অনার্স চতুর্থ বর্ষ, ইসলামী ইতিহাস)
নিজ জেলা : দিনাজপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: বিরগাঁও, ইউনিয়ন: ২ নং সুন্দরবন, থানা: সদর, জেলা: দিনাজপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : সাদিকুল ইসলাম
মায়ের নাম : খাদিজা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : শিক্ষক, ৪৩
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৮
মাসিক আয় : ১২ হাজার
আয়ের উৎস : বেতন
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. সাইফুল্লাহ, বয়স : ২১, শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ডিগ্রি প্রথম বর্ষ, সম্পর্ক: ভাই
২. ইব্রাহিম, বয়স : ১৭, শিক্ষার্থী, শ্রেণি: নবম, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : বড় ব্রিজ, জেলা স্কুলের সামনে
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই ও ৪ আগস্ট ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍