হোম / আহতদের তালিকা / ওমর ফারুক
ওমর ফারুক

ওমর ফারুক

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

১৯৮৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বরিশালের নিভৃত গ্রাম বাগধায় জন্ম নেওয়া ওমর ফারুক এক হাতেই সংসার, অন্য হাতে মানবতার প্রদীপ জ্বেলে এগিয়ে চলা এক অনমনীয় মানুষ। পেশায় কেয়ার গিভার হলেও তার আসল পরিচয় দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক সাহসী নাগরিক। ২০ জুলাই ২০২৪-এর রক্তাক্ত হামলায় রাবার বুলেটে বিদ্ধ হলেও ন্যায়ের পথে তার দৃঢ়তা এক মুহূর্তও টলেনি। তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ আঁকড়ে রাখা এই সংগ্রামী পিতা নিজের ক্ষতকে শক্তিতে রূপ দেন, আর ছড়িয়ে দেন মানবতার আলো। তার জীবন প্রমাণ করে সত্যের পথে হাঁটা মানুষকে থামানো যায় না, তারা নিজেরাই হয়ে ওঠে সমাজের অনুপ্রেরণা।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জুলাইয়ের রক্তাক্ত বীরেরা আমাদের শিখিয়েছেন বজ্রের মতো শক্তিশালী প্রতিবাদ
ওমর ফারুক
ক্রমিক: ০৩২
আইডি: ঢাকা সিটি ০৩২
পরিচিতি
ওমর ফারুক একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, যার জীবন সংগ্রাম ও মানবিক কার্যক্রম তাকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। তিনি ১৯৮৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের বাগধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোর কাটে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে, যেখানে সহানুভূতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার চর্চা ছিল নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। এ পরিবেশেই গড়ে ওঠে তার মানবিক মূল্যবোধ ও সমাজসেবার আকাঙ্ক্ষা। বর্তমানে তিনি রাজধানী ঢাকার রায়েরবাজার এলাকার হাশেম খান রোডের ৬ তলা গলিতে বসবাস করছেন। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি বেছে নিয়েছেন 'কেয়ার গিভার' হিসেবে কাজ করার পথ যেখানে তিনি শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ, প্রবীণ কিংবা অসহায় মানুষদের ঘরে গিয়ে ব্যক্তিগত সেবা প্রদান করেন। দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে তিনি এই সেবামূলক পেশায় যুক্ত আছেন এবং সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। তার সেবা গ্রহণকারীরা তাকে একজন দয়ালু, দায়িত্বশীল এবং আন্তরিক মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে থাকেন।
শুধু পেশাগত জীবনেই নয়, ওমর ফারুক নিজেকে যুক্ত রেখেছেন সমাজসেবামূলক ও মানবাধিকারভিত্তিক নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। দেশ ও মানবতার কল্যাণে তার নিষ্ঠা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। এসব আন্দোলনে তিনি কেবল সহানুভূতিশীল একজন মানুষ হিসেবেই নয়, বরং এক সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ওমর ফারুকের জীবন কেবল একজন শ্রমজীবীর জীবন নয়, বরং এটি একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের প্রতিচ্ছবি যিনি জীবনযুদ্ধের পাশাপাশি সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াতে কখনো পিছপা হন না। তার জীবন আমাদের শেখায়, সীমিত সামর্থ্য থাকলেও মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব এবং তা-ই একজন মানুষকে মহৎ করে তোলে।
পারিবারিক অবস্থা
ওমর ফারুক শুধু একজন শ্রমজীবী নন, তিনি একই সাথে একজন সংগ্রামী পিতা ও দায়িত্বশীল পরিবারের কর্তা। বর্তমানে তার পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৫ জন। পিতা লাল মিয়া ময়ান্দী ও মাতা গোলেকজান দু'জনেই প্রয়াত, তাই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে সব দায়িত্ব ওমর ফারুকের কাঁধে এসে পড়েছে। তিনি একাই তার তিন সন্তানকে লালন-পালন ও শিক্ষাদানসহ পরিবারের সকল ব্যয়ভার বহন করে চলেছেন।
তার বড় মেয়ে ফাবিহা বুশরা মোহাম্মাদিয়া আলিম মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। দ্বিতীয় সন্তান আব্দুর রহমান (৭ বছর) রায়েরবাজারের 'চেতনা বিকাশ কেন্দ্র'-এর প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তৃতীয় সন্তান আবদুল্লাহর বয়স মাত্র ১ বছর ৮ মাস। সে এখনও শিক্ষা জীবনে প্রবেশ করেনি। এই তিন সন্তানের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও শিক্ষা খরচ মেটানো একজন একক উপার্জনকারীর জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
আন্দোলনের পূর্বে ওমর ফারুক ঢাকার ওয়ারী এলাকায় একজন অসুস্থ রোগীর সেবায় নিযুক্ত ছিলেন এবং সেখান থেকে তিনি প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করতেন। এই সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি সাধ্যমতো পরিবারকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করতেন। কিন্তু আন্দোলনে অংশগ্রহণের পর এক ঘটনায় আহত হয়ে তাকে প্রায় ৯ মাস কর্মহীন অবস্থায় কাটাতে হয়। এ সময় পরিবারে চরম অর্থকষ্ট নেমে আসে, চিকিৎসাব্যয়, সন্তানদের লেখাপড়া, বাড়ি ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাকে তীব্র সংকটে পড়তে হয়।
সম্প্রতি প্রায় তিন মাস ধরে তিনি আবার একজন রোগীর সেবায় নিযুক্ত হয়েছেন এবং পূর্বের মতোই মাসিক ২০ হাজার টাকা আয় করছেন। তবে বর্তমান দ্রব্যমূল্য, সন্তানদের পড়াশুনা, ও চিকিৎসা খরচের কথা বিবেচনায় নিয়ে এই আয় তার পরিবারের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অনেক সময় তাকে ধার-দেনা করেও সংসার চালাতে হয়।
ওমর ফারুকের জীবনের এই বাস্তবতা আমাদের চোখে আনে শ্রমজীবী মানুষের নীরব সংগ্রাম ও আত্মত্মত্যাগের গল্প যারা পরিবার ও সমাজের কল্যাণে নিবেদিত থেকেও নিজের প্রয়োজনগুলো অবহেলিত রেখে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যান।
ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের ২০ জুলাই ছিল ওমর ফারুকের জীবনের এক বেদনাময় ও ভয়াবহ দিন। তিনি সেদিন ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছিলেন। তার এই অংশগ্রহণ আকস্মিক নয়, এর আগে ১৮ জুলাই (২০২৩) থেকে তিনি নিয়মিতভাবে মিছিল, পথসভা, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আহত ও নিপীড়িতদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, দেশ ও মানুষের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে শক্তিশালী করা।
২০ জুলাই দুপুরে তিনি রায়ের বাজার এলাকা থেকে কয়েকজন সহযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে মোহাম্মদপুর ভেড়িবাঁধ হয়ে তিন রাস্তার মোড়ের দিকে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে যোগ দিতে রওনা হন। এটি ছিল একটি শান্তিপূর্ণ গণজমায়েত, যেখানে সাধারণ ছাত্র, যুবক ও পেশাজীবীরা নিজেদের দাবি জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন। ওমর ফারুক ছিলেন সেসব মানুষের একজন, যিনি নিরস্ত্র, নির্ভীক ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন।
কিন্তু বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড় এলাকায় পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, আনসার বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সহযোগী সংগঠন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সমন্বয়ে একটি আক্রমণ চালানো হয়। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে তারা রাবার বুলেট, গুলি, কাঁদানে গ্যাস এবং লাঠিচার্জের মতো ভয়ংকর দমননীতির আশ্রয় নেয়। সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে দমন করতে ব্যবহৃত হয় চরম সহিংসতা।
এই হামলার সময় ওমর ফারুক পুলিশের ছোড়া চারটি রাবার বুলেটে গুরুতরভাবে আহত হন। তার পিঠে, বুকের উপরের অংশে এবং সবচেয়ে ভয়াবহভাবে মাথার সামনে চোখের ওপর রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়। আঘাতের তীব্রতায় তিনি রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। সঙ্গে থাকা সহযোদ্ধারা তৎক্ষণাৎ তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যান এবং প্রাথমিকভাবে রক্তক্ষরণ বন্ধের চেষ্টা করেন।
এই ঘটনাটি শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, বরং এটি শান্তিপূর্ণ মত প্রকাশের ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার একটি নির্মম উদাহরণ। ওমর ফারুকের মতো সাহসী নাগরিকরা গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ানোর যে চেষ্টা করেন, তা যেন দমন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সহানুভূতির দাবিদার।
চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ
২০২৪ সালের ২০ জুলাই বিকেলে মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়ে যৌথ বাহিনীর ছোঁড়া রাবার বুলেটে আহত হওয়ার পর ওমর ফারুক রাস্তায় পড়ে যান। সহযোদ্ধারা তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে প্রাথমিকভাবে রক্ত বন্ধের চেষ্টা করেন। তবে আহত হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর মাগরিবের আজানের আগে, তার শরীরে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে থাকে। অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ব্যথা সত্ত্বেও তিনি কোনো হাসপাতালের সহায়তা না পেয়ে রিকশায় করে নিজ বাসায় ফিরে যেতে বাধ্য হন।
রাতে ব্যথা ভয়ানকভাবে বেড়ে গেলে ওমর ফারুক ইবনে সিনা হাসপাতালে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু সে সময় আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা না দেয়ার মৌখিক নির্দেশ ছিল বলে জানা যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাত ও হুমকি-ধমকির মাধ্যমে তার চিকিৎসা না নেয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, যা ছিল চরম অমানবিক ও পেশাগত দায়িত্বচ্যুতির এক নির্মম উদাহরণ।
হতাশ ওমর ফারুককে হাসপাতাল থেকে কেবল একজন চিকিৎসকের ফোন নম্বর দেয়া হয়। ওই চিকিৎসক তাকে নাপা বা প্যারাসিটামল খাওয়ার পরামর্শ দেন। চারদিন নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার ফলে সাময়িকভাবে কিছুটা আরাম পেলেও, পঞ্চম দিন থেকে আবার তীব্র ব্যথা শুরু হয়। এরপর তিনি নিজ উদ্যোগে সরাসরি সে চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিস্তারিত পরীক্ষা করান। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এক্সরে করালে দেখা যায়, তার মাথা ও পিঠে রাবার বুলেটের টুকরো এখনো রয়ে গেছে। চিকিৎসক জানান, এই বুলেটগুলো অপসারণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ অপারেশন করলে স্নায়ু বা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্ষতি হতে পারে। তাই চিকিৎসক তাকে ওষুধ পর্যবেক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। ওমর ফারুক এরপর টানা এক মাস ওষুধ ও বিশ্রামে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। বর্তমানে কিছুটা সুস্থতা অনুভব করলেও তাঁর শরীরে এখনো পাঁচটি রাবার বুলেট রয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই সেই জায়গাগুলোতে তীব্র ব্যথা হয় এবং দৈনন্দিন কাজে বিঘ্ন ঘটে।
এই অভিজ্ঞতা তাকে শারীরিক কষ্টের চেয়েও বেশি মানসিকভাবে বিপর্যন্ত করেছে, কারণ একজন নাগরিক হিসেবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হয়েও ন্যায্য চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তার চিকিৎসাব্যয় বহন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
প্রস্তাবনা
১. তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
২. একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।



এক নজরে ওমর ফারুক
নাম: ওমর ফারুক
জন্মতারিখ: ২৮-০২-১৯৮৫
পিতা: লাল মিয়া, মৃত
মাতা: গোলেকজান, মৃত
মেয়ে: ফাবিহা বুশরা, ১১ বছর
ছেলে: আব্দুর রহমান, ৮ বছর
ছেলে: আব্দুল্লাহ, ১ বছর
পরিবারে সদস্য সংখ্যা: ৫ জন
স্থায়ী ঠিকানা: বাগধা, আগৈলঝারা, বরিশাল
বর্তমান ঠিকানা: রায়েরবাজার, ঢাকা
আহত হওয়ার তারিখ: ২০ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী: যৌথবাহিনী
আহত হওয়ার স্থান।: মোহাম্মদপুর, ঢাকা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍