হোম / আহতদের তালিকা / মো: জয়নাল
 মো: জয়নাল

মো: জয়নাল

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ব্যবসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও শৈশবের স্মৃতি
মো: জয়নাল। জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭০, রংপুর জেলারই এক সাধারণ গ্রামে। জীবনটা সহজ ছিল না, কিন্তু পরিশ্রম আর সৎপথে চলার চেষ্টা ছিল বরাবরই। বাবা জমির উদ্দিন ও মা ফয়জন উভয়েই আজ মৃত। তবুও তাদের নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা আজও তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। পৈত্রিক কোনো জমি-জমা না থাকায় কিশোর বয়সেই পেটের দায়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন জীবিকার খোঁজে।

জুলাই বিপ্লবের অগ্নিঝরা দিনগুলোর এক রক্তসাক্ষীবর্তমানে তিনি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কুড়িগ্রাম শহরের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিয়ে কিংবা সামাজিক আয়োজনে তার ‘ডেকোরেটর’ ব্যবসার চাহিদা ছিল অনেক। সংসারে ছয়জন সদস্য, যাদের মুখের হাসিই তার পরিশ্রমের প্রেরণা। বড় ছেলে আব্দুস সালাম (বয়স ৩২) বাবার ব্যবসাতেই হাত লাগায়। মেয়ে জয়া (২৫) বিবাহিত এবং শ্বশুরবাড়িতে। ব্যবসার স্বার্থে তিনি কোনো গ্রামে বাসা ভাড়া নিয়ে সংসার চালাতেন। তিনি অনেক ভদ্র ও শান্তশিষ্ট মানুষ। ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি সততার নীতি অবলম্বন করেন। তিনি তার ব্যবসার খরচ দিয়ে সংসারের সকলের ভরণ-পোষণ করতেন। এই সময়ে তিনি বুঝতে পারেন যে, শুধু পরিশ্রমই নয়, বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্য দিয়ে জীবনে এগিয়ে যাওয়া যায়।
উত্তপ্ত সময়, উত্তপ্ত শহর
স্বৈরাচারী সরকার চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে মেধাবীদের বঞ্চিত করে। এরই প্রতিবাদে ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। স্বৈরাচারী সরকার প্রচণ্ড চাপের মুখে কোটা সংস্কার করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। সাময়িকভাবে কোটা সংস্কার হলেও স্থায়ীভাবে এটার সমাধান হচ্ছিল না। যার কারণে চাকরির ক্ষেত্রে আবারও বৈষম্য হয়। ফলস্বরূপ ২০২৪ সালে এসে আবার আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে।
২০২৪ সালের জুলাই মাস। সারাদেশে ছাত্র-জনতার প্রতিবাদে উত্তাল সময়। রংপুরও ব্যতিক্রম ছিল না। শহরের প্রতিটি অলিগলিতে তখন টান টান উত্তেজনা। দোকানদার, রিকশাচালক, স্কুলছাত্র সবাই যেন অনুভব করছিল এক অদৃশ্য চাপ। প্রশাসনের চোখে তখন কেউই নিরাপদ ছিল না। যারাই একটু বেশি কথা বলছে বা জনতার পাশে দাঁড়াচ্ছে তাদের উপরই নেমে আসছে পুলিশি নির্যাতনের খড়গ। জয়নাল সাহেব রাজনীতির লোক নন, আন্দোলনের মাঠেও তাকে দেখা যায়নি কখনো। তিনি শুধু তাঁর ব্যবসা নিয়ে থাকতেন। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার যখন নির্বিচারে ছাত্র ছাত্রীদেরকে গুলি করে হত্যা করছিল তখন তিনিও বসে থাকতে পারেননি। তিনিও দোকান বন্ধ করে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে যোগ দেন।
১৯ জুলাইয়ের দিন রংপুর শহরে ছাত্র-জনতার জমায়েত
১৯ জুলাই ২০২৪। দুপুর ২ টার দিক। রংপুরের পৌর বাজারে এক শান্তিপূর্ণ মিছিলের আয়োজন করা হয়। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসে জড়ো হয়। মিছিলটি শুরু হয় ‘রংপুর সরকারি কলেজ’ গেট থেকে। মিছিল যত এগোয়, ততই ভিড় বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষ, দোকানদার, পথচারীরাও হাত তোলেন ছাত্রদের পক্ষে। মো: জয়নালও তখন বাজারে নিজের ডেকোরেটরের দোকান দেখতে গিয়েছিলেন। জনতার ঢলে তিনি বরং দাঁড়িয়ে যান পাশে শুধু একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নয়, একজন সহানুভূতিশীল নাগরিক হিসেবে।
এদিকে ছাত্ররা মাইকে বলছে, “আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছি, আমাদের দাবিতে সরকার সাড়া দিক।” কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে ছিল সম্পূর্ণ উল্টো প্রস্তুতি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিছিলের সামনে-পেছনে ঘিরে ফেলে পুলিশ ও সাদা পোশাকের আওয়ামী সন্ত্রাস বাহিনী। কোনোরকম পূর্বঘোষণা ছাড়াই শুরু হয় লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, এমনকি গুলিও।
অতর্কিত হামলা: রক্তে রঞ্জিত রংপুর
হঠাৎ করেই শুরু হয় তাণ্ডব। ছাত্র-জনতার হাতে ছিল না কিছুই। তারা শুধু নিজেদের কণ্ঠে প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে ছিল হকস্টিক, লোহার রড, গুলি। বাজারের একপাশে বসে থাকা মো: জয়নাল তখনই আহত হন, যখন এক রাবার বুলেট এসে তাঁর পায়ে লাগে। তিনি পড়ে যান, কিছু বুঝে ওঠার আগেই, তার পাশে এক কিশোর ছাত্রকে লাঠিপেটা করে টেনে নিয়ে যেতে দেখা যায়। পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা ঘরের চোরা গলি, দোকানের আড়াল সব জায়গায় ঢুকে ছাত্রদের খুঁজতে থাকে। রিকশার নিচে লুকিয়ে থাকা ছাত্রকে বের করে এনে মাথায় লাথি মারে। অনেকে হকস্টিক দিয়ে ছাত্রদের পিঠ ভেঙে দেয়। রংপুর শহরের কেন্দ্রস্থল পৌর বাজার পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে। হতাহত হয় অনেকেই।

ট্রমা, ভয় ও চিকিৎসা
মো: জয়নাল যেদিন আহত হন, সে দিনই তাঁকে রংপুর সরকারি মেডিকেল কলেজের নেয়া হয়। কিন্তু সেখানেও ছিল আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হুমকি ও হামলার ভয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তিনি নিজ বাড়িতে চলে যান। ডাক্তারের চিকিৎসায় তিনি কিছুটা সুস্থ হলেও মানসিকভাবে এখনও আতঙ্কিত। তিনি বলেন, আমি তো কোনো দল করিনি, শুধু পাশে দাঁড়িয়েছিলাম ছাত্রদের, ওরাও তো আমার দেশের সন্তান। আজও যখন চোখ বন্ধ করি, দেখি মাঠে পড়ে আছে রক্তমাখা পোশাক, লাঠির শব্দ, ছাত্রদের আর্তনাদ।
এই রক্তাক্ত আন্দোলন শুধু ছাত্রদের নয়, সাধারণ মানুষের শরীরেও ছুঁয়ে গেছে ক্ষত। আজকের এই আন্দোলন একটি ইতিহাস, যেখানে মো: জয়নালদের মতো মানুষ প্রমাণ করেছে, দেশ শুধু তরুণদের নয়, প্রতিটি ন্যায়ের পক্ষে থাকা মানুষের।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: জয়নাল
জন্ম তারিখ : ১ জানুয়ারি ১৯৭০
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : ব্যবসা
প্রতিষ্ঠান : ডেকোরেটর
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : থানা রোড ২, মালাটোল, ইউনিয়ন: রংপুর ৫৪০০, থানা: সদর, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : জমির উদ্দিন, মৃত
মায়ের নাম : ফয়জন, মৃত
আয়ের উৎস : ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. আব্দুস সালাম, বয়স: ৩২, পেশা: ব্যবসা, সম্পর্ক: ছেলে
২. জয়া, বয়স: ২৫, বিবাহিত, সম্পর্ক: মেয়ে
ঘটনার স্থান : পৌর বাজার, রংপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৪টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍