হোম / আহতদের তালিকা / মো: আলাউদ্দিন
মো: আলাউদ্দিন

মো: আলাউদ্দিন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শ্রমিক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শৈশবের রোদঝরা দিনগুলো
রংপুর জেলার পশ্চিম গনেশপুর গ্রামে মো: আলাউদ্দিনের জন্ম হয় ২০০৭ সালের ৬ মে। ছোট একটি পরিবার, তিনজনের সংসার। বাবা মো: আনোয়ার হোসেন পেশায় মাছের আড়োতে কাজ করেন। বয়সের ভারে ন্যূব্জ হলেও প্রতিদিন সকালবেলায় মাছের আড়তে যান। মা লাবনী বেগম একজন গৃহিণী, শান্ত, মমতাময়ী, সংসারের প্রতিটি কোণে যার ছোঁয়া। আলাউদ্দিন ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে, তাই সে-ই ছিল তাদের চোখের মনি। কিন্তু গ্রামীণ জীবনের সহজ সরলতাও ছিল না দুঃখহীন। অর্থনৈতিক অনটন ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। আলাউদ্দিন ছোট থেকেই দেখেছে কীভাবে তার বাবা দিনের পর দিন পরিশ্রম করে সংসার চালায়, আর মা দিনের পর দিন নিজেদের প্রয়োজন কাটছাঁট করে ছেলেকে স্কুলে পাঠান। পড়াশুনার শুরু হয় স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ক্লাসে সবসময় সে ছিল শান্ত, কিন্তু দায়িত্বশীল। সেই ছোট বয়স থেকেই তার চোখে ছিল একরকম পরিপক্বতা, একরকম বোঝাপড়া। যেটা সাধারণত অনেক বড়দের মাঝেও দেখা যায় না।

স্কুল জীবনের প্রেরণা ও প্রতিবন্ধকতা
আলাউদ্দিনের স্কুল জীবন খুব জটিল ছিল না, তবে সহজও বলা যাবে না। অভাব-অনটন কখনও তাকে দমাতে পারেনি, বরং আরও দায়িত্বশীল করেছে। স্কুলশেষে বাড়িতে এসে মায়ের কাজে সাহায্য করত, বাবার জন্য ঝুড়ি নিয়ে বাজারে যেত। ক্লাসের পড়া সে রাত জেগে শেষ করত।
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সে ভালোভাবেই পড়ে। কিন্তু অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর আর এগোতে পারেনি। পরিবারে উপার্জনের একমাত্র ভরসা বাবা, আর তিনি বয়সের ভারে ক্লান্ত। তখন আলাউদ্দিন বুঝে ফেলে, এখন আর স্কুল নয়, সংসার চালাতে হবে। তাই স্থানীয় এক পারটেক্সের দোকানে কাজ নেয়। সারাদিন কাঠ, আঠা আর ধুলাবালির ভেতর কাজ করে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত তাদের অতি কষ্টের সংসার।
সংসারের বোঝা কাঁধে তুলে নেয়া এক কিশোর
অষ্টম শ্রেনি পাস করার পর আলাউদ্দিনের জীবনটা বদলে যায়। প্রতিদিন সকাল ৭টায় দোকানে যেত, সন্ধ্যায় ফিরে ক্লান্ত শরীরে বাবা-মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসত। তার সেই হাসির আড়ালেই লুকিয়ে ছিল না বলা হাজার কষ্ট। বাবা মাছের আড়তে কাজ করতেন, কিন্তু বয়স বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো আয় করতে পারতেন না। মা গৃহস্থালির কাজ সামলে সামলাতেন।
তিনজনের সংসারে মাস শেষে হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে যেত। আলাউদ্দিন তবু একদিনও অভিযোগ করেনি। বরং প্রতিদিন নিজের জীবনকে প্রস্তুত করছিল নতুন দিনের জন্য, নতুন দায়িত্বের জন্য। এখনো তার পড়ালেখার ইচ্ছা যায়নি। সে সুযোগ পেলে নবম শ্রেণিতে এ ভর্তি হতে চায়।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ও রংপুরে এর বিস্তার
২০২৪ সালের জুলাই মাস। ঢাকায় শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে রাজপথে নামে। তাদের দাবি ছিল পরিষ্কার: বৈষম্যহীন একটি চাকরি ব্যবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইটঊঞ, ঘঝট, ইজঅঈ সহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমে পড়ে। ১৬ জুলাই ঢাকায় শুরু হয় সরকারি বাহিনী আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর নির্যাতন। ১৭ ও ১৮ জুলাই দিনে-দুপুরে স্বৈরাচারী সরকারের দল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকে ছাত্রদের উপর বেধড়ক লাঠিপেটা করা হয়, এমনকি ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেল ভেঙে মেয়েদের পর্যন্ত নিগৃহীত করা হয়। এই দমন-পীড়নের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। জেলা শহর, গ্রাম, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। রংপুরও ব্যতিক্রম ছিল না। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে, মিছিল ও বিক্ষোভ চলছে। আলাউদ্দিন এসব দেখে চুপ থাকতে পারেনি। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার, এই বোধ থেকেই সেও আন্দোলনে যুক্ত হয়। তার কাছে আন্দোলন মানে ছিল ভবিষ্যতের জন্য দাঁড়ানো, একটি বৈষম্যহীন দেশের স্বপ্ন দেখা।
রক্তাক্ত ১৯ জুলাই পুলিশের নারকীয় আক্রমণ
১৯ জুলাই ২০২৪, বিকেল ৪টা। সিটি মার্কেটের সামনে রংপুর শহরের ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিল। হঠাৎই কোনো ঘোষণা ছাড়া পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা মিছিলে হামলা চালায়। কারও হাতে বাঁশ, কারও হাতে হকস্টিক, কারও হাতে বন্দুক আর শটগান। মাঠে পড়ে থাকা ছাত্রদের হায়েনার মতো পিটিয়ে দমন করা হচ্ছিল। সবাই ভয়ে পালাতে থাকে। আলাউদ্দিন দৌড় দেয় পিছন দিকে। কিন্তু পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলে খুব কাছ থেকে ছররা গুলি ছুড়ে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ২০০টির বেশি ছররা গুলি বিদ্ধ হয়। সে তখন রক্তে ভেসে যায়। তার চিৎকারে আশেপাশে থাকা ছাত্ররা এগিয়ে আসে, কিন্তু পুলিশের ভয়াবহতা এমন ছিল কেউ কাছে যেতে পারছিল না। পুলিশ সেখান থেকে সরে গেলে ছাত্র-জনতা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় সরকারি মেডিকেল কলেজে নিয়ে যায়।
চিকিৎসা
মেডিকেল হাসপাতালে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পাহারা দিচ্ছিল। আহত ছাত্রদের চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিচ্ছিল না স্বৈরাচারী সরকারের প্রশাসনের ভয়ে। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বারবার হুমকি ও মামলার ভয় দেখাচ্ছিল। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে তাকে চলে আসতে হয়। গোপনে চিকিৎসা নিতে থাকেন। ৫ আগস্টে যখন স্বৈরাচারী সরকার দেশ থেকে যখন পালালো তখন তিনি আবার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় বর্তমান তিনি কিছুটা সুস্থ আছেন। তবে তার শরীরে এখনো অনেক গুলি বিদ্ধ হয়ে আছে। এখনও মাঝে মাঝে ডাক্তার দেখানো হয়। ওষুঁধপত্র চলমান রয়েছে।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আলাউদ্দিন
জন্ম তারিখ : ৬ মে ২০০৭
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শ্রমিক
প্রতিষ্ঠান : ৮ম শ্রেণি পাশ
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: পশ্চিম গনেশপুর, ইউনিয়ন: বাবুঁখা, থানা: কোতোয়ালি, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: আনোয়ার হোসেন
মায়ের নাম : মোছা: লাবনী বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : ব্যবসা (মাছের), ৬৬
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫০
আয়ের উৎস : ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
ঘটনার স্থান : সিটি মার্কেটের সামনে
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী : পুলিশ
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা : উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে তার বাকি ছররা গুলি গুলো বের করার ব্যবস্থা করা।
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা : এককালীন সহায়তা প্রয়োজন।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍