মো: নুরুজ্জামান মিয়া
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : জর্দার ব্যবসা
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
শৈশব ও পারিবারিক জীবন
রংপুর জেলার সদর থানার অন্তর্গত উত্তর জানকী ইউনিয়নের দালালীপাড়া গ্রামে ১৯৯০ সালের ১৯ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন মো: নুরুজ্জামান মিয়া। ছোটবেলা থেকেই তার জীবন ছিল সংগ্রামের ছায়ায় ঘেরা। পিতা সোলায়মান মিয়া ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ। তবে নুরুজ্জামান যখন কৈশোর পেরুচ্ছেন, তখনই তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন। সংসারের দায়িত্ব তখন অল্প বয়সেই তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। মা বাছিরুন নেসা একা হাতে সন্তানদের বড় করেছেন, আজ তিনি ৮৫ বছরের বৃদ্ধা। তবুও ছেলেকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দেন। তিনি খুব বেশি উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে ব্যবসার দিকে টেনে নিয়ে যায়। তিনি রংপুর শহরে শুরু করেন ছোট পরিসরে জর্দার ব্যবসা। ধীরে ধীরে ব্যবসা দাঁড়িয়ে যায়। পরিচিত হন একজন সৎ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়ী হিসেবে। তিনি দুই সন্তানের জনক। বড় ছেলে আব্দুল্লাহ (১২) ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, আর ছোট মেয়ে আফিয়া (৮) প্লে শ্রেণিতে পড়ে। তারা দুই ভাই-বোন নলেজ কেয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়াই তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য। ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াচ্ছেন, যেন তারা ন্যায়ের পক্ষে, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
উত্তাল জুলাই-আগস্ট এক আন্দোলনের সূচন
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এক ভয়াবহ ক্ষোভের আগুন। শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য, কোটা সংস্কারে প্রতারণা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, ছাত্রদের উপর গুম-খুন সব মিলিয়ে তরুণ সমাজ ফুঁসে ওঠে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে বিভিন্ন সময়ে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ছাত্রদের আন্দোলন দমন করতে পুলিশি জুলুম ও আওয়ামী ক্যাডারদের হামলা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এই সময় ছাত্ররাই শুধু নয় শ্রমজীবী, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষও যুক্ত হতে থাকে এই ন্যায়ের লড়াইয়ে। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনে ছিলেন। তাঁরা একের পর এক মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল আয়োজন করেন। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে পুলিশ গুলি করে হত্যা করলো তখন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা আরো ক্ষোভে ফেটে পড়লো। আন্দোলন আরো তীব্রতর হলো।
নুরুজ্জামান মিয়ার মতো ব্যবসায়ীরাও আন্দোলনকারীদের পাশে থেকে সহযোগিতা করতেন। কেউ কেউ খাবার দিতেন, কেউ লিফলেট বিতরণ করতেন। কিন্তু নুরুজ্জামান ছিলেন একটু ব্যতিক্রম। তিনি শুধু সহযোগিতাই করেননি, সুযোগ পেলেই ছাত্রদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। তাঁর চোখে আন্দোলন মানেই দেশের ভবিষ্যতকে বাঁচানো।
আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড ও রংপুরে আগুনের বিস্তার
তীব্র আন্দোলনের এক পর্যায়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে সরকার দলীয় পুলিশ বাহিনী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নিরস্ত্র আবু সাঈদকে যেভাবে গুলি করে হত্যা করা হয় তা ছিলো ইতিহাসে একটা কালো অধ্যায়। এই হত্যার প্রতিবাদে ছাত্র-জনতা আরো দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রাবাস থেকে তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে পুলিশ বাহিনী। সংবাদটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। চরম ক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থী সমাজ। ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয় “#ঔঁংঃরপবঋড়ৎঅনঁঝধুববফ” হ্যাশট্যাগ।
রংপুর জেলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে আন্দোলনের আগ্নেয়গিরি। শত শত ছাত্র-ছাত্রী মিছিল নিয়ে রংপুর শহরের পথে নামে। ১৯ জুলাই দুপুরের পর বিশাল মিছিল বের হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে তারা পৌঁছে যায় সিটি বাজার মোড়ে। সেখানে একত্রিত হয় হাজারো মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাধারণ ব্যবসায়ী, এমনকি রিকশা চালকেরাও। কিন্তু এই ন্যায়ের মিছিলে নেমে আসে ভয়াল দুঃস্বপ্ন। হঠাৎ করেই মিছিলে আক্রমণ করে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত সন্ত্রাসী বাহিনী। গুলি, টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জে চারদিক হয়ে ওঠে আতঙ্কের রাজ্য। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, রক্তে ভিজে যায় সিটি বাজারের রাস্তাগুলো।
গুলিবিদ্ধ নুরুজ্জামান এক ব্যবসায়ীর বীরত্ব
সে দিন ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৪টা। মো: নুরুজ্জামান মিয়া তাঁর জর্দার দোকান বন্ধ করে সকাল থেকেই ছাত্রদের সাথে সংহতি জানান এবং মিছিলে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে সিটি বাজারের দিকে এগোলে অপর পাশে থাকা স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনী এবং আওয়ামী যুবলীগের সন্ত্রাসী ও ছাত্রলীগের গুণ্ডা বাহিনী রড, হকস্টিক, চাপাতি এবং দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে পুলিশের সাথে আক্রমণে সহযোগিতা করেছিল। মিছিলটা সামনে এগোতেই পুলিশ প্রথমে টিয়ারগ্যাস ছাড়ে। পরবর্তীতে রাবার বুলেট, ছররা গুলি নিক্ষেপ করে ফলে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। গুলি করার সাথে সাথে অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন এবং রক্তাক্ত হয় সিটি বাজারের রাস্তা। গুলি লাগার সাথে সাথে অনেকেই পড়ে যাচ্ছিলেন। পাশে থাকা শিক্ষার্থীরা তাদের দ্রুত হসপিটালে নিয়ে যান। তখন নুরুজ্জামানের পায়ে গুলি লেগে পা ঝাঁঝরা হয়ে যায়। পা থেকে রক্ত বেয়ে রাস্তায় পড়ছিল। অল্প কিছুক্ষণ দৌড়িয়ে তিনি রাস্তায় পড়ে যান। শিক্ষার্থীরা দ্রুত তাকে ধরে নিকটস্থ মেডিকেলে নিয়ে যান। পুলিশ ও ক্যাডার বাহিনী তখনও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে শুধু গুলির আওয়াজ আর আহতদের কান্নায়।
চিকিৎসা
আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে নিকটস্থ ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে রক্ত পড়া বন্ধ করা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। তখন হাসপাতালগুলোর চিত্র ছিল ভয়াবহ। হাসপাতালে গেলে মামলা-হামলার ভয় দেখাতো সন্ত্রাসী বাহিনী। এই ভয়ে তিনি আর হাসপাতালে যাননি। তার অবস্থাও ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যায়। চিকিৎসা খাতে তাকে মেডিকেলে অনেক হেনেস্তা করা হয়েছে। অপারেশন করতে চায়নি, পরে তার সহধর্মিনী ডাক্তারকে অনেক ভাবে প্রেসার ক্রিয়েট করে, তারপর অপারেশন করানো হয়। মেডিকেলে সে অনেক কষ্ট পেয়েছে, পাশে কেউ ছিলোনা, তার স্ত্রী অনেক কষ্ট করেছে আমার জন্য। পরবর্তীতে যখন স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয় তখন তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজে দশ দিন ভর্তি থাকেন। ডাক্তাররা তার অপারেশন করে গুলি বের করেন। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন। তবে তার পায়ের শিরায় থাকা একটা গুলি বের করার জন্য অপারেশন করানো দরকার। যে দেশের জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করেছে, ডিবি হেফাজতে গিয়েছে তার কোন মহিমা আর সামনে নেই, যারা আন্দোলনে সাথে জড়িত ছিলো না তারাই আজকে বড় বড় নেতা সেজে বসে আছে। তিনি বলেন, যাই হোক সবচাইতে বড় পাওয়া দেশে তো বিপ্লব ঘটিয়েছি, স্বৈরাচার তো দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে, এটাই আমার জীবনের বড় পাওয়া, আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া যে আমরা খোলা মঞ্চে সকল বিষয়ে কথা বলতে পারছি।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: নুরুজ্জামান মিয়া
জন্ম তারিখ : ১৯ মার্চ ১৯৯০
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : জর্দার ব্যবসা
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : রংপুর
গ্রাম : দালালীপাড়া
ইউনিয়ন : উত্তর জানকী
থানা : সদর
জেলা : রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : সোলায়মান মিয়া, মৃত
মায়ের নাম : মোছা: বাছিরুন নেসা
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৮৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. আফিয়া, বয়স: ৮, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: প্লে, সম্পর্ক: মেয়ে
২. আব্দুল্লাহ, বয়স: ১২, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৫ম, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : সিটি বাজারের সামনে, রংপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৪টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : এককালীন সহায়তা করা
রংপুর জেলার সদর থানার অন্তর্গত উত্তর জানকী ইউনিয়নের দালালীপাড়া গ্রামে ১৯৯০ সালের ১৯ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন মো: নুরুজ্জামান মিয়া। ছোটবেলা থেকেই তার জীবন ছিল সংগ্রামের ছায়ায় ঘেরা। পিতা সোলায়মান মিয়া ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ। তবে নুরুজ্জামান যখন কৈশোর পেরুচ্ছেন, তখনই তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন। সংসারের দায়িত্ব তখন অল্প বয়সেই তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। মা বাছিরুন নেসা একা হাতে সন্তানদের বড় করেছেন, আজ তিনি ৮৫ বছরের বৃদ্ধা। তবুও ছেলেকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দেন। তিনি খুব বেশি উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে ব্যবসার দিকে টেনে নিয়ে যায়। তিনি রংপুর শহরে শুরু করেন ছোট পরিসরে জর্দার ব্যবসা। ধীরে ধীরে ব্যবসা দাঁড়িয়ে যায়। পরিচিত হন একজন সৎ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়ী হিসেবে। তিনি দুই সন্তানের জনক। বড় ছেলে আব্দুল্লাহ (১২) ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, আর ছোট মেয়ে আফিয়া (৮) প্লে শ্রেণিতে পড়ে। তারা দুই ভাই-বোন নলেজ কেয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়াই তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য। ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াচ্ছেন, যেন তারা ন্যায়ের পক্ষে, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
উত্তাল জুলাই-আগস্ট এক আন্দোলনের সূচন
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এক ভয়াবহ ক্ষোভের আগুন। শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য, কোটা সংস্কারে প্রতারণা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, ছাত্রদের উপর গুম-খুন সব মিলিয়ে তরুণ সমাজ ফুঁসে ওঠে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে বিভিন্ন সময়ে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ছাত্রদের আন্দোলন দমন করতে পুলিশি জুলুম ও আওয়ামী ক্যাডারদের হামলা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এই সময় ছাত্ররাই শুধু নয় শ্রমজীবী, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষও যুক্ত হতে থাকে এই ন্যায়ের লড়াইয়ে। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনে ছিলেন। তাঁরা একের পর এক মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল আয়োজন করেন। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে পুলিশ গুলি করে হত্যা করলো তখন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা আরো ক্ষোভে ফেটে পড়লো। আন্দোলন আরো তীব্রতর হলো।
নুরুজ্জামান মিয়ার মতো ব্যবসায়ীরাও আন্দোলনকারীদের পাশে থেকে সহযোগিতা করতেন। কেউ কেউ খাবার দিতেন, কেউ লিফলেট বিতরণ করতেন। কিন্তু নুরুজ্জামান ছিলেন একটু ব্যতিক্রম। তিনি শুধু সহযোগিতাই করেননি, সুযোগ পেলেই ছাত্রদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। তাঁর চোখে আন্দোলন মানেই দেশের ভবিষ্যতকে বাঁচানো।
আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড ও রংপুরে আগুনের বিস্তার
তীব্র আন্দোলনের এক পর্যায়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে সরকার দলীয় পুলিশ বাহিনী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নিরস্ত্র আবু সাঈদকে যেভাবে গুলি করে হত্যা করা হয় তা ছিলো ইতিহাসে একটা কালো অধ্যায়। এই হত্যার প্রতিবাদে ছাত্র-জনতা আরো দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রাবাস থেকে তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে পুলিশ বাহিনী। সংবাদটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। চরম ক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থী সমাজ। ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয় “#ঔঁংঃরপবঋড়ৎঅনঁঝধুববফ” হ্যাশট্যাগ।
রংপুর জেলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে আন্দোলনের আগ্নেয়গিরি। শত শত ছাত্র-ছাত্রী মিছিল নিয়ে রংপুর শহরের পথে নামে। ১৯ জুলাই দুপুরের পর বিশাল মিছিল বের হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে তারা পৌঁছে যায় সিটি বাজার মোড়ে। সেখানে একত্রিত হয় হাজারো মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাধারণ ব্যবসায়ী, এমনকি রিকশা চালকেরাও। কিন্তু এই ন্যায়ের মিছিলে নেমে আসে ভয়াল দুঃস্বপ্ন। হঠাৎ করেই মিছিলে আক্রমণ করে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত সন্ত্রাসী বাহিনী। গুলি, টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জে চারদিক হয়ে ওঠে আতঙ্কের রাজ্য। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, রক্তে ভিজে যায় সিটি বাজারের রাস্তাগুলো।
গুলিবিদ্ধ নুরুজ্জামান এক ব্যবসায়ীর বীরত্ব
সে দিন ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৪টা। মো: নুরুজ্জামান মিয়া তাঁর জর্দার দোকান বন্ধ করে সকাল থেকেই ছাত্রদের সাথে সংহতি জানান এবং মিছিলে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে সিটি বাজারের দিকে এগোলে অপর পাশে থাকা স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনী এবং আওয়ামী যুবলীগের সন্ত্রাসী ও ছাত্রলীগের গুণ্ডা বাহিনী রড, হকস্টিক, চাপাতি এবং দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে পুলিশের সাথে আক্রমণে সহযোগিতা করেছিল। মিছিলটা সামনে এগোতেই পুলিশ প্রথমে টিয়ারগ্যাস ছাড়ে। পরবর্তীতে রাবার বুলেট, ছররা গুলি নিক্ষেপ করে ফলে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। গুলি করার সাথে সাথে অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন এবং রক্তাক্ত হয় সিটি বাজারের রাস্তা। গুলি লাগার সাথে সাথে অনেকেই পড়ে যাচ্ছিলেন। পাশে থাকা শিক্ষার্থীরা তাদের দ্রুত হসপিটালে নিয়ে যান। তখন নুরুজ্জামানের পায়ে গুলি লেগে পা ঝাঁঝরা হয়ে যায়। পা থেকে রক্ত বেয়ে রাস্তায় পড়ছিল। অল্প কিছুক্ষণ দৌড়িয়ে তিনি রাস্তায় পড়ে যান। শিক্ষার্থীরা দ্রুত তাকে ধরে নিকটস্থ মেডিকেলে নিয়ে যান। পুলিশ ও ক্যাডার বাহিনী তখনও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে শুধু গুলির আওয়াজ আর আহতদের কান্নায়।
চিকিৎসা
আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে নিকটস্থ ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে রক্ত পড়া বন্ধ করা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। তখন হাসপাতালগুলোর চিত্র ছিল ভয়াবহ। হাসপাতালে গেলে মামলা-হামলার ভয় দেখাতো সন্ত্রাসী বাহিনী। এই ভয়ে তিনি আর হাসপাতালে যাননি। তার অবস্থাও ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যায়। চিকিৎসা খাতে তাকে মেডিকেলে অনেক হেনেস্তা করা হয়েছে। অপারেশন করতে চায়নি, পরে তার সহধর্মিনী ডাক্তারকে অনেক ভাবে প্রেসার ক্রিয়েট করে, তারপর অপারেশন করানো হয়। মেডিকেলে সে অনেক কষ্ট পেয়েছে, পাশে কেউ ছিলোনা, তার স্ত্রী অনেক কষ্ট করেছে আমার জন্য। পরবর্তীতে যখন স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয় তখন তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজে দশ দিন ভর্তি থাকেন। ডাক্তাররা তার অপারেশন করে গুলি বের করেন। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন। তবে তার পায়ের শিরায় থাকা একটা গুলি বের করার জন্য অপারেশন করানো দরকার। যে দেশের জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করেছে, ডিবি হেফাজতে গিয়েছে তার কোন মহিমা আর সামনে নেই, যারা আন্দোলনে সাথে জড়িত ছিলো না তারাই আজকে বড় বড় নেতা সেজে বসে আছে। তিনি বলেন, যাই হোক সবচাইতে বড় পাওয়া দেশে তো বিপ্লব ঘটিয়েছি, স্বৈরাচার তো দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে, এটাই আমার জীবনের বড় পাওয়া, আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া যে আমরা খোলা মঞ্চে সকল বিষয়ে কথা বলতে পারছি।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: নুরুজ্জামান মিয়া
জন্ম তারিখ : ১৯ মার্চ ১৯৯০
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : জর্দার ব্যবসা
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : রংপুর
গ্রাম : দালালীপাড়া
ইউনিয়ন : উত্তর জানকী
থানা : সদর
জেলা : রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : সোলায়মান মিয়া, মৃত
মায়ের নাম : মোছা: বাছিরুন নেসা
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৮৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. আফিয়া, বয়স: ৮, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: প্লে, সম্পর্ক: মেয়ে
২. আব্দুল্লাহ, বয়স: ১২, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৫ম, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : সিটি বাজারের সামনে, রংপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৪টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : এককালীন সহায়তা করা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍