হোম / আহতদের তালিকা / মো: আব্দুস শাফী
মো: আব্দুস শাফী

মো: আব্দুস শাফী

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

কাজলদহ গ্রামে শৈশবের আলোর রেখা
কুড়িগ্রাম জেলার সদর থানার গোগাদহ ইউনিয়নের এক নিভৃত গ্রাম কাজলদহ। চারদিক সবুজে মোড়া, নদী-নালার ধারে মাঠের বুক চিরে বেড়ে ওঠে যে শিশুটি, তার নাম মো: আব্দুস শাফী। জন্ম ৫ মার্চ, ১৯৯৯। বাবা মো: শহর আলী, একজন কৃষক; মা মোছা: রেজিবা বেগম, একজন গৃহিণী। স্বল্প আয়ের কৃষক পরিবারে স্বপ্নগুলো ছিল ছোট কিন্তু হৃদয়ে ছিল বিশালতা।
ছেলেবেলা থেকেই শাফী ছিল শান্ত, স্থির আর আত্মমগ্ন। মাটির ঘ্রাণ, হালচাষ করা মাঠ, আর আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ ছিল তার প্রতিদিনের সঙ্গী। এক বোন সাবিনা ইয়াসমিন, যিনি এখন বিবাহিত। পরিবারের চার সদস্যের ছোট গণ্ডিতে ছিল ভালোবাসার অবিরত প্রবাহ।
প্রতিদিন সকালে মাথায় বইয়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে গ্রামের স্কুলে যাওয়া, বিকেলে ধানক্ষেতে দৌড়ানো আর রাতে টেবিলে পড়া এই ছিল তার শৈশব। সেই সরল জীবনের গা ছুঁয়ে গড়ে উঠেছিল এক লড়াকু চরিত্র।
কৃষকের ঘরে জন্ম, ইংরেজি সাহিত্যে মনোনিবেশ
অভাব-অনটনের মাঝেও শাফীর ছিল প্রবল মেধা ও একাগ্রতা। বাবার গায়ের ঘাম মাটিতে ফেলার মূল্য যে ব্যর্থ হতে পারে না এ বিশ্বাস নিয়েই সে এগিয়ে চলেছিল। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হয়ে সে অনার্স শুরু করে। পড়াশোনার প্রতি ছিল তার অত্যধিক আগ্রহ, ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিতি ও শিক্ষকদের প্রিয় ছিল সে। কলেজজীবনে সে হয়ে ওঠে সকলের প্রেরণা। ইংরেজিতে সম্মান ডিগ্রি শেষ করে সে পাড়ি জমায় রংপুর শহরে। সেখানে চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। কোচিং, বই, টিউশনি সব মিলিয়ে ব্যস্ত জীবন। কিন্তু সেই ব্যস্ততার মাঝেও দেশের প্রতি ভালোবাসা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ছিল অটুট।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট-একটি রক্তাক্ত ইতিহাস
২০১৮ সাল। সরকারি চাকরিতে কোটা বৈষম্য নিয়ে সারা দেশে শুরু হয় আন্দোলন। ছাত্র-ছাত্রীরা বলছিল, কোটা চাই না, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চাই। কিন্তু সেই আন্দোলনে পুলিশি হামলা, লাঠিচার্জ, ছাত্রনেতাদের গ্রেপ্তার সবই হয়েছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জবাবে। সাময়িকভাবে সরকার কোটা বাতিল করলেও স্থায়ী সমাধান দেয়নি।
২০২৪ সালের শুরুতে হাইকোর্ট এক রায়ে পূর্বের কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে। এতে আবারও ছাত্র সমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রুয়েট, কুয়েট, প্রাইভেট এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সবখানে বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকার ছাত্রদের যৌক্তিক দাবি শুনতে না চেয়ে দমননীতি গ্রহণ করে। পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ যুগপৎ আক্রমণে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন দমনের চেষ্টা চলে। শাহবাগ, টিএসসি, মিরপুর, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলনার নিউমার্কেট সবখানেই ছাত্রদের রক্ত ঝরে।
আন্দোলন এবার ছড়িয়ে পড়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। কুড়িগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া, ঠাকুরগাঁওয়ের মতো জায়গায়ও প্রতিবাদ জোরদার হয়। আন্দোলনের মুখ্য দাবিগুলোর মধ্যে ছিল কোটা সংস্কার, পুলিশি দমন বন্ধ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার।

রংপুরে দাঁড়ানো এক সাহসী মুখ
আব্দুস শাফী তখন রংপুরে অবস্থান করছিলেন। চাকরির প্রস্তুতির ফাঁকে তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ান। প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতেন, মিছিল করতেন, বক্তব্য রাখতেন। শাফীও একজন চাকরিপ্রার্থী এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে ছিলেন সক্রিয়। তিনি জানতেন, আন্দোলন করতে গিয়ে কেউ কেউ গুলিবিদ্ধ হচ্ছেন, কেউ কেউ অপহৃত, তবুও পিছপা হননি। বাবার ফসল বিক্রি করে নিজের বই কেনা যাঁর জীবন বাস্তবতা, তিনি জানতেন যোগ্যতার অবমূল্যায়ন কতটা কষ্টকর। সেদিন তার মুখে একটাই স্লোগান ছিল: “আমার ভবিষ্যতের জন্য আমি লড়ছি।”

১৬ জুলাইয়ের রক্তাক্ত দুপুর
১৬ জুলাই ২০২৪। দুপুর ১২টা। রংপুর ছিল উত্তাল। সেদিনের আন্দোলনে হাজারো শিক্ষার্থী জড়ো হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। চারপাশে উত্তেজনা, তীব্র স্লোগান, ফেস্টুন আর রাগে উত্তাল প্রতিবাদ। সেখানে ছিলেন আবু সাঈদ একজন উজ্জ্বল, মেধাবী ছাত্র, যিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। হঠাৎ পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের সশস্ত্র হামলা শুরু হয়। আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়ান। কিন্তু সেই সাহসিকতার মাশুল দিতে হয় জীবন দিয়ে। পুলিশ তার বুকে একের পর এক গুলি চালায়। পেছনের দিকে খানিকটা হেঁটে পড়ে গিয়ে লুটিয়ে পড়েন তিনি। কেউ কাছে আসতেও সাহস পায়নি, তারপরেও কিছু ছাত্র এগিয়ে যায় তাকে দেখে, আবু সাঈদ আর বেঁচে নেই।
এই হত্যাকাণ্ডে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে আগুনের মতো। ছাত্ররা একসাথে চিৎকার করে ওঠে, “আবু সাঈদের রক্তের দাম চাই!” প্রচণ্ড গোলাগুলির মাঝে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় সবাই। আব্দুস শাফী পেছনের দিকে সরে যেতে চাইলে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। সে পড়ে যায়, আহত হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে।
অপহরণ, নির্যাতন, আর হাসপাতালের বিছানায় এক যোদ্ধা
আব্দুস শাফী তখনো পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়েননি। তিনি সামনের সারিতে থাকায় তাঁকে খুঁজে নেয় সন্ত্রাসীরা। ছাত্রলীগ-যুবলীগের কিছু সদস্য এবং পুলিশের সাদা পোশাকধারীরা তাকে তুলে নেয়। তাকে একটি অচেনা ঘরে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। তুই কিসের আন্দোলন করিস? প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে আসে লাঠির আঘাত, ঘুষি, লাথি। তারা তাকে অচেতন অবস্থায় ফেলে দেয়। কয়েকজন পথচারী ও সহযোদ্ধা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। শরীর ছিল ভেঙে পড়া, কিন্তু মন ছিল অটুট। বর্তমানে তিনি কিছুটা সুস্থ। কিন্তু তার মনে পড়ে সেই প্রতিটি মুহূর্ত, আবু সাঈদের গুলিবিদ্ধ দেহ, নিজের বেদনার চিৎকার, আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ। এই গল্প কেবল আব্দুস শাফীর নয় এটা বাংলাদেশের হাজারো মেধাবী ছাত্রের গল্প, যারা স্বপ্ন দেখে, সংগ্রাম করে এবং রক্তের বিনিময়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি

নাম : মো: আব্দুস শাফী
জন্ম তারিখ : ৫ মার্চ ১৯৯৯
জন্মস্থান : কুড়িগ্রাম
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ
নিজ জেলা : কুড়িগ্রাম
বর্তমান ঠিকানা : রংপুর
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: কাজলদহ, ইউনিয়ন: গোগাদহ, থানা: কুড়িগ্রাম সদর, জেলা: কুড়িগ্রাম
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: শহর আলী
মায়ের নাম : মোছা: রেজিবা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৫
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. সাবিনা ইয়াসমিন, বয়স : ২৫, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে।
আহত হওয়ার সময় : ১৬ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২ টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍