হোম / আহতদের তালিকা / মো: পলাশ আহমেদ
মো: পলাশ আহমেদ

মো: পলাশ আহমেদ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শৈশব, দারিদ্র্য আর এক লড়াইয়ের শুরু
২০০৪ সালে রংপুর জেলার কোতোয়ালি থানার নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মো: পলাশ আহমেদ। ছোটবেলা থেকেই তার জীবন এক কঠিন সংগ্রামের গল্প। পিতা মো: মজিবর রহমান একজন দিনমজুর। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেটে পয়সা রোজগার করেন, তাও অল্প কিছু টাকায় চার জনের সংসার চলে না। বয়স এখন ৫৪, কিন্তু জীবনের ভারে তাঁর শরীর অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। মা গৃহিণী, তবে বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন তিনিও। পলাশের পরিবারে সদস্য সংখ্যা চার জন। বাবা, মা, তিনি নিজে এবং তাঁর বড় বোন শবনম তরু, যার বয়স ২২ এবং তিনি বিবাহিত। বোনের বিয়ের পর পলাশের ওপরই পরিবারের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন গড়ে ওঠে। তিনি বর্তমানে রবার্টসন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১০ম শ্রেণির ছাত্র। স্কুলে পড়ালেখায় ভালো হলেও প্রতিদিন সকালে টিউশনি করা, বিকেলে বাবাকে কাজে সময় দেয়া এই ছিল তাঁর জীবনের রুটিন। তিনি জানতেন, দারিদ্র্য তাঁর পথের বাধা, কিন্তু মনের জোর ছিল পাহাড় সমান। তার বুকভরা স্বপ্ন ছিল শিক্ষিত হয়ে পরিবারটিকে মানুষের মতো একটা জীবন দেয়ার।

আন্দোলনের ঢেউ এবং তরুণদের জেগে ওঠা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উত্তাল অধ্যায়। কোটা সংস্কার, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য, ছাত্র নিপীড়নের বিরুদ্ধে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। রংপুর শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে এই আন্দোলন দানা বাঁধে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এ আন্দোলনের মস্তিষ্ক কিন্তু। পলাশ আহমেদ তখন রবার্টসন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র। তাঁর স্কুলের সামনেই দেখা যায় রিকশাচালক, দোকানদার, এমনকি মা-বোনদের মুখেও আলোচনার বিষয় একটাই- এই ছেলেগুলো তো আমাদের কথাই বলে। পলাশ নিজের ভেতর অনুভব করতে থাকে একটি নতুন আগ্রহ, এক শক্তি। সে প্রতিদিন ক্লা শেষে আন্দোলনের খোঁজখবর নিত। মেসেঞ্জার গ্রুপে বন্ধুদের সাথে আলাপ হতো, কেউ কেউ লিফলেট বিতরণে অংশ নিচ্ছিল। পলাশ বুঝে যায়, এই আন্দোলন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নয় এই লড়াই তার নিজের, তার বাবার, তার দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এক সংগ্রাম। তিনি বলেন, আমি রাজনীতি করতাম না। কিন্তু বুঝেছিলাম, এই লড়াই মানে ভবিষ্যৎ নিয়ে বাঁচার অধিকার।
রংপুরে আগুন ছড়ানো আন্দোলন এবং ভয়াবহ সংঘর্ষ
১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। এরপর থেকে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে আন্দোলনের গতি বাড়াতে থাকেন। আবু সাঈদ হত্যার বিচার চান। সারা দেশ তখন উত্তাল হয়ে উঠে। ১৭ জুলাই আবু সাঈদ হত্যার বিচার চেয়ে সারা দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেখানেও স্বৈরাচারী পুলিশ বাহিনী এবং আওয়ামী গুণ্ডা বাহিনী ছাত্রদের উপরে আক্রমণ চালায়। একদলীয় সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে মেসে মেসে অভিযান চালিয়ে ছাত্রদের তুলে নিয়ে গুম, খুন ও নির্যাতনে মেতে উঠতো। ১৮ জুলাই ২০২৪, দুপুরের পর থেকেই রংপুর শহর উত্তাল। শহরের প্রতিটি মোড়, দোকান, চায়ের স্টলে আলোচনা একটাই- আর কত মারবে সরকার? আর কতদিন মুখ বুজে থাকবো? বিকেল ৩টার সময় হাজারো শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে বের হয় রংপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ‘মডার্ন মোড়’ অভিমুখে। এদের মাঝে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী ছিল প্রচুর। পলাশ সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, চুপ করে থাকা যাবে না। বন্ধুদের সঙ্গে আমরাও পথে নামবো।
মিছিলে যোগ দিয়েই সে বুঝে যায়, এটা কেবল প্রতিবাদ নয়, এটা এক অদৃশ্য শক্তির উৎসব। কিন্তু সেই শক্তি টেকেনি বেশিক্ষণ। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই মডার্ন মোড়ে উপস্থিত হয় পুলিশের বিশাল বাহিনী। সাদা পোশাকে ছিল আওয়ামী ক্যাডাররা। হঠাৎ করেই শুরু হয় গুলি, টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ। চারপাশে কেবলই চিৎকার, ভাই দৌড়াও, সামনে একজনকে গুলি করে মেরে ফেলছে, একজন পড়ে গেছে।
পলাশ সেই গুলির ভিড়ে পড়ে যায়। পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলি তার শরীরেও বিদ্ধ হয়। অসংখ্য ছররা গুলি তার শরীরের বিভিন্ন অংশে ঢুুকে যায়। তাজা রক্ত শরীর বেয়ে রাস্তায় পড়তে থাকে। তবুও জীবন বাঁচানোর তাগিদে পিছনের দিকে দৌড়াতে থাকে। তার শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়। পড়ে থাকে রাস্তায়। ছাত্র-জনতা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দ্রুত উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
হয়রানি, চিকিৎসা, এবং এক অসমাপ্ত জীবনযুদ্ধ
গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় রংপুর সরকারি হাসপাতালে । কিন্তু সেখানে চিকিৎসার বদলে শুরু হয় সন্দেহ আর জিজ্ঞাসাবাদ। তাঁর পেশা, পরিচয়, কেন সেখান ছিলেন এসব প্রশ্নে তাঁকে হেনস্তা করা হয়। একপর্যায়ে এক চিকিৎসক সরাসরি বলেন, আপনি আন্দোলনে ছিলেন কেন, এখন ভোগেন। পাশাপাশি আওয়ামি সন্ত্রাসীরা মামলা ও হামলার ভয় দেখাচ্ছিল আহতদের। আহত অবস্থায় ছাত্র-জনতা কাতরাচ্ছিল তবুও চিকিৎসা করতে দিচ্ছিল না। এমন মানসিক ট্রমার মধ্যে ছিলো আহতরা। পরবর্তীতে তাঁকে পরিবার বাসায় ফিরিয়ে আনেন। সেখানে কয়েকদিন ধরে প্রাথমিক চিকিৎসা চলে। কিছুদিন পর ইনফেকশন দেখা দেয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় আবার নিয়ে যাওয়া হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে তিনি রংপুর সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সেখানে ডাক্তাররা অপারেশন করে তার গুলি বের করেন। বর্তমানে চিকিৎসা চলমান রয়েছে। ইনফেকশনের জায়গা এখনো সম্পূর্ণ ঠিক হয়নি। চিকিৎসা করাতে তার পরিবারের প্রায় ২৬ হাজার টাকা খরচ হয়।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: পলাশ আহমেদ
জন্ম তারিখ : ২০০৪
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : রবার্টসন স্কুল এন্ড কলেজ (১০ম শ্রেণি)
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা
গ্রাম : নুরপুর
থানা : কোতোয়ালি
জেলা : রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মজিবর রহমান
পিতার পেশা ও বয়স : দিনমজুর, ৫৪
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. শবনম তরু, বয়স: ২২, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : মডার্ন মোড়, রংপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৩টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা। এককালীন সহায়তা করা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍