হোম / আহতদের তালিকা / মোরসালিন মিয়া
মোরসালিন মিয়া

মোরসালিন মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : মোটর শ্রমিক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম, কৈশোর ও জীবনের তাড়নায় গাজীপুরে পাড়ি
২০০৭ সালের ১৬ অক্টোবর রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার ফতেপুর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোরসালিন মিয়া। উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামের সেই ছোট্ট ছেলেটির জীবনের গল্প কখনো মাঠে দৌড়ে বেড়ানোর, কখনো নদীর জলে পা ভেজানোর। তার জীবনজুড়ে ছিল অভাব, অপমান আর বাঁচার লড়াই। যেখানে অন্যরা খেলাধুলা ও বন্ধুত্বে সময় কাটাতো, সেখানে মোরসালিনের দিন কাটত পরের বাড়ির উঠোনে বসে চিন্তা করে, আজ কি খাওয়া হবে? দুর্বল আর ভেঙে পড়া এক টিনের ঘরেই প্রাথমিক পড়া শুরু করে সে। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে বেশিদিন বইয়ের পাতায় থাকতে দেয়নি। ১৭ বছর বয়সে ঘরে খাবার নেই, কাজ নেই, জমি নেই এই বাস্তবতা তাকে ঠেলে দেয় জীবনের কঠিন এক পথে। ২০২৪ সালের শুরুতেই সে চলে যায় গাজীপুরে, কর্মসংস্থানের খোঁজে। এক হাত ব্যাগে কয়েকটি জামা, আর চোখের কোণে মায়ের চুপচাপ কান্না। গ্রাম ছাড়ার সেই মুহূর্তে তার কাঁধে ছিল শুধু একটি দায়- মায়ের মুখে এক মুঠো ভাত তুলে দেয়া।
সংসার চালানোর কাঁধে এক কিশোর
মোরসালিন যখন সাত মাসের শিশু, তখনই তার বাবা-মায়ের সম্পর্ক ভেঙে যায়। বাবা মো: শাহিন মিয়া তখনই অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার গড়েন। এরপর আর কখনো ফিরে তাকাননি মোরসালিন বা তার মায়ের দিকে। মা মোছা: নাছিমা বেগম তখন দু’হাতেই আঁকড়ে ধরেন তাঁর দুই সন্তান মোরসালিন ও বড় মেয়ে শামিমা আক্তারকে। নিজেদের কোনো ভিটেমাটি না থাকায় মা মোরসালিনকে নিয়ে আশ্রয় নেন তাঁর মামার বাড়িতে। মোরসালিনের মামা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে একটু জায়গা দেন ঘর তুলতে। সেখানেই কাঠের বেড়াঘেরা ছোট্ট ঘরে শুরু হয় তাদের নতুন জীবন। শামিমা বড় হয়ে বিয়ে করে সংসারী হন, আর মোরসালিন হয়ে ওঠে মায়ের একমাত্র ভরসা।
মায়ের সংসার চালাতে, নিজের ছোট্ট জীবনটাকে কোনোক্রমে এগিয়ে নিতে সে চলে যায় গাজীপুর। সেখানে একটি খাবারের হোটেলে কাজ নেয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে, মেঝেমোছে, গ্লাস ধোয়, ক্রেতাদের খাবার এগিয়ে দেয়। দিনে মাত্র অল্প টাকা মজুরি, মাসশেষে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেয় বেশিরভাগটাই। নিজের জন্য রাখে খুব সামান্য। কিন্তু ক্লান্ত শরীরেও তার মুখে একটাই কথা, মা যেন খেতে পারে, এটাই শান্তি।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে এক শ্রমজীবী কিশোরের অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন করে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, এমনকি মফস্বলের স্কুলের ছাত্ররাও এ আন্দোলনে জড়িত হয়। আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের পর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে গাজীপুর। গাজীপুরের রাস্তায়, মোড়ে, স্টেশনে প্রতিদিনই কোনো না কোনো কর্মসূচি চলতো। মোরসালিন নিয়মিত ছাত্র আন্দেলনের সংবাদ দেখত, ভিডিও দেখত। একসময় তার মনেও আগুন জ্বলে ওঠে, এই রাষ্ট্র আমাদের কী দিয়েছে? আমরা যারা শ্রমিক, দিন এনে দিন খাই, আমাদের কথা কে ভাবে?”
৫ আগস্ট ২০২৪, সকালে হোটেলে কাজ সেরে একগ্লাস পানি খেয়ে বের হয় মোরসালিন। হোটেলের মালিক বলেছিলেন, “বাজারে যাস না, আজ শহরে উত্তেজনা।” কিন্তু মোরসালিন মনস্থির করে রেখেছিল আজ সে চুপ থাকবে না। সকাল সাড়ে ১১টার দিকেই সে যোগ দেয় ছাত্রদের একটি মিছিলে, উদ্দেশ্য: “চলো যাই ঢাকা” কর্মসূচি পালনের অংশ হিসেবে বাসন থানার সামনে জমায়েত। প্রথমবারের মতো সে নিজেকে অসহায় মনে করেনি। নিজেকে একজন সচেতন নাগরিক মনে হচ্ছিল, যে প্রতিবাদ জানাতে জানে।

গুলির শব্দে থেমে যাওয়া ভবিষ্যত
দুপুর ২টা ৩০ মিনিট বাসন থানার সামনে তখন জমায়েত বাড়ছে। ছাত্র-জনতা, শ্রমজীবী তরুণ, স্থানীয় মানুষ সবার কণ্ঠে প্রতিবাদের সুর। হঠাৎ করেই সরকারের পুলিশ বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসী দল রাস্তায় নেমে আসে। ছোঁড়া হয় রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস। দিগি¦দিক ছুটে পালায় সবাই। মোরসালিন আন্দোলনকারীদের সাথে সক্রিয় ছিলো। কিন্তু যখন হামলা শুরু হয়, তখন সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। কয়েকজনের সাথে মিলে ট্রাকের নিচে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখানেও রক্ষা মেলেনি। তিন জন পুলিশ তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনে। বাকি দুই তরুণকে চোখের সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয়। মোরসালিন কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমি শ্রমিক, আমি রাজনীতি করি না, আমি শুধু দাঁড়াইছিলাম। কিন্তু এক পুলিশ তার বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে বলে, তোদের মতো মানুষের বাঁচার অধিকার নাই। সেই মুহূর্তে হাঁটুর ঠিক ওপরে গুলি করে দেয় তাকে। ব্যথায় ছটফট করতে করতে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আশেপাশে কেউ নেই, রক্তে ভিজে যাচ্ছে রাস্তা। কিছুক্ষণ পর পুলিশের গাড়ি চলে গেলে ছাত্র-জনতা তাকে উদ্ধার করে গাজীপুর মেডিকেল কলেজে নিয়ে যায়।

হাসপাতাল, পঙ্গুত্ব আর অপরাজেয় এক আত্মা
গাজীপুর মেডিকেল কলেজে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন। হাঁটুর ওপর গুলিবিদ্ধ হওয়ায় পায়ের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রোগীর চাপ ও অস্ত্রোপচারের জায়গার সংকট থাকায় তাকে তড়িঘড়ি করে পাঠানো হয় ঢাকার হৃদরোগ হাসপাতালে।
সেখানে তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মোরসালিন। অবশেষে ডাক্তাররা জানিয়ে দেন, পা কেটে ফেলতে হবে, না হলে সংক্রমণে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যাবে। পরিবারের আর কোনো উপায় ছিল না। অপারেশনের মাধ্যমে হাঁটুর ওপরে থেকে পুরো পা কেটে ফেলা হয়। তার মামা, যিনি তাকে ছোটবেলা থেকে আশ্রয় দিয়েছেন, নিজের একমাত্র জমিটুকু বন্ধক রেখে দুই লক্ষ টাকা ঋণ যোগাড় করেন চিকিৎসার জন্য। অস্ত্রোপচারের পর মোরসালিনকে কৃত্রিম পা লাগানো হয়, কিন্তু তিনি আর কখনো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবেন না। বর্তমানে তিনি বাড়িতে থাকেন। কোনো কাজ করতে পারেন না। তার বয়স মাত্র ১৭, কিন্তু জীবনের কাছে হার মানতে শেখেননি এখনো। তিনি বলেন, আমার একটা পা নেই, কিন্তু আমি জানি, অন্যায় দেখলে দাঁড়াতে হবে। এক পায়ে হলেও প্রতিবাদ করবো।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোরসালিন মিয়া
জন্ম তারিখ : ১৬ অক্টোবর ২০০৭
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : মোটর শ্রমিক
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: বাজিতপুর, ইউনিয়ন: ফতেপুর, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: শাহিন মিয়া
মায়ের নাম : মোছা: নাছিমা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : গার্মেন্টস শ্রমিক, ৫০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ২ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. শামিমা আক্তার, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : বাসন থানার সামনে, গাজীপুর
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২:৩০টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍