হোম / আহতদের তালিকা / মো: শাহিনুর হোসেন
মো: শাহিনুর হোসেন

মো: শাহিনুর হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ভ্যানচালক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

দারিদ্র্যের কশাঘাতে বেড়ে ওঠা
রত্নেশ্বরপুর গ্রামের এক গরিব পরিবারে ১৯৭২ সালের ১৩ মে জন্ম শাহিনুর হোসেনের। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্য ছিল তার নিত্যসঙ্গী। বাবা মো: গোলজার হোসেন ও মা হাজেরা বেগম দুনিয়ায় সফর শেষ করছেন। অভাব-অনটনের সংসারে একবেলা খেয়ে আরেক বেলা না খেয়ে চলতো জীবন। স্কুলের প্রতি আগ্রহ থাকলেও পরিবার চালানোর তাগিদে খুব ছোট বয়সেই তাকে কাজ শুরু করতে হয়। বড় হয়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের বোঝাও ভারী হতে থাকে। একসময় নিজের পরিবার গড়ে তোলেন।
কিন্তু ভাগ্য তাকে উপহাস করতেই যেন জন্মেছে। তার তিন সন্তান তাদের মধ্যে পাভেল (২৮) ও শামিনা (২৫) দু’জনই প্রতিবন্ধী। পাভেল পুরোপুরি অচল আর শামিনা একজন বিবাহিত নারী হলেও প্রতিবন্ধকতা তাকে কষ্ট দিয়ে যায়। কন্যাকে ঢাকায় বিয়ে দিয়ে ছোট ছেলে শরবানু (১৮) একজন শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। পরিবারের সব দায়িত্ব শাহিনুর হোসেনের কাঁধে। কখনো গ্রামের আশেপাশে, কখনো বা ঢাকায় গিয়ে ভ্যান বা রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। বয়স ৫২ হলেও তার চেহারা আর গায়ের বল দেখে মনে হয় যেন ৭০ বছরের এক বৃদ্ধ। জীবনের ভারে প্রতিটি দিন ছিল তার কাছে এক যুদ্ধ।

জীবিকার টানে ঢাকায় আগমন
শাহিনুরের পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো দিনে দিনে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ে। তার ওপর দুই সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়ায় ব্যয় আরো বেড়ে যায়। তখন তিনি বাধ্য হয়ে আবার ঢাকার পথে রওনা হন।

ঢাকায় এসে শনিরআখড়া, যাত্রাবাড়ী, চিটাগাং রোড এলাকায় ভ্যান চালাতে থাকেন। প্রতিদিন সকাল হতেই ভোরে ঘর থেকে বেরিয়ে যান, সারাদিন রিকশা চালিয়ে সন্ধ্যায় ফিরতেন ছোট্ট একচালা ভাড়া বাড়িতে। দিনে যা আয় হতো তা দিয়েই চলতো পরিবারের খরচ। মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। শরীর ভেঙে যাচ্ছিল, কিন্তু সংসারের দায় তাকে এক মুহূর্তও বিশ্রাম নিতে দেয়নি।

আন্দোলনের শহরে জীবনের ঝুঁকি
২০২৪ সালের জুন-জুলাই মাসজুড়ে ঢাকাসহ সারাদেশে চলছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের নতুন ঢেউ। যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, চিটাগাং রোড প্রতিটি জায়গায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আন্দোলনে নামছিল। একদিকে রাষ্ট্রীয় দমন, অন্যদিকে জনতার দৃঢ় প্রতিরোধে উত্তাল ছিল রাজধানী। শাহিনুর হোসেন জানতেন, রাস্তায় নামা মানে জীবনের ঝুঁকি। কিন্তু উপার্জন না করলে সংসার চলবে কীভাবে? তাই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হতেন। আন্দোলনের শব্দ, পুলিশের গুলি, টিয়ারশেলের ধোঁয়া এসবের মধ্যেও মানুষের গন্তব্যে পৌঁছে দিতেন শাহিনুর। কারণ, তার পেছনে আট সদস্যের এক পরিবার।

সেই বিভীষিকাময় ২০ জুলাইয়ের বিকেল
২০২৪ সালের ২০ জুলাই, বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিট। প্রতিদিনের মতোই শাহিনুর হোসেন যাত্রাবাড়ী এলাকায় ভ্যান চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ কেউ একজন বলে দেয়, নিচ দিয়ে না, ফ্লাইওভার দিয়ে যাওয়াই নিরাপদ। তিনি ভ্যান উঠিয়ে দেন ফ্লাইওভারে।
কিন্তু তার জানা ছিল না, সেই সময় সরকারের সেনা ও পুলিশ বাহিনী হেলিকপ্টারসহ অভিযান চালাচ্ছে। আকাশে চক্কর দিচ্ছিল হেলিকপ্টার, নিচে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে চলছিল তাণ্ডব। হঠাৎ একটি হেলিকপ্টার থেকে গুলি নেমে আসে। সেখান থেকেই একটি গুলি এসে লাগে শাহিনুরের কাঁধে, বগলের নিচ দিয়ে গুলি শরীর বিদ্ধ করে বেরিয়ে যায়। রক্তে ভিজে যায় তার জামা, রাস্তা। তিনি ছটফট করতে করতে পড়ে যান রাস্তায়। আশেপাশের লোকজন আতঙ্কে পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর সাহস করে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।

চিকিৎসা, অসহায়তা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন শাহিনুর। সেখানে ১০-১২ দিন প্রাথমিক চিকিৎসা চললেও তার ডান হাত অচল হয়ে যায়। বগলের নিচ দিয়ে গুলি বের হওয়ায় শরীরে গভীর ক্ষত তৈরি হয়। তারপর চিকিৎসার ভার বহন করতে না পেরে চলে যান নিজ এলাকায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেও ১৫ দিন চিকিৎসার পর তার অবস্থার অবনতি দেখে তাকে রেফার করা হয় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে। পঙ্গু হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেন শাহিনুর। কিন্তু ডান হাত আর সচল হয়নি। যে হাতে তিনি রিকশার হ্যান্ডেল ধরতেন, জীবিকার জন্য লড়তেন সে হাত আজ নিষ্ক্রিয়। সংসারে আর কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই। তিনি আজ পুরোপুরি কর্মহীন। চিকিৎসার জন্য প্রায় ৪ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। এই টাকা তিনি ধার করেছেন, এমনকি ভাইয়ের জমি বন্ধক রেখে চিকিৎসা চালাতে হয়েছে। বর্তমানে সেই ঋণের বোঝা মাথায় আর সংসার

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: শাহিনুর হোসেন
জন্ম তারিখ : ১৩ মে ১৯৭২
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : ভ্যানচালক
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: রত্নেশ্বরপুর, ইউনিয়ন: কুমেদপুর, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: গোলজার হোসেন
মায়ের নাম : মোছা: হাজেরা বেগম
মাসিক আয় : বর্তমানে নেই
আয়ের উৎস : নেই
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৮
সন্তানদের বিবরণ
১. পাভেল, বয়স: ২৮, প্রতিবন্ধী, সম্পর্ক: ছেলে
২. শামিনা, বয়স: ২৫, প্রতিবন্ধী (বিবাহিত) সম্পর্ক: মেয়ে
৩. শরবানু, বয়স: ১৮, পেশা: শ্রমিক, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : শনির আখরা ফ্লাইওভার
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৫:৪৫মিনিট
আক্রমণকারী : পুলিশ
চিকিৎসার প্রস্তাবনা : উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানে প্রস্তাবনা : স্থানীয় বাজারে একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়া

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍