মোঃ শাহানুর আলম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : চাকরি, সিটি ব্যাংক
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম বৃত্তান্ত
শাহানুর আলম জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তার বাবা একজন চিকিৎসক, মা গৃহিণী। তার পৈতৃক নিবাস রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার ভেঘাবাড়ি ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামে অবস্থিত। এই গ্রামেই তার জন্ম। এখানেই গ্রামের আর দশটা ছেলের মতো কেটেছে তার শৈশব,কৈশোর। তার সব ভাই বোনেরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
আওয়ামী জিঘাংসার শিকার হয়ে ব্যাংকার থেকে বেকার,
চাকরি হারালেও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ছিলেন অদম্য ব্যাংকার থেকে রাজপথের সংগ্রামী
শাহানুর আলম পেশায় একজন ব্যাংকার। জুলাইয়ে তিনিও রাজপথে নেমে এলেন। অথচ তিনি ইচ্ছা করলেই নিরাপদে অফিসে বসে চুপচাপ ব্যাংকিং কাজ চালিয়ে যেতে পারতেন। দেশপ্রেম, গণতান্ত্রিক মন তাকে আরামের চেয়ার থেকে রাজপথে নামতে বাধ্য করলেন। পনের বছরের স্বৈরশাসন, ফ্যাসিবাদী নিয়মের বিরুদ্ধে তার সচেতন মন দ্রোহ করল। জুলাইয়ে যখন একদল ছাত্র তাদের দাবির কথা জানাল, সরকার তাদের গলা টিপে ধরল। ন্যায্য দাবি দমনে শুরু করল অস্ত্র প্রয়োগ। নিরীহ ছাত্রদের বুকে বুলেট নিক্ষেপ কটল। রাজপথে তরতাজা প্রাণের লাশ ফেলতে দ্বিধা করল না ফ্যাসিস্ট সরকার। পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে দেশ জুড়ে লাশের সারি বৃদ্ধি করতেছিল। এই অন্যায় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠল সমগ্র বাংলাদেশ। ছাত্রদের পাশে দাঁড়াল বিবেকবান অভিভাবক মহল। মুহুর্তে শুরু হল বিপ্লবী জাগরণ। যার যার অবস্থান থেকে আন্দোলনে অংশ নিতে থাকল সবাই। দেশে বিদেশে ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে জনজোয়ার তৈরি হল। এই মিছিলে ব্যাংকিংয়ের সুখের সময় ত্যাগ করে রাজপথের মিছিলে যোগ দিলেন লক্ষ লক্ষ শাহানুর আলমরা। প্রতিদিনের মতো ১৯ জুলাই ২০২৪ সকাল এগারটায় তারা অবস্থান নেন রামপুরা টিভি গেটের সামনে। পুলিশ নির্বিচারে মিছিলে গুলি চালায়। পুলিশের সাথে যোগ দেয় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়। দিগ্বিদিক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে জনতা। গুলি এসে লাগে তার কোমরে ও উরুতে। তিনি উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না। আহত শরীরেরই হামলা করে আওয়ামী গুণ্ডারা। লাঠির আঘাতে তাকে প্রায় থেতলে ফেলে। আধমরা পড়ে থাকেন মাটিতে। সহযোদ্ধারা উদ্ধার করে নিয়ে যান হাসপাতালে। তখন হাসপাতালে চিকিৎসা করাও ছিল আরেক আতঙ্ক।
জুলাইয়ে চিকিৎসা নেওয়া ছিল বিপদজনক
জুলাইয়ে যারা আহত হয়েছিলেন তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেও ভয় পেতেন। তখনকার পরিবেশ পরিস্থিতি কেমন ছিল তা অনুমান করতে পারবেন সেসময়ের ভুক্তভোগীদের জবানিতে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে। আসুন একজন শহীদের স্ত্রীর জবানে শুনি তখনকার পরিস্থিতির কথা। জুলাইয়ের ২০ তারিখে শহীদ হন শহীদ মনির উদ্দিন রাজু। তার লাশটি কেড়ে নেওয়া হয় তার স্ত্রী মোছাম্মত রেহানার হাত থেকে। তার মুখেই শুনি পরবর্তী কাহিনী। তিনি মোছাম্মত রেহানা (বেওয়ারিশ শহীদ মনির উদ্দিন রাজুর স্ত্রী) বলেন,
‘সেনাবাহিনি আমার কাছ থেইকা আমার স্বামীর লাশ কাইড়া নিয়া গুম করে ফেলছে...’
২০ জুলাই গাজীপুর সাতাইশের কী অবস্থা ছিল যে দেখে নাই, তারে কোনোদিন বোঝানো সম্ভব হবে না!
আমারে যখন ফোন করে জানায় যে আমার স্বামী গুলি খাইছে, আমি গিয়াও এমনকি ওরে তুলে আনতে পারি নাই। চারিদিক থেইকা গুলি চলতেছিল। পুলিশ, বিজিবি, ডিবি সবাই একলগে গুলি চালাইতেছিল। পাশে সেনাবাহিনী চুপচাপ লাইন ধইরা দাঁড়ায়ে আছে।
আমরা গলির ফাঁকে ফাঁকে লুকায়ে ছিলাম। আমার স্বামী রাস্তার উপরেই পইড়া ছিল প্রায় ১ ঘন্টা। গুলি কমার পর ধরাধরি কইরা হাসপাতালে নিয়া যাওয়া হয়। ততক্ষণে ও চইলা গেছে।
সেদিন ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল গুলি খাওয়া লোকে ভরা ছিল। ফ্লোরে ফ্লোরে রোগী। আমার স্বামীর পাশেই আরো ৩টা লাশ রাখা হয়।
হুট করে দেখি মেডিকেলে পুলিশ আর সেনাবাহিনীর ৪/৫টা গাড়ি একসাথে ঢুকলো। সবার হাতে রাইফেল! লোকজন চিৎকার করতেছিল, ‘লাশ নিয়া যাবে, যারা বাঁইচা আছে মাইরা ফেলবে।’ রোগী নিয়া লাশ নিয়া যে যেদিকে পারলো লুকায়ে গেল।
আমি একা হওয়ায় আমার স্বামীরে লুকাইতে পারলাম না। এক সেনাবাহিনী আমার দিকে হঠাৎ আগুন নিভানির সিলিন্ডারটা খুলে ছুইড়া মারলো। মনে হয় পরিকল্পনা ছিল, ধোয়া ছড়ায়ে গেলে ওই সময় আমার স্বামীরে নিয়া চইলা যাবে। কিন্তু সিলিন্ডারের মুখটা না ভাঙাতে, পারলো না।
আমার কাছে আইসা বলল, ‘লাশ তাজউদ্দিন মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি। ওইখানে আসেন।’ তারপর লাশ আমার হাত থেইকা কাইড়া নিয়া গাড়িতে তুলে ফেলল। এত করে বললাম, ১০টা মিনিট রাখেন, ওর বইনজামাই আসতেছে। রাখলো না।
আমি ওদের গাড়ির পিছনে পিছনে রিকশা নিয়া রওনা দিলাম। কিন্তু সাতাইশের মেইন রোডের কাছাকাছি আসতে আসতে ওরা একটা গলি দিয়া জোরে টান দিয়া হারায়া গেল।
এরপর থেকে শুধু তাজউদ্দিন না, এমন কোনো মেডিকেল নাই যেখানে খুঁজি নাই, এমন কোনো থানা নাই যাই নাই।
১ বছর হয়ে গেল, এখনো আমার স্বামীর কোনো হদিস পাই নাই। শুনছি ঘোড়াশাল নদীতে ওর লাশ ভাসায়ে দেওয়া হইছে।
- মোছাম্মত রেহানা (বেওয়ারিশ শহীদ মনির উদ্দিন রাজুর স্ত্রী)।
তখন সারা বাংলাদেশের অবস্থা বা দৃশ্যপট একই রকম ছিল। শাহানুর আলম আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হলেন। পরে ছাত্রলীগ সেখানে হামলা করে। তিনি কোনরকমে জান নিয়ে পালিয়ে আসেন। খিদমাহ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তারপর চলে যান গ্রামে।
চিকিৎসার সামগ্রিক বর্ণনা
পুলিশ এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ তাকে বন্দুক এবং লাঠি দিয়ে আঘাত করে, কোমর এবং কোমরের নিচে ডান পায়ের হাড় ফেটে যায়। তারপর সহযোদ্ধারা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিয়ে যাওয়ার পথে শাহবাগে বাধা প্রদান করে। এরপর সহযোদ্ধারা তাকে বাসা নিয়ে যায়। পরেরদিন আবার ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেই। এরপর খিলগাঁও খিদমা হসপিটাল এবং পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নেই।
চিকিৎসা বিষয়ক প্রস্তাবনা
তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন। এখনো তাকে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
কর্মসংস্থান
ব্যাংকে চাকরি ছিল। আহত হওয়ার দীর্ঘ সময় অসুস্থ আর তাছাড়া তার এখন টানা বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থাকার জটিলতা আছে। পুরোপুরি সুস্থ নন। বর্তমানে তিনি বেকার। তিনি শিক্ষিত মানুষ। তার একটি চাকরির প্রয়োজন। অথবা বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রয়োজন। তাকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার প্রস্তাবনা রাখছি।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ শাহানুর আলম
জন্ম তারিখ : ৩১-০১২-৮৯
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : চাকরি, সিটি ব্যাংক
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মহেশপুর, ইউনিয়ন : ভেন্ডাবাড়ী, থানা : পীরগঞ্জ, জেলা : রংপুর
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: মহেশপুর, ইউনিয়ন : ভেন্ডাবাড়ী, থানা : পীরগঞ্জ, জেলা : রংপুর
পিতার নাম : আব্দুল কাইয়ুব
পিতার পেশা : চিকিৎসক
মায়ের নাম : মৃত লেবু বেগম
পারিবারিক অবস্থা :
আয়ের পরিমাণ : অস্বচ্ছল
আয়ের উৎস : অসুস্থ থাকার কারণে কোন কাজ করতে পারছে না
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : তার ভাই বোনেরা সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত
নায়েব আলী শিক্ষক, ভাই
গোলাপ মিয়া কৃষক,
ফরহাদ আহমেদ মমিন হোমিও চিকিৎসক ও বোন
রোজিনা আক্তার বিবাহিত জীবনে সুখী পরিবারের সফল গৃহিণী
আহত হওয়ার স্থান: রামপুরা টিভি গেটের সামনে আহত হন
আক্রমণকারী: রামপুরা থানার পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা
আক্রমণের সময়: ১৯ জুলাই ২০২৪ সকাল ১১ টা।
আক্রমণের ধরন: কোমরে, উরুতে গুলিবিদ্ধ এবং লাঠির আঘাত
শাহানুর আলম জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তার বাবা একজন চিকিৎসক, মা গৃহিণী। তার পৈতৃক নিবাস রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার ভেঘাবাড়ি ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামে অবস্থিত। এই গ্রামেই তার জন্ম। এখানেই গ্রামের আর দশটা ছেলের মতো কেটেছে তার শৈশব,কৈশোর। তার সব ভাই বোনেরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
আওয়ামী জিঘাংসার শিকার হয়ে ব্যাংকার থেকে বেকার,
চাকরি হারালেও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ছিলেন অদম্য ব্যাংকার থেকে রাজপথের সংগ্রামী
শাহানুর আলম পেশায় একজন ব্যাংকার। জুলাইয়ে তিনিও রাজপথে নেমে এলেন। অথচ তিনি ইচ্ছা করলেই নিরাপদে অফিসে বসে চুপচাপ ব্যাংকিং কাজ চালিয়ে যেতে পারতেন। দেশপ্রেম, গণতান্ত্রিক মন তাকে আরামের চেয়ার থেকে রাজপথে নামতে বাধ্য করলেন। পনের বছরের স্বৈরশাসন, ফ্যাসিবাদী নিয়মের বিরুদ্ধে তার সচেতন মন দ্রোহ করল। জুলাইয়ে যখন একদল ছাত্র তাদের দাবির কথা জানাল, সরকার তাদের গলা টিপে ধরল। ন্যায্য দাবি দমনে শুরু করল অস্ত্র প্রয়োগ। নিরীহ ছাত্রদের বুকে বুলেট নিক্ষেপ কটল। রাজপথে তরতাজা প্রাণের লাশ ফেলতে দ্বিধা করল না ফ্যাসিস্ট সরকার। পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে দেশ জুড়ে লাশের সারি বৃদ্ধি করতেছিল। এই অন্যায় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠল সমগ্র বাংলাদেশ। ছাত্রদের পাশে দাঁড়াল বিবেকবান অভিভাবক মহল। মুহুর্তে শুরু হল বিপ্লবী জাগরণ। যার যার অবস্থান থেকে আন্দোলনে অংশ নিতে থাকল সবাই। দেশে বিদেশে ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে জনজোয়ার তৈরি হল। এই মিছিলে ব্যাংকিংয়ের সুখের সময় ত্যাগ করে রাজপথের মিছিলে যোগ দিলেন লক্ষ লক্ষ শাহানুর আলমরা। প্রতিদিনের মতো ১৯ জুলাই ২০২৪ সকাল এগারটায় তারা অবস্থান নেন রামপুরা টিভি গেটের সামনে। পুলিশ নির্বিচারে মিছিলে গুলি চালায়। পুলিশের সাথে যোগ দেয় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়। দিগ্বিদিক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে জনতা। গুলি এসে লাগে তার কোমরে ও উরুতে। তিনি উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না। আহত শরীরেরই হামলা করে আওয়ামী গুণ্ডারা। লাঠির আঘাতে তাকে প্রায় থেতলে ফেলে। আধমরা পড়ে থাকেন মাটিতে। সহযোদ্ধারা উদ্ধার করে নিয়ে যান হাসপাতালে। তখন হাসপাতালে চিকিৎসা করাও ছিল আরেক আতঙ্ক।
জুলাইয়ে চিকিৎসা নেওয়া ছিল বিপদজনক
জুলাইয়ে যারা আহত হয়েছিলেন তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেও ভয় পেতেন। তখনকার পরিবেশ পরিস্থিতি কেমন ছিল তা অনুমান করতে পারবেন সেসময়ের ভুক্তভোগীদের জবানিতে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে। আসুন একজন শহীদের স্ত্রীর জবানে শুনি তখনকার পরিস্থিতির কথা। জুলাইয়ের ২০ তারিখে শহীদ হন শহীদ মনির উদ্দিন রাজু। তার লাশটি কেড়ে নেওয়া হয় তার স্ত্রী মোছাম্মত রেহানার হাত থেকে। তার মুখেই শুনি পরবর্তী কাহিনী। তিনি মোছাম্মত রেহানা (বেওয়ারিশ শহীদ মনির উদ্দিন রাজুর স্ত্রী) বলেন,
‘সেনাবাহিনি আমার কাছ থেইকা আমার স্বামীর লাশ কাইড়া নিয়া গুম করে ফেলছে...’
২০ জুলাই গাজীপুর সাতাইশের কী অবস্থা ছিল যে দেখে নাই, তারে কোনোদিন বোঝানো সম্ভব হবে না!
আমারে যখন ফোন করে জানায় যে আমার স্বামী গুলি খাইছে, আমি গিয়াও এমনকি ওরে তুলে আনতে পারি নাই। চারিদিক থেইকা গুলি চলতেছিল। পুলিশ, বিজিবি, ডিবি সবাই একলগে গুলি চালাইতেছিল। পাশে সেনাবাহিনী চুপচাপ লাইন ধইরা দাঁড়ায়ে আছে।
আমরা গলির ফাঁকে ফাঁকে লুকায়ে ছিলাম। আমার স্বামী রাস্তার উপরেই পইড়া ছিল প্রায় ১ ঘন্টা। গুলি কমার পর ধরাধরি কইরা হাসপাতালে নিয়া যাওয়া হয়। ততক্ষণে ও চইলা গেছে।
সেদিন ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল গুলি খাওয়া লোকে ভরা ছিল। ফ্লোরে ফ্লোরে রোগী। আমার স্বামীর পাশেই আরো ৩টা লাশ রাখা হয়।
হুট করে দেখি মেডিকেলে পুলিশ আর সেনাবাহিনীর ৪/৫টা গাড়ি একসাথে ঢুকলো। সবার হাতে রাইফেল! লোকজন চিৎকার করতেছিল, ‘লাশ নিয়া যাবে, যারা বাঁইচা আছে মাইরা ফেলবে।’ রোগী নিয়া লাশ নিয়া যে যেদিকে পারলো লুকায়ে গেল।
আমি একা হওয়ায় আমার স্বামীরে লুকাইতে পারলাম না। এক সেনাবাহিনী আমার দিকে হঠাৎ আগুন নিভানির সিলিন্ডারটা খুলে ছুইড়া মারলো। মনে হয় পরিকল্পনা ছিল, ধোয়া ছড়ায়ে গেলে ওই সময় আমার স্বামীরে নিয়া চইলা যাবে। কিন্তু সিলিন্ডারের মুখটা না ভাঙাতে, পারলো না।
আমার কাছে আইসা বলল, ‘লাশ তাজউদ্দিন মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি। ওইখানে আসেন।’ তারপর লাশ আমার হাত থেইকা কাইড়া নিয়া গাড়িতে তুলে ফেলল। এত করে বললাম, ১০টা মিনিট রাখেন, ওর বইনজামাই আসতেছে। রাখলো না।
আমি ওদের গাড়ির পিছনে পিছনে রিকশা নিয়া রওনা দিলাম। কিন্তু সাতাইশের মেইন রোডের কাছাকাছি আসতে আসতে ওরা একটা গলি দিয়া জোরে টান দিয়া হারায়া গেল।
এরপর থেকে শুধু তাজউদ্দিন না, এমন কোনো মেডিকেল নাই যেখানে খুঁজি নাই, এমন কোনো থানা নাই যাই নাই।
১ বছর হয়ে গেল, এখনো আমার স্বামীর কোনো হদিস পাই নাই। শুনছি ঘোড়াশাল নদীতে ওর লাশ ভাসায়ে দেওয়া হইছে।
- মোছাম্মত রেহানা (বেওয়ারিশ শহীদ মনির উদ্দিন রাজুর স্ত্রী)।
তখন সারা বাংলাদেশের অবস্থা বা দৃশ্যপট একই রকম ছিল। শাহানুর আলম আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হলেন। পরে ছাত্রলীগ সেখানে হামলা করে। তিনি কোনরকমে জান নিয়ে পালিয়ে আসেন। খিদমাহ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তারপর চলে যান গ্রামে।
চিকিৎসার সামগ্রিক বর্ণনা
পুলিশ এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ তাকে বন্দুক এবং লাঠি দিয়ে আঘাত করে, কোমর এবং কোমরের নিচে ডান পায়ের হাড় ফেটে যায়। তারপর সহযোদ্ধারা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিয়ে যাওয়ার পথে শাহবাগে বাধা প্রদান করে। এরপর সহযোদ্ধারা তাকে বাসা নিয়ে যায়। পরেরদিন আবার ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেই। এরপর খিলগাঁও খিদমা হসপিটাল এবং পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নেই।
চিকিৎসা বিষয়ক প্রস্তাবনা
তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন। এখনো তাকে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
কর্মসংস্থান
ব্যাংকে চাকরি ছিল। আহত হওয়ার দীর্ঘ সময় অসুস্থ আর তাছাড়া তার এখন টানা বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থাকার জটিলতা আছে। পুরোপুরি সুস্থ নন। বর্তমানে তিনি বেকার। তিনি শিক্ষিত মানুষ। তার একটি চাকরির প্রয়োজন। অথবা বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রয়োজন। তাকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার প্রস্তাবনা রাখছি।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ শাহানুর আলম
জন্ম তারিখ : ৩১-০১২-৮৯
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : চাকরি, সিটি ব্যাংক
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: মহেশপুর, ইউনিয়ন : ভেন্ডাবাড়ী, থানা : পীরগঞ্জ, জেলা : রংপুর
বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: মহেশপুর, ইউনিয়ন : ভেন্ডাবাড়ী, থানা : পীরগঞ্জ, জেলা : রংপুর
পিতার নাম : আব্দুল কাইয়ুব
পিতার পেশা : চিকিৎসক
মায়ের নাম : মৃত লেবু বেগম
পারিবারিক অবস্থা :
আয়ের পরিমাণ : অস্বচ্ছল
আয়ের উৎস : অসুস্থ থাকার কারণে কোন কাজ করতে পারছে না
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : তার ভাই বোনেরা সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত
নায়েব আলী শিক্ষক, ভাই
গোলাপ মিয়া কৃষক,
ফরহাদ আহমেদ মমিন হোমিও চিকিৎসক ও বোন
রোজিনা আক্তার বিবাহিত জীবনে সুখী পরিবারের সফল গৃহিণী
আহত হওয়ার স্থান: রামপুরা টিভি গেটের সামনে আহত হন
আক্রমণকারী: রামপুরা থানার পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা
আক্রমণের সময়: ১৯ জুলাই ২০২৪ সকাল ১১ টা।
আক্রমণের ধরন: কোমরে, উরুতে গুলিবিদ্ধ এবং লাঠির আঘাত
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍