হোম / আহতদের তালিকা / মো: বেল্লাল হোসেন
মো: বেল্লাল হোসেন

মো: বেল্লাল হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

রগুনার ছোট্ট গ্রাম আমখোলা থেকে উঠে আসা মো: বেল্লাল হোসেন ছিলেন সততা, দায়িত্ব এবং মানবতার প্রতিচ্ছবি। ইবনে সিনা হাসপাতালে চাকরি করে পরিবার চালানো এই নিভৃত যোদ্ধা ১৯ জুলাই ২০২৪-এর শান্তিপূর্ণ মিছিলে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে নির্মম গুলিতে হারান চোখের আলো। তবুও তার কণ্ঠে ছিল সত্য উচ্চারণের দৃপ্ত শ্লোগান যা আজও আন্দোলনের স্মৃতিতে জ্বলে ওঠে সাহসের প্রদীপ হয়ে। তাঁর জীবনের গল্প আমাদের শেখায়, সত্য ও ন্যায়বিচারের পথে হাঁটা মানুষ কখনো পরাজিত হয় না, আহত হলেও নয়।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

তাদের চোখে ছিল যন্ত্রণা, কিন্তু কণ্ঠে ছিল সত্য উচ্চারণের দীপ্ত শ্লোগান
মো: বেল্লাল হোসেন
ক্রমিক: ০৩৪
আইডি: ঢাকা সিটি ০৩৪
জন্ম পরিচয়
মো: বেল্লাল হোসেন ১৯৯২ সালের ২০ মে জন্মগ্রহণ করেন বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার ছোট আমখোলা গ্রামে। জন্মস্থানটিই তার শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিতে ভরপুর। তার স্থায়ী ঠিকানা একই উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের অন্তর্গত ছোট আমখোলা গ্রামে। বর্তমানে তিনি বসবাস করছেন রাজধানী ঢাকার হাজারীবাগ থানার বাড়ৈখালি এলাকায়, যেখানে কর্মসূত্রেই তিনি অবস্থান করছেন।
পেশাগত জীবনে মো: বেল্লাল হোসেন একজন কর্মঠ ও দায়িত্ববান ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি রাজধানীর অন্যতম সুপরিচিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা হাসপাতালে চাকরি করতেন। তার এই চাকরির আয় দিয়েই চলত তার পরিবারের ভরণ পোষণ, যা তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পালন করতেন। পরিবারের সদস্যদের জীবনের প্রয়োজন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার।
বেল্লাল হোসেনের জীবনে পরিশ্রম একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি নিঃস্বার্থভাবে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন কখনও অভিযোগ না করে। তার সততা, নীতিবোধ এবং মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব তাঁকে এলাকার মানুষের কাছে একজন শ্রদ্ধেয় ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত করেছে। তার মতো। একজন মানুষ শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়, সমাজের জন্যও এক অনুকরণীয় আদর্শ।
ঢাকায় বসবাস করলেও গ্রামের সঙ্গে তার আত্মিক বন্ধন অটুট রয়েছে। গ্রামের মানুষের দুঃখ-কষ্টে তিনি পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন সর্বদা। কর্মস্থলে তিনি সহকর্মীদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেছেন তাঁর বিনয়, আন্তরিকতা ও পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে।
বর্তমান সময়ে, যখন জীবনধারণ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে, তখন বেল্লাল হোসেনের মতো সৎ, সংগ্রামী ও পরিশ্রমী মানুষদের জীবনী নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হতে পারে। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের শেখায় সততা, দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগই একজন মানুষকে মহান করে তোলে।
পারিবারিক প্রেক্ষাপট
মো: বেল্লাল হোসেন একজন সংগ্রামী, দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী মানুষ, যার জীবন ও জীবিকার প্রতিটি পদক্ষেপ জড়িত ছিল পরিবারের কল্যাণের সঙ্গে। তিনি বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার ছোট আমখোলা গ্রামের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা, নুরুল ইসলাম খাঁ, একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত ছিলেন। মা মোসাম্মাৎ জুমিনা একজন গৃহিণী, যিনি ১৯৬৬ সালের ১৬ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। মমতাময়ী এই মা ঘরের প্রতিটি কোণে ভালোবাসা, ত্যাগ ও স্নেহে সংসারকে গুছিয়ে রেখেছেন।
বেল্লাল হোসেনের দাম্পত্য জীবনও ছিল একান্তই সরল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। তার স্ত্রী নাছরিন বেগম, যিনি ২০০৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন, সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব গৃহিণী হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান হাবিবা, বয়স ৫ বছর, বর্তমানে ঢাকার "মাজ্জ্বল স্কুল" এর নার্সারি শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। ছোট্ট হাবিবা তাদের জীবনের আনন্দ ও আশার প্রতীক।
চার সদস্যের এই ছোট্ট পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন বেল্লাল হোসেন নিজেই। রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে চাকরির মাধ্যমে মাসে মাত্র ২৫,০০০ টাকা আয় করতেন, যা দিয়েই তিনি সংসার চালাতেন। এই সীমিত আয়ের মধ্যেই তিনি পরিবারের সবার প্রয়োজন পূরণে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। কোনো বিলাসিতা বা বাড়তি চাহিদার জায়গা ছিল না ছিল কেবল প্রয়োজন, দায়িত্ব ও ভালোবাসার জায়গা।
পরিবারের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে তিনি মাঝে মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও কিছু আর্থিক সহযোগিতা পেতেন, যা ছিল সাময়িক স্বস্তির উপায়। তবে জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি নিজস্ব পরিশ্রম এবং সততার ওপরই বেশি ভরসা করেছেন।
মো: বেল্লাল হোসেনের পরিবার নিছক একটি পরিবার নয় এটি একজন সংগ্রামী মানুষের জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি, যেখানে সীমিত আয়, অগাধ ভালোবাসা এবং অটুট দায়বদ্ধতা মিলেমিশে গড়ে তুলেছে এক অনন্য মানবিক গল্প।
ঘটনার বিবরণ
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে বেল্লাল হোসেন একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নেন, যা রায়েরবাজার থেকে শুরু হয়ে মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। মিছিলটি ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অংশ, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা, নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একত্রিত হয়েছিলেন। বেল্লাল হোসেন এই আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন, যিনি বরাবরই ন্যায়ের পক্ষে ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।
কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। মসজিদের সামনের রাস্তায় অবস্থানরত জনতার ওপর ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ এবং পুলিশের সমন্বিত বাহিনী কোনো ধরনের হুঁশিয়ারি বা পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হামলা চালায়। মুহূর্তেই আন্দোলনকারী জনতার ওপর নেমে আসে গুলির ঝড়। রাবার বুলেট, টিয়ার শেল, লাঠিচার্জ সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। চারপাশে আতঙ্ক, চিৎকার আর রক্তাক্ত দেহের ছড়াছড়ি।
এই হঠাৎ আক্রমণের সময় একটি গুলি এসে সরাসরি বেল্লাল হোসেনের চোখে আঘাত হানে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সাথে সাথে তার আশপাশের আন্দোলনকারীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করলেও, অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন বা লাঠিপেটার শিকার হন। বেল্লালের চোখে গুলির আঘাত এতটাই মারাত্মক ছিল যে, ঘটনাস্থলেই তিনি দৃষ্টিশক্তি হারানোর উপক্রম হন। আশেপাশের সহযোদ্ধারা জীবন ঝুঁকি নিয়ে তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন।
এই বর্বর হামলার পর, বেল্লালকে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা না পেলে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা বেল্লালের জীবনে একটি ভয়াবহ মোড় এনে দেয় শরীরিকভাবে তিনি গুরুতর আহত হন এবং মানসিকভাবেও চরমভাবে বিপর্যন্ত হয়ে পড়েন।
এই সহিংস হামলা শুধু বেল্লালের ওপর নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দমননীতির এক নগ্ন প্রকাশ, যেখানে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকারটুকুও রক্ষা পায় না। বেল্লাল হোসেনের এই ত্যাগ ও আহত হওয়ার ঘটনা আজও আন্দোলনরত ছাত্র সমাজের কাছে একটি বেদনাদায়ক প্রতীক হয়ে রয়েছে।
চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবরণ
চোখে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়াবহ ঘটনার পরপরই বেল্লাল হোসেনকে দ্রুত ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা তার চোখের প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পন্ন করেন এবং তৎক্ষণাৎ এক্স-রে করান। এক্স-রেতে দেখা যায়, গুলিটি তার চোখের ভিতরে প্রবেশ করেছে এবং তাৎক্ষণিক অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। পরিস্থিতির জটিলতা বিবেচনায় ইবনে সিনার চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত আল-নূর চক্ষু হাসপাতালে রেফার্ড করেন।
আল-নূর চক্ষু হাসপাতালে ডা. নূরনবী স্যারের অধীনে তার চিকিৎসা শুরু হয়। সেখানকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর স্যার বুঝতে পারেন যে, এ ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার আল-নূর হাসপাতালে সম্ভব নয়। তাই তিনি বেল্লালকে দ্রুত জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানোর পরামর্শ দেন।
বেল্লাল হোসেন পরে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। সেখানে অভিজ্ঞ চক্ষু বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচারে তার চোখের ভিতরে থাকা গুলিটি সফলভাবে বের করে আনা হয়। অস্ত্রোপচারের পর চোখের আঘাত সামান্য হলেও নিয়ন্ত্রণে আসে এবং অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
তবে এখনও বেল্লাল চোখে ঝাপসা দেখেন এবং তার চোখে স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফেরেনি। তাকে প্রতিনিয়ত চোখের ওষুধ ও ফলোআপ চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত চিকিৎসার পেছনে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে, যা তার নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এই ব্যয়ভার তাদের পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সংকটে ফেলেছে এবং ভবিষ্যতের চিকিৎসার জন্য তারা উদ্বেগে রয়েছে।
প্রস্তাবনা
১. তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
২. একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
পরিশেষে, মো. বেল্লাল হোসেন আজ এক অসহায় যোদ্ধা যিনি চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো দুর্দশায় ভুগছেন। পরিবার, চাকরি, চিকিৎসা সব দিক থেকে বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছেন। তার চিকিৎসার ধারাবাহিকতা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান এখন সময়োপযোগী সহায়তা দাবি করে।

এক নজরে মো: বেল্লাল হোসেন
নাম: মো: বেল্লাল হোসেন
জন্ম তারিখ: ২০-০৫-১৯৯২
পিতা: নুরুল ইসলাম, বৃদ্ধ
মাতা: জুমিনা, বৃদ্ধ
স্ত্রী : নাসরিন বেগম
মেয়ে: হাবিবা, ৫ বছর
পরিবারে সদস্য সংখ্যা: ৫ জন
বর্তমান ঠিকানা: হাজীরবাগ, বাড়ৈখালী, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা: আমখোলা, সোনাকাটি, তালতলী, বরগুনা
আহত হওয়ার তারিখ: ১৯ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ এবং পুলিশ বাহিনী
আহত হওয়ার স্থান।: মোহাম্মদপুর, ঢাকা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍