হোম / আহতদের তালিকা / মো: আবুল কালাম আজাদ
মো:  আবুল কালাম আজাদ

মো: আবুল কালাম আজাদ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

রংপুর
পেশা : ব্যবসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা


খোলাহাটি গ্রামের কালামের শৈশব
রংপুর জেলার হরিদেবপুর ইউনিয়নের গঙ্গাদাস (খোলাহাটি) গ্রামে মর্যাদাপূর্ণ কৃষক পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন মোঃ আবুল কালাম আজাদ। তার জন্ম ১৯৯০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। পিতা মোঃ মাজহারুল ইসলাম তখন একজন পরিশ্রমী কৃষক ছিলেন, আর মা শামছুর নাহার বেগম ছিলেন সংসারের মমতাময়ী রত্ন। আজাদের শৈশব কেটেছে ধানক্ষেতের পাশে খেলা করে, নদীর ধারে মাছ ধরে, আর রোদে পুড়ে স্কুলে যাতায়াত করে। গ্রামের পাঠশালায় শুরু হয়েছিল তার লেখাপড়া। জীবনের শুরুতেই দরিদ্রতা চিনে ফেলেছিল আজাদ। তবে হতাশ হননি। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বড় হতে থাকেন তিনি।

কষ্টের মাঝে গড়া স্বপ্ন, ভাঙনের আগের দিনগুলো
যৌবনে এসে আজাদ একাধিক ছোটখাটো চাকরি করে জীবিকা শুরু করেন। জীবনের এই সংগ্রামী পথের শেষে তিনি সাহস নিয়ে একটি ছোট ব্যবসা শুরু করেন রংপুর শহরের একটি বাজারে ছোট একটি দোকান। দোকান থেকে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলতো তার সাত সদস্যের পরিবার।
স্ত্রী ও চার সন্তান ফাহমিদ (৯ম শ্রেণি), সিনথিয়া (৮ম শ্রেণি), সিনহা (৩য় শ্রেণি) ও ছোট ছেলে ফাইজুল্লাহ। সবার মুখে হাসি ফুটাতে পারতেন তিনি। দিনগুলো চলছিল স্বপ্নের মতো, যদিও মাঝে মাঝে হিমশিম খেতে হতো বাজারদর ও আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সেই ছোট্ট সুখের জীবন তছনছ হয়ে যায়। ছাত্রদের উপর পুলিশি হামলার ছবি দেখে যিনি চোখ ফিরিয়ে থাকতে পারলেন না, তিনিই আজাদ।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন। শিক্ষিত বেকার যুবকদের হাজার হাজার আবেদন, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি না পাওয়া, বারবার নিয়োগ স্থগিত হওয়া। এসব বিষয় নিয়ে জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমে ছিল। মূল দাবি ছিল চাকরির ক্ষেত্রে মেধার যথার্থ মূল্যায়ন, কোটা ব্যবস্থা সংস্কার এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। ছাত্ররা রাজপথে নামে ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও একত্র হয়। কিন্তু এই যৌক্তিক দাবিগুলোর জবাব আসে অত্যন্ত নির্মমভাবে সরকার পুলিশ ও ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে আন্দোলন দমন করতে থাকে। রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ, এমনকি গুলি সবই ব্যবহার করা হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে সংবিধানে মতপ্রকাশের অধিকার আছে, সেখানে ছাত্রদের উপর এমন দমন দেখে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। অনেকেই ঘরে বসে থাকতে পারছিলেন না তাদের একজন ছিলেন ব্যবসায়ী আজাদ।
রাজপথে নেমে পড়া এক ব্যবসায়ীর গল্প
মোঃ আবুল কালাম আজাদ ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। তিনি রাজনীতির লোক নন, কোনো সংগঠনের সাথেও সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তবে তিনি ছিলেন এক জনদরদী, সচেতন নাগরিক। প্রতিদিন বাজারে দোকান করতেন, মানুষের সাথে কথা বলতেন, খবর রাখতেন চারপাশের। ছাত্রদের চোখে জল, বুক ভরা হতাশা দেখে তার হৃদয় কেঁপে উঠেছিল। বাজারে থেকে তিনি ছাত্রদের আন্দোলন প্রত্যক্ষ করছিলেন। তিনি চিন্তা করলেন ছাত্ররা ন্যায্য দাবি নিয়েই মাঠে নেমেছে। তখন মনে পড়লো, তার নিজের ছেলেও তো স্কুলে পড়ে একদিন তাকেও চাকরি খুঁজতে হবে। তাহলে, তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। রংপুর শহরের আন্দোলনে অংশ নিতে লাগলেন নিয়মিত। ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে, মিছিলে হাঁটলেন, মাইক ধরলেন, হাততালি দিলেন।
১৯ জুলাইয়ের রক্তাক্ত বিকেল
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, বিকাল ৫টার দিকে আজাদ রংপুর শহরের সিটি বাজার টাউন হল মোড়ে উপস্থিত হন ছাত্রদের এক প্রতিবাদ মিছিলে। হাজারো জনতা তখন সেখানে জড়ো হয়েছিল। ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণভাবে স্লোগান দিচ্ছিল “মেধার মূল্য দাও”, “অন্যায় কোটা বাতিল করো।” হঠাৎ করেই পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা যৌথভাবে হামলা চালায়। প্রথমে আসে টিয়ার সেল, পরে রাবার বুলেট ও ছরাগুলি। হুড়মুড় করে ছড়িয়ে পড়ে জনতা। চারদিকে ধোঁয়া, চিৎকার, কান্না। আজাদ তখন এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা এক শিক্ষার্থীকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান। ঠিক তখনই তার মাথায়, হাতে এবং পায়ে গুলি লাগে। মুহূর্তেই রক্তে ভিজে যায় শরীর। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তার গায়ের জামা রক্তে ভিজে লাল হয়ে যায়। ছাত্ররা তখন নিজেদের জীবন বাজি রেখে আজাদকে তুলে নিয়ে দৌড়ে যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
শরীরে গুলি নিয়ে বেঁচে থাকা এক প্রতিবাদ
হাসপাতালে কয়েকদিন ছিল যুদ্ধ। ডাক্তাররা জানান, তার শরীরে একাধিক গুলি লেগেছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে গুলি গুলো বের করা হয় । তবে মাথায় ঢুকে যাওয়া একটি গুলি আজও রয়ে গেছে। ডাক্তাররা অপারেশন করেও বের করতে পারেননি সেটি, কারণ অপারেশন করলে মৃত্যুঝুঁকি ছিল। সেই গুলি নিয়েই আজাদ বেঁচে আছেন কিন্তু যন্ত্রণা থেকে মুক্ত নন। মাঝেমধ্যেই তার মাথা প্রচণ্ড ব্যথা করে। তার বাম কান ড্যামেজ হয়ে গেছে ৯৮%।
আজ তার দোকান নেই, আয় নেই। পরিবারের ভরসা এখন সরকারি সহায়তা আর মানুষের দয়া। তবু তিনি বলেন, আমি আমার ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। গুলি খেয়েছি সত্য, কিন্তু বিবেক বেঁচে আছে।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মোঃ আবুল কালাম আজাদ
জন্ম তারিখ : ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯০
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : ব্যবসা (বর্তমানে বেকার)
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা
গ্রাম: গঙ্গাদাস (খোলাহাটি), ইউনিয়ন: হরিদেবপুর, থানা: রংপুর সদর, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মাজহারুল ইসলাম
মায়ের নাম : শামছুর নাহার বেগম, মৃত
পিতার পেশা ও বয়স : বৃদ্ধ, ৭৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. ফাহমিদ হাসান, বয়স: ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৯ম (কারমাইকেল কলেজিয়েট) সম্পর্ক: ছেলে
২. সিনথিয়া, বয়স: ১৩, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৮ম (সমাজকল্যান বিদ্যালয়), সম্পর্ক: মেয়ে
৩. সিনহা, বয়স: ৯, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৩য়, সম্পর্ক: মেয়ে
৪. ফাইজুল্লাহ, বয়স: ৩ বছর, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : সিটি বাজার,টাউন হল,রংপুর
আহত হওয়ার সময়কাল : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৫ টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍