হোম / আহতদের তালিকা / মো: নিরব বাবু
মো: নিরব বাবু

মো: নিরব বাবু

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

রংপুর
পেশা: শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো: নিরব বাবু
ক্রমিক: ৩৪২
আইডি: রংপুর বিভাগ ১৪৮

ওশনপুরের ছায়ায় নিরবের বেড়ে ওঠা
রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার ছোট্ট গ্রাম রওশনপুর। এখানেই ২০০৫ সালের ১ মার্চ জন্ম নেয় এক শান্তশিষ্ট ছেলে মো: নিরব বাবু। বাবা মো: জাহাঙ্গীর আলম, একজন পরিশ্রমী কৃষক, বয়স তখন ৪০ বছর। মা মোছা: নাজমা বেগম, ঘরের কাজ সামলে সন্তানদের মানুষ করাতেই তার জীবন নিবেদিত। ছোট্ট সংসার। চার সদস্যের পরিবার। বড় বোন সাম্মি আক্তার রিয়া বিবাহিত, আর ছোট বোন আতিকা খাতুন দুরামিঠাপুকুর দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই নিরব ভদ্র, লাজুক ও মনোযোগী ছাত্র। গ্রামের স্কুলেই তার শিক্ষাজীবন শুরু। বাবা-মার স্বপ্ন ছিল, নিরব যেন লেখাপড়া করে মানুষ হয়, তাদের মতো কষ্ট না করতে হয় তাকে। আব্দুর রউফ কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নিরব নিজের সাধনার পরিধি আরও বিস্তৃত করে। সকালে কলেজ, বিকেলে প্রাইভেট, আর রাতে বইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ। তার জীবন এক ছন্দময় সাধনার নাম। কিন্তু এই ছন্দে যে কালো মেঘ জমে উঠছিল, তা কেউ টের পায়নি তখন।


কোটা সংস্কার আন্দোলনের পূর্বাপর ২০১৮ ও ২০২৪
২০১৮ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। রাষ্ট্রের চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা গর্জে ওঠে। “বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ” তখন শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম নয়, এক গণজাগরণের নাম। ঢাকা থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। তখন সরকার গণআন্দোলনের মুখে সাময়িকভাবে কোটা সংস্কার করলেও এটার স্থায়ী কোনো সমাধান দেননি, যার ফলে ২০২৪ সালে এসে আন্দোলন আবার দানা বেঁধে ওঠে কারণ, পুরনো দাবি পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি, বরং আরও বৈষম্য তৈরি হয়েছে। তখন নিরব দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। তার চোখে তখন অন্যরকম আগুন। ঢাকা, রংপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট সব জায়গায় ছাত্ররা রাস্তায়। এই সময়ে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে, নির্বিচারে। তার এই হত্যাকাণ্ড যেন সারা দেশের ছাত্রসমাজের হৃদয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। নিরব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি।
সরাসরি আন্দোলনের ময়দানে
নিরব তখন নিয়মিত প্রাইভেট পড়ে কলেজে যায়। কিন্তু পীরগঞ্জ বাজারে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে পড়তে হয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে। ছাত্রলীগের কিছু সদস্য তাকে একদিন হুমকি দেয়। তোকে যেন আন্দোলনে দেখি না... তাহলে কিন্তু ভালো হবে না। নিরব চুপচাপ সেদিন চলে আসে। কিন্তু আবু সাঈদ হত্যার পর নিরবের ভিতরের ছাত্র মন আর ঘরে বসে থাকতে চায় না। কলেজে তার বন্ধুরা ব্যানার তৈরি করে ও পোস্টার লেখে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী তখন রাজপথে। আমরা কোটার নামে বৈষম্য মানব না। আবু সাঈদের রক্তের বদলা চাই,
বিচার চাই, অন্যায় মানব না। এমন সব স্লোগানে মুখরিত হয় রংপুর, পীরগঞ্জ, এমনকি গ্রামের রাস্তাও। নিরব নিজেও ব্যানার হাতে নামেন। তিনি মিছিলের সামনের সারিতে না থাকলেও, প্রতিটি দিন, প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি ছিলেন সাহসের প্রতীক।
গুলশান মোড়ে রক্তাক্ত বিকেল
৫ আগস্ট ২০২৪। সকাল দশটা বাজে। রোদের তেজ তখন বাড়ছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি উত্তপ্ত ছিল ছাত্রদের বুকের আগুন। নিরব সেদিন খুব ভোরে উঠে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে কলেজ ইউনিফর্ম পরে আন্দোলনে যান। গন্তব্য গুলশান মোড়, পীরগঞ্জ। সেখানে কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়। শুরু হয় মিছিল। স্লোগান আর ব্যানার নিয়ে তারা এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু যখন মিছিল গুলশান মোড়ের দিকে অগ্রসর হয় তখন হঠাৎ করে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী একত্র হয়ে শিক্ষার্থীদের উপর চড়াও হয়। পুলিশ টিয়ারশেল ছোড়ে, ছাত্রলীগ ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। ছাত্ররা আত্মরক্ষার জন্যও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই উত্তপ্ত সংঘর্ষে নিরবের মাথায় একটি ইট এসে লাগে। মুহূর্তেই রক্ত ঝরতে থাকে। সঙ্গীরা দ্রুত তাকে তুলে নিয়ে যায় নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানে তার মাথায় পাঁচটি সেলাই দিতে হয়। কিন্তু পরবর্তী চিকিৎসা গ্রাম্যভাবে চালিয়ে নিতে হয়, কারণ পরিস্থিতি এতটাই ভীতিকর হয়ে উঠেছিল। নিরব ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। মাথায় ক্ষতের দাগটি আজও আছে প্রমাণ হিসেবে, সে একদিন এই দেশের ছাত্র আন্দোলনের এক সাহসী অংশ ছিল। নিরবের জীবনে স্বপ্ন আছে, শিক্ষার আলো আছে, তবে সেই আলোর পথে ছায়া ফেলে কিছু শক্তি যারা চায় না তরুণ প্রজন্ম জেগে উঠুক। কিন্তু নিরবরা জেগে উঠবেই, কারণ তারাই ভবিষ্যতের কণ্ঠস্বর। রওশনপুরের মাটিতে বেড়ে ওঠা এই নিরব আজ শুধু একজন শিক্ষার্থী নয় এক সংগ্রামী, এক প্রতীক।


একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদির
নাম : মো: নিরব বাবু
জন্মতারিখ : ১ মার্চ ২০০৫
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : আব্দুর রউফ কলেজ (একাদশ শ্রেণী)
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: রওশনপুর, ইউনিয়ন: আব্দুল্লাহপুর, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: জাহাঙ্গীর আলম
মায়ের নাম : মোছা: নাজমা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৪০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. সাম্মি আক্তার রিয়া, বয়স: ২২, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
২. আতিকা খাতুন, বয়স: ১৬, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: দশম, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : গুলশান মোড়, পীরগঞ্জ
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৫টা
আক্রমণকারী : পুলিশ, আওয়ামী লীগ
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍