হোম / আহতদের তালিকা / মো: আশরাফুল ইসলাম
মো: আশরাফুল ইসলাম

মো: আশরাফুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : রাজমিস্ত্রী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

ছোটবেলার ছায়া ও কৈশোরের কাঁধে দায়িত্ব
রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার জাহাঙ্গীরবাদ গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেন মো: আশরাফুল ইসলাম। তার জন্ম ২০০০ সালের ১০ অক্টোবর। পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না, কিন্তু ভালোবাসা ছিল অগাধ। বাবার নাম হায়দার আলী, একজন পরিশ্রমী কৃষক। মা পেয়ারী বেগম, মমতাময়ী গৃহিণী ছিলেন। যিনি আজ আর নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতি আশরাফুলের হৃদয়ে অমলিন।
শৈশব কাটে গ্রামের মাটির ঘরে, ধানের শীষ আর শীতের কুয়াশার সাথে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা শুরু করলেও বেশিদূর আগাতে পারেননি। সংসারের চাপ, আর্থিক টানাপোড়েন, মায়ের অসুস্থতা সব মিলিয়ে কৈশোরেই জীবনের ভার কাঁধে তুলে নেন। তরুণ বয়সেই রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন আশরাফুল। খাওয়া-পরা আর বাবার সঙ্গে জমি-জমার খরচ জোগাতে দিন-রাত খেটেছেন ইট, বালি আর ঘামে গড়া জীবন তাঁর।

ছোট্ট সেই পরিবারটি আজ নিঃস্বপ্রায়।
তবু আশরাফুল বলেন, আমি রাজমিস্ত্রি হতে পারি, কিন্তু আমি মানুষ। দেশের জন্য দাঁড়িয়েছি, তাই আজ চোখের আলো হারিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস হারাইনি। মো: আশরাফুল ইসলাম আজ একটি নাম নয় বরং একটি প্রতিবাদের প্রতীক। একজন রাজমিস্ত্রী হয়েও তিনি প্রমাণ করেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শুধু ছাত্র নয়, প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। তাঁর রক্ত, চোখ এই দেশের স্বাধীনতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

পরিবার ও শহরমুখো সংগ্রাম
আশরাফুলের সংসার ছোট হলেও দায়িত্ব অনেক। বাবা হায়দার আলী এখন ৬৫ বছরের বৃদ্ধ। কাজের শক্তি আর নেই। মা নেই বহুদিন। তাঁর শূন্যতা আজও অনুভব করেন তিনি। স্ত্রী একজন গার্মেন্টস কর্মী। তাদের একমাত্র ছেলে শোয়াইব। বয়স মাত্র পাঁচ। সংসারের খরচ চালানো গ্রামে আর সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ভবিষ্যতের আশা নিয়ে পরিবারসহ গাজীপুরে পাড়ি জমান। সেখানে স্ত্রী কাজ নেন গার্মেন্টসে আর আশরাফুল নিজে মিস্ত্রির কাজে লেগে যান। সন্তান শোয়াইবকে রেখে যান গ্রামের বাড়িতে। শ্বশুরবাড়ির মা শোয়াইবকে আগলে রাখেন। এভাবেই চলতে থাকে এক ধরনের ছন্দহীন কিন্তু সহনশীল জীবন। দু’জনের আয় আর সীমিত চাহিদায় স্বপ্ন বোনা চলছিল মাঝে মধ্যে বাড়ি যাওয়া, ছেলের সাথে সময় কাটানো আর পরিশ্রমের মাঝে হাসিমুখে বাঁচার চেষ্টা। কিন্তু হঠাৎ নেমে আসে ঘন অন্ধকার।
আন্দোলনের ঢেউ ও রক্তাক্ত প্রতিরোধ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের চেহারা বদলে যায়। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন এক নতুন মোড় নেয়। সরকার তাদের দাবি না মেনে বরং গুলি করে হত্যা করতে থাকে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা সব শহরেই ছাত্ররা বিক্ষোভে নামে। সরকারের রক্তচক্ষু আর পুলিশি বর্বরতা সত্ত্বেও আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে-গঞ্জে। স্বৈরাচারী সরকারের অব্যাহত দমন-পীড়নে জনসাধারণ ক্ষুব্ধ হয়। পুলিশ-ডিবি একত্রে সাধারণ মানুষ, ছাত্র, কর্মজীবী সবাইকে হামলা করে। আন্দোলন শুধু ছাত্রদের নয়, হয়ে ওঠে জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতিচ্ছবি।
রাজমিস্ত্রি থেকে রক্তাক্ত প্রতিবাদী
আশরাফুল ইসলাম তখন ঢাকার গাজীপুরে রাজমিস্ত্রির কাজ করছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের উত্তাপে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ঘরে বসে থাকতে পারেননি তিনি। যিনি সারা জীবন ঘাম ঝরিয়েছেন, তিনি এবার রক্ত ঝরাতে প্রস্তুত ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ছাত্রদের সাহসিকতায় অনুপ্রাণিত হয়ে ২০ জুলাই ২০২৪ দুপুরে তিনি বাইপাসে আন্দোলনরত জনতার সাথে যোগ দেন। তারা সবাই তখন শান্তিপূর্ণ মিছিল করছিলেন। হঠাৎ একদল পুলিশ ও ডিবি সদস্য হায়নার মতো আক্রমণ করে। ছোঁড়া হয় টিয়ারশেল, গুলি আর ছররা। হঠাৎ করেই আশরাফুলের বুক, গলা ও মাথায় ছররা গুলি এসে ঝাঁঝরা করে দেয় তার দেহ। একটি গুলি লাগে ডান চোখে, বাকিগুলো বুকে, গলায় ও মাথার পাশে। রক্তে ভেসে যায় বাইপাস। আশরাফুল পড়ে যান রাস্তায়। জনতা ছুটে আসে, চিৎকার করে তাকে উদ্ধার করে গাজীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।
চিকিৎসা ও অবহেলার দীর্ঘশ্বাস
হাসপাতালে প্রথমে তাকে ভর্তি নিতে চায়নি কর্তৃপক্ষ। অনেক কাকুতি-মিনতির পর সামান্য প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাকে। তিনি উপায় না পেয়ে ফার্মগেটের ইস্পাহানি হাসপাতালে চলে যান । সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলে। তার ডান চোখে গুলি এখনো রয়ে গেছে। প্রথমে ঝাপসা দেখলেও এখন কিছুই দেখতে পান না সে চোখে। বাম চোখ যেন রক্ষা পায়, এ জন্য ডাক্তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। শরীরের আরও কিছু অংশে এখনো গুলি বিদ্ধ আছে। পরে তিনি রংপুর ফিরে আসেন এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় দুই লক্ষাধিক টাকা ঋণ করতে হয়েছে। পাওনাদারদের চাপ বাড়ছে। পরিবারে উপার্জনের একমাত্র ভরসা স্ত্রী, তিনিও সন্তানের জন্য ছুটি নিয়েছেন।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আশরাফুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০০০
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : রাজমিস্ত্রী
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: জাহাঙ্গীর বাদ, ইউনিয়ন: পীরগঞ্জ, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: হায়দার আলী
মায়ের নাম : মোছা: পেয়ারী বেগম, মৃত
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৬৫
আয়ের উৎস : স্ত্রীর গার্মেন্টসের বেতন
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩
সন্তানদের বিবরণ
১. শোয়াইব, বয়স: ৫, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : বাইপাস, গাজীপুর
আহত হওয়ার সময় : ২০ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ডিবি
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : স্থানীয় বাজারে মুদির দোকান দিয়ে দেয়া

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍