হোম / আহতদের তালিকা / মো: আল ফিরোজ কবির
মো: আল ফিরোজ কবির

মো: আল ফিরোজ কবির

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সরল শিকড় থেকে সংগ্রামের শুরু
রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার সরানন্দপুর গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম মো: আল ফিরোজ কবিরের। জন্ম তারিখ ২০০৫ সালের ৬ জুন। বাবা মো: শফি আলম একজন পরিশ্রমী কৃষক, বয়স ৪৮। মা আসমা বেগম গৃহিণী, যিনি সংসার চালানোর জন্য নিঃশব্দে লড়ে যান প্রতিদিন। তিন ভাই-বোনের মধ্যে ফিরোজ সবার বড়। ছোট বোন রুমানা আক্তার চতরা উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আর সবচেয়ে ছোট ভাই আকাশের বয়স মাত্র তিন বছর। শৈশব থেকেই ফিরোজ দেখেছেন কীভাবে বাবা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে জমিতে কাজ করেন। মায়ের হাতে খেয়ে, বাবার ঘামে ভিজে থাকা জামা দেখে তিনি বুঝে গেছেন, জীবনে কিছু করতে হলে সংগ্রামই একমাত্র পথ। তাই পড়ালেখাকে আঁকড়ে ধরেন। স্কুল থেকে ভালো রেজাল্ট করে এখন তিনি কারমাইকেল কলেজে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্র। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল, ফিরোজ একদিন বড় মানুষ হবে। ফিরোজও নিজে নিজে স্বপ্ন দেখতেন, তিনিও একদিন অনেক বড় হবেন। কিন্তু সেই স্বপ্নে একদিন হঠাৎ আঘাত হানে নিষ্ঠুর বাস্তবতা।


আন্দোলনের আগুন ও ছাত্র সমাজের জাগরণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সারাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ দাবি ছিল ন্যায্য হারে সুযোগ নিশ্চিত করা, বৈষম্য কমানো এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা ন্যায্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু সরকার এসব দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়ে বরং কঠোর দমন-পীড়ন শুরু করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। যখন পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থীদের মৃত্যু ঘটে, তখন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। কেউ চুপ থাকতে পারেনি। ফিরোজও পারেননি। তিনি তখনও ক্লাস করছিলেন কারমাইকেল কলেজে। কিন্তু মনে হচ্ছিল কিছু একটা করতে হবে। সবার সাথে রাস্তায় না নামলে যেন নিজেকেই বিশ্বাসঘাতক মনে হতো। তাই একদিন সহপাঠীদের সাথে নিয়ে রওয়ানা দেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এবং বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। সেই থেকে তিনি নিয়মিত সকাল থেকে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৬ জুলাইয়ের বিভীষিকাময় দুপুর
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, দুপুর ১টা। ফিরোজ ও তার বন্ধুদের একটি দল শান্তিপূর্ণ মিছিল করছিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান “বৈষম্যের অবসান চাই, কোটার সংস্কার চাই।” কিন্তু শান্তিপূর্ণ সেই কর্মসূচির মাঝেই শুরু হয় নরক যন্ত্রণা।
হঠাৎ করে পুলিশ আসে পিকআপ ভ্যানে করে। কোনো সাবধানবাণী ছাড়াই তারা টিয়ারশেল ছোড়ে, লাঠিচার্জ করে। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়। সেদিনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক পেতে দেয় রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। পুলিশ কাছ থেকে তার বুকে সরাসরি গুলি করতে থাকে একের পর এক। তিনি পতাকা হাতে ধীরে ধীরে ঢলে পড়েন পিচঢালা রাস্তায়। ফিরোজও সেদিন সেই মিছিলেরই একজন ছিলেন। মুহুর্মুহু গুলি ছুঁড়লে তিনি পেছনে সরে যাচ্ছিলেন হঠাৎ। এক পুলিশ সদস্য খুব কাছ থেকে তার দিকে রাইফেল তাক করে ছররা গুলি ছুঁড়ে। কয়েকটি ছররা এসে লাগে ফিরোজের চোখের নিচে, মাথায়, গলায় এবং বুকে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারদিক তখন কোলাহলে ভরে ওঠে। একজন রক্তাক্ত শিক্ষার্থী পড়ে আছে রাস্তায়, পুলিশ তাকেও লাঠি দিয়ে আঘাত করে। পরে সহপাঠীরা অনেক কষ্টে উদ্ধার করে তাকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
হাসপাতালের দরজায় অপেক্ষা আর অবহেলা

ফিরোজকে প্রথমে নেয়া হয় দর্শনা মা ও শিশু ক্লিনিক হাসপাতালে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সেখানে রোগীর ভিড়, ডাক্তারদের গাফিলতি ও রাজনৈতিক চাপে তার চিকিৎসা বিলম্বিত হয়। চোখের নিচে এখনো গুলি রয়ে গেছে। মাথাসহ শরীরের প্রায় ১৯/২০টা গুলির মধ্যে কিছু বের করা হয়েছে। বাকিগুলো এখনো রয়ে গেছে। নিয়মিত চিকিৎসা আর ব্যান্ডেজের খরচ চালাতে গিয়ে পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অনার্স পড়ুয়া এই ছেলেটির এখন বইয়ের ব্যাগের বদলে হাতে ঝুলে ব্যান্ডেজ, চোখে কষ্টের ঘুম আর মনে একটাই প্রশ্ন, আমরা কি শুধু ছাত্র, না এ দেশের নাগরিক? আল ফিরোজ কবিরের গল্প শুধুই একজন ছাত্রের নয়, এটা হচ্ছে অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে লাখো তরুণের প্রতীক। তার রক্তে লেখা হয়েছে স্বাধীনতা ও ন্যায়ের নতুন অধ্যায়।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আল ফিরোজ কবির
জন্ম তারিখ : ৬ জুন ২০০৫
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : কারমাইকেল কলেজ (ইস. ইতিহাস, অনার্স ১ম বর্ষ)
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: সরানন্দপুর, ইউনিয়ন: চত্রা, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: শফি আলম
মায়ের নাম : মোছা: আসমা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৪৮
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. রুমানা আক্তার, বয়স: ১২, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৫ম, সম্পর্ক: বোন
২. আকাশ, বয়স: ৩, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে
আহত হওয়ার সময় : ১৬ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍