হোম / আহতদের তালিকা / মো: নাছরুল ইসলাম
মো: নাছরুল ইসলাম

মো: নাছরুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শ্রমিক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে উঠা
রংপুর জেলার সদ্যপুষ্করনী ইউনিয়নের এক সবুজ শ্যামল গ্রামেই জন্ম নেয় মো: নাছরুল ইসলাম। তার জন্ম ২০০২ সালের ২০ নভেম্বর। ছোটবেলা কেটেছে গ্রামের খোলা মাঠ, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, আর ধানক্ষেতের পাশে। বাবা মো: লাল মিয়া একজন রিকশাচালক, বয়স এখন ৪৫; মা মোছা: নাজনীন বেগম একজন গৃহিণী, বয়স ৪০। ভাই-বোনের মধ্যে সে বড়। তার ছোট ভাই নাজমুল (১৭), পড়ছে অষ্টম শ্রেণিতে, আর বোন ইলমুনী এখন বিবাহিত। গ্রামে বড় হলেও নাছরুল মোটামুটি ভালো ছাত্রই ছিল। কিন্তু আর্থিক কষ্টের কারণে বেশিদূর পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। মাধ্যমিক পেরুতেই হাল ধরতে হয় সরসারের। সংসারে নিত্য প্রয়োজনীয় খরচ, ভাই-বোনদের পড়াশুনা সব কিছুতেই বাবা-মায়ের চোখে ছিল অসহায়ত্ব। এই চাপের মধ্যে একদিন ছোট্ট ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নাছরুল ঢাকার পথে রওনা দেয়, জীবনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে।

গার্মেন্টসের কাঁধে সংসারের ভার
ঢাকায় এসে নাছরুল চাকরি নেয় একটি গার্মেন্টসে। সেখানকার কাজ ছিল খুব কঠিন। প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা কাজ, কখনো রাতেও, তবু নাছরুল কাজ করত ধৈর্য নিয়ে। সে জানত, তার মাসশেষে পাঠানো টাকাই ভাইয়ের স্কুলের খরচ, মা-বাবার ওষুধ আর বাড়ির চাল-ডাল।
মাসে গার্মেন্টস থেকে যে বেতন পেত, তা দিয়ে ঠিকভাবে চলে না তবুও পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে যা পাওয়া যেত, তাতেই সন্তুষ্ট ছিল সে।
প্রতিদিন ভোরে উঠে গার্মেন্টসে যেত আর রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরত। কিন্তু তার মনের ভেতর ছিল তৃপ্তি। সে কিছু একটা করছে, পরিবারের জন্য।
আন্দোলনের আগুন, ফিরে আসা ইতিহাস
২০১৮ সালে দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়েছিল। ছাত্র-ছাত্রীরা ন্যায্য বণ্টনের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল। তখন বলা হয়েছিল, সংস্কার হবে। কিন্তু কথা রাখা হয়নি। বরং ২০২৪ সালে সেই আন্দোলন আবার নতুন করে শুরু হয়। ছাত্ররা বলল, এটা আর শুধু কোটা সংস্কার নয়, এটা এখন ন্যায়ের আন্দোলন, বাঁচার আন্দোলন।
সরকার আবারও তাদের দমন করতে উঠে পড়ে লাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, রংপুর সব জায়গায় ছাত্রদের ওপর গুলি ছোড়া হয়, টিয়ারশেল মারা হয়, অনেকেই মারা যায়, আহত হয় শত শত। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এই আন্দোলন ছিল আগুনের মতো, নাছরুলও সেই আগুনে জ্বলে ওঠেন।
গার্মেন্টস শেষে রাজপথে এক শ্রমিক
নাছরুল একজন গার্মেন্টস শ্রমিক হলেও তার হৃদয়ে ছিল ছাত্রদের প্রতি ভালোবাসা। গার্মেন্টস থেকে ফিরেই সে আন্দোলনে অংশ নিত। কখনো কখনো গার্মেন্টস বন্ধ থাকলে সারা দিনই থাকত রাস্তায়। সে দেখেছে শ্যামলীর রাস্তায় কিভাবে ছাত্রদের পেটানো হয়, মেয়েদের হেনস্তা করা হয়, ছেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।চোখের সামনে যেন গণহত্যা চলছিল। শ্যামলী তখন এক ভয়াবহ জায়গা। প্রতিদিন বিক্ষোভ, প্রতিদিন গুলি, প্রতিদিন লাঠিচার্জ। ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও আহত হচ্ছিল। তবুও আন্দোলন থামেনি।
নাছরুল নিজের শ্রমিক পরিচয় ভুলে গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে একাত্ব হয়ে ওঠে। তার হাতে তখন আর সেলাই করা কাপড় নয়, ছিল প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড।
৫ আগস্টের সেই অভিশপ্ত বিকেল
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দুপুর ৩টা।
খবর ছড়িয়ে পড়ে, স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। মুহূর্তেই ঢাকার দিকে রওনা হয় লাখ লাখ জনতা। তারা জাতীয় সংসদ ভবনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে গাজীপুর, উত্তরা, রমনা, শ্যামলী সব দিক থেকে। ছাত্র, শিক্ষক, মা, শিশু সবাই রাস্তায়। শ্যামলীর রাস্তা তখন লোকে লোকারণ্য। নাছরুলও ছিলেন সেই জনস্রোতে। কিন্তু তখনও পুলিশ চুপ করে ছিল না। বরং আরও বেশি হিংস্রভাবে হামলা শুরু করে। ছররা গুলি, বুলেট, টিয়ারশেল যা কিছু ছিল, তারা তা দিয়ে হামলা চালায়। নাছরুল সামনে থেকেই ছাত্রদের ঢাল হয়ে দাঁড়ান। কিন্তু এক পর্যায়ে একটি ছররা গুলি এসে তার বাম পায়ের উরুতে বিদ্ধ হয়। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। চারপাশ তখন রক্তে রঞ্জিত। রাস্তায় পড়ে থাকে শত শত আহত শরীর। নাছরুলকে ছাত্র-জনতারা টেনে সরিয়ে নেয় একটি ভাঙা রিকশার নিচে। রক্তে ভেজা শরীর নিয়ে সে তখন চোখ মেলে তাকিয়ে বলে, আমি কিছু চাইনি ভাই, শুধু ন্যায় চেয়েছিলাম। তাকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল হাসপাতালে নেয়া হয়।
ব্যথার বিছানায় এক প্রতিবাদী শ্রমিক
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা করার পর তাকে ঢাকা পঙ্গুত্বের রেফার করে। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসা নেন পরে নাছরুলকে পরে ঢাকা মেডিকেল নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার পায়ের উরুতে দু’টি অপারেশন করা হয়। উরুর পাশাপাশি তার একটা অণ্ডকোষও বেরিয়ে যায়। উরুতে অপারেশন করে হাড় জোড়া লাগানোর জন্য রড বসানো হয়। হাড় পরিপূর্ণভাবে জোড়া লাগলে অপারেশন করে রড বের করতে হবে। বর্তমানে তিনি ঠিকভাবে হাঁটতে পারেন না, পায়ের ব্যথায় ঘুমাতেও পারেন না। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন, কিন্তু তার পরিবারের পক্ষে সেটা দেয়া সম্ভব না। বাবা রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন, তাতে ওষুধ কেনাই কষ্টকর। চিকিৎসা চালাতে গিয়ে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা তিনি ঋণী হন। মো: নাছরুল ইসলাম শুধু একজন শ্রমিক নয়, তিনি এক সাহসী নাগরিক। তার রক্তে লেখা হয়েছে গণজাগরণের ইতিহাস। তার দুঃখ, তার ব্যথা, তার প্রতিবাদ সবই এ দেশের নতুন প্রজন্মের গর্ব হয়ে থাকবে।


একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি

নাম : মো: নাছরুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ২০ নভেম্বর ২০০২
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শ্রমিক
প্রতিষ্ঠান : গার্মেন্টস
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: সদ্যপুস্করনী, ইউনিয়ন: সদ্যপুষ্করনী, থানা: রংপুর সদর, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: লাল মিয়া
মায়ের নাম : মোছা: নাজনীন বেগন
পিতার পেশা ও বয়স : রিকশাচালক, ৪৫
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. নাজমুল, বয়স: ১৭, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: ভাই
২. ইলমুনী, বয়স: ২০, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : শ্যামলী, ঢাকা
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৩টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
চিকিৎসার প্রস্তাবনা : উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে রড বের করার ব্যবস্থা করা
কর্মসংস্থানে প্রস্তাবনা : স্থানীয় বাজারে একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়া

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍