হোম / আহতদের তালিকা / মো: জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী
মো: জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী

মো: জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : ব্যবসা

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
জন্ম রংপুর জেলার এক শান্ত, নিরিবিলি গ্রাম গনেশপুরে। ১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারিতে জন্ম নেন জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী। বাবা আব্দুল খালেক সিদ্দিকী ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ। মা জাহেরা খাতুন ছিলেন একজন গৃহিণী। তারা কেউ এখন দুনিয়াতে বেঁচে নেই। ছোটবেলা থেকেই জাহাঙ্গীর ছিলেন মিশুক ও শান্ত স্বভাবের। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটি পড়াশুনার পাশাপাশি ছিলেন চটপটে, কর্মঠ ও মানবিক। তার বড় মেয়ে জেরিন তাসনিম সিদ্দিকী বিবাহিত। তার ছোট ছেলে সাদমান সাকিব সিদ্দিকী রংপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে উঠতে হয় তাকে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো না থাকায় পড়াশুনার পাশাপাশি ছোটখাটো কাজও করতে হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়ভার তার উপরেই এসে পড়ে। তিনি রংপুর শহরে একটি ফার্মেসিতে নিয়মিত বসেন। মানুষের সেবা দেন। তিনি ওষুধ বিক্রির পাশাপাশি গ্রামের মানুষদের প্রাথমিক চিকিৎসায় সহযোগিতা করতেন। ডাক্তার নামেও তার পরিচিত ছিলো বেশ। মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝার এক সহজাত ক্ষমতা ছিল তার। তার কাছে অসহায় মানুষ যেন একটু স্বস্তির আশ্রয় খুঁজে পেত।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের খবর জাহাঙ্গীরের মনেও নাড়া দিয়েছিল। তার ছেলে সাদমান সাকিব সিদ্দিকী ছিল রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র। চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে সারাদেশের ছাত্র-জনতা যখন রাস্তায় নামে, তখন জাহাঙ্গীর বুঝতে পারেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই আন্দোলন কতটা প্রয়োজনীয়। সরকার সাময়িকভাবে কিছু দাবি মেনে নিলেও স্থায়ী কোনো সমাধান আসেনি। বরং সময় গড়াতেই দেখা যায়, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য বেড়েছে। প্রশ্ন ফাঁস, দুর্নীতি, চাকরির ক্ষেত্রে দলীয়করণ ইত্যাদি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ২০২৪ সালে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল রাখা হলে আন্দোলন আবারও দানা বেঁধে ওঠে।
যেখানে নতুন করে আন্দোলনের ঢেউ ওঠে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রাজশাহী ও রংপুর সহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ছাত্র জনতার ক্ষোভ।
এক বিকেলের বিভীষিকা
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, বিকেল ৫টা। প্রতিদিনের মতোই জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী তার মেডিসিনের দোকানে বসেছিলেন নিউ সুপার মার্কেটের পাশে। দুই সন্তান নিয়ে তার জীবন মোটামুটি ভালোই চলছিল। মেয়ে জেরিন তাসনিম বিবাহিত, আর ছেলে সাদমান কলেজে পড়ে। আশা ছিল সে একদিন ভালো কিছু করবে। হঠাৎ বিকেলের শান্ত পরিবেশ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। রংপুর শহরের রাজপথে ছাত্র জনতা অবস্থান নিলে, ছাত্রলীগ ও পুলিশ একযোগে তাদের ওপর হামলা চালায়। আশেপাশের মানুষ দিগি¦দিক ছুটতে থাকে। জাহাঙ্গীরের ফার্মেসির দরজা ছিল খোলা। আতঙ্কে কয়েকজন ছাত্র দোকানের ভেতরে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখানেই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তাদেরকে দেখতে পেয়ে দোকানের সামনে আসে। দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে দেওয়ায় তারা দোকানে লাথি মেরে দোকানের শাটল বাঁকা করে ফেলে। প্রাণের ভয়ে তারা দোকানের ঝাপ খুলছিল না। স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশবাহিনী এতটাই নির্দয় ছিল যে, তারা বন্দুকের নল দোকানের ঝাপের নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে কয়েক রাউন্ড ছররা গুলি ও রাবার বুলেট ছাড়ে। জাহাঙ্গীর আলমের পায়ের টাকনুতে গুলি লেগে টাকনুর মাংস এবং হাড় উড়ে যায়। অন্যান্যদের পায়ে শত শত ছররা গুলি লাগে। রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় পুরা দোকানের ফ্লোর। এমন পরিস্থিতিতে তাদের আর্তনাদ এবং তারা ভয়ে বেরও হতে পারছে না। তাদের পা থেকে রক্ত দোকানের বাইরে বেয়ে পড়ছিল। পরবর্তীতে পুলিশ চলে গেলে ছাত্র-জনতা তাদের উদ্ধার করে। কিন্তু সেই সময় হাসপাতালেও ছিল একই চিত্র। সন্ত্রাসী আওয়ামী লীগের হামলা ও মামলার হুমকি। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলেন না, কিন্তু মানুষকে সহযোগিতা করতে যেয়ে তিনিও আহত হলেন মারাত্মকভাবে।
চিকিৎসা
জাহাঙ্গীর আলম ভয়ে হাসপাতালেও যাননি। প্রথমে তার ভাইয়ের ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি না পেয়ে তিনি একটি প্রাইভেট হসপিটাল প্রাইম হসপিটালে ভর্তি হন। সেখানে তিন দিন অবস্থান নিয়ে চিকিৎসা চালান। কিন্তু তার পায়ের অবস্থা জটিল হওয়ার কারণে তার চিকিৎসা হয়নি। তিনি চলে যান ঢাকার কেয়ার হসপিটালে। সেখানে পায়ের অপারেশন করা হয় কয়েকবার। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে প্রায় ৭ লক্ষ টাকা বিল হয়। এই বিল পরিশোধ না করে তারা বের হতে পারবে না এমন পরিস্থিতিতে তার মাথায় চিন্তার যেন অন্ত ছিলো না। নিজের যা পুঁজি ছিল এবং আশেপাশে থেকে ধার নিয়ে টাকা পরিশোধ করে তিনি বাড়ি চলে যান। কিন্তু তার ক্ষত এখনো সম্পূর্ণ সেড়ে ওঠেনি। বয়স হওয়ার কারণে তার শরীর আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকরা বলেছে তার দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হবে। ঔষধপত্র এখনো চলমান রয়েছে।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী
জন্ম তারিখ : ১ জানুয়ারি ১৯৬৬
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : ব্যবসা
প্রতিষ্ঠান : মেডিসিনের দোকান
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : রংপুর
গ্রাম : গণেশপুর
ইউনিয়ন : বাবু খাঁ
থানা : সদর
জেলা : রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : আব্দুল খালেক সিদ্দিকী, মৃত
মায়ের নাম : জাহেরা খাতুন, মৃত
মাসিক আয় : ৩০ হাজার
আয়ের উৎস : ব্যবসা
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. জেরিন তাসনিম সিদ্দিকী, বিবাহিত, সম্পর্ক: মেয়ে
২. সাদমান সাকিব সিদ্দিকী, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: রংপুর সরকারি কলেজ, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : নিউ সুপার মার্কেট, রংপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৫টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা : এককালীন সহায়তা করা।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍