সোহেল রানা মিঠু
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : ঘড়ির মেকানিক
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
জন্ম পরিচয়
মিঠুর পুরো নাম সোহেল রানা মিঠু। তার পিতার নাম মতিয়ার এবং মাতার নাম জরিনা। সে মূলত একজন ঘড়ির মেকানিক, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাকে ফুটপাতে ঘড়ি মেরামতের কাজ করতে হয়। তার ঠিকানা হলো রংপুর জেলার সদর থানার অন্তর্গত জমনাপাড়ার ফকির মোহাম্মদ রোড। তার আয়ের প্রধান উৎস এই মেকানিকের কাজ, যা দিয়ে সে কোনোমতে সংসার চালায়। এই সামান্য আয় দিয়েই তাকে জীবনধারণ করতে হয়, যা তার সংগ্রামী জীবনের এক করুণ চিত্র তুলে ধরে।
মিঠুমিঠুর দুঃখের গল্প
মিঠুর জীবনটা ছিল ঘড়ির কাঁটার মতো, একঘেয়ে আর নিরন্তর। নিউ সুপার মার্কেটের এক কোণে বসে সে ঘড়ি সারাতো, তার প্রতিটি টিক-টিক শব্দ যেন তার জীবনের একাকীত্বেরই প্রতিধ্বনি। তার কোনো সন্তান ছিল না, এই শূন্যতা তার ভেতরে এমন এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল যা কোনো ঘড়ি সারিয়েও পূরণ করা যেত না। তার হাতগুলো ছিল রুক্ষ, কঠিন পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু এই হাতগুলোই ছিল তার একমাত্র অবলম্বন, সংসার চালানোর একমাত্র উপায়। প্রতিটি নতুন দিন তার কাছে আসতো এক নতুন সংগ্রামের বার্তা নিয়ে, এক নতুন যুদ্ধের আহ্বান নিয়ে।
সেদিনও ছিল এমনই এক সাধারণ দিন। সূর্য তার চিরচেনা আলো ছড়িয়েছিল ঢাকার ব্যস্ত ফুটপাতে। মিঠু তার ছোট টুলবক্স আর ভাঙা চেয়ার নিয়ে বসেছিল। তার চারপাশে মানুষের কোলাহল, ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক আর গাড়ির অবিরাম শব্দ। সে মনোযোগ দিয়ে একটি পুরনো ঘড়ি সারার চেষ্টা করছিল, তার সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশগুলো যেন কিছুতেই ঠিক জায়গায় বসতে চাইছিল না। হঠাৎ করেই বাতাসের সুর পাল্টে গেল। এক অস্বাভাবিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল চার পাশে।
তার চিরচেনা গলিটা, যা সাধারণত মানুষের অবাধ চলাচলের পথ, সেদিন যেন এক রুদ্ধশ্বাস মঞ্চে পরিণত হলো। একদল উত্তেজিত আন্দোলনকারী গলি থেকে বেরিয়ে এল, তাদের স্লোগান আর চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। তারপর এল পুলিশ, তাদের সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ সব কোলাহল ছাপিয়ে গেল, এক আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত নিয়ে। মিঠুর পেটে ভয়ের এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে আতঙ্কিত চোখে চারদিকে তাকাল, পালানোর কোনো পথ নেই। সে যেন এক অনিচ্ছাকৃত দর্শক হয়ে এক ভয়াবহ নাটকের অংশ হয়ে গেল।
চারদিকে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। মানুষের চিৎকার, পুলিশের ধাওয়া আর গুলির শব্দে বাতাস যেন কেঁপে উঠল। মিঠু, প্রাণের তাগিদে, কোনোমতে নিজেকে বাঁচাতে চাইল। তার চোখ পড়ল কাছের এক ফার্মেসির দিকে, যেন এক মরুদ্যানের মতো। সে প্রাণপণে ছুটল, মানুষের ভিড় ঠেলে ফার্মেসির ভেতরে ঢুকে পড়ল, হাঁপাচ্ছিল সে, বুকটা ধড়ফড় করছিল।
সে ভেবেছিল, সে নিরাপদ। কিন্তু তার ধারণা ভুল ছিল।
পরের মুহূর্তগুলো ছিল এক তীব্র যন্ত্রণার প্রহর। তার বাম পায়ে যেন হাজার হাজার সুঁই একসাথে বিঁধে গেল, এক অসহ্য জ্বালাপোড়া তাকে গ্রাস করল। সে আর্তনাদ করে উঠল, এক গভীর, পশুর মতো চিৎকার, যা বাইরের কোলাহলে হারিয়ে গেল। সে লুটিয়ে পড়ল, তার শরীর ব্যথায় কুঁকড়ে গেল, বাম পা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে মনে হলো। সে নিচে তাকাল, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল, এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখল! তার বাম পা, যা একসময় তার জীবনের অবলম্বন ছিল, এখন ছিন্নভিন্ন, গুলিতে ঝাঁঝরা। ব্যথা ছিল অসহনীয়, এক তীব্র যন্ত্রণা যা তার অস্তিত্বকে গ্রাস করে ফেলছিল।
কতক্ষণ কেটেছিল সে জানে না, হয়তো অনন্তকাল, হয়তো কয়েক মিনিট। মিঠু সেখানেই পড়ে ছিল, রক্ত ঝরছিল অবিরাম, তার পা এক ধ্বংসস্তূপের মতো। দাঙ্গার শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, তার কানে বাজছিল অবিরাম ভোঁ ভোঁ শব্দ আর তার ক্ষতবিক্ষত পায়ের তীব্র যন্ত্রণা। অবশেষে কেউ একজন হয়তো ফার্মেসির কোনো দয়ালু মানুষ তাকে সাহায্য করল। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো, পথের পুরোটা সময় ছিল ব্যথা আর ভয়ের এক অস্পষ্ট স্মৃতি।
ডাক্তাররা তার পা নিয়ে কাজ করছিলেন, তাদের মুখ ছিল গম্ভীর, তাদের নড়াচড়া ছিল নির্ভুল। তারা কিছু গুলি বের করতে পারলেন, কিন্তু ছোট ছোট সীসার টুকরোগুলো তার মাংসের গভীরে গেঁথে রইল সেই ভয়াবহ দিনের এক অশুভ স্মারক হয়ে। সে যতটুকু চিকিৎসা পেল তাতে তার শরীরের ক্ষত কিছুটা সারল, কিন্তু আর্থিক বোঝা ছিল বিশাল। মিঠুর কোনো বীমা বা কোনো সঞ্চয় ছিল না, শুধু ঘড়ি সারিয়ে যা আয় করত তাই ছিল তার সম্বল। সে আশা করেছিল, প্রার্থনা করেছিল, কোনো সাহায্য পাবে সরকার থেকে, বেসরকারি সংস্থা থেকে, যে কোনো জায়গা থেকে। কিন্তু তার আকুতি কেউ শুনল না। কোনো সরকারি সাহায্য এলো না, কোনো বেসরকারি সংস্থা সাহায্যের হাত বাড়াল না। সে ছিল কেবল আরেকটি পরিসংখ্যান, আমলাতন্ত্র আর উদাসীনতার বিশাল যন্ত্রে হারিয়ে যাওয়া আরেকটি শিকার।
সে তার ছোট শূন্য ঘরে ফিরে এলো ঘড়ির পরিচিত টিকটিক শব্দের পরিবর্তে তার পায়ে ছিল এক অবিরাম ব্যথা। তার বাম পা, যা একসময় তার স্থির সঙ্গী ছিল, এখন তা এক চিরস্থায়ী কষ্টের উৎস। গেঁথে থাকা গুলির টুকরোগুলো, ছোট ছোট বিষাক্ত পোকামাকড়ের মতো তাকে অবিরাম যন্ত্রণা দিত, বিশেষ করে যখন আবহাওয়া ঠাণ্ডা বা স্যাঁতসেঁতে হতো। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল এক সংগ্রাম, এক নতুন ব্যথার ঢেউ, ভয়াবহ অভিজ্ঞতার এক স্পষ্ট স্মারক।
মিঠুর জীবন যা এমনিতেই এক নীরব হতাশার বুননে বোনা ছিল, এখন যন্ত্রণা আর নিরাশার সূতোয় আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেল। মাতৃত্বের আনন্দ, যা এক সুদূর স্বপ্ন ছিল এবং সে অনেক আগেই ত্যাগ করেছিল, এখন তার জায়গায় এল এক ভাঙা শরীর আর ভাঙা এক আত্মা। সে কাজ করার চেষ্টা করত, ঘড়ি সারাতো, কিন্তু তার হাত, যা একসময় এত নিপুণ ছিল, তা ব্যথা আর ক্লান্তিতে কাঁপত। পায়ের অবিরাম ব্যথার কারণে সে বেশিক্ষণ বসতে পারত না, এমনকি সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারত না। নিউ সুপার মার্কেটের ব্যস্ত কোলাহল যা একসময় তার কর্মক্ষেত্র ছিল, এখন তার কাছে তার বিধ্বস্ত জীবনের এক নিষ্ঠুর উপহাস মনে হতো।
মিঠুর গল্প কেবল তার একার নয়। এটি সেই নির্মম উদাসীনতার এক জীবন্ত প্রমাণ যা প্রায়শই দুর্ঘটনার পর দেখা যায়, অসংখ্য মানুষের এক মর্মস্পর্শী প্রতিধ্বনি যারা সমাজের ফাটলে পড়ে যায়, তাদের বোঝা একা বহন করতে বাধ্য হয়। সে এমন এক দিনের স্বপ্ন দেখে যখন ব্যথা কমে যাবে, যখন সে খোঁড়াবে না, যখন সে তার ঘড়ি সারানোর কাজে ফিরে যেতে পারবে, ঘড়ির পরিচিত ছন্দে। কিন্তু প্রতিটি দিন, যখন তার গেঁথে থাকা গুলির টুকরোগুলো তাকে অবিরাম যন্ত্রণা দেয়, সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসে, তার জায়গায় আসে এক অপরিবর্তনীয় জীবনের কঠিন বাস্তবতা, এক জীবন যা চিরতরে তার বাম পায়ের গুলির দাগে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তার অস্তিত্ব এক সহনশীলতার প্রমাণ, কিন্তু একই সাথে অবহেলার এক বিশাল ভারের প্রমাণও বটে, এক দুঃখজনক, নীরব প্রমাণ যা ক্ষতি আর অবিরাম ব্যথায় সংজ্ঞায়িত এক জীবনকে তুলে ধরে।
চিকিৎসা ও প্রস্তাবনা
বর্তমানে সুস্থ, কিন্তু ভেতরে এখনো ছররা গুলি আছে। ডাক্তার বলেছে এখন সে সুস্থ। সে বাইরে হাঁটে, হাসে, কাজেও ফিরে যায়। কিন্তু শরীরে রয়ে গেছে কিছু ছররা গুলি, যেগুলো অস্ত্রোপচারেও তোলা যায়নি।
প্রতিদিন একটু ব্যথা, মনে করিয়ে দেয় সেই দিনটার কথা, যখন জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে সে বেঁচে ফিরেছিল।
কর্মসংস্থান ও বাজেট প্রস্তাবনা: ব্যবসার জন্য মূলধন দিলে পরিবারের জন্য জীবন চালানো সম্ভব। এক্ষেত্রে তিন লক্ষ টাকা প্রয়োজন।ন্যায়ের দাবিতে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি
এক নজরে সোহেল রানা
নাম : মো: সোহেল রানা মিঠু
জন্ম তারিখ : ৫ মার্চ ১৯৭৭
জন্মস্থান : গ্রাম: জমনা পাড়া, সদর থানা, রংপুর
পেশা : ঘড়ির মেকানিক
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : ফকির মোহাম্মদ রোড, গ্রাম: জমনাপাড়া, সদর থানা, রংপুর
পারিবারিক তথ্য
পিতার নাম : মো: মতিয়ার রহমান
মায়ের নাম : জরিনা বেগম
পারিবারিক অবস্থা : (দারিদ্র্য)
আয়ের উৎস : ঘড়ির মেকানিক
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ২ জন
ঘটনার স্থান : রংপুর
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪
সময় : বিকেল ৫.০০টা
মিঠুর পুরো নাম সোহেল রানা মিঠু। তার পিতার নাম মতিয়ার এবং মাতার নাম জরিনা। সে মূলত একজন ঘড়ির মেকানিক, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাকে ফুটপাতে ঘড়ি মেরামতের কাজ করতে হয়। তার ঠিকানা হলো রংপুর জেলার সদর থানার অন্তর্গত জমনাপাড়ার ফকির মোহাম্মদ রোড। তার আয়ের প্রধান উৎস এই মেকানিকের কাজ, যা দিয়ে সে কোনোমতে সংসার চালায়। এই সামান্য আয় দিয়েই তাকে জীবনধারণ করতে হয়, যা তার সংগ্রামী জীবনের এক করুণ চিত্র তুলে ধরে।
মিঠুমিঠুর দুঃখের গল্প
মিঠুর জীবনটা ছিল ঘড়ির কাঁটার মতো, একঘেয়ে আর নিরন্তর। নিউ সুপার মার্কেটের এক কোণে বসে সে ঘড়ি সারাতো, তার প্রতিটি টিক-টিক শব্দ যেন তার জীবনের একাকীত্বেরই প্রতিধ্বনি। তার কোনো সন্তান ছিল না, এই শূন্যতা তার ভেতরে এমন এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল যা কোনো ঘড়ি সারিয়েও পূরণ করা যেত না। তার হাতগুলো ছিল রুক্ষ, কঠিন পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু এই হাতগুলোই ছিল তার একমাত্র অবলম্বন, সংসার চালানোর একমাত্র উপায়। প্রতিটি নতুন দিন তার কাছে আসতো এক নতুন সংগ্রামের বার্তা নিয়ে, এক নতুন যুদ্ধের আহ্বান নিয়ে।
সেদিনও ছিল এমনই এক সাধারণ দিন। সূর্য তার চিরচেনা আলো ছড়িয়েছিল ঢাকার ব্যস্ত ফুটপাতে। মিঠু তার ছোট টুলবক্স আর ভাঙা চেয়ার নিয়ে বসেছিল। তার চারপাশে মানুষের কোলাহল, ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক আর গাড়ির অবিরাম শব্দ। সে মনোযোগ দিয়ে একটি পুরনো ঘড়ি সারার চেষ্টা করছিল, তার সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশগুলো যেন কিছুতেই ঠিক জায়গায় বসতে চাইছিল না। হঠাৎ করেই বাতাসের সুর পাল্টে গেল। এক অস্বাভাবিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল চার পাশে।
তার চিরচেনা গলিটা, যা সাধারণত মানুষের অবাধ চলাচলের পথ, সেদিন যেন এক রুদ্ধশ্বাস মঞ্চে পরিণত হলো। একদল উত্তেজিত আন্দোলনকারী গলি থেকে বেরিয়ে এল, তাদের স্লোগান আর চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। তারপর এল পুলিশ, তাদের সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ সব কোলাহল ছাপিয়ে গেল, এক আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত নিয়ে। মিঠুর পেটে ভয়ের এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে আতঙ্কিত চোখে চারদিকে তাকাল, পালানোর কোনো পথ নেই। সে যেন এক অনিচ্ছাকৃত দর্শক হয়ে এক ভয়াবহ নাটকের অংশ হয়ে গেল।
চারদিকে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। মানুষের চিৎকার, পুলিশের ধাওয়া আর গুলির শব্দে বাতাস যেন কেঁপে উঠল। মিঠু, প্রাণের তাগিদে, কোনোমতে নিজেকে বাঁচাতে চাইল। তার চোখ পড়ল কাছের এক ফার্মেসির দিকে, যেন এক মরুদ্যানের মতো। সে প্রাণপণে ছুটল, মানুষের ভিড় ঠেলে ফার্মেসির ভেতরে ঢুকে পড়ল, হাঁপাচ্ছিল সে, বুকটা ধড়ফড় করছিল।
সে ভেবেছিল, সে নিরাপদ। কিন্তু তার ধারণা ভুল ছিল।
পরের মুহূর্তগুলো ছিল এক তীব্র যন্ত্রণার প্রহর। তার বাম পায়ে যেন হাজার হাজার সুঁই একসাথে বিঁধে গেল, এক অসহ্য জ্বালাপোড়া তাকে গ্রাস করল। সে আর্তনাদ করে উঠল, এক গভীর, পশুর মতো চিৎকার, যা বাইরের কোলাহলে হারিয়ে গেল। সে লুটিয়ে পড়ল, তার শরীর ব্যথায় কুঁকড়ে গেল, বাম পা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে মনে হলো। সে নিচে তাকাল, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল, এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখল! তার বাম পা, যা একসময় তার জীবনের অবলম্বন ছিল, এখন ছিন্নভিন্ন, গুলিতে ঝাঁঝরা। ব্যথা ছিল অসহনীয়, এক তীব্র যন্ত্রণা যা তার অস্তিত্বকে গ্রাস করে ফেলছিল।
কতক্ষণ কেটেছিল সে জানে না, হয়তো অনন্তকাল, হয়তো কয়েক মিনিট। মিঠু সেখানেই পড়ে ছিল, রক্ত ঝরছিল অবিরাম, তার পা এক ধ্বংসস্তূপের মতো। দাঙ্গার শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, তার কানে বাজছিল অবিরাম ভোঁ ভোঁ শব্দ আর তার ক্ষতবিক্ষত পায়ের তীব্র যন্ত্রণা। অবশেষে কেউ একজন হয়তো ফার্মেসির কোনো দয়ালু মানুষ তাকে সাহায্য করল। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো, পথের পুরোটা সময় ছিল ব্যথা আর ভয়ের এক অস্পষ্ট স্মৃতি।
ডাক্তাররা তার পা নিয়ে কাজ করছিলেন, তাদের মুখ ছিল গম্ভীর, তাদের নড়াচড়া ছিল নির্ভুল। তারা কিছু গুলি বের করতে পারলেন, কিন্তু ছোট ছোট সীসার টুকরোগুলো তার মাংসের গভীরে গেঁথে রইল সেই ভয়াবহ দিনের এক অশুভ স্মারক হয়ে। সে যতটুকু চিকিৎসা পেল তাতে তার শরীরের ক্ষত কিছুটা সারল, কিন্তু আর্থিক বোঝা ছিল বিশাল। মিঠুর কোনো বীমা বা কোনো সঞ্চয় ছিল না, শুধু ঘড়ি সারিয়ে যা আয় করত তাই ছিল তার সম্বল। সে আশা করেছিল, প্রার্থনা করেছিল, কোনো সাহায্য পাবে সরকার থেকে, বেসরকারি সংস্থা থেকে, যে কোনো জায়গা থেকে। কিন্তু তার আকুতি কেউ শুনল না। কোনো সরকারি সাহায্য এলো না, কোনো বেসরকারি সংস্থা সাহায্যের হাত বাড়াল না। সে ছিল কেবল আরেকটি পরিসংখ্যান, আমলাতন্ত্র আর উদাসীনতার বিশাল যন্ত্রে হারিয়ে যাওয়া আরেকটি শিকার।
সে তার ছোট শূন্য ঘরে ফিরে এলো ঘড়ির পরিচিত টিকটিক শব্দের পরিবর্তে তার পায়ে ছিল এক অবিরাম ব্যথা। তার বাম পা, যা একসময় তার স্থির সঙ্গী ছিল, এখন তা এক চিরস্থায়ী কষ্টের উৎস। গেঁথে থাকা গুলির টুকরোগুলো, ছোট ছোট বিষাক্ত পোকামাকড়ের মতো তাকে অবিরাম যন্ত্রণা দিত, বিশেষ করে যখন আবহাওয়া ঠাণ্ডা বা স্যাঁতসেঁতে হতো। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল এক সংগ্রাম, এক নতুন ব্যথার ঢেউ, ভয়াবহ অভিজ্ঞতার এক স্পষ্ট স্মারক।
মিঠুর জীবন যা এমনিতেই এক নীরব হতাশার বুননে বোনা ছিল, এখন যন্ত্রণা আর নিরাশার সূতোয় আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেল। মাতৃত্বের আনন্দ, যা এক সুদূর স্বপ্ন ছিল এবং সে অনেক আগেই ত্যাগ করেছিল, এখন তার জায়গায় এল এক ভাঙা শরীর আর ভাঙা এক আত্মা। সে কাজ করার চেষ্টা করত, ঘড়ি সারাতো, কিন্তু তার হাত, যা একসময় এত নিপুণ ছিল, তা ব্যথা আর ক্লান্তিতে কাঁপত। পায়ের অবিরাম ব্যথার কারণে সে বেশিক্ষণ বসতে পারত না, এমনকি সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারত না। নিউ সুপার মার্কেটের ব্যস্ত কোলাহল যা একসময় তার কর্মক্ষেত্র ছিল, এখন তার কাছে তার বিধ্বস্ত জীবনের এক নিষ্ঠুর উপহাস মনে হতো।
মিঠুর গল্প কেবল তার একার নয়। এটি সেই নির্মম উদাসীনতার এক জীবন্ত প্রমাণ যা প্রায়শই দুর্ঘটনার পর দেখা যায়, অসংখ্য মানুষের এক মর্মস্পর্শী প্রতিধ্বনি যারা সমাজের ফাটলে পড়ে যায়, তাদের বোঝা একা বহন করতে বাধ্য হয়। সে এমন এক দিনের স্বপ্ন দেখে যখন ব্যথা কমে যাবে, যখন সে খোঁড়াবে না, যখন সে তার ঘড়ি সারানোর কাজে ফিরে যেতে পারবে, ঘড়ির পরিচিত ছন্দে। কিন্তু প্রতিটি দিন, যখন তার গেঁথে থাকা গুলির টুকরোগুলো তাকে অবিরাম যন্ত্রণা দেয়, সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসে, তার জায়গায় আসে এক অপরিবর্তনীয় জীবনের কঠিন বাস্তবতা, এক জীবন যা চিরতরে তার বাম পায়ের গুলির দাগে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তার অস্তিত্ব এক সহনশীলতার প্রমাণ, কিন্তু একই সাথে অবহেলার এক বিশাল ভারের প্রমাণও বটে, এক দুঃখজনক, নীরব প্রমাণ যা ক্ষতি আর অবিরাম ব্যথায় সংজ্ঞায়িত এক জীবনকে তুলে ধরে।
চিকিৎসা ও প্রস্তাবনা
বর্তমানে সুস্থ, কিন্তু ভেতরে এখনো ছররা গুলি আছে। ডাক্তার বলেছে এখন সে সুস্থ। সে বাইরে হাঁটে, হাসে, কাজেও ফিরে যায়। কিন্তু শরীরে রয়ে গেছে কিছু ছররা গুলি, যেগুলো অস্ত্রোপচারেও তোলা যায়নি।
প্রতিদিন একটু ব্যথা, মনে করিয়ে দেয় সেই দিনটার কথা, যখন জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে সে বেঁচে ফিরেছিল।
কর্মসংস্থান ও বাজেট প্রস্তাবনা: ব্যবসার জন্য মূলধন দিলে পরিবারের জন্য জীবন চালানো সম্ভব। এক্ষেত্রে তিন লক্ষ টাকা প্রয়োজন।ন্যায়ের দাবিতে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি
এক নজরে সোহেল রানা
নাম : মো: সোহেল রানা মিঠু
জন্ম তারিখ : ৫ মার্চ ১৯৭৭
জন্মস্থান : গ্রাম: জমনা পাড়া, সদর থানা, রংপুর
পেশা : ঘড়ির মেকানিক
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : ফকির মোহাম্মদ রোড, গ্রাম: জমনাপাড়া, সদর থানা, রংপুর
পারিবারিক তথ্য
পিতার নাম : মো: মতিয়ার রহমান
মায়ের নাম : জরিনা বেগম
পারিবারিক অবস্থা : (দারিদ্র্য)
আয়ের উৎস : ঘড়ির মেকানিক
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ২ জন
ঘটনার স্থান : রংপুর
আক্রমণকারী : পুলিশ
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪
সময় : বিকেল ৫.০০টা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍