হোম / আহতদের তালিকা / মো: শাওন হোসেন
মো: শাওন হোসেন

মো: শাওন হোসেন

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

রিকশার হ্যান্ডেলে ভর করে পরিবারকে বাঁচানো মো: শাওন হোসেন ন্যায়ের ডাক শুনে ২০২৪ সালের আন্দোলনে দাঁড়িয়েছিলেন নিঃশব্দ এক সাধারণ সৈনিক হয়ে। ধানমণ্ডির রাস্তায় পুলিশের ছিটাগুলিতে এক চোখ হারালেও মাথা নিচু করেননি তিনি। তাঁর রক্তে লেখা ক্ষত আজও বলে স্বাধীনতার মানে শুধু পতাকা তোলা নয় শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। অসমাপ্ত চিকিৎসা আর ক্ষতবিক্ষত চোখ নিয়েও শাওনের প্যাডেল থামে না, কারণ তাঁর স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে দুই ছেলের ভবিষ্যতের আলোয়।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা
মো: শাওন হোসেন
ক্রমিক: ০৩৫
আইডি: ঢাকা সিটি ০৩৫
পারিবারিক প্রেক্ষাপট
নাম মো: শাওন হোসেন একজন রিকশাচালক, যাঁর জীবন শুরু ও শেষ হয় ঢাকার গলির বাঁকে, ঘামে ভেজা হ্যান্ডেল আঁকড়ে। তাঁর দিন কাটত রায়ের বাজারের মেকআপ খান রোডে, যেখানে প্রতিটি সকাল মানে ছিল শ্রম, প্রতিটি সন্ধ্যা মানে ছিল পরিবারের মুখে একমুঠো হাসি ফেরানো। পিতা ইউসুফ হোসেন তালুকদার রিকশা চালিয়ে বৃদ্ধ হয়েছেন, মা ফিরোজা বেগম এখনও মানুষের বাসায় কাজ করেন। এই সংসার স্বপ্ন দেখত না ধনী হওয়ার, দেখত কেবল ক্ষুধা ও অভাব থেকে একটু ন্যায়ের পরশ পাওয়ার।
শাওনের সংসারে দুই সন্তান, একজন মাত্র পাঁচ বছরের, আরেকজন দেড়। ছোট্ট হাতগুলো তখনো বর্ণমালা ছোঁয়নি, অথচ বাবা তখন রাজপথে ন্যায় খুঁজছিল। স্ত্রী তাছলিমা আক্তার রানু, শিক্ষাগত যোগ্যতা চতুর্থ শ্রেণি, এখন বাঁচার অঙ্কও বুঝতে পারেন না। জীবন হয়ে গেছে রক্ত ও রুটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘস্থায়ী কান্না। ভাই ফয়সাল বেকার, বোন সায়মা স্কুলে যায়, আর এই পরিবার ছিল শাওনের কাঁধে যেখানে প্রতিটি প্যাডেল মানে ছিল উত্তরাধিকারের দায়িত্ব।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে, রাজপথে গর্জে ওঠে গণআন্দোলন "বৈষম্যের অবসান চাই।" শাওন ছিলেন না মঞ্চে, ছিলেন না কোনো নেতার পাশে তাঁর অস্ত্র ছিল রিকশার হ্যান্ডেল আর বিশ্বাস ছিল চোখে। ৪ আগস্ট, ঢাকার রাজপথ যখন উত্তাল, শাওন নিজের রিকশা ফেলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কেউ তাঁকে বলেনি দাঁড়াতে, কেউ তাঁকে তাড়ায়নি তবু। তাঁর সামনে তখন শুধু একটি বিশ্বাস যদি তাঁর সন্তানেরা বড় হয়, তারা যেন ন্যায়ের দেশে বড় হয়।
কিন্তু সে দিন রক্ত নামে আকাশ থেকে। হঠাৎ শুরু হয় গুলি বৃষ্টি, আর সে গুলিতে শাওনের চোখে ছিটাগুলি ঢুকে যায়। সে শুধু এক চোখ নয়, এক জীবনের দিগন্ত হারায়। গায়ে ছিটা গুলির ছাপ রেখে তাঁর শরীর বলে দেয় এই রাষ্ট্র শুধু চোখ কাড়ে না, ভবিষ্যতও গিলে নেয়। শাওন তখন পড়ে যান রাস্তায়, রক্তে গড়িয়ে যায় তাঁর দিন, রাত, সংসার।
চিকিৎসা হয় সীমিত। কারণ তিনি বড় কেউ নন একজন রিকশাচালক মাত্র। আর রাষ্ট্র বড় কাকে বলে? যার গায়ে দামি জামা, যার নামে থাকে দলীয় চিঠি। শাওনের নামের পাশে "বিপ্লবী" লিখে দেয় না কেউ, তবু ইতিহাস জানে, সে গুলি খেয়েছিল ন্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে। তাঁর চোখ গেলেও, এখনও তিনি সাহসে বলতে পারেন, "আমি মাথা নিচু করিনি।"
এই পরিবার এখন চোখের জল দিয়ে সংসার চালায়। রুটি নেই, কিন্তু শাওনের শরীরে ইতিহাসের সিলমোহর আছে যেটা প্রতিটি গর্জনের দিনে প্রমাণ করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধু পতাকা তোলার নয়, আবারো মাথা তোলার লড়াইয়ের নাম। শাওন হোসেন সেই লড়াইয়ের এক নীরব, অথচ অমর সৈনিক।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার বর্ণনা ও শারীরিক অবস্থা
১৮ জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যা। ঢাকা শহরের বাতাসে তখন ভাসছিল বিদ্রোহের গন্ধ। ধানমণ্ডির শংকর এলাকায় শাওন হোসেন তাঁর অটোরিকশা চালিয়ে ফিরছিলেন বাড়ির পথে যেখানে অপেক্ষায় ছিল তাঁর দুই সন্তান, স্ত্রী, আর এক ক্লান্ত সংসার। কিন্তু সেদিন সেই পথ শুধু বাড়ির দিকে যাচ্ছিল না, যাচ্ছিল ইতিহাসের এক অমোঘ ক্ষতের দিকে। রাজপথ তখন উত্তাল ছিল ছাত্র-জনতার শ্লোগানে 'বৈষম্য নয়, ন্যায়ের পতাকা চাই।" কিন্তু রাষ্ট্র, যেটি নিজের মানুষকেই শত্রু ভাবে, সে হঠাৎই ভয়ংকর হয়ে উঠল। পেছন থেকে পুলিশ ছুঁড়ে দিল ছিটাগুলি যেখানে লক্ষ্যবস্তু ছিল না, ছিল শুধুই প্রতিশোধ। শাওন, যে কোনো ব্যানার বহন করেননি, কোনো প্রতিবাদে স্লোগান দেননি, তাকেও ছাড়ল না সেই গুলি।
শাওনের শরীরের বিভিন্ন অংশে এসে বিঁধল ছিটা গুলি। সে মুহূর্তে তাঁর সামনে ভেসে উঠেছিল স্ত্রীর মুখ, ছেলের হাঁটতে শেখার দৃশ্য, আর ছোট ছেলেটির কান্নার শব্দ। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, তার পিঠ, হাত, মাথা, কপাল রক্তে ভিজে যায়। যখন তাঁকে হাসপাতালে নেয়া হয়, তখনো তাঁর চোখে ভয় নয়, ছিল ঘোর লাগা এক বিস্ময় এ কোন দেশে সে জন্মেছে, যেখানে একজন শ্রমজীবী নাগরিক গুলি খায় শুধু পাশে থাকার দায়ে?
চিকিৎসার সময় চিকিৎসকেরা তাঁর শরীর থেকে বেশির ভাগ ছিটা গুলি বের করতে সক্ষম হন। কিন্তু একটি গুলি ছোট, তবু নিষ্ঠুর চোখে ঢুকে পড়ে, বিশেষ অপারেশনের পর বের করতে হয় সেটি। আর কপালের গভীরে রয়ে যায় আরেকটি ছিটা গুলি, অপারেশনের ঝুঁকির কারণে যেটিকে বাদ দেয়া হয়, যার উপস্থিতি এখনো প্রতিটি রাতে তাঁকে তাড়িয়ে ফেরে। ডাক্তাররা বলেছিলেন, "আপনার চোখে চাপ পড়বে, একটা ভালো চশমা ব্যবহার করা জরুরি।" কিন্তু শাওনের ঘরে যে একদিনে আয় হয় পাঁচশো টাকা, সেখানে ভালো চশমার দাম হয়ে ওঠে বিলাসিতা।
চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ২৫ হাজার টাকার বেশি যা তাঁর পরিবারের জন্য ছিল আকাশ ছোঁয়ার মতো। সাহায্য করেনি কেউ, না কোনো দাতা সংস্থা, না কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। তাঁর চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে, যেমন অসম্পূর্ণ থেকে গেছে তাঁর জীবনের স্বপ্নগুলোও। এখনো তাঁর কপাল ব্যথায় জ্বলে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে দিনের শেষে, কিন্তু রিকশার প্যাডেল ঠেলা থামে না। কারণ এই মানুষটির হাতে অস্ত্র নেই, গলায় সুর নেই, তাঁর আছে একটি দায়, আর তা হলো পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখা, মাথা নিচু না করে।
এই শাওন একজন নিঃশব্দ শহীদ, যিনি গুলি খেয়েও নিজের পরিচয় হারাননি। যাঁর রক্ত শুষে নিয়েছে রাস্তাঘাট, কিন্তু প্রতিবাদ আজও থামেনি তাঁর চোখে। তাঁর মতো হাজারো মানুষ ছিল জুলাই বিপ্লবের অনুপম সৈনিক যাঁরা ব্যানার ছিঁড়ে নয়, জীবন ছিঁড়ে লিখে দিয়েছে ইতিহাস।
শাওনের মাথায় রয়ে যাওয়া ছিটা গুলি যেন একটি রাষ্ট্রের চেতনাহীনতার প্রতীক একটি শোষণের কাঠামোতে জন্ম নেয়া ব্যথা, যা যতদিন থাকবে, ততদিন জ্বলবে বিবেকের দাবানল।
জীবনের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা
শাওনের ঘরে এখন শুধু রুটি নেই, ঘুমও নেই কারণ তার চোখ দুটো এখন জীবনের দোলনায় দুলছে। ডাক্তার বলেছেন, একটা ছিটা গুলি কপালের ভেতরেই রয়ে গেছে এবং চোখে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। অথচ এ চোখ দিয়েই সে চালায় রিকশা, এই চোখই তার পরিবারের চুলা জ্বালায়। যদি চোখ চলে যায়, তবে শুধু আলো নয় চলে যাবে চলার পথ, সব চাকা থেমে যাবে জীবনের। এই ভয় তাকে ঘুমাতে দেয় না, নিঃশব্দে সে তাকিয়ে থাকে চোখ খুলে, চোখ হারানোর আশঙ্কায়।
তার স্বপ্ন বড় নয়, একটা ছোট দোকান, রাস্তার মোড়ে, যেখানে চা থাকবে, বিস্কুট থাকবে, মানুষজন দাঁড়াবে, সে হাসবে। "চাকরি চাই না" সে বলে, "ভিক্ষা চাই না, চাই শুধু একটা সুযোগ, যাতে নিজের হাতে গড়া হাড় ভাঙা ঘাম দিয়ে আমি পরিবারটাকে বাঁচাতে পারি।" এই স্বপ্নের নিচে চাপা পড়ে আছে দুটি ছোট বাচ্চার ভবিষ্যৎ, এক শিক্ষাহীন স্ত্রীর নির্ভরতা, আর বাবা-মায়ের নিঃশব্দ দৃষ্টির প্রার্থনা।
এখনো যদি রাষ্ট্র সাড়া না দেয়, তবে এই বিপ্লব যে শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ ছিল সেটাই প্রমাণ হয়ে থাকবে। কিন্তু যদি কেউ হাত বাড়ায় কোনো সংগঠন, কোনো মানুষ তবে সেই হাতই হবে জুলাই বিপ্লবের আসল বিজয়। কারণ একটি চোখ বাঁচানো মানে একটি পরিবারের স্বপ্নকে চোখ ফেরানোর সুযোগ দেওয়া।
প্রস্তাবনা
১. চোখ ও কপালের অস্ত্রোপচারের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সহায়তা,
২. ছোট ব্যবসা শুরু করার জন্য পুঁজি বা অনুদান,
৩. শিশুদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি বা পাঠ সহায়তা।
চিকিৎসার বিবরণ: প্রথমে শরীর থেকে ছিটা গুলি বের করা হয় এবং পরে চোখে প্রবেশ করা গুলির জন্য অপারেশন করা হয়। কপালে এখনও একটি ছিটা গুলি রয়ে গেছে যা বের করা হয়নি।
বর্তমান অবস্থা: চিকিৎসকরা চোখের জন্য চশমা ব্যবহার করতে বলেছেন, কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তা কিনতে পারেননি।
ভবিষ্যৎ চিকিৎসা: চোখের আরও চিকিৎসার প্রয়োজন আছে।
চিকিৎসায় ব্যয়: আহত হওয়ার পর প্রায় ২৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে, কিন্তু অর্থের অভাবে পুরোপুরি চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি।

এক নজরে মো: শাওন হোসেন
নাম: মো: শাওন হোসেন
পিতার নাম: মো: ইউসুফ
মাতার নাম: ফিরোজা বেগম
জন্ম তারিখ: ০৫ মার্চ ২০০২
নিজ জেলা: চাঁদপুর
বর্তমান ঠিকানা: রায়ের বাজার, মেকআপ খান রোড, ইউসুফ স্কুলের সামনে, জেনারেটর গলি, হোল্ডিং নাম্বার: ই-৩৭৭
স্থায়ী ঠিকানা: তালুকদার বাড়ী, গ্রাম: দোপাল্লা, ডাকঘর: উয়ারূক ৩৬১০, থানা: শাহরাস্তি, জেলা: চাঁদপুর
পারিবারিক তথ্য
বাবার পেশা: রিক্সাচালক
মায়ের পেশা: বাসায় কাজ করেন
ভাই-বোন: একজন ছোট ভাই, ফয়সাল হোসেন (বয়স ২০, বেকার) এবং একজন ছোট বোন সায়মা আক্তার (বয়স ১৪, স্কুলে পড়ে): তাছলিমা আক্তার রানু, শিক্ষাগত যোগ্যতা চতুর্থ শ্রেণি
সন্তান: দুই ছেলে, একজনের বয়স ৫ বছর এবং ছোটজনের বয়স দেড় বছর
দুর্ঘটনার বিবরণ
ঘটনার তারিখ ও স্থান
১৮ জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যায়, ধানমন্ডি শংকর এলাকায়
ঘটনার বিবরণ: অটোরিকশা চালানোর সময় পুলিশের ছিটানো গুলিতে (ছিটাগুলি) আহত হন
চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য
হাসপাতাল: জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍