হোম / আহতদের তালিকা / মো: ফরহাদ মন্ডল
মো: ফরহাদ মন্ডল

মো: ফরহাদ মন্ডল

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী (সমাজ বিজ্ঞান, এম এ)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মাটির গন্ধে বেড়ে ওঠা
রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর গ্রামে ১৯৯৬ সালের ১৫ই নভেম্বর জন্ম নেয় ফরহাদ মন্ডল। তার শৈশব কেটেছে মাটি, ধানক্ষেত আর সংগ্রামের সঙ্গে। পিতা মো: বয়েন মন্ডল একজন কৃষক, বয়স ষাট। মা মোছা: পারুল বেগম একজন গৃহিণী, বয়স পঁয়তাল্লিশ। ছোট্ট সংসার হলেও টানাপোড়েন লেগেই থাকতো। মাসিক আয় মাত্র দশ হাজার টাকা। আয় আসে বাজারে ছোট একটি স্টেশনারি দোকান আর পিতার চাষাবাদের খাঁটি ঘামের বিনিময়ে। পাঁচ সদস্যের পরিবারে ফরহাদ ছিল একরকম আলোর বাতি। বড় ভাই ফারুক মন্ডল ডিগ্রি পাস করেও বেকার, আরেক ভাই ফয়সাল শাহ আব্দুর রউফ কলেজের ডিগ্রির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী এবং একমাত্র ছোট বোন ফারিয়া জান্নাত রায়পুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী । পরিবারের চাওয়া ছিল ফরহাদ অন্তত পড়ালেখা করে কিছু একটা করবে। সে আশা নিয়ে সে স্কুল, কলেজ পেরিয়ে আজ পড়ছে বগুড়ার আজিজুল হক সরকারি কলেজে সমাজবিজ্ঞানে এম.এ করছে। নিজের মেধা ও অধ্যবসায় আর প্রতিজ্ঞা দিয়েই সে এতদূর এসেছে।
রক্তের বিনিময়ে বলা প্রতিবাদের গল্প

উত্তাল দিনগুলো
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বাংলাদেশের ছাত্র আন্দেলন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সে সময় সাধারণ ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক আন্দোলন। সরকারি চাকরিতে বৈষম্য, দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস, চাকরির অনিশ্চয়তা, পুলিশি হয়রানি আর শাসকগোষ্ঠীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফরহাদ মন্ডল তখন বগুড়ায় থাকলেও দিন রাত রাজপথে ছিল তার চিহ্ন। বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে সহপাঠীদের সঙ্গে সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন করছিল নিয়মিত। ছাত্রদের এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ক্রমেই বৃহৎ আকার নেয়। ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে মফস্বলের স্কুল-কলেজে ছড়িয়ে পড়ে এক জাগরণের ধ্বনি “ছাত্র বাঁচাও, দেশ বাঁচাও”। ফরহাদ প্রতিটি মুহূর্তে যুক্ত ছিলেন মিছিলের সামনের সারিতে। পুলিশের টিয়ারগ্যাস, জল কামান আর ছাত্রলীগের হামলা উপেক্ষা করে তারা আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে দেয়।
গ্রামের পথে, রক্তাক্ত বিকেল
সারাদেশে যখন আন্দোলন তুঙ্গে, সরকার তখন আতঙ্কিত। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ফরহাদ তখন রায়পুরের বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু তার আন্দোলনের মনোবল এতটুকু কমে না। গ্রামেও সে সাংগঠনিক কাজ শুরু করে। ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২টা। সেদিন পীরগঞ্জের ছাত্র জনতা একত্রিত হয় প্রথমে বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে শুরু হয় একটি বিশাল মিছিল, গন্তব্য সরকারি স্কুলের পূর্ব গেট।
কিন্তু ওঁত পেতে ছিল ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা। হাতে দেশি-বিদেশি অস্ত্র, রড, হকস্টিক, চাপাতি, কিরিচ। মিছিলটি স্কুল গেটের কাছাকাছি যেতেই শুরু হয় নারকীয় হামলা। মিছিল লক্ষ্য করে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে, এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। চারদিক তখন চিৎকার, কান্না আর রক্তে লাল হয়ে ওঠে।
ফরহাদ মন্ডলকে টার্গেট করে কয়েকজন হামলাকারী ঘিরে ধরে। রড ও হকস্টিক দিয়ে মাথায়, হাতে ও পিঠে আঘাত করতে থাকে। রক্ত ঝরতে থাকে অবিরাম। জীবন বাঁচাতে সে দৌঁড়াতে থাকে, কিন্তু শরীর তখন আর চলছিল না।

চিকিৎসা আর আত্মগোপন
সহপাঠী ও স্থানীয় ছাত্র-জনতা ফরহাদকে তৎক্ষণাৎ উদ্ধার করে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানেই তার মাথায় তিনটি গভীর ক্ষতের সেলাই দেয়া হয়। শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও মানসিক যন্ত্রণা তখন বেশি। যারা জনগণের সেবক হওয়ার কথা, তারাই তাকে রক্তাক্ত করেছে। চিকিৎসার পরও তিনি বাড়িতে ফিরতে পারেননি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ নেতারা হুমকি দিচ্ছিল, যদি ফরহাদকে এলাকায় দেখা যায়, তখন আর রক্ত নয়, জীবনই কেড়ে নেয়া হবে। প্রাণরক্ষার জন্য তাকে গোপনে দু’দিন আত্মগোপনে থাকতে হয় এক আত্মীয়ের বাড়িতে।

ফিরে আসা ও প্রত্যয়ের শপথ
যেদিন স্বৈরাচারী সরকার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়, সে দিন ফরহাদ তার বাড়িতে ফেরে। কিন্তু আগের ফরহাদ আর নেই। চোখে তখন এক দৃষ্টি, লক্ষ্য স্পষ্ট, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে। পরিবার তাকে নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু সে জানে, এ লড়াই কেবল তার নয়, এটা দেশের প্রতিটি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো ছাত্রের সংগ্রাম। তার গায়ে এখনও আঘাতের দাগ। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন তবে মাথার সেলাইয়ের চিহ্ন রয়ে গেছে চুলের নিচে। কিন্তু মনের ভিতর গেঁথে গেছে প্রতিজ্ঞা, এই দেশ ছাত্রদের, এই দেশ জনতার, এই দেশ অন্যায়ের নয়। মো: ফরহাদ মন্ডলের গল্প কোনো গল্প নয়, এ এক জীবন্ত দলিল। যেখানে আমরা দেখি এক কৃষক পিতার ছেলে কীভাবে রক্ত দিয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়। তার মতো হাজারো ফরহাদই এই দেশের আশা।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: ফরহাদ মন্ডল
জন্ম তারিখ : ১৫ নভেম্বর ১৯৯৬
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শিক্ষার্থী (সমাজ বিজ্ঞান, এম এ)
প্রতিষ্ঠান : বগুড়া আজিজুল হক কলেজ
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: রায়পুর, ইউনিয়ন: রায়পুর, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: বয়েন মন্ডল
মায়ের নাম : মোছা: পারুল বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষি, ৬০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
মাসিক আয় : ১০ হাজার
আয়ের উৎস : বাজারে স্টেশনারি দোকান ও কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. ফারুক মন্ডল, বয়স: ৩১, পেশা: বেকার, শ্রেণি: ডিগ্রি পাশ, সম্পর্ক: ভাই
২. ফয়সাল, বয়স: ২৪, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ডিগ্রি ১ম বর্ষ, সম্পর্ক: ভাই
৩. ফারিয়া জান্নাত, বয়স: ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : সরকারি স্কুলের পুর্ব গেইট
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২টা
আক্রমণকারী : আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍