হোম / আহতদের তালিকা / মো: শাকিল ইসলাম
মো: শাকিল ইসলাম

মো: শাকিল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : কৃষক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মাটির ঘ্রাণে বেড়ে ওঠা
রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার শংকরপুর মন্ডলপাড়ার মাটিতে জন্ম নিয়েছিল এক শান্ত স্বভাবের কিশোর, নাম মো: শাকিল ইসলাম। ২০০৩ সালের ২৮ ডিসেম্বরে জন্ম হয়েছিল কৃষক মো: শুকুর আলী এবং গৃহিণী মোছা: নাজমিন বেগমের ঘরে। ছোটবেলা থেকেই কৃষির সাথে তার নিবিড় সম্পর্ক। বাবা শুকুর আলী একজন সহজ-সরল কৃষক, যিনি জীবনের ষাট বছর পার করেও এখনও মাটিকে আঁকড়ে রেখেছেন। মা নাজমিন বেগম, ঘর সামলে সন্তানের যত্নে দিন পার করতেন। তাদের ছোট সংসারে সদস্য সংখ্যা ছয়জন। আয় বলতে একমাত্র ভরসা কৃষিক্ষেত। মাসিক আয় প্রায় ১০ হাজার টাকা, যা দিয়ে সংসার চালানো রীতিমতো যুদ্ধের শামিল। কিন্তু সেই ছোট ঘরেই ভালোবাসা ছিল পরিপূর্ণ। শাকিলের শৈশব কেটেছে গরু চরানো, ধান কাটার মৌসুমে বাবার সাথে জমিতে কাজ করা, আর বিকেলে পুকুরপাড়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করে। জীবনের পাঠ সে নিয়েছে কঠিন বাস্তবতা থেকেই।

শৈশবেই কাঁধের বোঝা
যৌবনের শুরুতেই শাকিলকে নামতে হয় জীবিকার লড়াইয়ে। বাবা দিন দিন দুর্বল হচ্ছিলেন, মা বয়সের ভারে ক্লান্ত তাই সংসারের দায় কাঁধে তুলে নেয় শাকিল। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই সে চলে যায় জমিতে, কখনো নিড়ানি হাতে, কখনো হালচাষে গরু নিয়ে। ঘামে ভেজা তার কাঁধে যেন পরিবারের স্বপ্নগুলো ভর করে থাকত। শাকিল কৃষিকাজ করে যা আয় করতেন, তা দিয়েই চালাতেন ঘরের খরচ। কখনো সার, বীজ কিনতে হিমশিম খেতে হতো। খরায় ফসল পুড়ে যেত, অতিবৃষ্টিতে জমি ডুবে যেত তবু হাল ছেড়েননি তিনি। এই সংগ্রামশীল জীবনে তার অভিমান ছিল না, ছিল কেবল একটিই আকাঙ্ক্ষা দেশটা হোক সবার জন্য সমান সুযোগের, যেখানে পরিশ্রমীদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে না।
আন্দোলনের ডাক ও উত্তাল জুলাই
২০২৪ সালের জুলাই। সারাদেশে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ছাত্র ও তরুণদের নেতৃত্বে কোটা সংস্কার আন্দোলন। দিন দিন অন্যায়ের মাত্রা বাড়ছিল, রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানরা সাধারণ মানুষ আর ছাত্রদের কণ্ঠ রোধ করতে চাইছিল। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটার বিরুদ্ধে হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নামল। রংপুর, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী সর্বত্র রাজপথ মুখরিত ছিল, সবার জন্য সমান সুযোগ চাই। কোটার যৌক্তিক সংস্কার চাই, বৈষম্য দূর করো ইত্যাদি স্লোগানে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিবাদের ছবি, ভিডিও, বক্তব্য। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের হাতে শিক্ষার্থীরা আহত হচ্ছিল, কিন্তু ভয় পায়নি কেউ। এই আন্দোলন ছিল ন্যায়ের জন্য, দেশের জন্য। শাকিল নিজের শ্রমজীবী পরিচয় ভুলে গিয়েছিলেন এই একতার ডাকে। তার মনে হচ্ছিল, যদি এই ব্যবস্থার পরিবর্তন না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বৈষম্যের শিকার হবে।
শহীদ মিনারে রক্তাক্ত প্রতিবাদ
৪ আগস্ট ২০২৪। সেই দিন শাকিল আর তার কয়েকজন বন্ধু মিলে শহীদ মিনারে যাচ্ছিলেন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নিতে। বদরগঞ্জ শহীদ মিনারের দিকেই তারা যাচ্ছিল, প্রত্যাশা ছিল মানববন্ধন হবে, প্রতিবাদ হবে, আর কোনো সাধারণের রক্ত ঝরবে না। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। যাত্রাপথে তারা পেরিয়ে যাচ্ছিলেন একজন স্থানীয় আওয়ামী লীগের পৌর মেয়রের বাড়ির পাশ দিয়ে। সেই বাড়ির ছাদে আগে থেকেই ওঁৎ পেতে ছিল যুবলীগ-ছাত্রলীগের কিছু সন্ত্রাসী। হঠাৎ করেই আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমে এলো, তবে সেটা ছিল ইট-পাটকেল-লোহার টুকরার।
একটি বড় ইট শাকিলের মাথায় প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে। মুহূর্তেই তার মাথা ফেটে যায়, রক্তে ভিজে যায় মুখ, জামা-কাপড়। কিছুক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেও পরে জ্ঞান হারায়। পাশে থাকা ছাত্র ও স্থানীয় জনতা তাকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। হাসপাতালে তার মাথায় প্রায় ১০টি সেলাই দিতে হয়। কিন্তু হাসপাতালের পরিবেশও ছিল নিরাপদ না। সেখানে ঢুকে সন্ত্রাসীরা আহতদের খুঁজে বের করে হয়রানি করছিল। ফলে সে বাড়ি ফিরে আসে। সেখান থেকেই তার চিকিৎসা চলেছে দীর্ঘদিন।
আজ শাকিল কিছুটা সুস্থ। তিনি বলেন, আমি একাদশ শ্রেণির ছাত্র, অন্যায়-ন্যায় বুঝি। ছাত্রদের রক্ত যখন রাস্তায় পড়ে, তখন ঘরে বসে থাকা পাপ। আমি আমার জায়গা থেকে প্রতিবাদ করেছি। শাকিল ইসলাম এখনো সেই একই মাটিতে কাজ করেন, কিন্তু তার চোখে অন্যরকম দীপ্তি কারণ তিনি জানেন, তিনি শুধু ফসলের মাঠেই নয়, প্রতিবাদের মাঠেও ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পাশে।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: শাকিল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ২৮ ডিসেম্বর ২০০৩
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : কৃষক
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : শংকরপুর মন্ডলপাড়া, ইউনিয়ন : বদরগঞ্জ পৌরসভা, থানা: বদরগঞ্জ, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: শুকুর আলী
মায়ের নাম : মোছা: নাজমিন বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৬০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫০
মাসিক আয় : ১০ হাজার
আয়ের উৎস : কৃষি থেকে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ঘটনার স্থান : শহীদ মিনার, বদরগঞ্জ
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪
আক্রমণকারী : আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍