দেলোয়ার হোসেন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
দেলোয়ার হোসেন এক সাধারণ ছাত্র, যিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনে অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে হয়ে ওঠেন নীরব সাহসের প্রতীক। ঝিগাতলার রাস্তায় টিয়ারশেল আর রামদার আঘাতে রক্তাক্ত হলেও তিনি নিজের জীবনকে ঢাল করেছিলেন নিরপরাধ মানুষকে রক্ষা করতে। মাথা ফাটার ক্ষত আজো ব্যথা দেয়, কিন্তু তাঁর চোখে জ্বলে থাকে গণতন্ত্র ফেরানোর স্বপ্ন। পরিবার, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ হারানোর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও দেলোয়ার আজ জীবন্ত শহীদ এক অনমনীয় তরুণ।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
দেলোয়ার হোসেন
ক্রমিক: ০৩৬
আইডি: ঢাকা সিটি ০৩৬
পরিচিতি
দেলোয়ার হোসেন একটা নাম, যেটা একসময় ছিল স্কুল-কলেজের হাজিরা খাতায়, বন্ধুদের চায়ের আড্ডায় কিংবা কোনো মায়ের স্নেহের ডাকনামে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সেই নাম ছিড়ে ফেলা হয় জনতার বুকে, রাষ্ট্রের গুলিতে। দেলোয়ার ছিলেন না কোনো রাজনৈকিত দলের নেতা কিংব্য মিছিলে শ্লোগান দাতা। তিনি ছিলেন এক ছাত্র, এক ভাই, এক ছেলে যার বুকের গভীরে ছিল শুধু এক টুকরো দেশ, যেখানে মানুষ মানুষ হয়ে বাঁচবে। সে আশার ভার নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন রাস্তায় ও রাজপথে যেখানে তখন ধ্বনি উঠছিল, "রাষ্ট্র সংস্কার চাই, গণতন্ত্র ফেরত চাই।"
তাঁর পরিবার বাবা মামুনুর রশিদ, যিনি কামরাঙ্গীর চরের একটি ছোট মার্কেটে দোকান চালাতেন: মা সালমা বেগম, যার জীবন কেটেছে রান্নাঘরের ধোঁয়ার ভেতর। দেলোয়ার এই পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান যিনি মাঝের ভাই হয়েও একদিন পুরো পরিবারের কাঁধ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর বড় ভাই মাসুম ব্যবসায়ী, ছোট ভাই আবু সাঈদ এখনো ছাত্র: আর ছোট বোন ফাহিমা, যার বইয়ের পাতায় এখনো লেখা হয়নি এই গুলির কথা, তবু সে প্রতিদিন পড়ে, তার ভাইয়ের মুখ।
৪ আগস্ট ছিল না কোনো বিশেষ উৎসব, ছিল না কোনো ছুটি। কিন্তু সে দিনটি ইতিহাসের কালিতে রঙিন হয়ে আছে। উত্তরের ঢাকায়, প্রতিবাদের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছিল রাজপথে, অলিতে-গলিতে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজে, স্কুল থেকে চায়ের দোকানে। সেই ঢেউয়ের একটা অংশ ছিল দেলোয়ার, একটা তরঙ্গ, যেটা প্রবলভাবে রাষ্ট্রের গায়ে ধাক্কা দিয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র তো সমুদ্র নয় সে আগুন। সে আগুনে পুড়ে গেলেন দেলোয়ার, কিন্তু ছাই হয়ে যাননি। তিনি আছেন মাঠের প্রতিটি শুষ্ক পাতায়, প্রতিটি ভাঙা ব্যানারে, প্রতিটি মা-বাবার চোখে, যারা ভাবেন, "আমার ছেলেও তো যেতে পারত।"
শিক্ষাজীবনের যে বছর তিনি হারালেন, সেটি কোনো পরীক্ষার খাতা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু যে শিক্ষা তিনি পেলেন, একটি রাষ্ট্র কীভাবে নিজের সন্তানদের রক্তে ভিজে থাকতে পারে, তা চোখে দেখা শিক্ষা। তাঁর কণ্ঠে এখনো রক্ত জমে, কিন্তু চিৎকার নেই। কারণ দেলোয়ার জানতেন যে, বিপ্লব নীরব থাকে, তার গর্জন হয় ইতিহাসে।
তিনি বেঁচে আছেন, তবে শহীদের মর্যাদায় এক জীবন্ত স্মারক, যার পায়ে গুলি না লাগলেও পথ আটকে গিয়েছিল। তিনি এখনো হাঁটেন, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে শোনেন সে দিনটার গুলির শব্দ। তাঁর জীবনের প্রতি পাতায় লেগে আছে রাষ্ট্রবিরোধী বাস্তবতার ঘ্রাণ আর সেই ঘ্রাণেই তিনি বুঝেছেন, স্বাধীনতা কাগজে আসে না, আসে রক্তে, আসে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায়।
যেভাবে রক্তাক্ত হন
তাকে আমরা অনেকেই চিনি না। কিন্তু ইতিহাসে এমন কিছু নাম থাকে, যেগুলো কেবল ডাকনাম হয়ে থাকে রাজপথে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, ঢাকার বাতাস ছিল ধোঁয়ায় ঘেরা, চোখে ছিল টিয়ার গ্যাসের দংশন, আর আকাশজুড়ে ঘনিয়ে উঠছিল বিপ্লবের কালো মেঘ। ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে, সেদিন শহরের বুক চিরে দাঁড়ানো একদল মানুষ ছিল, যারা জেগেছিল শুধুই বাঁচার অধিকারের জন্য ভোট, খাদ্য, ন্যায্যতা। আর সে জাগরণেই ছিলেন দেলোয়ার, বুক উঁচিয়ে, ভয় না পেয়ে। তিনি কোনো ব্যানার বহন করেননি, কোনো পার্টির পতাকা হাতে ছিল না, শুধু ছিল একটি হৃদয়, যেটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনড় ছিল।
পুলিশের ছোড়া একটি টিয়ারশেল এসে সোজা আঘাত করে তাঁর পিঠে। মুহূর্তেই শরীর অবশ হয়ে আসে, চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়ে যায়। কিন্তু তখনও তাঁর মাথায় ছিল না নিজের জীবন বাঁচানোর চিন্তা, বরং আশেপাশে থাকা সেই কয়েকজন মেয়েকে নিরাপদে। রাখার দায়বোধ। তাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন এক বাসায় এবং দেলোয়ার নিজে বাঁশ হাতে দাঁড়িয়েছিলেন দরজার সামনে মানুষ। হতে গেলে অনেক সময় অস্ত্র লাগে না, লাগে শুধু এক ফোঁটা সাহস আর একগাদা মানবতা।
কিন্তু ছাত্রলীগের হেলমেটবাহিনী এ মানবতা দেখে ভয় পায়। তারা জানত, একজন মানুষ যদি অন্যের জন্য দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। তারা দেলোয়ারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রামদা দিয়ে কোপানো হয় মাথায়। মাথার খুলি ফেটে যায়, রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে রাস্তাটা। তিনি সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাকে মরে গেছে ধরে ছাত্রলীগ টেনে নিয়ে যাচ্ছিল গলির ভেতরে যেখানে হয়তো আরেকটি মর্গের নম্বর হয়ে যেতেন দেলোয়ার।
কিন্তু ঈশ্বর হয়তো তখন শহরের কোনো ক্লান্ত কোণে হাত রেখেছিলেন। জাপান-বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের কয়েকজন সাহসী ইন্টার্ন চিকিৎসক দেলোয়ারকে টেনে নিয়ে যান ভেতরে। তখনো তাঁর দেহ তীব্র রক্তক্ষরণে ভেসে যাচ্ছে, তবু তাঁকে ফেলে আসেনি বিপ্লব। পরে তাঁকে পাঠানো হয় নিউরো সায়েন্স-ইনস্টিটিউটে যেখানে শুরু হয় আরেক লড়াই, অস্ত্র ছাড়াই, এক ছাত্রের জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম।
পাঁচটি হাসপাতাল ঘুরে, পাঁচবার জাগা ও হারানোর মাঝামাঝি দেলোয়ার একটা দেশকে প্রশ্ন করেন, "এটা আমার দেশ তো? তাহলে কেন মাথা ফাটার পরও আমি পরিচিত নই, সম্মানিত নই?" তাঁর চিকিৎসায় আজও ঋণে ডুবে আছে পরিবার, কিন্তু রাষ্ট্র? রাষ্ট্র তখন ব্যস্ত ছিল "নিরাপত্তা নিশ্চিত" করার অভিনয়ে।
এই দেলোয়ার, যিনি মাথায় কোপ খেয়েও মাথা নিচু করেননি, আমাদের মনে করিয়ে দেন বিপ্লব শুধু শ্লোগানে থাকে না, থেকে যায় মস্তিষ্কের সেই গভীর ক্ষতের মধ্যে, যা বোঝায়, মানুষ মরেও অমর হয়, যদি তার রক্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে পড়ে এবং ঝিগাতলার সেই গলিতে আজও বাতাসে ভাসে তাঁর নাম একটি ছিন্ন মাথার প্রতিবাদ, একটি চুপচাপ মহান মানুষ, যিনি বেঁচে থেকেও ইতিহাসের শহীদ।
বর্তমান শারীরিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা
আজ দেলোয়ার বেঁচে আছেন, হাঁটেন, কথা বলেন ও স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু সেই বেঁচে থাকা এক ধরনের যুদ্ধ, যেখানে প্রতিটি ভোরে তাঁর মাথা ঘোরে, বুকের মাঝে একটা ব্যথা জমে থাকে, ঠিক যেন রাষ্ট্র এখনো রামদার ধার ছুঁয়ে যাচ্ছে মগজের ভেতরে। চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। তিনি বেঁচেছেন, কারণ ছিল, একটুখানি ঈমান, আর বিপ্লবের অসমাপ্ত তাগিদ।
এক বছর পিছিয়ে গেছে পড়াশোনা, কিন্তু তার ক্ষত শুধু একাডেমিরক নয় জীবনের চাকায়, পরিবারের ভবিষ্যতে। এই দেলোয়ার আজ কাজ করতে পারেন, বলতে পারেন "আলহামদুলিল্লাহ" কিন্তু তিনিই জানেন, তাঁর মতো একজন আহত যোদ্ধা, যার শরীরে এখনো বহন করে রাষ্ট্রের অস্ত্রের ছাপ, তাঁর জন্য একটি সরকারি চাকরি মানে কেবল অর্থ নয়, একটা স্বীকৃতি আর মাথা উঁচু করে বলা, "আমি ছিলাম বিপ্লবে, আমি বেঁচে আছি গর্বে।"
এই পুনর্বাসন, যদি হয় তা শুধু দেলোয়ারকে ফেরাবে না, বরং তাঁর বাবা-মাকে, ভাই-বোনকে, এমনকি ঝিগাতলার সেই আড়াল ঘরে আশ্রয় নেওয়া মেয়েগুলোকেও বিশ্বাস দেবে যে, বিপ্লবীরা পড়ে থাকে না, তারা ইতিহাসে ফিরেও দাঁড়ায়।
প্রস্তাবনা
১। সরকারি দপ্তরে চাকরির নিশ্চয়তা দেলোয়ারের জন্য যেন। তাঁর ভবিষ্যৎ স্থায়ী হয়।
২। চিকিৎসা সংক্রান্ত আর্থিক অনুদান ও ফলোআপ ফান্ড, কারণ মাথা ও বুকের আঘাত দীর্ঘস্থায়ী।
৩। পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি ও স্কলারশিপ।
ঘটনার বিবরণ: ছাত্রলীগের সাথে সংঘর্ষের সময় পুলিশের
টিয়ারশেল পিঠে লাগে। পরে একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলে, সেখানে থাকা কয়েকজন মেয়েকে রক্ষা করার সময় ছাত্রলীগের সদস্যরা তাকে রামদা দিয়ে মাথায় কোপ দেয় এবং তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।
এক নজরে দেলোয়ার হোসেন
নাম: দেলোয়ার হোসেন
জন্ম তারিখ: ০১-০১-২০০১
পিতার নাম: মামুনুর রশিদ
মাতার নাম: সালমা বেগম
পেশা: ছাত্র
ঠিকানা: ঢাকা, কামরাঙ্গীর চর, রনি মার্কেট, হোল্ডিং-১২১২
পারিবারিক তথ্য
বাবার পেশা: ব্যবসায়ী
মায়ের পেশা: গৃহিণী
ভাই-বোন: ৩ ভাই, ১ বোন
বড় ভাই: মো: মাসুম, ব্যবসায়ী এবং বিবাহিত
ছোট ভাই: আবু সাঈদ, ছাত্র
বোন: ফাহিমা, ছাত্রী
আহত হওয়ার তারিখ ও স্থান: ৪ আগস্ট, ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ড
ক্রমিক: ০৩৬
আইডি: ঢাকা সিটি ০৩৬
পরিচিতি
দেলোয়ার হোসেন একটা নাম, যেটা একসময় ছিল স্কুল-কলেজের হাজিরা খাতায়, বন্ধুদের চায়ের আড্ডায় কিংবা কোনো মায়ের স্নেহের ডাকনামে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সেই নাম ছিড়ে ফেলা হয় জনতার বুকে, রাষ্ট্রের গুলিতে। দেলোয়ার ছিলেন না কোনো রাজনৈকিত দলের নেতা কিংব্য মিছিলে শ্লোগান দাতা। তিনি ছিলেন এক ছাত্র, এক ভাই, এক ছেলে যার বুকের গভীরে ছিল শুধু এক টুকরো দেশ, যেখানে মানুষ মানুষ হয়ে বাঁচবে। সে আশার ভার নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন রাস্তায় ও রাজপথে যেখানে তখন ধ্বনি উঠছিল, "রাষ্ট্র সংস্কার চাই, গণতন্ত্র ফেরত চাই।"
তাঁর পরিবার বাবা মামুনুর রশিদ, যিনি কামরাঙ্গীর চরের একটি ছোট মার্কেটে দোকান চালাতেন: মা সালমা বেগম, যার জীবন কেটেছে রান্নাঘরের ধোঁয়ার ভেতর। দেলোয়ার এই পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান যিনি মাঝের ভাই হয়েও একদিন পুরো পরিবারের কাঁধ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর বড় ভাই মাসুম ব্যবসায়ী, ছোট ভাই আবু সাঈদ এখনো ছাত্র: আর ছোট বোন ফাহিমা, যার বইয়ের পাতায় এখনো লেখা হয়নি এই গুলির কথা, তবু সে প্রতিদিন পড়ে, তার ভাইয়ের মুখ।
৪ আগস্ট ছিল না কোনো বিশেষ উৎসব, ছিল না কোনো ছুটি। কিন্তু সে দিনটি ইতিহাসের কালিতে রঙিন হয়ে আছে। উত্তরের ঢাকায়, প্রতিবাদের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছিল রাজপথে, অলিতে-গলিতে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজে, স্কুল থেকে চায়ের দোকানে। সেই ঢেউয়ের একটা অংশ ছিল দেলোয়ার, একটা তরঙ্গ, যেটা প্রবলভাবে রাষ্ট্রের গায়ে ধাক্কা দিয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র তো সমুদ্র নয় সে আগুন। সে আগুনে পুড়ে গেলেন দেলোয়ার, কিন্তু ছাই হয়ে যাননি। তিনি আছেন মাঠের প্রতিটি শুষ্ক পাতায়, প্রতিটি ভাঙা ব্যানারে, প্রতিটি মা-বাবার চোখে, যারা ভাবেন, "আমার ছেলেও তো যেতে পারত।"
শিক্ষাজীবনের যে বছর তিনি হারালেন, সেটি কোনো পরীক্ষার খাতা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু যে শিক্ষা তিনি পেলেন, একটি রাষ্ট্র কীভাবে নিজের সন্তানদের রক্তে ভিজে থাকতে পারে, তা চোখে দেখা শিক্ষা। তাঁর কণ্ঠে এখনো রক্ত জমে, কিন্তু চিৎকার নেই। কারণ দেলোয়ার জানতেন যে, বিপ্লব নীরব থাকে, তার গর্জন হয় ইতিহাসে।
তিনি বেঁচে আছেন, তবে শহীদের মর্যাদায় এক জীবন্ত স্মারক, যার পায়ে গুলি না লাগলেও পথ আটকে গিয়েছিল। তিনি এখনো হাঁটেন, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে শোনেন সে দিনটার গুলির শব্দ। তাঁর জীবনের প্রতি পাতায় লেগে আছে রাষ্ট্রবিরোধী বাস্তবতার ঘ্রাণ আর সেই ঘ্রাণেই তিনি বুঝেছেন, স্বাধীনতা কাগজে আসে না, আসে রক্তে, আসে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায়।
যেভাবে রক্তাক্ত হন
তাকে আমরা অনেকেই চিনি না। কিন্তু ইতিহাসে এমন কিছু নাম থাকে, যেগুলো কেবল ডাকনাম হয়ে থাকে রাজপথে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, ঢাকার বাতাস ছিল ধোঁয়ায় ঘেরা, চোখে ছিল টিয়ার গ্যাসের দংশন, আর আকাশজুড়ে ঘনিয়ে উঠছিল বিপ্লবের কালো মেঘ। ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে, সেদিন শহরের বুক চিরে দাঁড়ানো একদল মানুষ ছিল, যারা জেগেছিল শুধুই বাঁচার অধিকারের জন্য ভোট, খাদ্য, ন্যায্যতা। আর সে জাগরণেই ছিলেন দেলোয়ার, বুক উঁচিয়ে, ভয় না পেয়ে। তিনি কোনো ব্যানার বহন করেননি, কোনো পার্টির পতাকা হাতে ছিল না, শুধু ছিল একটি হৃদয়, যেটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনড় ছিল।
পুলিশের ছোড়া একটি টিয়ারশেল এসে সোজা আঘাত করে তাঁর পিঠে। মুহূর্তেই শরীর অবশ হয়ে আসে, চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়ে যায়। কিন্তু তখনও তাঁর মাথায় ছিল না নিজের জীবন বাঁচানোর চিন্তা, বরং আশেপাশে থাকা সেই কয়েকজন মেয়েকে নিরাপদে। রাখার দায়বোধ। তাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন এক বাসায় এবং দেলোয়ার নিজে বাঁশ হাতে দাঁড়িয়েছিলেন দরজার সামনে মানুষ। হতে গেলে অনেক সময় অস্ত্র লাগে না, লাগে শুধু এক ফোঁটা সাহস আর একগাদা মানবতা।
কিন্তু ছাত্রলীগের হেলমেটবাহিনী এ মানবতা দেখে ভয় পায়। তারা জানত, একজন মানুষ যদি অন্যের জন্য দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। তারা দেলোয়ারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রামদা দিয়ে কোপানো হয় মাথায়। মাথার খুলি ফেটে যায়, রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে রাস্তাটা। তিনি সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাকে মরে গেছে ধরে ছাত্রলীগ টেনে নিয়ে যাচ্ছিল গলির ভেতরে যেখানে হয়তো আরেকটি মর্গের নম্বর হয়ে যেতেন দেলোয়ার।
কিন্তু ঈশ্বর হয়তো তখন শহরের কোনো ক্লান্ত কোণে হাত রেখেছিলেন। জাপান-বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের কয়েকজন সাহসী ইন্টার্ন চিকিৎসক দেলোয়ারকে টেনে নিয়ে যান ভেতরে। তখনো তাঁর দেহ তীব্র রক্তক্ষরণে ভেসে যাচ্ছে, তবু তাঁকে ফেলে আসেনি বিপ্লব। পরে তাঁকে পাঠানো হয় নিউরো সায়েন্স-ইনস্টিটিউটে যেখানে শুরু হয় আরেক লড়াই, অস্ত্র ছাড়াই, এক ছাত্রের জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম।
পাঁচটি হাসপাতাল ঘুরে, পাঁচবার জাগা ও হারানোর মাঝামাঝি দেলোয়ার একটা দেশকে প্রশ্ন করেন, "এটা আমার দেশ তো? তাহলে কেন মাথা ফাটার পরও আমি পরিচিত নই, সম্মানিত নই?" তাঁর চিকিৎসায় আজও ঋণে ডুবে আছে পরিবার, কিন্তু রাষ্ট্র? রাষ্ট্র তখন ব্যস্ত ছিল "নিরাপত্তা নিশ্চিত" করার অভিনয়ে।
এই দেলোয়ার, যিনি মাথায় কোপ খেয়েও মাথা নিচু করেননি, আমাদের মনে করিয়ে দেন বিপ্লব শুধু শ্লোগানে থাকে না, থেকে যায় মস্তিষ্কের সেই গভীর ক্ষতের মধ্যে, যা বোঝায়, মানুষ মরেও অমর হয়, যদি তার রক্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে পড়ে এবং ঝিগাতলার সেই গলিতে আজও বাতাসে ভাসে তাঁর নাম একটি ছিন্ন মাথার প্রতিবাদ, একটি চুপচাপ মহান মানুষ, যিনি বেঁচে থেকেও ইতিহাসের শহীদ।
বর্তমান শারীরিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা
আজ দেলোয়ার বেঁচে আছেন, হাঁটেন, কথা বলেন ও স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু সেই বেঁচে থাকা এক ধরনের যুদ্ধ, যেখানে প্রতিটি ভোরে তাঁর মাথা ঘোরে, বুকের মাঝে একটা ব্যথা জমে থাকে, ঠিক যেন রাষ্ট্র এখনো রামদার ধার ছুঁয়ে যাচ্ছে মগজের ভেতরে। চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। তিনি বেঁচেছেন, কারণ ছিল, একটুখানি ঈমান, আর বিপ্লবের অসমাপ্ত তাগিদ।
এক বছর পিছিয়ে গেছে পড়াশোনা, কিন্তু তার ক্ষত শুধু একাডেমিরক নয় জীবনের চাকায়, পরিবারের ভবিষ্যতে। এই দেলোয়ার আজ কাজ করতে পারেন, বলতে পারেন "আলহামদুলিল্লাহ" কিন্তু তিনিই জানেন, তাঁর মতো একজন আহত যোদ্ধা, যার শরীরে এখনো বহন করে রাষ্ট্রের অস্ত্রের ছাপ, তাঁর জন্য একটি সরকারি চাকরি মানে কেবল অর্থ নয়, একটা স্বীকৃতি আর মাথা উঁচু করে বলা, "আমি ছিলাম বিপ্লবে, আমি বেঁচে আছি গর্বে।"
এই পুনর্বাসন, যদি হয় তা শুধু দেলোয়ারকে ফেরাবে না, বরং তাঁর বাবা-মাকে, ভাই-বোনকে, এমনকি ঝিগাতলার সেই আড়াল ঘরে আশ্রয় নেওয়া মেয়েগুলোকেও বিশ্বাস দেবে যে, বিপ্লবীরা পড়ে থাকে না, তারা ইতিহাসে ফিরেও দাঁড়ায়।
প্রস্তাবনা
১। সরকারি দপ্তরে চাকরির নিশ্চয়তা দেলোয়ারের জন্য যেন। তাঁর ভবিষ্যৎ স্থায়ী হয়।
২। চিকিৎসা সংক্রান্ত আর্থিক অনুদান ও ফলোআপ ফান্ড, কারণ মাথা ও বুকের আঘাত দীর্ঘস্থায়ী।
৩। পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি ও স্কলারশিপ।
ঘটনার বিবরণ: ছাত্রলীগের সাথে সংঘর্ষের সময় পুলিশের
টিয়ারশেল পিঠে লাগে। পরে একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলে, সেখানে থাকা কয়েকজন মেয়েকে রক্ষা করার সময় ছাত্রলীগের সদস্যরা তাকে রামদা দিয়ে মাথায় কোপ দেয় এবং তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।
এক নজরে দেলোয়ার হোসেন
নাম: দেলোয়ার হোসেন
জন্ম তারিখ: ০১-০১-২০০১
পিতার নাম: মামুনুর রশিদ
মাতার নাম: সালমা বেগম
পেশা: ছাত্র
ঠিকানা: ঢাকা, কামরাঙ্গীর চর, রনি মার্কেট, হোল্ডিং-১২১২
পারিবারিক তথ্য
বাবার পেশা: ব্যবসায়ী
মায়ের পেশা: গৃহিণী
ভাই-বোন: ৩ ভাই, ১ বোন
বড় ভাই: মো: মাসুম, ব্যবসায়ী এবং বিবাহিত
ছোট ভাই: আবু সাঈদ, ছাত্র
বোন: ফাহিমা, ছাত্রী
আহত হওয়ার তারিখ ও স্থান: ৪ আগস্ট, ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ড
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍