শাহাদাত হোসেন সাব্বির
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শিক্ষার্থী (মনোবিজ্ঞান বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
বাবা আনিসুর রহমান স্থানীয় একটি ক্লিনিকে চাকরি করতেন। মা শাহনাজ পারভিন ছিলেন একজন গৃহিণী। সংসার চলতো সীমিত আয়ে মাত্র ১২ হাজার টাকা মাসিক আয়। তবুও সংসারে ভালোবাসা, পরিশ্রম আর স্বপ্নের কোনো ঘাটতি ছিল না। পাঁচ সদস্যের পরিবারে সাব্বির ছিল দ্বিতীয় সন্তান। ছোট বোন সামিরা আক্তার তখন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করেই শুরু হয়েছিল তার শিক্ষাজীবন। গাঁয়ের মেঠোপথ ধরে স্কুলে যাওয়া, ধানক্ষেতে খেলা, ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে গল্প শোনা সব মিলিয়ে সাব্বিরের শৈশব কেটেছে প্রকৃতির সঙ্গে হাত মিলিয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহাদাত
যে গুলি খেয়েও মাথা নত করেনিমেধাবী ছাত্র থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা
ছোটবেলা থেকেই সাব্বির ছিল ভীষণ মেধাবী। চোখেমুখে ছিল গভীর মনোযোগ আর পড়াশোনার প্রতি এক অদ্ভুত ভালোবাসা। বাবা আনিসুর রহমান সবসময় বলতেন, তুই যদি মানুষ হস, তাহলে এই দরিদ্রতা একদিন পাল্টে যাবে। সেই বিশ্বাস নিয়েই সাব্বির চলতে থাকে কঠিন পথ ধরে।
গ্রামের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয় নামী এক কলেজে। তারপর শুরু হয় আরও বড় স্বপ্নের যাত্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অনুপ্রেরণা, অধ্যবসায় আর গভীর আগ্রহ তাকে মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করে দেয়। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের জীবনে সে নিজেকে খুঁজে পায় এক নতুন আলোকে। বর্তমানে সে মনোবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত । ছাত্র হিসেবে সে ছিল শান্ত, বিনয়ী, দায়িত্বশীল। বন্ধুদের ভালোবাসা আর শিক্ষকদের প্রশংসা তাকে করে তোলে সবার প্রিয়। কিন্তু কেবল পড়ালেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না তার জীবন। সে ছিল একজন সচেতন নাগরিকও, যে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস রাখে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর
২০১৮ সালের সেই আলোড়িত সময়, যখন সরকারি চাকরিতে কোটা বৈষম্য নিয়ে গোটা দেশের ছাত্রসমাজ আন্দোলনে নেমে পড়ে তখন থেকেই সাব্বিরের ভেতরে জন্ম নেয় প্রতিবাদের বীজ। যদিও তখন সে স্কুল পড়ুয়া, কিন্তু মনের ভিতর প্রশ্ন জাগে, যোগ্যতা যেখানে মূল বিষয় হওয়া উচিত, সেখানে বৈষম্যের ঠাঁই কীভাবে হয়? সরকার তখন প্রচণ্ড গণ-আন্দোলনের মুখে কোটা সংস্কারের দাবি মেনে নিলে স্থায়ী কোন সমাধান দেন নাই। পরে ২০২৪ সালে হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আবার আন্দোলনে নামে। তাদের প্রতিবাদ ছিল শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক। কিন্তু সেই শান্ত কণ্ঠস্বরের জবাবে আসে ভয়ংকর দমন-পীড়ন। সরকার পুলিশ বাহিনী, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লাঠিয়াল বাহিনীকে লেলিয়ে দেয়। শাহবাগ, টিএসসি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র হামলা, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার। ছাত্রদের রক্তে ভিজে যায় রাজপথ। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তে রংপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা, রাজশাহী গ্রাম থেকে শহরে। বিশেষ করে ১৬ জুলাই ২০২৪ দিনটি ইতিহাসের কালো অধ্যায় হয়ে রয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি সরাসরি গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। এই নির্মমতা যেন আগুন ছড়িয়ে দেয় আন্দোলনে। শাহাদাত তখন রংপুরে অবস্থান করছিল এবং সেইদিন আন্দোলনে ছিলো।
রক্তাক্ত দুপুরের সাক্ষী
১৬ জুলাই, ২০২৪। দুপুর ১টা। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে জড়ো হয়েছিল শত শত ছাত্রছাত্রী। তাদের মুখে ছিল প্রতিবাদের ধ্বনি কোটা ব্যবস্থার সংস্কার চাই। সামনে থেকে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন শাহাদাত। রক্তে আগুন, চোখে প্রতিজ্ঞা বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সে ছিল প্রথম সারিতে। হঠাৎ করেই পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের যৌথ হামলা শুরু হয়। রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, গুলি চারপাশ যেন রণক্ষেত্র। চিৎকার, কান্না আর ধোঁয়ার মধ্যে অনেকেই পড়ে যায়। আবু সাইদ সেদিন বুক পেতে দিয়েছিল। আর সেই বুককেই লক্ষ্য করে পুলিশ সরাসরি কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে তার বুককে ঝাঝরা করে দেয়। সে পিছনের দিকে কয়েকবার পাক খায়। একজন ছাত্র রিস্ক নিয়ে তাকে ধরতে গেলে সে মাঠিতে লুটিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে নিস্তেজ হয়ে যায়। আন্দোলন তখনো চলছিলো। অন্য দিকে সাঈদের লাশ তখনো গড়াগড়ি খাচ্ছে রাস্তায়। সাব্বির সহ অনেকেই দৌড়ে যায়। কিন্ত পুলিশের উপুর্যুপরি গুলির মধ্যে পড়ে যায় সে। ঠিক তখনই এক পুলিশ সদস্য তার দিকে তাক করে গুলি ছোড়ে। গুলি লাগে তার হাতে, অণ্ডকোষে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। চারপাশ থেকে সরে যায় মানুষ, কিন্তু কয়েকজন সহপাঠী ঝুঁকি নিয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়।
হাসপাতালের বিছানায় জীবনের যুদ্ধ
প্রথমে সাব্বিরকে নেওয়া হয় স্থানীয় একটি ক্লিনিকে। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় নিউরো সায়েন্স ও স্কয়ার হাসাপাতালে। তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সর্বশেষ পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এখনো তার শরীরের বিভিন্ন অংশে বেশ কিছু ছোররা গুলি আছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এখন বিদেশ যেতে হবে।
তার চিকিৎসায় পরিবার খরচ করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এই টাকার জন্য পরিবারকে করতে হয় অনেক দেনা-পাওনা। একজন সামান্য ক্লিনিক কর্মী পিতার পক্ষে এতটা খরচ বহন করা সহজ ছিল না। কিন্তু সন্তানের জন্য তারা সব হারাতেও প্রস্তুত ছিলেন। চিকিৎসার বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় সাব্বিরের চোখে ছিল না কান্না, ছিল সংগ্রামের আগুন। সে বলেছিল, আমার গায়ে গুলি লেগেছে, কিন্তু মনের বিশ্বাসে নয়। আমি আবার হাঁটবো, আবার লিখবো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলবো।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে বাকি গুলি গুলো বের করার ব্যবস্থা করা।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা।সবুজ গাঁয়ের শিশুটি
রংপুর জেলার গংগাচড়া থানার এক শান্ত, নিরিবিলি গ্রাম আরাজীনিয়ামত। গাছগাছালিতে ঢাকা পথ, ধানক্ষেতের মাথা ছুঁয়ে যাওয়া বাতাস আর পাখির কলতানে ভরা সেই গ্রামেই জন্ম নেয় এক শিশু শাহাদাত হোসেন সাব্বির। জন্ম ২০০৫ সালের ১ জুলাই। শিশুর মুখে তখনই ছিল একরাশ মুগ্ধতা। তার চোখজুড়ে ছিল স্বপ্ন, আর হৃদয়জুড়ে ছিল গ্রামের সবুজ প্রকৃতির ভালোবাসা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : শাহাদাত হোসেন সাব্বির
জন্ম তারিখ : ১ জুলাই ২০০৫
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শিক্ষার্থী (মনোবিজ্ঞান বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ)
প্রতিষ্ঠান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নিজ জেলা : রংপুর
বর্তমান ঠিকানা : ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: আরাজীনিয়ামত, ইউনিয়ন: বুড়িরহাট, থানা: গংগাচড়া, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : আনিসুর রহমান
মায়ের নাম : শাহনাজ পারভিন
পিতার পেশা ও বয়স : ক্লিনিক এ চাকরি, ৫৩
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
মাসিক আয় : ১২ হাজার
আয়ের উৎস : চাকরি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. সামিরা আক্তার, বয়স: ১৭, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: দ্বাদশ, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ১নং গেট
আহত হওয়ার সময় : ১৬ জুলাই ২০২৪, দুপুর ৩টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহাদাত
যে গুলি খেয়েও মাথা নত করেনিমেধাবী ছাত্র থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা
ছোটবেলা থেকেই সাব্বির ছিল ভীষণ মেধাবী। চোখেমুখে ছিল গভীর মনোযোগ আর পড়াশোনার প্রতি এক অদ্ভুত ভালোবাসা। বাবা আনিসুর রহমান সবসময় বলতেন, তুই যদি মানুষ হস, তাহলে এই দরিদ্রতা একদিন পাল্টে যাবে। সেই বিশ্বাস নিয়েই সাব্বির চলতে থাকে কঠিন পথ ধরে।
গ্রামের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয় নামী এক কলেজে। তারপর শুরু হয় আরও বড় স্বপ্নের যাত্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অনুপ্রেরণা, অধ্যবসায় আর গভীর আগ্রহ তাকে মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করে দেয়। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের জীবনে সে নিজেকে খুঁজে পায় এক নতুন আলোকে। বর্তমানে সে মনোবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত । ছাত্র হিসেবে সে ছিল শান্ত, বিনয়ী, দায়িত্বশীল। বন্ধুদের ভালোবাসা আর শিক্ষকদের প্রশংসা তাকে করে তোলে সবার প্রিয়। কিন্তু কেবল পড়ালেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না তার জীবন। সে ছিল একজন সচেতন নাগরিকও, যে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস রাখে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর
২০১৮ সালের সেই আলোড়িত সময়, যখন সরকারি চাকরিতে কোটা বৈষম্য নিয়ে গোটা দেশের ছাত্রসমাজ আন্দোলনে নেমে পড়ে তখন থেকেই সাব্বিরের ভেতরে জন্ম নেয় প্রতিবাদের বীজ। যদিও তখন সে স্কুল পড়ুয়া, কিন্তু মনের ভিতর প্রশ্ন জাগে, যোগ্যতা যেখানে মূল বিষয় হওয়া উচিত, সেখানে বৈষম্যের ঠাঁই কীভাবে হয়? সরকার তখন প্রচণ্ড গণ-আন্দোলনের মুখে কোটা সংস্কারের দাবি মেনে নিলে স্থায়ী কোন সমাধান দেন নাই। পরে ২০২৪ সালে হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আবার আন্দোলনে নামে। তাদের প্রতিবাদ ছিল শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক। কিন্তু সেই শান্ত কণ্ঠস্বরের জবাবে আসে ভয়ংকর দমন-পীড়ন। সরকার পুলিশ বাহিনী, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লাঠিয়াল বাহিনীকে লেলিয়ে দেয়। শাহবাগ, টিএসসি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র হামলা, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার। ছাত্রদের রক্তে ভিজে যায় রাজপথ। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তে রংপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা, রাজশাহী গ্রাম থেকে শহরে। বিশেষ করে ১৬ জুলাই ২০২৪ দিনটি ইতিহাসের কালো অধ্যায় হয়ে রয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি সরাসরি গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। এই নির্মমতা যেন আগুন ছড়িয়ে দেয় আন্দোলনে। শাহাদাত তখন রংপুরে অবস্থান করছিল এবং সেইদিন আন্দোলনে ছিলো।
রক্তাক্ত দুপুরের সাক্ষী
১৬ জুলাই, ২০২৪। দুপুর ১টা। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে জড়ো হয়েছিল শত শত ছাত্রছাত্রী। তাদের মুখে ছিল প্রতিবাদের ধ্বনি কোটা ব্যবস্থার সংস্কার চাই। সামনে থেকে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন শাহাদাত। রক্তে আগুন, চোখে প্রতিজ্ঞা বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সে ছিল প্রথম সারিতে। হঠাৎ করেই পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের যৌথ হামলা শুরু হয়। রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, গুলি চারপাশ যেন রণক্ষেত্র। চিৎকার, কান্না আর ধোঁয়ার মধ্যে অনেকেই পড়ে যায়। আবু সাইদ সেদিন বুক পেতে দিয়েছিল। আর সেই বুককেই লক্ষ্য করে পুলিশ সরাসরি কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে তার বুককে ঝাঝরা করে দেয়। সে পিছনের দিকে কয়েকবার পাক খায়। একজন ছাত্র রিস্ক নিয়ে তাকে ধরতে গেলে সে মাঠিতে লুটিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে নিস্তেজ হয়ে যায়। আন্দোলন তখনো চলছিলো। অন্য দিকে সাঈদের লাশ তখনো গড়াগড়ি খাচ্ছে রাস্তায়। সাব্বির সহ অনেকেই দৌড়ে যায়। কিন্ত পুলিশের উপুর্যুপরি গুলির মধ্যে পড়ে যায় সে। ঠিক তখনই এক পুলিশ সদস্য তার দিকে তাক করে গুলি ছোড়ে। গুলি লাগে তার হাতে, অণ্ডকোষে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। চারপাশ থেকে সরে যায় মানুষ, কিন্তু কয়েকজন সহপাঠী ঝুঁকি নিয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়।
হাসপাতালের বিছানায় জীবনের যুদ্ধ
প্রথমে সাব্বিরকে নেওয়া হয় স্থানীয় একটি ক্লিনিকে। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় নিউরো সায়েন্স ও স্কয়ার হাসাপাতালে। তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সর্বশেষ পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এখনো তার শরীরের বিভিন্ন অংশে বেশ কিছু ছোররা গুলি আছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এখন বিদেশ যেতে হবে।
তার চিকিৎসায় পরিবার খরচ করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এই টাকার জন্য পরিবারকে করতে হয় অনেক দেনা-পাওনা। একজন সামান্য ক্লিনিক কর্মী পিতার পক্ষে এতটা খরচ বহন করা সহজ ছিল না। কিন্তু সন্তানের জন্য তারা সব হারাতেও প্রস্তুত ছিলেন। চিকিৎসার বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় সাব্বিরের চোখে ছিল না কান্না, ছিল সংগ্রামের আগুন। সে বলেছিল, আমার গায়ে গুলি লেগেছে, কিন্তু মনের বিশ্বাসে নয়। আমি আবার হাঁটবো, আবার লিখবো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলবো।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা
উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে বাকি গুলি গুলো বের করার ব্যবস্থা করা।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা।সবুজ গাঁয়ের শিশুটি
রংপুর জেলার গংগাচড়া থানার এক শান্ত, নিরিবিলি গ্রাম আরাজীনিয়ামত। গাছগাছালিতে ঢাকা পথ, ধানক্ষেতের মাথা ছুঁয়ে যাওয়া বাতাস আর পাখির কলতানে ভরা সেই গ্রামেই জন্ম নেয় এক শিশু শাহাদাত হোসেন সাব্বির। জন্ম ২০০৫ সালের ১ জুলাই। শিশুর মুখে তখনই ছিল একরাশ মুগ্ধতা। তার চোখজুড়ে ছিল স্বপ্ন, আর হৃদয়জুড়ে ছিল গ্রামের সবুজ প্রকৃতির ভালোবাসা।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : শাহাদাত হোসেন সাব্বির
জন্ম তারিখ : ১ জুলাই ২০০৫
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শিক্ষার্থী (মনোবিজ্ঞান বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ)
প্রতিষ্ঠান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নিজ জেলা : রংপুর
বর্তমান ঠিকানা : ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: আরাজীনিয়ামত, ইউনিয়ন: বুড়িরহাট, থানা: গংগাচড়া, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : আনিসুর রহমান
মায়ের নাম : শাহনাজ পারভিন
পিতার পেশা ও বয়স : ক্লিনিক এ চাকরি, ৫৩
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
মাসিক আয় : ১২ হাজার
আয়ের উৎস : চাকরি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. সামিরা আক্তার, বয়স: ১৭, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: দ্বাদশ, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ১নং গেট
আহত হওয়ার সময় : ১৬ জুলাই ২০২৪, দুপুর ৩টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও ছাত্রলীগ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍