হোম / আহতদের তালিকা / মো: মনোয়ারুল ইসলাম
মো: মনোয়ারুল ইসলাম

মো: মনোয়ারুল ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী ও কুরিয়ারে চাকরি

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মো: মনোয়ারুল ইসলামের জন্ম ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি, রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া থানার চর ইচলী গ্রামে। এই গ্রামটি তিস্তা নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত। প্রতিটি বর্ষায় এই নদী তার ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে হাজির হয়। বহু ঘরবাড়ি, শস্যভরা জমি আর মানুষের স্বপ্ন ভেসে যায় নদীর গর্ভে। মনোয়ারুলের ছোটবেলা কেটেছে এমনই এক নদীবিধ্বস্ত অঞ্চলে। মাঠে-ঘাটে খেলে বেড়ানো, ভাঙনের শব্দে রাত জাগা আর প্রতিবার বর্ষার সঙ্গে জীবনযুদ্ধ সবই ছিল তার বেড়ে ওঠার অনিবার্য অংশ।

তার পরিবার ছিল ছয়জনের। বাবা মো: রফিকুল ইসলাম একজন কৃষক, মা ময়না বেগম একজন গৃহিণী। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ছিল সবার বড়। তার বোন রুপালি আক্তার ছিলো বিবাহিত। ছোট ভাই আনোয়ারুল ইসলাম অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে এবং তার বাবার কাজে সহযোগিতা করে। সবার ছোট আশরাফুল পঞ্চম শ্রেণর শিক্ষার্থী। তিনিই সবার বড় হওয়ার কারণে ছোট থেকেই দায়িত্ব আর পরিশ্রম ছিল তার জীবনসঙ্গী।
ভাঙনের পরে সংগ্রামের শুরু
তিস্তার ভয়াল ভাঙনে একসময় তাদের নিজ ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। মাথার ছাদ, স্মৃতির উঠান সবই হারিয়ে যায় স্রোতের সাথে। পরিবার আশ্রয় নেয় অন্য এক লোকের বাড়িতে, একটা ছোট কুঁড়েঘরে। মনোয়ারুল তখনও পরীক্ষার্থী। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। পরীক্ষার পরেই ঢাকায় চলে যান কাজের খোঁজে। কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি যোগাড় করেন, মাসশেষে যে সামান্য টাকা পেতেন তা দিয়ে চালাতেন নিজের পড়াশুনা আর সংসারের খরচ।

ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় যখন লোকেরা অফিসে যায়, তখন মনোয়ারুল দিনের পর দিন প্যাকেট ডেলিভারি করে বেড়াতেন। ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরতেন রাত করে। তবুও প্রতি রাতে বইয়ের পাতা উল্টাতেন, কারণ তিনি জানতেন এই সংগ্রামের গায়ে লেগে আছে তার পরিবারের ভবিষ্যৎ।
ছাত্র জাগরণের ঢেউ

২০২৪ সালের জুন-জুলাই মাসে হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ। ২০১৮ সালে যে কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়েছিল, তার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে আবারও বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থা চালু হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে নটরডেম, ভিকারুননিসা, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, কলেজ এমনকি স্কুলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরাও রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলনটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বাইরেও নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর সবখানেই ছাত্র-জনতা জেগে ওঠে। মিছিলে উঠেছিল একই স্লোগান:
“মেধার অধিকার, বৈষম্য নয়! ছাত্রের গায়ে গুলি কেন? এই ছিল সেই সময়, যখন একটি নতুন প্রজন্ম নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় রাজপথে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তারা কেউ দল করত না, করত প্রতিবাদ।

প্রতিবাদের পথে মনোয়ারুল
মনোয়ারুল কেবল একজন শ্রমজীবী ছাত্র ছিলেন না, ছিলেন একজন সচেতন নাগরিক। তিনি দেখেছেন কীভাবে আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর প্রতিদিন চালানো হচ্ছিল হামলা, কীভাবে পুলিশ গুলি চালিয়ে প্রাণ নিচ্ছে নিরপরাধ তরুণদের।
তিনি আর বসে থাকতে পারেননি। কুরিয়ার সার্ভিসের কাজ শেষে সময় পেলে চলে যেতেন আন্দোলনে। নারায়ণগঞ্জের রেলস্টেশন, চাষাড়া মোড়, বন্দর এলাকা প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছাত্রদের প্রতিবাদ চলছিল। তার সাথে যোগ দিয়েছিল আরও অনেক শ্রমজীবী ছাত্র, যারা কাজের ফাঁকে ন্যায়ের জন্য গলা মিলিয়েছিল। মনোয়ারুল প্রতিবাদ করতেন এক সাদামাটা কণ্ঠে, কিন্তু তার বক্তব্য ছিল দৃঢ়, আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবে না, এই রাষ্ট্র আমাদের চেপে রাখতে পারবে না।
রক্তাক্ত বিকেল, অসমাপ্ত চিকিৎসা
১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৩টা। মনোয়ারুল নারায়ণগঞ্জের একটি বিক্ষোভে অংশ নেন। প্রতিদিনের মতো আজকেও ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই পুলিশ, ছাত্রলীগ ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা একযোগে চড়াও হয়। চারদিক থেকে ছুঁড়তে থাকে রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, গুলি। ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কেউ গলির মধ্যে পালায়, কেউ পড়ে যায় রাস্তায়। মনোয়ারুল দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এক কোণে ঢুকতেই সেখানেই পড়ে যায় রাবার বুলেটের আঘাতে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছররা গুলি লাগে। হাত-পা-মুখে গভীর ক্ষত হয়। রক্তে ভিজে যায় তার জামা। ছাত্র-জনতা সাহস করে তাকে নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।
কিন্তু সেখানেও চিকিৎসার নামে ছিল অবহেলা, ছিল ভয় আর পক্ষপাত। রাজনৈতিক চাপের ভয়ে অনেক চিকিৎসক তাকে স্পর্শ করতেও ভয় পাচ্ছিল। সাতদিন ধরে সেই হাসপাতালে পড়ে থেকে অবশেষে পরিবারের সহায়তায় চলে আসে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে অপারেশন করে শরীর থেকে গুলি বের করা হয়, কিন্তু এখনো প্রায় ১২৮ টা গুলি তার শরীরে রয়ে গেছে। সারা শরীর ব্যথা করে, কোনো ভারী কাজ করতে পারে না এবং রোদেও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তিস্তাপারের ছেলেটি এখন রক্ত দিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছে, প্রমাণ করেছে প্রান্তিক জীবন থেকেও উঠে আসা যায় প্রতিবাদের মঞ্চে। আজ সে শুধু একজন ছাত্র বা কুরিয়ার কর্মী নয় সে একজন আদর্শের প্রতীক।নদীভাঙা ভূমিহীন ছেলের
রাজপথে রক্তদানতিস্তা নদীর কোলে শৈশবের গল্প

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: মনোয়ারুল ইসলাম
জন্ম তারিখ : ১ জানুয়ারি ২০০৪
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শিক্ষার্থী ও কুরিয়ারে চাকরি
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : রংপুর
গ্রাম : চর ইচলী
ইউনিয়ন : মহিপুর
থানা : গঙ্গাচড়া
জেলা : রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: রফিকুল ইসলাম
মায়ের নাম : মোছা: ময়না বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৪৭
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. আনোয়ারুল, বয়স: ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: ভাই
২. আশরাফুল, বয়স: ১৩ পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৫ম, সম্পর্ক: ভাই
৩. রুপালী খাতুন, বয়স: ১৮, পেশা: বিবাহিত, শ্রেণি: , সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : নারায়ণগঞ্জ
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৩টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা : উন্নত চিকিৎসা পেলে তার শরীর থেকে ছররাগুলি বের করা সম্ভব
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা : স্থানীয় বাজারে একটা ব্যবসার জন্য মূলধন দিয়ে সহায়তা করা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍