হোম / আহতদের তালিকা / মো: নাইম মিয়া
মো: নাইম মিয়া

মো: নাইম মিয়া

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : অটোরিকশাচালক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সবুজ শ্যামল গাঁয়ের ছেলে
রংপুর জেলার কাউনিয়া থানার মাছহাড়ী ইউনিয়নের ছোট্ট এক গ্রাম উদায়নারায়ণ মাছহাড়ী। এখানেই ২০০০ সালের ২ ডিসেম্বর জন্ম নেয় এক শান্তশিষ্ট, চুপচাপ ছেলে মো: নাইম মিয়া। গ্রামটা ছিল যেন ছবির মতো। চারপাশে বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত, মাঝে মধ্যে দিগন্ত ছোঁয়া কলাবাগান, আর বয়ে চলা একটি সরু খাল। ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে পা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিংবা বর্ষার বিকেলে কাদামাটিতে ছেলেদের খেলা এসবই ছিল তার শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অটোচালক নাইম ও
ন্যায়ের লড়াই
নাইমের বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রী, মা গৃহিণী। পরিবারের আয় খুবই সীমিত ছিল, কিন্তু ভালোবাসায় ছিল পরিপূর্ণ। ছোট বয়স থেকেই নাইম দেখেছে কিভাবে তার বাবা সকালবেলায় ইট-সিমেন্ট নিয়ে কাজে যেতেন আর মা রান্নাঘরে উঠে পড়ে লেগে যেতেন ছেলেমেয়ের খাবার তৈরিতে। নাইমের চোখে তখন থেকে গেঁথে গিয়েছিল একটাই দৃশ্য, সংসারের চাকা চালাতে হলে পরিশ্রমই সবচেয়ে বড় উপায়।
অটোরিকশার চাকা আর জীবনসংগ্রাম
নাইম বুঝতে পারছিলো সংসারের উন্নতি করতে হলে তার হাড় ভাঙা পরিশ্রম করতে হবে। তাই তিনি অটোরিকশা চালানো শুরু করে। ভোরবেলায় নামতো রাস্তায়, একেকদিন রোদ, বৃষ্টি, আবার কখনো তীব্র ঠাণ্ডা। তবুও গাড়ির হ্যান্ডেলে তার হাতে কখনো ক্লান্তি আসেনি কারণ সে জানত, প্রতিদিনের আয় মানেই পরিবারের মুখে হাসি।
বিয়ের পর ঘরে আসে তার একমাত্র সন্তান, কন্যা নাদিয়া। পাঁচ মাস বয়সী এই ছোট্ট মেয়েটির হাসি আর কান্নাই হয়ে ওঠে নাইমের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। সে অটোরিকশা চালিয়ে যা পায়, তা দিয়েই চলে ছয়জনের সংসার বাবা-মা, স্ত্রী, মেয়ে ও নিজে। নাঈম প্রতিদিন যা আয় করত তাতে তার সংসারের খরচ চলত। নাঈমের দিনকাল ভালোই চলছিল। কিন্তু জুলাই আন্দোলন তার জীবনে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে।
কোটা আন্দোলনের দাবানল
২০২৪ সালের শুরুর দিকেই বাংলাদেশের রাজপথে শুরু হয় সেই ২০১৮ সালের অমীমাংসিত এক আন্দোলন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে। একে একে ঢাকার রাজপথ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং শহর উত্তাল হয়ে ওঠে। রংপুরও বাদ যায়নি। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। ১৬ জুলাই, শহরের রাস্তায় ন্যায্য দাবিতে অংশ নিয়েছিল সে। কিন্তু সে দিনই তার জীবনের শেষ দিন হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের নির্মম গুলিতে তার প্রাণ ঝরে যায়। সাঈদের মৃত্যুর পর রংপুর অঞ্চলে আন্দোলনের আগুন যেন দ্বিগুণ বেগে ছড়িয়ে পড়ে। ১৭, ১৮ ও ১৯ জুলাই রংপুরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ দলে দলে রংপুর শহরের দিকে আসতে থাকে। ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক সবাই মিলেই একসঙ্গে আওয়াজ তোলে, আবু সাঈদ হত্যার বিচার চাই।
নাইম মিয়া অটো চালক ও সংগ্রামী নাগরিক
এই উত্তাল সময়ে নাইমের ভিতরেও জেগে ওঠে প্রতিবাদের আগুন। দিনের বেলা অটো চালাত, কিন্তু বিকেল হলেই যোগ দিত মিছিলে। সে বিশ্বাস করত, এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের না এটা তার মেয়ের ভবিষ্যতের জন্যও। সে চায় না তার সন্তানও একদিন অন্যায়ের শিকার হোক।
১৯ জুলাই বিকাল তিনটা। শহরের কেন্দ্রস্থলে, টাউন হল মোড়ে জনতা জমে উঠতে থাকে। অন্যদিকে পুলিশ ও ছাত্রলীগ অস্ত্রসহ অবস্থান নেয়। শুরু হয় টানটান উত্তেজনা। হঠাৎ করে পুলিশ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট আর ছররা গুলি নিক্ষেপ করে। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় মিছিল। চারপাশে ধোঁয়া, চিৎকার, আতঙ্ক। হতাহত হয় অনেকেই। অনেকেই রক্তমাখা অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকে। নাইমের চারপাশে রক্ত দেখে নাইমও দৌড় দেয়। একজন অটোচালক হয়েও সে ছিল আন্দোলনের সামনে। দৌড়াতে গিয়ে পেছনের দিকে তাকাতেই দেখলো, একের পর এক ছররা গুলি ছুটে আসছে তার দিকেই। সে বাঁচার জন্য ছুটতে থাকে, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। তার পিঠ ও পায়ে বেশ কয়েকটি ছররা গুলি লাগে।
আতঙ্ক, চিকিৎসা আর বেঁচে থাকার যুদ্ধ
রক্তাক্ত শরীর নিয়ে সে হাসপাতালে যায়, কিন্তু শহরের মেডিকেল তখনও ছিল আতঙ্কে। আহতদের ঢুকতে দিচ্ছিল না। চারদিকে ছুটোছুটি, কান্না, আহত মানুষের আর্তনাদ সব মিলে যেন যুদ্ধের এক বিভীষিকা। নাইম অবশেষে শহরের হাসপাতাল ছেড়ে চলে যায় গ্রামে। সেখানেই স্থানীয় এক গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়। তার শরীরে প্রায় ৪০ টার মতো ছররা গুলি ছিল। স্থানীয় ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে প্রায় সবগুলোই বের করা হয়েছে। বর্তমানে তার শরীরে একটি ছররা গুলি আছে। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: নাইম মিয়া
জন্ম তারিখ : ২ ডিসেম্বর ২০০০
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : অটোরিকশাচালক
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: উদায়নারায়ণ মাছহাড়ী, ইউনিয়ন: মাছহাড়ী, থানা: কাউনিয়া, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: রফিকুল ইসলাম
মায়ের নাম : মোছা: লায়লা খাতুন
পিতার পেশা ও বয়স : রাজমিস্ত্রী, ৪০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৫
মাসিক আয় : ১০ হাজার
আয়ের উৎস : অটোরিকশা চালানো
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৬ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. নাদিয়া, বয়স: ৫ মাস, সম্পর্ক: মেয়ে
ঘটনার স্থান : টাউন হল মোড়, রংপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকাল ৩টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
কর্মসংস্থানে প্রস্তাবনা : এককালীন সহায়তা করা

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍