মো: জাহাঙ্গীর আলম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : চা স্টল ও মুদী দোকান
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
সবুজ শ্যামলে গড়া শৈশব
১৯৯৮ সালের ১০ ডিসেম্বর, রংপুর জেলার কাউনিয়া থানার মাছহাড়ী ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম উদয়নারায়ণ মাছহাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন মো: জাহাঙ্গীর আলম। গ্রামটি ছিল সত্যিই এক অপার সৌন্দর্যের আধার। চারদিকে ধানক্ষেত, মাঝখানে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট এক খাল।
সকালে পাখির কলতান আর সন্ধ্যায় কুয়াশাঘেরা মাঠ যেন শৈশবের প্রতিটি মুহূর্তে তাকে আলতো করে ছুঁয়ে যেত। তার বাবা মো: হায়দার আলী একজন দিনমজুর, আর মা মোছা: আংগুরা খাতুন একজন গৃহিণী। অল্প আয়ের সংসারে বড় হলেও ভালোবাসা আর নিরহংকার জীবনদর্শন ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য। শৈশবে মাঠে খেলার আনন্দ, বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে সাঁতার এসবই ছিল তার প্রতিদিনের সঙ্গী। স্কুলে যেতেন পায়ে হেঁটে, কখনো খালি পায়ে। বইয়ের পাতা ছেঁড়া হলেও তার চোখে ছিল স্বপ্ন, আর মনে ছিল একটা প্রশ্ন, এই দারিদ্র্য পেরিয়ে জীবন কি নতুন কিছু দিতে পারবে?
কঠোর পরিশ্রমে গড়া ব্যবসায়িক জীবন
কিন্তু স্বপ্নে ছেঁকে থাকা সেই চোখে বাস্তবের ছায়া দ্রুতই পড়ে। পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়, স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন জাহাঙ্গীর। কৈশোরেই তাকে নেমে পড়তে হয় জীবিকার খোঁজে। প্রথমে দিনমজুরের কাজ করেন এবং নিজের গ্রামের রাস্তার ধারে একটি ছোট্ট চা-স্টল দেন। পরে ধীরে ধীরে মুদী দোকানও চালু করেন। সেই ছোট্ট দোকানই তার স্বপ্নের আঁচল হয়ে ওঠে। সকালবেলা দোকান খোলেন, নিজের হাতে চা বানান, চাল-ডাল, সাবান-তেল বিক্রি করেন, ছোট শিশুদের মুখে হাসি এনে দেন এক টাকার চকলেট দিয়ে। তার এই ছোট্ট ব্যবসা থেকেই মাসে গড়ে দশ হাজার টাকার মতো আয় হয়। সেই অর্থ দিয়েই তিনি পরিবারের তিন সদস্য, তিন বছরের একমাত্র ছেলে রোহান বাবু এবং বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণ করেন। তিনি কখনো বিলাসী হননি, কখনো অভিযোগ করেননি। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, নিজের ঘামই শ্রেষ্ঠ পুঁজি।
আন্দোলনের সূচনা ও তার অংশগ্রহণ
২০১৮ সাল, যখন ঢাকার রাজপথে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন, তখনও জাহাঙ্গীর ছিলেন একজন নীরব পর্যবেক্ষক। তিনি খবরের কাগজ পড়তেন, মোবাইলে ইউটিউবে ভিডিও দেখতেন, আর বুঝতেন দেশে একটা বড় পরিবর্তনের বাতাস বইছে। কিন্তু সেই আন্দোলন চাপা পড়ে যায় সরকারের প্রতিশ্রুতি আর রাজনৈতিক চালে।
কিন্তু ২০২৪ সালে সে দাবিই আবার জ্বলে ওঠে নতুন শিখায়। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেমে পড়ে রাজপথে। এবার ঢাকা, জগন্নাথ, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর, এমনকি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরাও একযোগে আওয়াজ তোলে। জাহাঙ্গীর আলম একজন দোকানদার হলেও মনে প্রাণে ছিলেন দেশপ্রেমিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের ন্যায্য দাবিতে সকল শ্রেণির মানুষের পাশে থাকা উচিত।
দোকানের পেছনে বসে মোবাইলে খবর দেখে, ইউটিউবে বক্তৃতা শুনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই আন্দোলন দেশের ভবিষ্যতের জন্য জরুরি।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড ও উত্তাল প্রতিবাদ
১৬ জুলাই ২০২৪, দেশজুড়ে নেমে আসে শোক আর ক্ষোভ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড যেন জাহাঙ্গীরের হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি আর শুধু দর্শক থাকেননি। ১৭ জুলাই, সে দিনও আবু সাঈদ-এর হত্যার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে রংপুরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন করে। তিনিও এ আন্দোলনের একজন সক্রিয় সৈনিক ছিলেন। সেদিন স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনী এবং আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীরা ছাত্র-জনতার ওপর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেদিন পুলিশের উপর্যুপুরি ছররা গুলিতে তার পায়ে সামান্য জখম হয়, কিন্তু তাতেও থামেননি। প্রতিদিন বিকেলে দোকান বন্ধ করে তিনি মিছিলে যোগ দিতেন।
একজন সাধারণ দোকানদার হয়েও তিনি ছিলেন সেই আন্দোলনের অদৃশ্য সৈনিক। কারণ তিনি বুঝেছিলেন আবু সাঈদের মৃত্যু মানে ন্যায়ের মৃত্যু, নীরব থাকা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া।
বন্দিত্ব, নির্যাতন ও বেদনাময় দিনগুলো
২৭ জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যা ৬টা। দোকানে বসে গরম চা বানাচ্ছিলেন জাহাঙ্গীর। হঠাৎ সিভিল পোশাকধারী কয়েকজন পুলিশ এসে তাকে কিছু না বলেই ধরে নিয়ে যায়। প্রতিবাদ করতে গেলে গাড়িতে তুলেই শুরু হয় মারধর। বন্দুকের নল দিয়ে বুকে আঘাত, লাঠির ঘায়ে পিঠ রক্তাক্ত হয়ে যায়। আশেপাশের মানুষ চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু কোনো কোর্টে হাজির করা হয়নি। তাকে রাখা হয় গোপন কক্ষে। কেউ জানত না সে বেঁচে আছে কিনা। সেই কয়েদখানায় দিনে একবেলা খাবার, রাতে ঠাণ্ডা মেঝেতে শুয়ে থাকা আর চোখ বাঁধা অবস্থায় নির্যাতন ছিল তার নিয়তি। কখনো বিদ্যুৎ শক, কখনো আবার বাঁধা অবস্থায় পেটানো ও শরীর জুড়ে আঘাত। ৫ আগস্ট ২০২৪, সরকার পতনের পরে ৭ আগস্ট তাকে রাতের আঁধারে ছেড়ে দেয়া হয় গ্রামের এক রাস্তার ধারে। তিনি তখনও ঠিকভাবে হাঁটতে পারছিলেন না।
চিকিৎসা, ঘুরে দাঁড়ানো ও অটল অবস্থান
মুক্তির পরে স্থানীয়দের সহায়তায় জাহাঙ্গীরকে নেয়া হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, পায়ের হাড়ে চোট সব মিলিয়ে তার চিকিৎসা ব্যয় দাঁড়ায় আট থেকে নয় হাজার টাকা। তার স্ত্রী, বৃদ্ধ মা-বাবা মিলে ধার দেনা করে সেই টাকা যোগাড় করেন। চিকিৎসাশেষে ধীরে ধীরে সুস্থ হন জাহাঙ্গীর, কিন্তু তার মানসিক ক্ষত আর প্রতিবাদের আগুন আজও নিভেনি। আজও তিনি বিশ্বাস করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে হবে।
মো: জাহাঙ্গীর আলম আজ শুধুই একজন মুদী দোকানদার নন, তিনি গ্রামের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে থাকা হাজারো প্রতিবাদী কণ্ঠের প্রতীক। তার শরীরের ক্ষত, চোখের ক্ষোভ আর মুখের হাসি সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক সাহসিকতার নাম, এক সংগ্রামের ইতিহাস।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: জাহাঙ্গীর আলম
জন্ম তারিখ : ১০ ডিসেম্বর ১৯৯৮
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : চা স্টল ও মুদী দোকান
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: উদয় নারায়ণ মাছহাড়ী, ইউনিয়ন: মাছহাড়ী, থানা: কাউনিয়া, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: হায়দার আলী
মায়ের নাম : মোছা: আংগুরা খাতুন
পিতার পেশা ও বয়স : দিনমজুর, ৫০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০
মাসিক আয় : ১০ হাজার
আয়ের উৎস : ব্যবসা থেকে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. রোহান বাবু, বয়স: ৩ বছর, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : গ্রামের দোকান থেকে
আহত হওয়ার সময় : ২৭ জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যা ৬টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
কর্মসংস্থানে প্রস্তাবনা : এককালীন সহায়তা করা
১৯৯৮ সালের ১০ ডিসেম্বর, রংপুর জেলার কাউনিয়া থানার মাছহাড়ী ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম উদয়নারায়ণ মাছহাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন মো: জাহাঙ্গীর আলম। গ্রামটি ছিল সত্যিই এক অপার সৌন্দর্যের আধার। চারদিকে ধানক্ষেত, মাঝখানে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট এক খাল।
সকালে পাখির কলতান আর সন্ধ্যায় কুয়াশাঘেরা মাঠ যেন শৈশবের প্রতিটি মুহূর্তে তাকে আলতো করে ছুঁয়ে যেত। তার বাবা মো: হায়দার আলী একজন দিনমজুর, আর মা মোছা: আংগুরা খাতুন একজন গৃহিণী। অল্প আয়ের সংসারে বড় হলেও ভালোবাসা আর নিরহংকার জীবনদর্শন ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য। শৈশবে মাঠে খেলার আনন্দ, বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে সাঁতার এসবই ছিল তার প্রতিদিনের সঙ্গী। স্কুলে যেতেন পায়ে হেঁটে, কখনো খালি পায়ে। বইয়ের পাতা ছেঁড়া হলেও তার চোখে ছিল স্বপ্ন, আর মনে ছিল একটা প্রশ্ন, এই দারিদ্র্য পেরিয়ে জীবন কি নতুন কিছু দিতে পারবে?
কঠোর পরিশ্রমে গড়া ব্যবসায়িক জীবন
কিন্তু স্বপ্নে ছেঁকে থাকা সেই চোখে বাস্তবের ছায়া দ্রুতই পড়ে। পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়, স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন জাহাঙ্গীর। কৈশোরেই তাকে নেমে পড়তে হয় জীবিকার খোঁজে। প্রথমে দিনমজুরের কাজ করেন এবং নিজের গ্রামের রাস্তার ধারে একটি ছোট্ট চা-স্টল দেন। পরে ধীরে ধীরে মুদী দোকানও চালু করেন। সেই ছোট্ট দোকানই তার স্বপ্নের আঁচল হয়ে ওঠে। সকালবেলা দোকান খোলেন, নিজের হাতে চা বানান, চাল-ডাল, সাবান-তেল বিক্রি করেন, ছোট শিশুদের মুখে হাসি এনে দেন এক টাকার চকলেট দিয়ে। তার এই ছোট্ট ব্যবসা থেকেই মাসে গড়ে দশ হাজার টাকার মতো আয় হয়। সেই অর্থ দিয়েই তিনি পরিবারের তিন সদস্য, তিন বছরের একমাত্র ছেলে রোহান বাবু এবং বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণ করেন। তিনি কখনো বিলাসী হননি, কখনো অভিযোগ করেননি। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, নিজের ঘামই শ্রেষ্ঠ পুঁজি।
আন্দোলনের সূচনা ও তার অংশগ্রহণ
২০১৮ সাল, যখন ঢাকার রাজপথে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন, তখনও জাহাঙ্গীর ছিলেন একজন নীরব পর্যবেক্ষক। তিনি খবরের কাগজ পড়তেন, মোবাইলে ইউটিউবে ভিডিও দেখতেন, আর বুঝতেন দেশে একটা বড় পরিবর্তনের বাতাস বইছে। কিন্তু সেই আন্দোলন চাপা পড়ে যায় সরকারের প্রতিশ্রুতি আর রাজনৈতিক চালে।
কিন্তু ২০২৪ সালে সে দাবিই আবার জ্বলে ওঠে নতুন শিখায়। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেমে পড়ে রাজপথে। এবার ঢাকা, জগন্নাথ, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর, এমনকি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরাও একযোগে আওয়াজ তোলে। জাহাঙ্গীর আলম একজন দোকানদার হলেও মনে প্রাণে ছিলেন দেশপ্রেমিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের ন্যায্য দাবিতে সকল শ্রেণির মানুষের পাশে থাকা উচিত।
দোকানের পেছনে বসে মোবাইলে খবর দেখে, ইউটিউবে বক্তৃতা শুনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই আন্দোলন দেশের ভবিষ্যতের জন্য জরুরি।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড ও উত্তাল প্রতিবাদ
১৬ জুলাই ২০২৪, দেশজুড়ে নেমে আসে শোক আর ক্ষোভ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড যেন জাহাঙ্গীরের হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি আর শুধু দর্শক থাকেননি। ১৭ জুলাই, সে দিনও আবু সাঈদ-এর হত্যার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে রংপুরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন করে। তিনিও এ আন্দোলনের একজন সক্রিয় সৈনিক ছিলেন। সেদিন স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনী এবং আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীরা ছাত্র-জনতার ওপর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেদিন পুলিশের উপর্যুপুরি ছররা গুলিতে তার পায়ে সামান্য জখম হয়, কিন্তু তাতেও থামেননি। প্রতিদিন বিকেলে দোকান বন্ধ করে তিনি মিছিলে যোগ দিতেন।
একজন সাধারণ দোকানদার হয়েও তিনি ছিলেন সেই আন্দোলনের অদৃশ্য সৈনিক। কারণ তিনি বুঝেছিলেন আবু সাঈদের মৃত্যু মানে ন্যায়ের মৃত্যু, নীরব থাকা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া।
বন্দিত্ব, নির্যাতন ও বেদনাময় দিনগুলো
২৭ জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যা ৬টা। দোকানে বসে গরম চা বানাচ্ছিলেন জাহাঙ্গীর। হঠাৎ সিভিল পোশাকধারী কয়েকজন পুলিশ এসে তাকে কিছু না বলেই ধরে নিয়ে যায়। প্রতিবাদ করতে গেলে গাড়িতে তুলেই শুরু হয় মারধর। বন্দুকের নল দিয়ে বুকে আঘাত, লাঠির ঘায়ে পিঠ রক্তাক্ত হয়ে যায়। আশেপাশের মানুষ চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু কোনো কোর্টে হাজির করা হয়নি। তাকে রাখা হয় গোপন কক্ষে। কেউ জানত না সে বেঁচে আছে কিনা। সেই কয়েদখানায় দিনে একবেলা খাবার, রাতে ঠাণ্ডা মেঝেতে শুয়ে থাকা আর চোখ বাঁধা অবস্থায় নির্যাতন ছিল তার নিয়তি। কখনো বিদ্যুৎ শক, কখনো আবার বাঁধা অবস্থায় পেটানো ও শরীর জুড়ে আঘাত। ৫ আগস্ট ২০২৪, সরকার পতনের পরে ৭ আগস্ট তাকে রাতের আঁধারে ছেড়ে দেয়া হয় গ্রামের এক রাস্তার ধারে। তিনি তখনও ঠিকভাবে হাঁটতে পারছিলেন না।
চিকিৎসা, ঘুরে দাঁড়ানো ও অটল অবস্থান
মুক্তির পরে স্থানীয়দের সহায়তায় জাহাঙ্গীরকে নেয়া হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, পায়ের হাড়ে চোট সব মিলিয়ে তার চিকিৎসা ব্যয় দাঁড়ায় আট থেকে নয় হাজার টাকা। তার স্ত্রী, বৃদ্ধ মা-বাবা মিলে ধার দেনা করে সেই টাকা যোগাড় করেন। চিকিৎসাশেষে ধীরে ধীরে সুস্থ হন জাহাঙ্গীর, কিন্তু তার মানসিক ক্ষত আর প্রতিবাদের আগুন আজও নিভেনি। আজও তিনি বিশ্বাস করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে হবে।
মো: জাহাঙ্গীর আলম আজ শুধুই একজন মুদী দোকানদার নন, তিনি গ্রামের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে থাকা হাজারো প্রতিবাদী কণ্ঠের প্রতীক। তার শরীরের ক্ষত, চোখের ক্ষোভ আর মুখের হাসি সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক সাহসিকতার নাম, এক সংগ্রামের ইতিহাস।
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: জাহাঙ্গীর আলম
জন্ম তারিখ : ১০ ডিসেম্বর ১৯৯৮
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : চা স্টল ও মুদী দোকান
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: উদয় নারায়ণ মাছহাড়ী, ইউনিয়ন: মাছহাড়ী, থানা: কাউনিয়া, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: হায়দার আলী
মায়ের নাম : মোছা: আংগুরা খাতুন
পিতার পেশা ও বয়স : দিনমজুর, ৫০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪০
মাসিক আয় : ১০ হাজার
আয়ের উৎস : ব্যবসা থেকে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. রোহান বাবু, বয়স: ৩ বছর, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : গ্রামের দোকান থেকে
আহত হওয়ার সময় : ২৭ জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যা ৬টা
আক্রমণকারী : পুলিশ
কর্মসংস্থানে প্রস্তাবনা : এককালীন সহায়তা করা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍