হোম / আহতদের তালিকা / শাকিল আহমেদ জয়
শাকিল আহমেদ জয়

শাকিল আহমেদ জয়

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
রংপুর জেলার কাউনিয়া থানার হারাগাছ ইউনিয়নের চর চতুরা গ্রামে ২০০১ সালের ১৮ আগস্ট জন্ম নেয় এক সম্ভাবনাময় ছেলে শাকিল আহমেদ জয়। গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশেই তার শৈশব কেটেছে। পরিবার ছিল ছোট, তবে সংগ্রামী। বাবা মো: মশিয়ার রহমান একজন সাইকেল মেকার ও কৃষিকাজ করেন। বয়স এখন ৫৮, কিন্তু তখনও পরিশ্রমে কোনো ত্রুটি ছিল না। মা মোছা: ছামছুন নাহার একজন গৃহিণী। বয়স ৪৭ হলেও সংসারের সব দায়িত্ব একা হাতে সামলাতেন। চার বোনের সবাই বিবাহিত। তাই সংসারে একমাত্র ছেলেই হয়ে ওঠেন ভরসার স্থল। তিনজনের ছোট এই পরিবারে মাসিক আয় মাত্র ৭ হাজার টাকা। সাইকেল মেরামত আর ক্ষুদ্র কৃষিকাজই ছিল উপার্জনের একমাত্র উৎস।

ছোটবেলা থেকেই জয় পড়াশোনায় আগ্রহী ছিল। দারিদ্র্য তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। পড়াশোনার পাশাপাশি সে দায়িত্ববান ছিল পরিবারের প্রতি। রংপুর সরকারি কলেজে পড়া এই তরুণ স্বপ্ন দেখত, লেখাপড়া করে একদিন পরিবারের কষ্ট দূর করবে।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে দেশের ছাত্র সমাজ যখন সুষ্ঠু নিয়োগ, নিয়োগে বৈষম্যের অবসান এবং চাকরিতে প্রাপ্য মর্যাদার দাবিতে রাস্তায় নামে, তখন জয়ও সে আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন শুধু ডিগ্রি নিয়ে বসে থাকলে কিছু হবে না। যদি শেষমেশ চাকরির বাজারে বৈষম্যের শিকার হতে হয়, তাহলে এই কষ্ট করে পড়াশোনারই বা মানে কী? পড়ালেখার পাশাপাশি সংসার চালাতে জয় গাজীপুরের শফিপুরে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করছিল। দিনে কাজ, রাতে ক্লান্ত শরীরে পড়া। তবে চোখে ছিল আগুন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারার সাহস ছিল তার। তাই গার্মেন্টসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আন্দোলনে অংশ নিতেন। মনে মনে ভাবতেন, যদি আজ চুপ করে থাকি, তাহলে কাল আর কেউ আমাদের কথা বলবে না।
দায়িত্বের ভার ও আন্দোলনে অংশগ্রহণ
বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে হওয়ায় সংসারের ভার জয় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল অনেক আগেই। চার বোনের বিয়ের পর সে-ই ছিল পরিবারের প্রধান ভরসা। তাই কলেজের পড়া আর গার্মেন্টসের চাকরি একসাথে চালিয়ে যাচ্ছিল। দারিদ্র্য সত্ত্বেও সে কখনো হাল ছাড়েনি।
তবে সমাজের প্রতি ছিল তার গভীর দায়িত্ববোধ। ছাত্রদের আন্দোলনের খবর প্রতিদিন নজরে রাখতেন। চোখে জল নিয়ে শুনতেন পুলিশ লাঠিপেটা করছে, রাবার বুলেট ছুঁড়ছে, গুলি করছে নিরীহ ছাত্রদের ওপর। নিজের ভবিষ্যতের জন্য, দেশের ভবিষ্যতের জন্য আন্দোলনের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারলেন না। তার বৃদ্ধ মা বাবা ফোন করে বলেছিল বাবা তুই আন্দোলনে যাস নে। কিন্ত তিনি ন্যায়ের আন্দোলনের সামনের সাড়িতে থাকতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন এই আন্দোলন শুধু চাকরির জন্য না, এটা মর্যাদা, অধিকার, ন্যায়ের লড়াই।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়াবহ দিন
তারিখটা ছিল ৫ আগস্ট ২০২৪। দুপুর ২টা। শফিপুর তখন রণক্ষেত্র। ছাত্র-জনতা এবং পুলিশের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছিল। চারপাশে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, লাঠিপেটা সব মিলিয়ে যেন এক আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছিল এলাকা। জয়ও সেই দিন আন্দোলনের মিছিলে ছিল। ছেলেটি কখনো ভাবেনি, এই দিনটা তার জীবনের গতিপথ আমূল বদলে দেবে।
মিছিল হঠাৎ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। সামনে থেকে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা টিয়ার শেল ছুড়তে থাকে। আন্দোলনকারীরা দৌড়ে পালাতে থাকে। জয়ও দৌড় দেয়। কিন্তু ঠিক তখনই, এক পুলিশ সদস্য খুব কাছ থেকে তার বাম পায়ের টাকনাতে গুলি করে। তৎক্ষণাৎ তার হাড় ভেঙে যায়। রক্তে ভেসে যায় রাস্তাটি। যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ছাত্র-জনতা কোনোভাবে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় স্থানীয় শফিপুর জেনারেল হাসপাতালে।

চিকিৎসা ও জীবনের নতুন লড়াই
শফিপুর থেকে দ্রুত তাকে নেওয়া হয় বদরুদ্দোজা হাসপাতালে। অবস্থার অবনতি হওয়ায় সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে। কয়েকদিন ভর্তি থাকার পর, আবার স্থানান্তর করা হয় ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে। সেখানে তার পায়ে দুটি জটিল অপারেশন করা হয়। ইস্পাতের রড বসানো হয় হাড়ে। তবুও, আজ পর্যন্ত জয় পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। এখনো খুঁড়িয়ে হাঁটেন। প্রতিটি পদক্ষেপে অনুভব করেন ব্যথার চিৎকার, কিন্তু মন থেকে তিনি ভেঙে পড়েননি। পায়ের শক্তি হারালেও সাহসের শক্তি আজও অটুট এই শাকিল আহমেদ জয় শুধু একজন ছাত্র না, সে একজন যোদ্ধা, ভবিষ্যতের জন্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক সাহসী নাম।


একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : শাকিল আহমেদ জয়
জন্ম তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০০১
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : রংপুর সরকারি কলেজ
নিজ জেলা : রংপুর
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: চর চতুরা, ইউনিয়ন: হারাগাছ, থানা: কাউনিয়া, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মশিয়ার রহমান
মায়ের নাম : মোছা: ছামছুন নাহার
পিতার পেশা ও বয়স : সাইকেল মেকার+কৃষক, ৫৮
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৭
মাসিক আয় : ৭ হাজার
আয়ের উৎস : মেকানিক ও কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
ভাইবোন বিবরণ: চার বোনই বিবাহিত
ঘটনার স্থান : শফিপুর, গাজিপুর
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ২ টা
আক্রমণকারী : পুলিশ ও আনসার

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍