হোম / আহতদের তালিকা / মো: রেদোয়ান ইসলাম রনি
মো: রেদোয়ান ইসলাম রনি

মো: রেদোয়ান ইসলাম রনি

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী (১০ম শ্রেণি)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সবুজ শ্যামল গ্রামে বেড়ে ওঠা
৩১ মে ২০০৫ সালে রংপুর জেলার কাউনিয়া থানার নিজপাড়া গ্রামে জন্ম নেয় মো: রেদোয়ান ইসলাম রনি। শৈশব কেটেছে মাটির গন্ধমাখা সেই গ্রামে, যেখানে সকাল শুরু হয় পাখির কুজন আর সন্ধ্যায় মাঠজুড়ে ছেলেদের হাসির ঝলক। তার স্কুলের নাম গাজিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়। সে তখন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। রনির প্রতিদিনের জীবন ছিল সাদামাটা, কিন্তু আনন্দে ভরপুর। সকালে স্কুল, বিকেলে মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা, আর সন্ধ্যাবেলা বইখাতা নিয়ে বসা এই ছিল তার নিত্যদিনের চিত্র। প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটি ছিল ভীষণ প্রাণবন্ত। গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে তার মনও হয়ে উঠেছিল সরল ও স্পষ্টবাদী।
একটি সংগ্রামী পরিবার
রনির পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে মেঝো। বড় ভাই রাকিব এখন কাউনিয়া কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। আর ছোট বোন মোছা: রিনি পড়ে কাউনিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে, অষ্টম শ্রেণিতে। রনির বাবা হাছেন আলী একজন অটোরিকশাচালক, বয়স ৪৫ বছর। প্রতিদিন রোদে-ঘামে ভিজে রাস্তায় রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন, তাই দিয়েই চলে পরিবারের ভরণপোষণ। মা গোলাপী বেগম, বয়স ৩৮, তিনি একজন গৃহিণী। সংসারের হাল ধরেন নিঃশব্দে। ছোট এই পরিবারটি স্বপ্ন দেখে একদিন ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে মানুষ হবে, বাবা-মার কষ্টের প্রতিদান দেবে। অভাব থাকলেও ভালোবাসা আর সম্মিলিত চেষ্টার কোনো ঘাটতি ছিল না। রনি জানত তাকে ভালো মানুষ হতে হবে, কারণ পরিবার তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আন্দোলনের আগুনে আগুনে তরুণ রনি
স্কুল ছুটি হলে রনি ঢাকায় খালার বাড়িতে বেড়াতে যায়। তখন দেশজুড়ে ছাত্রদের মধ্যে এক আলোড়ন চলছে চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের আন্দোলন। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনের স্থায়ী কোনো ফল না পাওয়ায় ২০২৪ সালে ফের তা নতুন উদ্যমে শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নেতৃত্ব দেন, আর সামাজিক মাধ্যমে #বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হ্যাশট্যাগে ছাত্ররা একত্রিত হতে থাকে। আন্দোলনের মূল কথা ছিল সরকারি চাকরিতে যেন মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়, যাতে সকল শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পায়। কিন্তু সরকার বরং পুলিশ, আনসার বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদের দিয়ে আন্দোলন দমন করতে শুরু করে। জুলাই মাসে একাধিক হামলা চালানো হয় ছাত্রদের ওপর। ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পুলিশ সরাসরি গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরিস্থিতি বিস্ফোরণ ঘটায়। ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর নির্মম গুলিবর্ষণে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, এমনকি স্কুলের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেয়। গ্রামের স্কুলপড়ুয়া রনিও সেই আগুনে পুড়তে থাকে ভেতরে ভেতরে।
৫ আগস্টের নির্মম সকাল
৫ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১টা ৩০ মিনিট। রনি খালার বাড়ি থেকে বের হতেই খালা নিষেধ করেন, তুই যাস না, বাইরে অনেক সমস্যা! কিন্তু রনি থাকতে পারেনি। দেশের জন্য, শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসা থেকে সে রাস্তায় নেমে পড়ে। সে শফিপুর আনসার একাডেমির সামনে গিয়ে আন্দোলনে অংশ নেয়। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে স্লোগান, চোখে সাহস। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। পুলিশ, আনসার এবং সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা একত্র হয়ে নির্মম নির্যাতন শুরু করে। টিয়ারশেল, লাঠিপেটা, গুলি সব মিলে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। পুলিশের উপুর্যুপরি গুলির কারণে ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ছাত্র জনতা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। পুলিশ তবুও গুলি করতে করতে সামনের দিকে আগায়। রনি ছিল সামনে সারিতে। সেও পিছনের দিকে দৌড় দেয়। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি করলে তার শরীরে প্রায় ৫০-৬০ টা ছোররাগুলি লাগে। ব্যথায় ছটফট করতে থাকে সে। পাশেই একটা টিয়ারগ্যাস ছাড়ে ধোঁয়া, কাশি, দম বন্ধ হয়ে আসা সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল মৃত্যুই যেন সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
হাসপাতালে দিন আর যন্ত্রণার রাত
ছাত্র-জনতা মিলে রনিকে উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পাঠানো হয় কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে তার শরীরে লাগা গ্যাস শেলগুলোর অনেকগুলো অপসারণ করা হয়। তবে এখনো তার শরীরে ১৫-১৬টি ছোররা গুলির টুকরো রয়ে গেছে। প্রতিদিন সেই জায়গাগুলো চুলকায়, জ্বলে। চিকিৎসার পেছনে পরিবারের প্রায় লক্ষ টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে, যা এই রিকশাচালক বাবার পক্ষে কল্পনার বাইরে ছিল। আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার নিয়ে তিনি তার চিকিৎসা চালান। তবুও রনি হার মানেনি। আজও সে বলে আমি যন্ত্রণায় থাকলেও লড়াই থেমে যায়নি। ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো ভুল ছিল না। আজ আমি কষ্টে আছি, কাল হয়তো কেউ মুক্তভাবে হাঁটবে এই পথেই।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা।



একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: রেদোয়ান ইসলাম রনি
জন্ম তারিখ : ৩১ মে ২০০৫
জন্মস্থান : রংপুর
পেশা : শিক্ষার্থী (১০ম শ্রেণি)
প্রতিষ্ঠান : গাজিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: নিজপাড়া, ইউনিয়ন: পৌরসভা, থানা: কাউনিয়া, জেলা: রংপুর
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : হাছেন আলী
মায়ের নাম : গোলাপী বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : অটোরিকশা চালক, ৪৫
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৮
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. রাকিব, বয়স: ২৪, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: দ্বাদশ (কাউনিয়া কলেজ), সম্পর্ক: ভাই
২. মোছা: রিমি, বয়স ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: ৮ম (কাওনিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়), সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : শফিপুর আনসার একাডেমি
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১:৩০টা
আক্রমণকারী : আনসার

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍