আলামিন মিয়া
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আলামিন মিয়া ময়মনসিংহের এক সাধারণ তরুণ, যিনি সন্তানের জন্মের মাত্র ৪২ দিন পর রাষ্ট্রের রাইফেলের গুলিতে বিদ্ধ হন। হয়ে ওঠেন নীরব প্রতিরোধের প্রতীক। রামপুরার রাজপথে লুটিয়ে পড়লেও তাঁর মন ভাঙেনি; ভেঙেছে কেবল শরীরের অঙ্গ। আজও তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটেন, তবু চোখে জ্বলে একটি ছোট পরিবারের নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ গড়ার জেদ। করুণা নয় তিনি চান শুধু কাজ, সম্মান ও বাঁচার ন্যায্য সুযোগ। এই আহত যোদ্ধা প্রমাণ করে দিয়েছেন: গুলি শরীরে লাগে, স্বপ্নে নয়।
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
আহত যোদ্ধার শরীরে বুলেট, বুকে আগুন
আলামিন মিয়া
ক্রমিক: ০৩৭
আইডি: ঢাকা সিটি ০৩৭
পরিচিতি ও বাস্তবতা
অন্ধকারের ভিতর থেকেও যারা আলো দেখে, তাদের নাম হয় না কেবল 'আহত', তাদের নাম হয়ে যায় প্রতিরোধ। আলামিন মিয়া ময়মনসিংহ জেলার চররাঘবপুর গ্রামের সেই একরোখা তরুণ, যার জীবন ছিল এক ধুসর স্বপ্ন, যার দিন কাটত রোজগারের দুশ্চিন্তায়, আর রাত কাটত সন্তানকে কোলে নিয়ে। যখন ছেলে সন্তানের জন্ম হয়, তখন দেশ তালহারা এক নৌকার মতো টালমাটাল, আর রাষ্ট্র তখন বন্দুকের ট্রিগার চেপে নিরস্ত্র জনগণের প্রাণ শুষে নিচ্ছিল। সন্তান জন্মের ৪২ দিন পর, এক শিশুর মুখে দুধের গন্ধ যখন এখনো শুকোয়নি, তখন সেই বাবার শরীরে ঢুকে যায় একটি গুলি, কেবল মাংস নয়, ছিন্নভিন্ন করে দেয় একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ।
আলামিনের পিতা বৃদ্ধ, একটা ছেঁড়া লুঙ্গি আর কুঁজো হয়ে আসা পিঠ নিয়ে প্রতিদিন লড়েন নিজ অস্তিত্বের জন্য। মা একটি বাসায় কাজ করেন, দুধ, চাল, তেল যোগাড় করতে গিয়ে মুখে পড়ে রাজ্যের ঘাম। অথচ এই পরিবার কোনোদিন হাত পাতেনি, কোনোদিন পা চাটেনি কোনো নেতার। তারা শুধু ভালো থাকতে চেয়েছিল, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছিল। আর আল আমিন? সে তো শুধু একটি চাকরি চেয়েছিল অথবা যদি কপাল ভালো হয়, গরুর খামার খুলে নিজের মতো করে সংসারটা দাঁড় করাতে চেয়েছিল।
কিন্তু এই রাষ্ট্র এমন এক যন্ত্র, যেখানে মানুষের স্বপ্ন মানে নিরাপত্তার ঝুঁকি। আল আমিনের শরীরে গুলি ঢুকে যায় ২০ জুলাই, ঢাকার উত্তাল রাজপথে। সে কোনো নেতার দেহরক্ষী ছিল না, কোনো কোর্ট-স্যুট পরা টকশো বক্তা ছিল না। সে ছিল একটি 'না বলা সত্য', যে রাষ্ট্রের চোখে পড়ে গিয়েছিল। গুলি তার পায়ের মাংস ছিঁড়ে দেয়, হাঁটা হয় না ঠিকমতো, দাঁড়ানো যায় না দীর্ঘক্ষণ আর সেই অক্ষমতা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, এই দেশে বাঁচতে গেলেও রাজপথে রক্ত দিতে হয়।
তবুও আলামিন হারে না। এখনো সে স্বপ্ন দেখে একটা গরুর খামার হবে, একটা চাকরি পেলে সংসার আবার হেসে উঠবে। তার স্ত্রী অনন্যা, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে, এখন জীবন নামক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর তোলার চেষ্টা করছে। দশ মাসের সেই শিশু এখন হাঁটতে শিখছে, কিন্তু বাবার খোঁড়ানো দেখে ভয় পায়। আল আমিন জানে, এই দেশের বুকে স্বপ্ন দেখা অনেক বেশি বিপজ্জনক। তবুও সে স্বপ্ন দেখে।
এ রাষ্ট্র যদি মানুষ চেনে, তবে আল আমিনদের চিনতে শিখুক। যারা গুলি খেয়েও ভিক্ষা চায় না, চায় না করুণা। তারা চায় শুধু সুযোগ, কাজ ও সম্মান। একটি ক্ষুদ্র স্বপ্ন, একটি সৎ পরিবার, আর একটি ব্যথাহীন সকাল এই তো চাওয়া। এর চেয়ে বড় বিপ্লব আর কী হয়?
গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্ত ও চিকিৎসার রুদ্ধযুদ্ধ
অন্ধকার যদি সিঁড়ি দেখা না দেয়, তবে পায়ের রক্ত দিয়েই পথ বানাতে হয়। আল আমিন ঠিক এ কাজটিই করেছিলেন। ১৯ জুলাই ২০২৪, এক শুক্রবার, যখন ঢাকার বাতাস শ্লোগানের শব্দে কাঁপছিল, "বৈষম্য নয়, স্বাধীনতা চাই" তখনো কেউ জানত না কার শরীরে সেই স্বাধীনতার মূল্য বিঁধে আসবে রাইফেলের বুলেট হয়ে। বিকাল চারটা, শহরের বুকে উত্তাপ। ঠিক তখনই চূড়ান্ত হয়ে উঠেছিল যখন রাষ্ট্রের লেলিয়ে দেয়া বাহিনী রাইফেলের ট্রিগারে আঙুল রাখল। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের বুক চিরে উড়ে এলো ধাতব বারুদ। যেন রাষ্ট্র নিজেই ঘোষণা করল, এ দেশের মানুষ কথা বললে তার ফুসফুস চিরে দেবো আমরা।
আলামিনের কাঁধে কারও পতাকা ছিল না, হাতে কোনো দলে দলে ধরা ব্যানার ছিল না, ছিল শুধু মুখে সত্য, মনে আগুন, আর চোখে সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানের ভবিষ্যৎ। সে ভবিষ্যৎকে ভালো রাখতে গিয়েই তাঁর শরীরে বিঁধে আসে একটি বড় বুলেট। গুলি তার বাম অণ্ডকোষে লেগে যায়, বুকের ভেতর রক্তের নদী নামে, আর বাস্তবতা থমকে যায় এই কি আমাদের দেশ? এই কি মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া? সে মুহূর্তে আলামিন মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, অজ্ঞান হয়ে যান। কে জানত, এই নিথর দেহটিই একদিন দেশের বিবেককে প্রশ্ন করবে "আমার অপরাধ কী ছিল?"
চেতনা ফেরে এক হাসপাতালের বিছানায়। কিন্তু সে বিছানা যেন হাসপাতালের নয়, বরং কারাগারের মতো। চারপাশে তখনো আওয়ামী লীগ নামক দানব ঘুরছে গায়ের জোরে। চিকিৎসকরা জানেন, রাষ্ট্রপক্ষ দেখতে পাচ্ছে, না কিন্তু তারা বোঝে, যাকে গুলি করা হয়েছে, সে বিপজ্জনক। কারণ সে চুপ করে নেই, সে চিৎকার করে না। তাই তার চিকিৎসায় হয় দেরি, হয় অবহেলা, হয় রাজনীতির মৃদু শ্বাস ফেলে দেয়া। তাকে একটি মাত্র অপারেশন দেয়া হয় মূত্রনালিতে। স্থায়ী নল লাগানো হয়, কারণ ক্ষত এত গভীর যে, চলাফেরা বা স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা পড়ে। চিকিৎসক জানান, তাঁর পুরুষাঙ্গ হানি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, আরেকটি জটিল অপারেশন বাকি।
এই পর্যন্ত চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ৫৩ থেকে ৫৭ হাজার টাকা যেটা আলামিনের মতো একজন সাধারণ মানুষের কাছে শুধু টাকা নয়, একটা ভবিষ্যৎ মরুভূমি। এ টাকা এসেছে ধার, দান আর মর্যাদার বদলে পাওয়া নিঃশব্দ করুণা থেকে। কিন্তু আল আমিন আজও মাথা নিচু করেননি। তিনি আহত, কিন্তু পরাজিত নন। তাঁর চোখে এখনো আগুন, তাঁর বুকে এখনো গর্জে ওঠে সেই শ্লোগান "আমি গুলি খেয়েছি, কিন্তু মিথ্যার কাছে মাথা নত করিনি।"
কারণ বিপ্লবী হওয়া মানে শুধু মারা যাওয়া নয়, অনেক সময় গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়ে বেঁচে থাকার কষ্টকে বহন করাও একটি বিদ্রোহ। আলামিন আজও হাঁটতে পারেন না ঠিকমতো, সোজা দাঁড়াতে গেলে ব্যথা ওঠে। কিন্তু তার কণ্ঠে শব্দ এখনও অক্ষত সেই শব্দ বলছে: "এই রাষ্ট্র বদলাতেই হবে। আমার রক্ত যদি পথ দেখায়, তবে সে পথেই হাঁটবে আমার সন্তান।"
বর্তমান অবস্থা
আলামিনের কন্ঠে নেই হতাশার কান্না, বরং আছে এক দৃঢ় উচ্চারণ "একটা চাকরি হলে আমি বাঁচতে পারব। না হলে গরুর খামার করে জীবন চালাতে চাই। বাবা সেটা চালাতে পারবেন।"
কথাটা যেন সাধারণ কোনো চাকরিপ্রার্থীর আবেদন নয় এটা এক আহত যোদ্ধার আহ্বান, যে রাষ্ট্রের গুলিকে পরাজিত করেছে, কিন্তু অনাহারে সন্তানকে পরাজিত হতে দিতে চায় না।
সে রাষ্ট্রের কাছে ভিক্ষা চায় না, দয়া চায় না, সে চায় ন্যায্যতা। কারণ তার শরীরে যে বুলেট বিধেছিল, তা শত্রুর ছিল না, রাষ্ট্রের ছিল: আর সেই রাষ্ট্রেরই এখন দায়িত্ব তার সন্তান রক্ত না চুষে খেতে পায় কি না তা নিশ্চিত করা। তার স্ত্রী অনন্যা, যে দশ মাসের সন্তানকে বুকে চেপে ঘরে অপেক্ষা করেছিল, তাকে আর খালি হাঁড়ির তাপে ঘুম পাড়াতে চায় না সে। এ লজ্জা, এই দায় এখন রাষ্ট্রের।
আল আমিন এক হাতে ক্ষতচিহ্ন মুছে, অন্য হাতে ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। তার চাওয়া ক্ষুদ্র নয়, সোজা: একটি চাকরি, একটি সুযোগ, একটি সম্মান।
এই হলো নতুন বাংলাদেশের প্রতীক যেখানে প্রতিবাদীরা গুলি খেয়েও হাত বাড়ায় কাজের দিকে, আর চোখ রাখে এক ন্যায়ের ভোরে।
প্রস্তাবনা
আলামিনের জন্য একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী না হলে, সরকারি আর্থিক অনুদানে একটি গরুর খামার স্থাপন, যাতে তার পরিবার মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। বাকি চিকিৎসার পূর্ণ ব্যয় বহন, যেন ভবিষ্যতের পুরুষাঙ্গহানি ঠেকানো যায়। সন্তান ও স্ত্রীর জন্য স্বল্প আয়ের পরিবার পুনর্বাসন প্যাকেজে অন্তর্ভুক্তি।
অপারেশনের বিবরণ: প্রস্রাবের নালীতে অস্ত্রোপচার
(Anastomotic Urethroplasty) করা হয়। প্রস্রাবের জন্য একটি নল লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
রোগ নির্ণয়: বাম অণ্ডকোষে গুলির আঘাত (bullet injury on Lt. Side of scrotum) এবং অণ্ডকোষ ফুলে যাওয়া।
বর্তমান চিকিৎসা: বর্তমানে ডাক্তারের ফলোআপে আছেন।
ভবিষ্যৎ চিকিৎসা: পুরুষাঙ্গের ক্ষতি হয়ে থাকলে ভবিষ্যতে একটি অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে, যা এখনো বাকি আছে।
এক নজরে আলামিন মিয়া
নাম:: আলামিন মিয়া
জন্ম তারিখ: ০১-০১-২০০১
নিজ জেলা: ময়মনসিংহ
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: চররাঘবপুর, বোরর চর ইউনিয়ন, জেলা: ময়মনসিংহ
বর্তমান ঠিকানা: খিলগাঁও, ঢাকা
পারিবারিক তথ্য
বাবার নাম: কদম আলী
বাবার বয়স ও পেশা: ৬৪, বয়স হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে কোনো কাজ করেন না
মাতার নাম: শিল্পী বেগম
মায়ের বয়স ও পেশা: ৪৮, গৃহকর্মী
ভাই-বোন: দুই বোন (রুমা ও নাজমা), দু'জনেই বিবাহিত
স্ত্রী অনন্যা, শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাশ
সন্তান: দশ মাস বয়সী একটি ছেলে সন্তান আছে
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ১৯ জুলাই, রোজ শুক্রবার, বিকাল চারটার দিকে
আক্রমণকারী: আন্দোলনরত অবস্থায় রাইফেলের একটি বড় বুলেট শরীরে লাগলে তিনি আহত ও অজ্ঞান হয়ে যান
আহত হওয়ার স্থান : রামপুরা টিভি সেন্টার, ঢাকা
আলামিন মিয়া
ক্রমিক: ০৩৭
আইডি: ঢাকা সিটি ০৩৭
পরিচিতি ও বাস্তবতা
অন্ধকারের ভিতর থেকেও যারা আলো দেখে, তাদের নাম হয় না কেবল 'আহত', তাদের নাম হয়ে যায় প্রতিরোধ। আলামিন মিয়া ময়মনসিংহ জেলার চররাঘবপুর গ্রামের সেই একরোখা তরুণ, যার জীবন ছিল এক ধুসর স্বপ্ন, যার দিন কাটত রোজগারের দুশ্চিন্তায়, আর রাত কাটত সন্তানকে কোলে নিয়ে। যখন ছেলে সন্তানের জন্ম হয়, তখন দেশ তালহারা এক নৌকার মতো টালমাটাল, আর রাষ্ট্র তখন বন্দুকের ট্রিগার চেপে নিরস্ত্র জনগণের প্রাণ শুষে নিচ্ছিল। সন্তান জন্মের ৪২ দিন পর, এক শিশুর মুখে দুধের গন্ধ যখন এখনো শুকোয়নি, তখন সেই বাবার শরীরে ঢুকে যায় একটি গুলি, কেবল মাংস নয়, ছিন্নভিন্ন করে দেয় একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ।
আলামিনের পিতা বৃদ্ধ, একটা ছেঁড়া লুঙ্গি আর কুঁজো হয়ে আসা পিঠ নিয়ে প্রতিদিন লড়েন নিজ অস্তিত্বের জন্য। মা একটি বাসায় কাজ করেন, দুধ, চাল, তেল যোগাড় করতে গিয়ে মুখে পড়ে রাজ্যের ঘাম। অথচ এই পরিবার কোনোদিন হাত পাতেনি, কোনোদিন পা চাটেনি কোনো নেতার। তারা শুধু ভালো থাকতে চেয়েছিল, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছিল। আর আল আমিন? সে তো শুধু একটি চাকরি চেয়েছিল অথবা যদি কপাল ভালো হয়, গরুর খামার খুলে নিজের মতো করে সংসারটা দাঁড় করাতে চেয়েছিল।
কিন্তু এই রাষ্ট্র এমন এক যন্ত্র, যেখানে মানুষের স্বপ্ন মানে নিরাপত্তার ঝুঁকি। আল আমিনের শরীরে গুলি ঢুকে যায় ২০ জুলাই, ঢাকার উত্তাল রাজপথে। সে কোনো নেতার দেহরক্ষী ছিল না, কোনো কোর্ট-স্যুট পরা টকশো বক্তা ছিল না। সে ছিল একটি 'না বলা সত্য', যে রাষ্ট্রের চোখে পড়ে গিয়েছিল। গুলি তার পায়ের মাংস ছিঁড়ে দেয়, হাঁটা হয় না ঠিকমতো, দাঁড়ানো যায় না দীর্ঘক্ষণ আর সেই অক্ষমতা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, এই দেশে বাঁচতে গেলেও রাজপথে রক্ত দিতে হয়।
তবুও আলামিন হারে না। এখনো সে স্বপ্ন দেখে একটা গরুর খামার হবে, একটা চাকরি পেলে সংসার আবার হেসে উঠবে। তার স্ত্রী অনন্যা, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে, এখন জীবন নামক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর তোলার চেষ্টা করছে। দশ মাসের সেই শিশু এখন হাঁটতে শিখছে, কিন্তু বাবার খোঁড়ানো দেখে ভয় পায়। আল আমিন জানে, এই দেশের বুকে স্বপ্ন দেখা অনেক বেশি বিপজ্জনক। তবুও সে স্বপ্ন দেখে।
এ রাষ্ট্র যদি মানুষ চেনে, তবে আল আমিনদের চিনতে শিখুক। যারা গুলি খেয়েও ভিক্ষা চায় না, চায় না করুণা। তারা চায় শুধু সুযোগ, কাজ ও সম্মান। একটি ক্ষুদ্র স্বপ্ন, একটি সৎ পরিবার, আর একটি ব্যথাহীন সকাল এই তো চাওয়া। এর চেয়ে বড় বিপ্লব আর কী হয়?
গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্ত ও চিকিৎসার রুদ্ধযুদ্ধ
অন্ধকার যদি সিঁড়ি দেখা না দেয়, তবে পায়ের রক্ত দিয়েই পথ বানাতে হয়। আল আমিন ঠিক এ কাজটিই করেছিলেন। ১৯ জুলাই ২০২৪, এক শুক্রবার, যখন ঢাকার বাতাস শ্লোগানের শব্দে কাঁপছিল, "বৈষম্য নয়, স্বাধীনতা চাই" তখনো কেউ জানত না কার শরীরে সেই স্বাধীনতার মূল্য বিঁধে আসবে রাইফেলের বুলেট হয়ে। বিকাল চারটা, শহরের বুকে উত্তাপ। ঠিক তখনই চূড়ান্ত হয়ে উঠেছিল যখন রাষ্ট্রের লেলিয়ে দেয়া বাহিনী রাইফেলের ট্রিগারে আঙুল রাখল। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের বুক চিরে উড়ে এলো ধাতব বারুদ। যেন রাষ্ট্র নিজেই ঘোষণা করল, এ দেশের মানুষ কথা বললে তার ফুসফুস চিরে দেবো আমরা।
আলামিনের কাঁধে কারও পতাকা ছিল না, হাতে কোনো দলে দলে ধরা ব্যানার ছিল না, ছিল শুধু মুখে সত্য, মনে আগুন, আর চোখে সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানের ভবিষ্যৎ। সে ভবিষ্যৎকে ভালো রাখতে গিয়েই তাঁর শরীরে বিঁধে আসে একটি বড় বুলেট। গুলি তার বাম অণ্ডকোষে লেগে যায়, বুকের ভেতর রক্তের নদী নামে, আর বাস্তবতা থমকে যায় এই কি আমাদের দেশ? এই কি মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া? সে মুহূর্তে আলামিন মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, অজ্ঞান হয়ে যান। কে জানত, এই নিথর দেহটিই একদিন দেশের বিবেককে প্রশ্ন করবে "আমার অপরাধ কী ছিল?"
চেতনা ফেরে এক হাসপাতালের বিছানায়। কিন্তু সে বিছানা যেন হাসপাতালের নয়, বরং কারাগারের মতো। চারপাশে তখনো আওয়ামী লীগ নামক দানব ঘুরছে গায়ের জোরে। চিকিৎসকরা জানেন, রাষ্ট্রপক্ষ দেখতে পাচ্ছে, না কিন্তু তারা বোঝে, যাকে গুলি করা হয়েছে, সে বিপজ্জনক। কারণ সে চুপ করে নেই, সে চিৎকার করে না। তাই তার চিকিৎসায় হয় দেরি, হয় অবহেলা, হয় রাজনীতির মৃদু শ্বাস ফেলে দেয়া। তাকে একটি মাত্র অপারেশন দেয়া হয় মূত্রনালিতে। স্থায়ী নল লাগানো হয়, কারণ ক্ষত এত গভীর যে, চলাফেরা বা স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা পড়ে। চিকিৎসক জানান, তাঁর পুরুষাঙ্গ হানি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, আরেকটি জটিল অপারেশন বাকি।
এই পর্যন্ত চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ৫৩ থেকে ৫৭ হাজার টাকা যেটা আলামিনের মতো একজন সাধারণ মানুষের কাছে শুধু টাকা নয়, একটা ভবিষ্যৎ মরুভূমি। এ টাকা এসেছে ধার, দান আর মর্যাদার বদলে পাওয়া নিঃশব্দ করুণা থেকে। কিন্তু আল আমিন আজও মাথা নিচু করেননি। তিনি আহত, কিন্তু পরাজিত নন। তাঁর চোখে এখনো আগুন, তাঁর বুকে এখনো গর্জে ওঠে সেই শ্লোগান "আমি গুলি খেয়েছি, কিন্তু মিথ্যার কাছে মাথা নত করিনি।"
কারণ বিপ্লবী হওয়া মানে শুধু মারা যাওয়া নয়, অনেক সময় গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়ে বেঁচে থাকার কষ্টকে বহন করাও একটি বিদ্রোহ। আলামিন আজও হাঁটতে পারেন না ঠিকমতো, সোজা দাঁড়াতে গেলে ব্যথা ওঠে। কিন্তু তার কণ্ঠে শব্দ এখনও অক্ষত সেই শব্দ বলছে: "এই রাষ্ট্র বদলাতেই হবে। আমার রক্ত যদি পথ দেখায়, তবে সে পথেই হাঁটবে আমার সন্তান।"
বর্তমান অবস্থা
আলামিনের কন্ঠে নেই হতাশার কান্না, বরং আছে এক দৃঢ় উচ্চারণ "একটা চাকরি হলে আমি বাঁচতে পারব। না হলে গরুর খামার করে জীবন চালাতে চাই। বাবা সেটা চালাতে পারবেন।"
কথাটা যেন সাধারণ কোনো চাকরিপ্রার্থীর আবেদন নয় এটা এক আহত যোদ্ধার আহ্বান, যে রাষ্ট্রের গুলিকে পরাজিত করেছে, কিন্তু অনাহারে সন্তানকে পরাজিত হতে দিতে চায় না।
সে রাষ্ট্রের কাছে ভিক্ষা চায় না, দয়া চায় না, সে চায় ন্যায্যতা। কারণ তার শরীরে যে বুলেট বিধেছিল, তা শত্রুর ছিল না, রাষ্ট্রের ছিল: আর সেই রাষ্ট্রেরই এখন দায়িত্ব তার সন্তান রক্ত না চুষে খেতে পায় কি না তা নিশ্চিত করা। তার স্ত্রী অনন্যা, যে দশ মাসের সন্তানকে বুকে চেপে ঘরে অপেক্ষা করেছিল, তাকে আর খালি হাঁড়ির তাপে ঘুম পাড়াতে চায় না সে। এ লজ্জা, এই দায় এখন রাষ্ট্রের।
আল আমিন এক হাতে ক্ষতচিহ্ন মুছে, অন্য হাতে ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। তার চাওয়া ক্ষুদ্র নয়, সোজা: একটি চাকরি, একটি সুযোগ, একটি সম্মান।
এই হলো নতুন বাংলাদেশের প্রতীক যেখানে প্রতিবাদীরা গুলি খেয়েও হাত বাড়ায় কাজের দিকে, আর চোখ রাখে এক ন্যায়ের ভোরে।
প্রস্তাবনা
আলামিনের জন্য একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী না হলে, সরকারি আর্থিক অনুদানে একটি গরুর খামার স্থাপন, যাতে তার পরিবার মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। বাকি চিকিৎসার পূর্ণ ব্যয় বহন, যেন ভবিষ্যতের পুরুষাঙ্গহানি ঠেকানো যায়। সন্তান ও স্ত্রীর জন্য স্বল্প আয়ের পরিবার পুনর্বাসন প্যাকেজে অন্তর্ভুক্তি।
অপারেশনের বিবরণ: প্রস্রাবের নালীতে অস্ত্রোপচার
(Anastomotic Urethroplasty) করা হয়। প্রস্রাবের জন্য একটি নল লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
রোগ নির্ণয়: বাম অণ্ডকোষে গুলির আঘাত (bullet injury on Lt. Side of scrotum) এবং অণ্ডকোষ ফুলে যাওয়া।
বর্তমান চিকিৎসা: বর্তমানে ডাক্তারের ফলোআপে আছেন।
ভবিষ্যৎ চিকিৎসা: পুরুষাঙ্গের ক্ষতি হয়ে থাকলে ভবিষ্যতে একটি অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে, যা এখনো বাকি আছে।
এক নজরে আলামিন মিয়া
নাম:: আলামিন মিয়া
জন্ম তারিখ: ০১-০১-২০০১
নিজ জেলা: ময়মনসিংহ
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: চররাঘবপুর, বোরর চর ইউনিয়ন, জেলা: ময়মনসিংহ
বর্তমান ঠিকানা: খিলগাঁও, ঢাকা
পারিবারিক তথ্য
বাবার নাম: কদম আলী
বাবার বয়স ও পেশা: ৬৪, বয়স হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে কোনো কাজ করেন না
মাতার নাম: শিল্পী বেগম
মায়ের বয়স ও পেশা: ৪৮, গৃহকর্মী
ভাই-বোন: দুই বোন (রুমা ও নাজমা), দু'জনেই বিবাহিত
স্ত্রী অনন্যা, শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাশ
সন্তান: দশ মাস বয়সী একটি ছেলে সন্তান আছে
আহত হওয়ার তারিখ ও সময়: ১৯ জুলাই, রোজ শুক্রবার, বিকাল চারটার দিকে
আক্রমণকারী: আন্দোলনরত অবস্থায় রাইফেলের একটি বড় বুলেট শরীরে লাগলে তিনি আহত ও অজ্ঞান হয়ে যান
আহত হওয়ার স্থান : রামপুরা টিভি সেন্টার, ঢাকা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍