হোম / আহতদের তালিকা / আব্দুল হাকিম
আব্দুল হাকিম

আব্দুল হাকিম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

ধাইজান পাড়ার ছেলে
১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি, নীলফামারীর জলঢাকা থানার কাঁঠালী ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম ধাইজানপাড়ায় জন্ম নেয় এক শিশু আব্দুল হাকিম। বাড়ির পরিবেশ ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু হাকিমের চোখে ছিল অসাধারণ স্বপ্ন। পাঁচ সদস্যের পরিবারে সে ছিল মায়ের কাছে সবচেয়ে আপন। তার মা বিলকিছ বেগম, একজন গৃহিণী, সারা দিন সংসারের কাজ সামলে ছেলেদের মানুষ করেছেন যত্নে।শান্ত মিছিল থেকে
রক্তাক্ত হাসপাতাল

হাকিমের বড় ভাই বিপ্লব এবং সবুজ দু’জনেই ছিলেন বেকার। একমাত্র উপার্জনক্ষম ভাই বাবু বিদেশে থাকতেন, তিনিই সংসারের খরচ চালাতেন । গ্রামে বেড়ে ওঠা হাকিম পড়াশোনার প্রতি খুবই মনোযোগী ছিল। ধানক্ষেতের মাঝখানে খেলাধুলা, গ্রামের পাঠশালার বেঞ্চে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা ছেলেটিকে যখন কেউ জিজ্ঞাসা করত বড় হয়ে কী হতে চাও সে নির্দ্বিধায় বলত, মানুষ হতে চাই, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চাই। মেধা আর অধ্যবসায়ে হাকিম ভর্তি হয় নীলফামারী সরকারি কলেজে। এখন সে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। কলেজে তার পরিচয় শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে নয়, বরং একজন সচেতন তরুণ নাগরিক হিসেবে। যে সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবতে জানে। অন্য ভাইদের কর্মহীনতা, বৃদ্ধ মা আর পরিবারের নির্ভরশীলতা তাকে ভিতরে ভিতরে কষ্ট দিত। কিন্তু হাকিম নিজের কষ্ট কখনো প্রকাশ করত না। পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের নানা বিষয়ে সহায়তা করা, দরিদ্র ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানো, গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তার নিত্যদিনের কাজ।
আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ২০১৮ সালে আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সরকার যখন কোনো স্থায়ী সমাধান দেয়নি, তখন আবারও ছাত্রসমাজ পথে নামে। এই আন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারের নয় বরং বেকার যুবসমাজের ন্যায্য অধিকারের আন্দোলন। শিক্ষিত তরুণরা যখন বছরের পর বছর ধরে চাকরির জন্য হাহাকার করে, তখন তারা স্পষ্ট বুঝে যায় এই ব্যবস্থার সংস্কার না হলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আব্দুল হাকিম তখন বুঝে ফেলেন এই সংগ্রাম থেকে পিছিয়ে থাকলে তার ভাই-বোন, তার গ্রামের ছেলে-মেয়েরা কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। তিনি আন্দোলনের শুরু থেকেই যুক্ত হন শান্তিপূর্ণ মিছিল, সভা, লিফলেট বিতরণ সবখানেই তিনি ছিলেন প্রথম সারিতে।
রক্তাক্ত ৪ আগস্ট
৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২:৩০।
জলঢাকা পেট্রোল পাম্পের সামনে চলছিল শান্তিপূর্ণ মিছিল। ছাত্রদের কণ্ঠে ছিল গর্জন, কোটা সংস্কার চাই! চাকরির অধিকার চাই!
“শিক্ষার্থীদের দাবি মানতে হবে! মানতে হবে।
হাকিম ছিলেন সেই মিছিলের নেতৃত্বে। তার মুখে ছিল দৃঢ় সংকল্প, চোখে ছিল স্পষ্ট স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ করেই মিছিলের সামনে আসে এক অন্ধকার ঝড়।
ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় সন্ত্রাসীরা লাঠি, রড, হকস্টিক, চাপাতি এবং বিদেশি অস্ত্র নিয়ে ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যারা এসেছিল দাবি জানাতে, তারা হয়ে পড়ে আঘাতে তার শরীর রক্তে ভেসে যায়। পেট্রোল পাম্পের পাশেই সে লুটিয়ে পড়ে। তার শরীরের প্রতিটি অস্থিতে জমে ওঠে ব্যথা, চোখে ঝাপসা হয়ে আসে আলো। তাকে সেখান থেকে ছাত্র জনতা দ্রুত উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়। তার শরীরে ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। চামড়ায় কাটা দাগ, হাড়ে ফাটল এবং ব্যথায় কাঁপতে থাকা শরীর, সব কিছু নিয়ে সে মৃত্যুর সাথে লড়তে থাকে। অনেকদিন হাসপাতালে থাকার পর অবশেষে সে একটু একটু করে সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু শরীরের দাগ আর মনের যন্ত্রণা থেকে যায় আজীবনের জন্য। আজ সে বেঁচে আছে, কিন্তু তার শরীরে প্রতিটি ব্যথা মনে করিয়ে দেয় তাকে শুধু তার মত প্রকাশের জন্যই আঘাত করা হয়েছিল। আব্দুল হাকিম এখনো নিজের কষ্ট গোপন করে হাসে, কারণ সে জানে তার এই রক্ত কোনোদিন বৃথা যাবে না। সে একজন আহত, কিন্তু জীবন্ত ইতিহাস হয়ে থাকবে। আব্দুল হাকিমের গল্প কোনো কাল্পনিক উপাখ্যান নয় এটি বাংলাদেশের বাস্তবতা, যেখানে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ করা হয় লাঠি দিয়ে, স্বপ্নকে থামিয়ে দেওয়া হয় রড দিয়ে। তবু হাকিমের মতো তরুণরা বারবার প্রমাণ করে দেয় প্রতিটি আঘাত একদিন হয়ে উঠবে পরিবর্তনের বীজ।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : আব্দুল হাকিম
জন্ম তারিখ : ২৫ জানুয়ারি ১৯৯৯
জন্মস্থান : নীলফামারী
পেশা : শিক্ষার্থী
প্রতিষ্ঠান : নীলফামারী সরকারি কলেজ (মাস্টার্স)
নিজ জেলা : নীলফামারী
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : ধাইজানপাড়া, ইউনিয়ন : কাঁঠালী, থানা : জলঢাকা, জেলা : নীলফামারী
পিতার নাম : একরামুল হক
মায়ের নাম : বিলকিছ বেগম
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৫০
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. বিল্পব, বয়স: ৩৫, পেশা: বেকার, সম্পর্ক: ভাই
২. সবুজ, বয়স: ৩০, পেশা: বেকার, সম্পর্ক: ভাই
৩. বাবু, বয়স: ২৮, পেশা: প্রবাসী, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : জলঢাকা, পেট্রোল পাম্পের সামনে
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২:৩০ টা
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍