হোম / আহতদের তালিকা / মো: নুর ইসলাম
মো: নুর ইসলাম

মো: নুর ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : দর্জি

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

আইডি: রংপুর বিভাগ ১৮৩সেলাই মেশিনের মানুষটি
পঞ্চগড় জেলার সদর থানার রামেরডাঙা পৌরসভার ছোট্ট গ্রাম রামেরডাঙায় জন্ম নেয় এক নিরীহ মানুষ মো: নুর ইসলাম। জন্ম তারিখ ২২ জুন ১৯৭৮। বাবা আব্দুল লতিফ ও মা মোছা মরজিনা বেগম দু’জনেই আজ মৃত। ছোটবেলা থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে মাথা নিচু না করে বাঁচতে হয়।

নুর ইসলাম পেশায় একজন দর্জি। নিজের হাতে তৈরি পোশাকে তিনি গড়ে তুলতেন অন্যের আত্মবিশ্বাস। এই পেশাই ছিল তার গর্ব। একটি ছোট দোকানে বসে প্রতিদিন কাপড় কাটতেন, সেলাই করতেন, ভাঁজ করতেন একটি নিখুঁত শৈল্পিক জীবনের মতো। তার আয়ের একমাত্র উৎস সেই সেলাই মেশিন, যার আওয়াজে চলত তার পরিবার। মাসে যা আয় হতো, তা প্রায় ১০ হাজার টাকা। পরিবারে আছেন পাঁচজন সদস্য। বড় মেয়ে মোছা: নুর নেহারকে অনেক কষ্টে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন এখন ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করেন। তারা একত্রে মিলে এই সংসার চালাতেন, ভাগ করে নিতেন হাসি-কান্না-চিন্তা। নুর ইসলাম ছিলেন সহজ-সরল মানুষ। কারো সাথে উচ্চৈ:স্বরে কথা বলতেন না, কারো ক্ষতি করতেন না বরং সুযোগ পেলেই করতেন উপকার। সমাজে তাকে সবাই চিনত একজন ভদ্র, নিরীহ, পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে। জীবনটা ছিল নিঃশব্দে বয়ে চলা নদীর মতো, যেখানে ছিল আত্মতুষ্টি, সন্তানের জন্য আশা, আর শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু কে জানতো সেই শান্ত নদীর বুকেও একদিন বয়ে যাবে রক্তের ঢেউ?

গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল ঢেউ
২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। সরকারি চাকরিতে ৫৬% কোটা থাকায় মেধাবী তরুণদের স্বপ্ন ধ্বংস হচ্ছিল বারবার। সরকার সে সময় কোটা বাতিল ঘোষণা দিলেও কোনো স্থায়ী সমাধান দেয়নি। ফলাফল প্রশ্ন ফাঁস, অবৈধ নিয়োগ, ক্ষমতার বাণিজ্য। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আবারও গর্জে ওঠে ছাত্র সমাজ। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। এবার আন্দোলন ছিল আরও সুসংগঠিত, আরও শক্তিশালী। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, এমনকি পাড়াগাঁয়ের শিক্ষার্থীরাও জানিয়ে দেয় তাদের প্রতিবাদ। হাজার হাজার চাকরি প্রত্যাশী ছাত্র-ছাত্রী একত্রিত হয়ে বলে, “আমরা মেধার অধিকার চাই।” কিন্তু সরকার তা শুনলো না। বরং ভয়ংকর দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শাহবাগ হয়ে ওঠে রণক্ষেত্র। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী সন্ত্রাসীরা দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রদের ওপর। নারীদেরও ছাড় দেয়নি। রক্তে ভিজে যায় ঢাকার রাজপথ।

এই আন্দোলন ধীরে ধীরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। স্কুল ছাত্র থেকে গার্মেন্টস কর্মী, কৃষক থেকে দিনমজুর সবাই এক দফা দাবি নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়। সবাই বলে “স্বৈরাচার সরকারের পতন চাই।”
এই উত্তাল সময়ে একজন নিরীহ দর্জিও নীরবে প্রতিবাদ করতে শুরু করেন, তিনি মো: নুর ইসলাম।

ঘটনার বিবরণ
নুর ইসলাম প্রতিদিনের মতো পঞ্চগড় শহরে কাজে যেতেন। মহিলাদের থ্রিপিস, ছেলেদের পাঞ্জাবি, স্কুল ড্রেস তার দোকানে সবকিছুই পাওয়া যেত। কিন্তু চলমান আন্দোলন তার মনে প্রশ্ন জাগায়। সে নিজে ছাত্র না হলেও, দেশের সন্তানদের প্রতি তার ভালোবাসা অগাধ। প্রথমদিকে নুর ইসলাম দূর থেকে আন্দোলন পর্যবেক্ষণ করতেন। একদিন নিজের পকেট থেকে ২০০ টাকা খরচ করে আন্দোলনরত ছাত্রদের জন্য পানি কিনে দেন। ছাত্ররা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এরপর অনেক শ্রমজীবী মানুষ তাকে টাকা দিয়ে বলেন, আপনি ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান, আমরা আছি। নুর ইসলাম সে সব দিয়ে শুকনো খাবার, পানি কিনে ছাত্রদের বিতরণ করতে থাকেন। কিছুদিন পর ছাত্রলীগ-যুবলীগের চোখে পড়ে যায় এই ‘সহানুভূতির অপরাধ’। তারা তাকে দেখে নেয়। তারপর বাড়িতে যেয়ে হুমকি দেয়া হয়। তবুও নুর ইসলাম দমে যাননি। তার মনে ছিল, এই ছেলে-মেয়েগুলো তো আমাদেরই সন্তান, দেশের ভবিষ্যৎ। ৫ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১টা মহিলা কলেজ রোড, পঞ্চগড়। সেদিন ‘এক দফা দাবি, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ স্লোগানে ছাত্ররা বিক্ষোভ করছিল। নুর ইসলামও পাশে ছিলেন। কিছু ছাত্রকে আনতে তিনি একটু দূরে যান। পথে ওঁত পেতে থাকা যুবলীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাত, মাথা, পিঠ সব জায়গায় তারা দেশি-বিদেশি অস্ত্র, হকস্টিক, রড দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। মাথা ফেটে রক্ত বের হয়। শরীর রক্তে ভেসে যায়। তাকে মরার মতো করে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। পরে আন্দোলনকারী ছাত্ররা ছুটে আসে, তাকে তুলে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। পঞ্চগড় শহরে তখনকার প্রতিটি মানুষ জানতো নুর ইসলাম কোনো রাজনীতি করেন না, তবুও শুধু মানবতা দেখানোর অপরাধে রক্তাক্ত হয়েছেন।

চিকিৎসা
তাকে পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা নুর ইসলামের মাথায় পাঁচটি সেলাই দেন। রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়, তবে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। কয়েকদিন হাসপাতালে থাকার পর তিনি বাড়ি ফেরেন। বাড়ি থেকেই তিনি চিকিৎসা নেন। ডাক্তার দেখান আর ঔষধ খান নিয়মিত। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন। তবে তিনি জানান, তার স্মৃতিশক্তি এখন আগের মতো নেই। কথাবার্তা মাঝে মাঝে গুলিয়ে ফেলেন। আগের মতো আর মনে রাখতে পারেন না। এখন নুর ইসামের কাছে একটাই প্রশ্ন আমি কী দোষ করেছিলাম?
আমি তো কারো ক্ষতি করিনি, কখনো রাজনীতি করিনি। শুধু মানবতার পাশে দাঁড়ানোয় আজ তার শরীর নির্যাতিত, আহত, স্মৃতি হারানো এক নীরব কণ্ঠস্বর। নুর ইসলাম আজও বিশ্বাস করেন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো অপরাধ নয়। তবে এই রাষ্ট্র, এই সরকার, এই সন্ত্রাসের ব্যবস্থায় সেটা অপরাধে পরিণত হয়েছে।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
এককালীন সহায়তা করা।

মোঃ ইসা : জুলাই আন্দোলনের এক শ্রমিক যোদ্ধার নাম
মাটির গন্ধ মাখা এক নিভৃত ভোরে (জন্ম সাল পাওয়া যাইনি) ঠাকুরগাঁও জেলার গরেয়া ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম মিলনপুরে জন্ম নেন মোঃ ইসা। গ্রামবাংলার পাখির ডাক আর ধানক্ষেতের সবুজ নিস্তব্ধতার মাঝে গড়ে ওঠা এই মানুষটির শৈশব জুড়ে ছিল কষ্ট, কিন্তু সে কষ্টের ভেতরেই ছিল মাটির কাছাকাছি থাকার এক অনন্য শক্তি। তাঁর পিতা আব্দুর রহমান ছিলেন একজন কৃষক; নীরব, নিঃশব্দ অথচ দৃঢ়চেতা এক সংগ্রামী মানুষ, যিনি প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই মাটি কাটতে নামতেন আর সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীরে ফিরতেন ঘরে।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: নুর ইসলাম
জন্ম তারিখ : ২২ জুন ১৯৭৮
জন্মস্থান : পঞ্চগড়
পেশা : দর্জি
নিজ জেলা : পঞ্চগড়
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : রামেরডাংগা, ইউনিয়ন : রামেরডাংগা পৌরসভা, থানা : পঞ্চগড় সদর, জেলা : পঞ্চগড়
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : আব্দুল লতিফ, মৃত
মায়ের নাম : মোছা: মরজিনা বেগম, মৃত
মাসিক আয় : ১০ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : দর্জি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
সন্তানদের বিবরণ
১. মোছা: নুর নেহার, বয়স: ২৪, বিবাহিত, সম্পর্ক: মেয়ে
২. আব্দুল্লাহ আল মামুন, বয়স: ১৯, পেশা: ইলেকট্রিশিয়ান, সম্পর্ক: ছেলে
ঘটনার স্থান : মহিলা কলেজ রোড, পঞ্চগড়
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, সকাল ১১ টা
আক্রমণকারী : যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍