সোলায়মান ইসলাম
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শিক্ষার্থী (ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষ)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
পঞ্চগড় জেলার বোদা থানার সাকোয়া ইউনিয়নের সবুজ গ্রাম আমিন নগরে জন্ম সোলায়মান ইসলামের। তার জন্ম ২০০৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। ছোটবেলা থেকেই সে প্রকৃতির একেবারে কোলে বেড়ে উঠেছে, ধানক্ষেত, তালগাছ, খাল-বিল আর আকাশছোঁয়া সবুজে মোড়ানো গ্রামে তার শৈশবের দিনগুলো ছিলো স্নিগ্ধ, নির্ভার।
সোলায়মানের বাবা কামাল হোসেন একজন কৃষক। বয়স পঞ্চান্নছুঁই ছুঁই। মা কল্পনা বেগম গৃহিণী, মমতাময়ী ও ধর্মপরায়ণ। পরিবারে পাঁচ সদস্য। বড় বোন দুলালীর বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ভাই সামিউল অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে, সেও একই মাদ্রাসার ছাত্র। সোলায়মান নিজেও একজন ছাত্র, পড়ে সাকোয়া জমিলাতুন্নেছা ফাজিল মাদ্রাসায়। দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সে পড়াশোনায় খুবই মনোযোগী এবং মেধাবী একজন তরুণ। গ্রামে সবাই তাকে “নম্র-ভদ্র” ছেলের মতোই জানে।
তার নামাজে অনুপস্থিতি ছিলো না বললেই চলে। মাগরিব কিংবা এশার সময়, মসজিদের বাঁশের মিনারে যখন আজান ওঠে, তখন তাকে দেখা যেতো পাঞ্জাবি আর টুপি পরে ছুটে যেতে। তার মুখে ছিল একরাশ সম্ভ্রম আর চোখে ছিলো দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছা।
শহরে স্বপ্ন খুঁজতে যাত্রা
কিন্তু শুধু পড়াশোনা কিংবা ভালো আচরণ জীবনের সবকিছু নয়। বাস্তবতা ছিল কঠিন। বাবা কামাল হোসেন সারাদিন মাঠে কাজ করতেন, কিন্তু খরচের তুলনায় আয় কিছুই না। পাঁচজনের সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। তাই পরিবারের বোঝা কিছুটা হালকা করতে, জীবনের কোনো একটা স্থির ঠিকানা খুঁজতে ৯ জুলাই ২০২৪ সালে সোলায়মান পাড়ি জমান গাজীপুরের আশুলিয়ায়।
সেখানে তার পুরোনো বন্ধু সুমন থাকতো। সুমন তাকে নিজের বাসায় থাকতে দেয়। সকাল হলেই সোলায়মান বেরিয়ে পড়তেন কাজের খোঁজে। গাজীপুরের গলি থেকে ফ্যাক্টরি এলাকা পর্যন্ত বহুবার ঘুরেছেন, কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। তার মুখে তখনও ছিলো হাসি, চোখে ছিলো স্বপ্ন, ভেতরে ছিলো দেশের প্রতি ভালোবাসা।
এমন সময়েই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঝড়। ২০১৮ সালের আন্দোলনের রেশ যেন আবার নতুন করে উথলে উঠলো। সোলায়মান এই আন্দোলনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ছিলেন আগেই। এবার নিজেই প্রতিটি র্যালিতে অংশ নিতে লাগলেন। সুমনও তার সঙ্গে থাকতো। তারা দু’জনে মিলে আশুলিয়া থানার সামনেই ছাত্রদের প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন, স্লোগান দিতেন, দাবির পক্ষে সোচ্চর হতেন।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট- ২০১৮ থেকে ২০২৪
২০১৮ সালে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ প্রথমবার কোটা সংস্কারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়। সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান ৫৬ শতাংশ কোটা নিয়ে বহুদিন ধরে প্রশ্ন উঠছিল। মেধাবীরা দাবি করছিলেন, মেধার মূল্যায়ন হোক, কোটার অবসান হোক। ঢাকার শাহবাগ, টিএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থানা শহর সবখানে ছাত্ররা দাঁড়িয়েছিল মাথা উঁচু করে। সরকার একবার কৌশলে আন্দোলন দমন করেছিল, বলেছিলো সংস্কার হবে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো আবারো কোটাব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার গোপন উদ্যোগ শুরু হয়। ২০২৪ সালে যখন কোটার পূর্ণাঙ্গ রূপ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখনই আবার রাস্তায় নামে শিক্ষার্থী, চাকরি প্রত্যাশীরা। এবার আন্দোলন ছিল আরও বৃহৎ আরও বিস্ফোরক। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, এমনকি মফস্বলের তরুণরাও সোচ্চার হয়।
আন্দোলনের শক্তি ছিলো একটাই “কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার চাই!” সোলায়মান ইসলাম, একজন ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হয়েও এই আন্দোলনের চেতনা নিজের ভেতরে ধারণ করেছিল।
পাঁচ আগস্টের বিভীষিকা
৫ আগস্ট ২০২৪, বিকেল ৫টা। পুরো ঢাকা তখন উত্তাল। আন্দোলনের শেষ প্রান্তে এসে খবর আসে, স্বৈরাচারী সরকার প্রধান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। জনতার উচ্ছ্বাস ছুঁয়ে যায় আকাশ। ছেলেরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে ছুটে চলে গণভবনের দিকে।
সোলায়মান ও তার বন্ধু সুমন একসাথে বের হন। গন্তব্য গণভবন। কিন্ত আশুলিয়া থানার সামনে যেতেই স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনীর বাধার সম্মুখীন হন। ছাত্র-জনতা যেতে চাইলে পুলিশ বেরিকেড দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। হঠাৎই গর্জে ওঠে পুলিশের গুলি। স্বৈরাচারীর পতনের পরও পুলিশ ছাত্রদের উপর গুলি চালাতে থাকে, যেন তারা আরেকটা হুকুম পালন করছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে। থানার সকল পুলিশ একযোগে ছাত্র-জনতা কে লক্ষ্য করে গুলি করতে করতে সামনে এগোতে থাকে। গলি লেগে ছাত্র-জনতা একের পর এক রাস্তায় আহত হয়ে পড়ে থাকে । অনেকের দেহ নিস্তেজ হয়ে যায়। অনেকে রক্ত মাখা অবস্থায় দিগ¦দিক দৌড়াতে থাকে। এ যেন দেশের মধ্যেই যুদ্ধের দামামা। উপর্যুপরি একটি গুলি খুব কাছ থেকে এসে লাগে সুমনের গায়ে । সে সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে পড়ে যায়। মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। তার দেহ নিস্তেজ হয়ে যায়। সোলায়মান ছুটে যায় তাকে ধরতে, কিন্তু তখনই তার গায়েও লাগে ছররা গুলি। ছবির মতো মুহূর্তে সে লুটিয়ে পড়ে সুমনের রক্তে। এমন মুমুর্ষু অবস্থায় ছাত্র জনতা তাদেরকে উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতে নিয়ে যায়। কিন্ত তার বন্ধু সুমন সেখানেই শহীদ হয়ে যান।
একটি বেদনার দীর্ঘ ছায়া
গাজীপুরের এক প্রাইভেট ক্লিনিকে সুমনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। তার শরীর থেকে চারটি ছররা গুলি বের করা হয়। কিন্তু মানসিক ক্ষত তা থেকে মুক্তি নেই। সেখান থেকে ছুটি নিয়ে চলে যান নিজ গ্রাম আমিন নগর। সেখানে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘ চিকিৎসা চলে। এখন তিনি মোটামুটি সুস্থ। হাঁটতে পারেন, কথা বলতে পারেন, কিন্তু কাজ করতে পারেন না আগের মতো। সবচেয়ে বড় ব্যথা হলো সুমনের মৃত্যু। সোলায়মান আজও রাতের বেলা সুমনের রক্তাক্ত দেহ দেখতে পান চোখ বন্ধ করলেই। ঘুমাতে পারেন না। তার মনে হয়, সেই গুলি তার শরীরে নয়, জীবনের ওপর পড়ে ছিল।
তিনি এখন গ্রামের মসজিদে মাঝে মাঝে দোয়া করেন, কোরআন তেলাওয়াত করেন। বলতেন,
“সুমনের মৃত্যু যেন বৃথা না যায়। আমরা যে আন্দোলন করেছিলাম, তা যেন দেশের তরুণদের অধিকার আদায়ের জন্য পথ তৈরি করে দেয়।”
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : সোলায়মান ইসলাম
জন্ম তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৪
জন্মস্থান : পঞ্চগড়
পেশা : শিক্ষার্থী (ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষ)
প্রতিষ্ঠান : সাকোয়া জমিলাতুন্নেছা ফাজিল মাদ্রাসা
নিজ জেলা : পঞ্চগড়
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : আমিন নগর, ইউনিয়ন : সাকোয়া, থানা : বোদা, জেলা : পঞ্চগড়
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : কামাল হোসেন
মায়ের নাম : কল্পনা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৭
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
আয়ের উৎস : কৃষি থেকে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. দুলালী, বয়স ২৪, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
২. সামিউল, বয়স: ১৭, পেশা: শিক্ষার্থী (সাঁকোয়া ফজিলাতুন্নেসা ফাজিল মাদ্রাসা), শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : আশুলিয়া থানার সামনে, গাজীপুর
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকেল ৫ টা
আক্রমণকারী : পুলিশ আমিন নগরের শান্তশিষ্ট ছেলেটি
সোলায়মানের বাবা কামাল হোসেন একজন কৃষক। বয়স পঞ্চান্নছুঁই ছুঁই। মা কল্পনা বেগম গৃহিণী, মমতাময়ী ও ধর্মপরায়ণ। পরিবারে পাঁচ সদস্য। বড় বোন দুলালীর বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ভাই সামিউল অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে, সেও একই মাদ্রাসার ছাত্র। সোলায়মান নিজেও একজন ছাত্র, পড়ে সাকোয়া জমিলাতুন্নেছা ফাজিল মাদ্রাসায়। দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সে পড়াশোনায় খুবই মনোযোগী এবং মেধাবী একজন তরুণ। গ্রামে সবাই তাকে “নম্র-ভদ্র” ছেলের মতোই জানে।
তার নামাজে অনুপস্থিতি ছিলো না বললেই চলে। মাগরিব কিংবা এশার সময়, মসজিদের বাঁশের মিনারে যখন আজান ওঠে, তখন তাকে দেখা যেতো পাঞ্জাবি আর টুপি পরে ছুটে যেতে। তার মুখে ছিল একরাশ সম্ভ্রম আর চোখে ছিলো দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছা।
শহরে স্বপ্ন খুঁজতে যাত্রা
কিন্তু শুধু পড়াশোনা কিংবা ভালো আচরণ জীবনের সবকিছু নয়। বাস্তবতা ছিল কঠিন। বাবা কামাল হোসেন সারাদিন মাঠে কাজ করতেন, কিন্তু খরচের তুলনায় আয় কিছুই না। পাঁচজনের সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। তাই পরিবারের বোঝা কিছুটা হালকা করতে, জীবনের কোনো একটা স্থির ঠিকানা খুঁজতে ৯ জুলাই ২০২৪ সালে সোলায়মান পাড়ি জমান গাজীপুরের আশুলিয়ায়।
সেখানে তার পুরোনো বন্ধু সুমন থাকতো। সুমন তাকে নিজের বাসায় থাকতে দেয়। সকাল হলেই সোলায়মান বেরিয়ে পড়তেন কাজের খোঁজে। গাজীপুরের গলি থেকে ফ্যাক্টরি এলাকা পর্যন্ত বহুবার ঘুরেছেন, কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। তার মুখে তখনও ছিলো হাসি, চোখে ছিলো স্বপ্ন, ভেতরে ছিলো দেশের প্রতি ভালোবাসা।
এমন সময়েই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঝড়। ২০১৮ সালের আন্দোলনের রেশ যেন আবার নতুন করে উথলে উঠলো। সোলায়মান এই আন্দোলনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ছিলেন আগেই। এবার নিজেই প্রতিটি র্যালিতে অংশ নিতে লাগলেন। সুমনও তার সঙ্গে থাকতো। তারা দু’জনে মিলে আশুলিয়া থানার সামনেই ছাত্রদের প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন, স্লোগান দিতেন, দাবির পক্ষে সোচ্চর হতেন।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট- ২০১৮ থেকে ২০২৪
২০১৮ সালে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ প্রথমবার কোটা সংস্কারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়। সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান ৫৬ শতাংশ কোটা নিয়ে বহুদিন ধরে প্রশ্ন উঠছিল। মেধাবীরা দাবি করছিলেন, মেধার মূল্যায়ন হোক, কোটার অবসান হোক। ঢাকার শাহবাগ, টিএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থানা শহর সবখানে ছাত্ররা দাঁড়িয়েছিল মাথা উঁচু করে। সরকার একবার কৌশলে আন্দোলন দমন করেছিল, বলেছিলো সংস্কার হবে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো আবারো কোটাব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার গোপন উদ্যোগ শুরু হয়। ২০২৪ সালে যখন কোটার পূর্ণাঙ্গ রূপ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখনই আবার রাস্তায় নামে শিক্ষার্থী, চাকরি প্রত্যাশীরা। এবার আন্দোলন ছিল আরও বৃহৎ আরও বিস্ফোরক। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, এমনকি মফস্বলের তরুণরাও সোচ্চার হয়।
আন্দোলনের শক্তি ছিলো একটাই “কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার চাই!” সোলায়মান ইসলাম, একজন ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হয়েও এই আন্দোলনের চেতনা নিজের ভেতরে ধারণ করেছিল।
পাঁচ আগস্টের বিভীষিকা
৫ আগস্ট ২০২৪, বিকেল ৫টা। পুরো ঢাকা তখন উত্তাল। আন্দোলনের শেষ প্রান্তে এসে খবর আসে, স্বৈরাচারী সরকার প্রধান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। জনতার উচ্ছ্বাস ছুঁয়ে যায় আকাশ। ছেলেরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে ছুটে চলে গণভবনের দিকে।
সোলায়মান ও তার বন্ধু সুমন একসাথে বের হন। গন্তব্য গণভবন। কিন্ত আশুলিয়া থানার সামনে যেতেই স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনীর বাধার সম্মুখীন হন। ছাত্র-জনতা যেতে চাইলে পুলিশ বেরিকেড দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। হঠাৎই গর্জে ওঠে পুলিশের গুলি। স্বৈরাচারীর পতনের পরও পুলিশ ছাত্রদের উপর গুলি চালাতে থাকে, যেন তারা আরেকটা হুকুম পালন করছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে। থানার সকল পুলিশ একযোগে ছাত্র-জনতা কে লক্ষ্য করে গুলি করতে করতে সামনে এগোতে থাকে। গলি লেগে ছাত্র-জনতা একের পর এক রাস্তায় আহত হয়ে পড়ে থাকে । অনেকের দেহ নিস্তেজ হয়ে যায়। অনেকে রক্ত মাখা অবস্থায় দিগ¦দিক দৌড়াতে থাকে। এ যেন দেশের মধ্যেই যুদ্ধের দামামা। উপর্যুপরি একটি গুলি খুব কাছ থেকে এসে লাগে সুমনের গায়ে । সে সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে পড়ে যায়। মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। তার দেহ নিস্তেজ হয়ে যায়। সোলায়মান ছুটে যায় তাকে ধরতে, কিন্তু তখনই তার গায়েও লাগে ছররা গুলি। ছবির মতো মুহূর্তে সে লুটিয়ে পড়ে সুমনের রক্তে। এমন মুমুর্ষু অবস্থায় ছাত্র জনতা তাদেরকে উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতে নিয়ে যায়। কিন্ত তার বন্ধু সুমন সেখানেই শহীদ হয়ে যান।
একটি বেদনার দীর্ঘ ছায়া
গাজীপুরের এক প্রাইভেট ক্লিনিকে সুমনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। তার শরীর থেকে চারটি ছররা গুলি বের করা হয়। কিন্তু মানসিক ক্ষত তা থেকে মুক্তি নেই। সেখান থেকে ছুটি নিয়ে চলে যান নিজ গ্রাম আমিন নগর। সেখানে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘ চিকিৎসা চলে। এখন তিনি মোটামুটি সুস্থ। হাঁটতে পারেন, কথা বলতে পারেন, কিন্তু কাজ করতে পারেন না আগের মতো। সবচেয়ে বড় ব্যথা হলো সুমনের মৃত্যু। সোলায়মান আজও রাতের বেলা সুমনের রক্তাক্ত দেহ দেখতে পান চোখ বন্ধ করলেই। ঘুমাতে পারেন না। তার মনে হয়, সেই গুলি তার শরীরে নয়, জীবনের ওপর পড়ে ছিল।
তিনি এখন গ্রামের মসজিদে মাঝে মাঝে দোয়া করেন, কোরআন তেলাওয়াত করেন। বলতেন,
“সুমনের মৃত্যু যেন বৃথা না যায়। আমরা যে আন্দোলন করেছিলাম, তা যেন দেশের তরুণদের অধিকার আদায়ের জন্য পথ তৈরি করে দেয়।”
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : সোলায়মান ইসলাম
জন্ম তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৪
জন্মস্থান : পঞ্চগড়
পেশা : শিক্ষার্থী (ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষ)
প্রতিষ্ঠান : সাকোয়া জমিলাতুন্নেছা ফাজিল মাদ্রাসা
নিজ জেলা : পঞ্চগড়
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : আমিন নগর, ইউনিয়ন : সাকোয়া, থানা : বোদা, জেলা : পঞ্চগড়
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : কামাল হোসেন
মায়ের নাম : কল্পনা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৭
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
আয়ের উৎস : কৃষি থেকে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. দুলালী, বয়স ২৪, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
২. সামিউল, বয়স: ১৭, পেশা: শিক্ষার্থী (সাঁকোয়া ফজিলাতুন্নেসা ফাজিল মাদ্রাসা), শ্রেণি: ৮ম, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : আশুলিয়া থানার সামনে, গাজীপুর
আহত হওয়ার সময় : ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকেল ৫ টা
আক্রমণকারী : পুলিশ আমিন নগরের শান্তশিষ্ট ছেলেটি
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍