হোম / আহতদের তালিকা / মেহেদী হাসান
মেহেদী হাসান

মেহেদী হাসান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শ্রমিক

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

সবুজ গ্রামের ছেলে
পঞ্চগড় জেলার বোদা থানার বড় শশী ইউনিয়নের বকদুল ঝুলা (মহিষ বাথান) গ্রামে জন্ম হয়েছিল মেহেদী হাসানের। এই গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব চারপাশে সবুজ ধানের ক্ষেত, পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর সাদামাটা এক গ্রামীণ জীবন। এই শান্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠে মেহেদী। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র চারজন। বাবা নুর আলম, মা নাজমুন নাহার, বড় বোন অলেমা আর ছোট ভাই আলী হাসান। বাবা দিনমজুর, মা গৃহিণী। বাবার বয়স চল্লিশ, মায়ের পঁয়ত্রিশ। সংসার চলত দিন আনে দিন খায় ধারায়।মেহেদী খুব ছোটবেলায় পড়ালেখায় বেশ আগ্রহী ছিল। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে পড়া শুরু করে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া চালিয়ে যায়। কিন্তু সংসারের অভাব, বাবার ভাঙা পিঠ, আর বাড়ির চারপাশে দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর ছায়া ওকে থামিয়ে দেয়। লেখার টেবিল ছেড়ে, খেলাধুলার মাঠ পেছনে ফেলে, ১৪ বছর বয়সেই ওর জীবন গার্মেন্টস নামের এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে সে পাড়ি জমায় ঢাকায় দেশের রাজধানী, অথচ অনেকটা তার কাছে অজানা অন্ধকার। কাজ নেয় যাত্রাবাড়ীর ইমরান গার্মেন্টসে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাড় ভাঙা কাজ করতে হয়। গভীর নিঃশ্বাসের ভেতরেই ওর কৈশোর হারিয়ে যেতে থাকে। পিঠের ভাঁজে সংসারের দায়, চোখে ঘুমের বদলে দায়িত্ব। মেহেদী জানত, তার আয়েই পরিবারটা বেঁচে আছে। বাবার পক্ষে আর সম্ভব নয়।


স্বপ্নের ভিতরে আন্দোলনের আগুন
২০২৪ সালের জুন-জুলাই। ঢাকার রাজপথে ছাত্রদের ঢল। নতুন প্রজন্ম, যারা বিচার চায়, স্বচ্ছতা চায় এবং চায় মেধার মূল্যায়ন। কোটা সংস্কার আন্দোলন আবার জ্বলে ওঠে। ২০১৮ সালের মতো আবারো ছাত্র-জনতা মাঠে নামে।
যাত্রাবাড়ী ছিল সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিনই মিছিল, স্লোগান আর পুলিশের টিয়ারশেল। মেহেদী, যার বয়স ১৪, সে শুধু গার্মেন্টসে কাজই করছিল না বরং একটা চিন্তাশীল কিশোর হয়ে উঠছিল। মেধাবীদের সাথে তার নিজের স্বপ্নও জড়িত ছিল। সে চেয়েছিল তার ছোট ভাই যেন একদিন কলেজে যেতে পারে, যেন চিবুকে ইস্পাত নয়, হাতে কলম থাকে।
প্রথম দিকে সে দূর থেকে মিছিল দেখত, ভয়ে মেশেনি। কিন্তু বারবার যাত্রাবাড়ীর মোড়ে ছাত্র-জনতার রক্ত আর পুলিশের লাঠিচার্জ দেখে তার ভেতরে প্রশ্ন জেগে ওঠে, “আমি কি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারি না?” এমন প্রশ্ন তাকে টেনে নেয় ছাত্রদের মিছিলে। গার্মেন্টসের মধ্যাহ্ন বিরতিতে, ছুটির পর, একেকদিন সে কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থাকত আন্দোলনকারীদের পাশে। সে বুঝতে পেরেছিল, এই সংগ্রাম শুধু চাকরির কোটা নয়, এটা তার নিজের স্বপ্নের জন্যও।
১৯ জুলাইয়ের নির্মম বিকেল
কয়েকদিন আগে, ১৬ জুলাই, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পুলিশ প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। সে ঘটনার রক্ত তখনও শুকায়নি। মেহেদী সেদিন গার্মেন্টস থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে ফিরছিল। যাত্রাবাড়ী থানার সামনেই


মিছিল হচ্ছিল, সে এগিয়ে যায়, দু’পাশে ছাত্র-জনতা স্লোগান দিচ্ছে। এক সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ হঠাৎ করে চারপাশ থেকে টিয়ারশেল আর গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। মেহেদী সামনে থাকায় পালাতে পারেনি। পুলিশ তাকে ধরে ফেলে। তারপর শুরু হয় অমানবিক পিটুনি। বন্দুকের নল দিয়ে পেটানো হয় তাকে। মাথা, চোখের পাশে, মুখে একের পর এক আঘাত। বুটের লাথি, বন্দুকের চাপে চিবুকের হাড় ভেঙে যায়। রক্তে ভেসে যায় তার মুখ ও শরীর।
এক কিশোর শ্রমিক, যার শরীরে তখনও কৈশোরের কোমলতা বিদ্যমান, তাকে নির্মমভাবে মারধর করে। চোখের পাশেও রক্ত জমে যায়। কোনো কথা না শুনে তাকে গাড়িতে তোলে, সেখানে আরও মারধর চলে। সেই কিশোর চিৎকার করলেও কেউ শোনেনি। সে ভেবেছিল, বাঁচবে না আর।
হাসপাতালের নামে হাহাকার
তাকে ফেলে রেখে চলে যায় রক্তাক্ত অবস্থায়। ছাত্র-জনতা ছুটে আসে। রক্তাক্ত মেহেদীকে উদ্ধার করে নিকটবর্তী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখান থেকে দ্রুতই ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হয়। ঢাকা মেডিকেলে ছিল তখন এক বিভীষিকাময় দৃশ্য! আহত ছাত্রদের ঢল, আতঙ্কিত চিকিৎসক, হাসপাতাল চত্বরে দাপিয়ে বেড়ানো সন্ত্রাসী যুবলীগের ক্যাডার। মেহেদী হাসানও সেই ভয়ে চিকিৎসা পায় না। সে সারাদিন ওভাবে পড়ে থাকে। মুখ থেতলে গেছে, কথা বলতে পারে না, খেতে পারে না। তীব্র ব্যথায় তার সমস্ত শরীর কাঁপছিল। চিকিৎসা না পেয়ে অসহায় অবস্থায় বাড়ি চলে যায়। কিন্ত অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরে ছাত্রদের চেষ্টায় অনেক কষ্টে তাকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ৩০ জুলাই। তার মুখের হাড় ভাঙা, চোখের নিচে আঘাত, চিবুকের হাড় চূর্ণ। চিকিৎসকরা অপারেশন করেন। এখনো তার মুখে ইস্পাতের পাত বসানো। চিবুকের ওপর সেই পাত আজও তাকে ব্যথা দেয়। এখনো তিনি ভাত খেতে পারেন না। এখনো চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন---।


একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি

নাম : মেহেদী হাসান
জন্মস্থান : পঞ্চগড়
পেশা : শ্রমিক
প্রতিষ্ঠান : ইমরান গার্মেন্টস, যাত্রাবাড়ী
নিজ জেলা : পঞ্চগড়
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: বকদুলঝুলা, (মহিষবাথান), ইউনিয়ন: বড় শশী, থানা: বোদা, জেলা: পঞ্চগড়
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : নূর আলম
মায়ের নাম : নাজমুন নাহার
পিতার পেশা ও বয়স : দিনমজুর, ৪০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৩৫
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. অলেমা, বয়স : ২৩, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
২. আলী হাসান, বয়স: ১৮, পেশা: শ্রমিক, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : যাত্রাবাড়ী থানার সামনে
আহত হওয়ার সময় : ১৯ জুলাই ২০২৪, বিকেল ৫টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍