হোম / আহতদের তালিকা / মো: নিয়াজি রহমান
মো: নিয়াজি রহমান

মো: নিয়াজি রহমান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী (দ্বাদশ শ্রেণি)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

মাটির বুক থেকে উঠে আসা ছেলেটি
ঠাকুরগাঁও জেলার এক নিভৃত গ্রাম বান্দিগড়। সবুজ ধানের মাঠে ঘেরা, পাখির কলতানে ভরা, যেন প্রকৃতির এক আপন নিবাস। এখানেই ২০০৬ সালের ১ নভেম্বর এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেয় মো: নিয়াজি রহমান। তার পিতার নাম মো: সামছুল আলম, বয়স ৫৫ বছর, পেশায় একজন কৃষক।


মায়ের নাম মোছা: গোলাপী আক্তার, বয়স ৪৮ বছর, যিনি একজন গৃহিণী। ছোট একটি পরিবারের মধ্যে নিয়াজির শৈশব গড়িয়ে যায়, তাদের সংসার ছিল সাদামাটা, কিন্তু ভালোবাসায় ভরা। সকালের কুয়াশা ভেদ করে মাঠে কাজ করতে যেতেন সামছুল আলম। ছেলেরা তখনো ঘুমে বিভোর, কিন্তু মা গোলাপী আক্তার সবার জন্য খাবার তৈরি করে রাখতেন। গরুর ঘন্টাধ্বনি, কুয়াশা ঢাকা বাঁশঝাড় আর বৃষ্টিতে কাদামাটি মাখা পথ ছিল নিয়াজির চেনা জগত।
ছোটবেলা থেকেই নিয়াজি বাবার পেছন পেছন হাঁটত ধানক্ষেতে, দেখত কীভাবে বাবার হাতের কোদাল মাটি চষে ফসল ফলায়। এই দৃশ্য তার মনে একধরনের শ্রদ্ধা আর অনুপ্রেরণা জাগাত। নিয়াজির পরিবারে ছিল আরও একজন তার বড় ভাই গোলাম আযম। বয়সে কিছুটা বড়, কিন্তু সম্পর্কের দিক থেকে ছিলেন তার অভিভাবকসুলভ বন্ধু। গোলাম আযম তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পড়াশোনা ছিল তাদের দুই ভাইয়ের একমাত্র স্বপ্ন ও মুক্তির পথ। বাবার কষ্টের ঘাম আর মায়ের প্রতিদিনের ত্যাগ তাদের মনে প্রোথিত করেছিল একধরনের দায়বদ্ধতা এই দারিদ্র্যকে তারা মেনে নেবে না। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয় নিয়াজির আনুষ্ঠানিক শিক্ষা। গরমে জ্বলতে থাকা ক্লাসরুম, নুন-ভাজা মুড়ির টিফিন, আর খেলার মাঠের ধুলো সব মিলিয়ে ছিল তার কৈশোরের চেনা দৃশ্য। সেই বিদ্যালয়েই তার আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয় সে বুঝে ফেলে, যত অভাব-অনটন থাকুক, শিক্ষা তার পথ হবে। সেখান থেকে মাধ্যমিকে ওঠার পর তার পথ আরও প্রশস্ত হয়।
বীরগঞ্জ কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর, সে ও তার ভাই শহরে চলে আসে। দিনাজপুর শহরেই থাকতেন। সেখানে শুরু হয় শহরের বাস্তবতা আর গ্রাম থেকে উঠে আসা এক মেধাবী ছেলের অদম্য সংগ্রাম।
আগুন জ্বলা দিনগুলি জুলাই-আগস্ট ২০২৪ এর আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়। বাংলাদেশের জনপদ জুড়ে যেন একটা চাপা উত্তেজনা জমা হচ্ছিল ধীরে ধীরে একটি অসন্তোষ, একটি জমাটবাঁধা ক্ষোভ। এ ক্ষোভ জন্ম নিয়েছিল বছরের পর বছর ধরে কোটা সংস্কারের নামে ছাত্রসমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের টানাপোড়েন থেকে। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর সরকার কিছুটা সাড়া দিয়েছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতি ভেসে যায়। নতুন করে বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের জুনের শেষভাগ থেকে। সরকার তখন চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে কিছু পরিবর্তনের আভাস দেয়। কিন্তু তাতে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রেখে এক শ্রেণির মানুষের পক্ষে অন্যায়ের জায়গা তৈরি হচ্ছে, অথচ মেধাবীদের ঠাঁই হচ্ছে না। প্রান্তিক অঞ্চলের মেধাবী ছাত্ররা যারা দিন রাত কষ্ট করে পড়াশোনা করে, তারা দেখছিল কেবলমাত্র কোটার কারণে তাদের সুযোগ হারিয়ে যাচ্ছে। সেই হতাশা আর ক্ষোভ নিয়েই নতুন করে আন্দোলনের ঢেউ ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা শহরের ছাত্রছাত্রী রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ, গঠনমূলক এবং সর্বোপরি, যৌক্তিক। কিন্তু সরকার প্রথম থেকেই এই আন্দোলনকে কঠোরভাবে দমন করতে চায়। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে লাঠিচার্জ, গ্রেফতার, এমনকি কখনও কখনও কাঁদানে গ্যাস ছোড়া শুরু হয়। আরেকদিকে, ছাত্রলীগ ও সরকার-সমর্থিত সন্ত্রাসীদের দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ, আহত, এবং হেনস্তার ঘটনা বাড়তে থাকে। নিয়াজি রহমান ও তার ভাই গোলাম আযম তখন ঠাকুরগাঁওয়ে থাকলেও মনেপ্রাণে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শহরের ছাত্রদের সঙ্গে মিলে তারাও সংগঠিত হতে শুরু করে। বীরগঞ্জ কলেজে প্রায়ই তারা সহপাঠীদের নিয়ে আলোচনা করত, নতুন করে ছেলেমেয়েদের সচেতন করত। ১৮ জুলাই ২০২৪, এই দিনটি ছিল ঠাকুরগাঁওয়ের জন্য এক বেদনাদায়ক মোড়। কোর্ট চত্বরের চৌরাস্তার মোড়ে হাজারো ছাত্রছাত্রী জড়ো হয় মিছিল করতে। দাবি ছিল একটাই মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, আর বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করতে হবে। নিয়াজি আর গোলাম আযম এই মিছিলের অগ্রভাগে ছিল। সেই দিন পুলিশ নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করে। মেয়েদের গায়ে হাত পড়ে, ছেলেরা রক্তাক্ত হয়, কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায় থানায়। নিয়াজি সামান্য আহত হলেও আন্দোলন থামায়নি। এই ঘটনার কয়েকদিন পর আন্দোলনের ঢেউ আরও বাড়ে।
গুলিবিদ্ধ নিয়াজি
৪ আগস্ট ২০২৪। দিনটা ছিল রোববার। সকাল থেকেই ঠাকুরগাঁও শহরের কোর্ট চত্বর, চৌরাস্তা, বাসস্ট্যান্ড, হাসপাতাল মোড়সহ নানা জায়গায় ছাত্র-জনতার ভিড় জমতে থাকে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নানা শ্রেণিপেশার মানুষ কোটা সংস্কারের দাবিতে মিছিলে অংশ নেয়। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল একটাই স্লোগান, ছাত্র হত্যার বিচার চাই। নিয়াজি ও তার বড় ভাই গোলাম আযম সকালে ঘুম থেকে উঠে হালকা নাস্তা করে তৈরি হয় আন্দোলনে যাওয়ার জন্য। ছোট ভাই তখন দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী, বড় ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু সেই দিন, শুধু বই-খাতা নয়, তারা সাথে করে নিয়েছিল মনের সাহস, চোখে আগুন, আর বুকে ছিল একটি স্বপ্ন এই দেশটাকে একটু বেশি ন্যায়ের, একটু বেশি সম্মানের জায়গা বানানোর।
বেলা একটার দিকে মিছিলটা চৌরাস্তা মোড়ে পৌঁছায়। হঠাৎ বিনা হুঁশিয়ারিতে পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করে। মানুষ চারদিকে ছুটছে, রাস্তায় লুটিয়ে পড়ছে আহতরা, ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। ঠিক তখনই, নিয়াজি মুহূর্তেই সে অনুভব করে এক তীব্র জ্বালা শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। তার পরনের জামা ভিজে যায় রক্তে। তার শরীরে প্রায় ২৫/৩০ টা ছররাগুলি লাগে। ছাত্র-জনতা নিয়াজিকে তুলে নেয়, রিকশা খোঁজে, কেউ হাসপাতালে ফোন করে। কিন্তু পুলিশ তখনও লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে, আহতদের হাসপাতালে যেতে দিচ্ছেনা। অনেক চেষ্টার পর ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নেয়া হয় নিয়াজিকে। সেখানে ডাক্তাররা তার শরীর থেকে গুলি বের করে। সবগুলো বের করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন। তবে এখনো তার শরীরে পাঁচ-ছয়টি গুলি রয়ে গেছে। এখনো মাঝে মধ্যে ব্যাথা করে সেই স্থানে।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: নিয়াজি রহমান
জন্ম তারিখ : ১ নভেম্বর ২০০৬
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : শিক্ষার্থী (দ্বাদশ শ্রেণি)
প্রতিষ্ঠান : বীরগঞ্জ কলেজ, দিনাজপুর
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : ঠাকুরগাঁও
গ্রাম : বান্দিগড়
ইউনিয়ন : বেগুনবাড়ি
থানা : ঠাকুরগাঁও সদর
জেলা : ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: সামছুল আলম
মায়ের নাম : মোছা: গোলাপী আক্তার
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৫
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৮
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. গোলাম আযম, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছু, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : চৌরাস্তা, কোর্ট চত্বর, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ১৮ জুলাই ২০২৪ ও ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍