হোম / আহতদের তালিকা / মো: আবু সাঈদ
মো: আবু সাঈদ

মো: আবু সাঈদ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী (অনার্স ১ম বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

ঠাকুরগাঁও জেলার জামালপুর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামে ২০০০ সালের ১১ জানুয়ারি জন্ম নেয় মো: আবু সাঈদ। সে ছিল মো: জুলফিকার আলী এবং বিলকিস বানুর একমাত্র ছেলে। একটি তিনজনের ছোট্ট, সরল পরিবার। বাবা একজন হোমিও চিকিৎসক, মা একজন গৃহিণী। সামান্য আয়ের সংসার হলেও আদর-ভালোবাসার কোনো ঘাটতি ছিল না। বাবা-মা নিজেদের শত অভাবের মাঝেও ছেলেকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। রামপুর গ্রামটি ছিল প্রকৃতির এক শান্ত কোণে। চারপাশে ধানক্ষেত, আমগাছ, বাঁশঝাড় আর সরু মেঠোপথের ভিতর দিয়ে বয়ে যেত একটি ছোট খাল। সেখানেই বেড়ে উঠেছে আবু সাঈদ। শৈশবেই বাবার চিকিৎসা চেম্বারে বসে সাঈদ দেখত গ্রামের মানুষের কষ্ট, শোনত তাদের রোগ-ব্যথার গল্প। বাবার সঙ্গে রোগী দেখা, ওষুধ বানানো সবকিছুতেই তার একটা টান ছিল।
স্কুলজীবন কেটেছে গ্রামের সরকারি বিদ্যালয়ে। সেখানে সে ছিল শান্ত, মনোযোগী আর দায়িত্ববান এক শিক্ষার্থী। বাবার স্বপ্ন ছিল, ছেলে একদিন বড় হয়ে সমাজের জন্য কিছু করবে। সেই স্বপ্ন নিয়েই সাঈদ ভর্তি হয় দিনাজপুর সরকারি কলেজে, সমাজবিজ্ঞান অনার্সে। প্রতিদিন ভোরে রামপুর থেকে দিনাজপুর শহরে যাতায়াত করত, কখনো বাইসাইকেল, কখনো লোকাল বাসে আকুল ইচ্ছা ছিল মানুষকে জানা, সমাজকে বদলানোর।
আন্দোলনের দিনগুলো একটা ইতিহাসের ধারাবাহিকতা
আবু সাঈদের মত সচেতন শিক্ষার্থীরা কখনো কেবল বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না। ২০১৮ সাল, যখন বাংলাদেশে প্রথমবার কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, তখনকার আন্দোলনের মূল দাবি ছিল, চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে সুযোগ তৈরি হোক। অথচ শিক্ষিত বেকার যুবকদের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছিল কোটা প্রথার নামে বৈষম্যের কারণে। সেই আন্দোলনে ছাত্ররা নির্মমভাবে পিটুনির শিকার হয়েছিল। সাঈদ সেইসব ভিডিও, ছবি দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিল এই রাষ্ট্র কেন নিজের ভবিষ্যতের কণ্ঠরোধ করে? ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নতুন ঢেউ আসে। এবার আরও ব্যাপক, আরও বিস্তৃত। মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে দেশের প্রতিটি শহরে ছড়িয়ে পড়ে ছাত্র-জনতার জাগরণ। ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও, গ্রাম থেকে শহর সবখানে ছাত্রদের কণ্ঠে ছিল একটাই স্লোগান: “মেধার অধিকার নিশ্চিত করো!”
আবু সাঈদ, সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে, বুঝতেন এই লড়াই কেবল চাকরির জন্য নয় এটি ন্যায়ের পক্ষে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক সংগ্রাম।
বর্বরতার অধ্যায় যেখানে রাষ্ট্র দাঁড়ায় জনগণের বিপক্ষে
২০২৪ সালের আগস্ট। আন্দোলন দেশব্যাপী বিস্তৃত হতে থাকে। কিন্তু আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় দমন-পীড়নের ভয়াবহতা। ঢাকায়, রাজশাহীতে, রংপুরে, ঠাকুরগাঁয়েও ছাত্রদের উপর নেমে আসে নিপীড়নের ঝড়। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, প্রশাসনের পুলিশ বাহিনী একত্র হয়ে হামলা চালাতে থাকে সাধারণ আন্দোলনকারীদের উপর। কোথাও গুলি, কোথাও রড, কোথাও রাবার বুলেট, কোথাও চোখ ফাটিয়ে দেওয়া টিয়ার গ্যাস। অনেকেই প্রাণ হারায়, কেউ কেউ হয়ে পড়ে পঙ্গু। রাষ্ট্র যেন ছাত্রদের আর জনগণের বিপক্ষে এক নৃশংস দানবে পরিণত হয়েছিল। এই দৃশ্য যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র কিন্তু প্রতিপক্ষ ছিল নিজেরই রাষ্ট্রযন্ত্র।
আবু সাঈদ এই সমস্ত নির্মমতা প্রত্যক্ষ করছিলো। তার ভেতরে জেগে উঠছিল প্রতিবাদের আগুন। সে জানত, নীরবতা মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ। তাই সে নিয়মিত অংশ নিত ঠাকুরগাঁয়ের আন্দোলনে।
৪ আগস্ট ২০২৪ এক বিকেল বদলে দেয় জীবন
সেদিন ছিল ৪ আগস্ট ২০২৪। বিকাল তিনটা। ঠাকুরগাঁয়ের কোর্ট চত্বরে জড়ো হয়েছিল হাজারো জনতা, চাকরিপ্রত্যাশী, শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ। আবু সাঈদ তাদের মধ্যেই ছিলেন, মাথায় ব্যান্ডে বাঁধা সাদা কাপড়, হাতে প্ল্যাকার্ড, মেধার অধিকার ফিরিয়ে দাও। আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল। সবাই কেবল স্লোগান দিচ্ছিল, কথা বলছিল, দাবি জানাচ্ছিল। হঠাৎ করেই চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে পুলিশ ও আওয়ামী সংগঠনের কর্মীরা। শুরু হয় আগ্রাসী হামলা। পুলিশ ছুড়তে থাকে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট। ধোঁয়ার কুয়াশায় চারদিক অন্ধকার। আর্তনাদে ভরে ওঠে আকাশ।
সাঈদ তখন ছুটছিল, ঠিক তখনই তার পায়ে ছুটে আসে একের পর এক রাবার বুলেট। একটি-দুটি নয় প্রায় ৫০টির মতো ছোররা গুলি ঢুকে যায় তার পায়ে। ব্যথায় ছটফট করতে থাকা ছেলেটির চিৎকার যেন ঠাকুরগাঁওয়ের আকাশকেও কাঁপিয়ে দেয়। সেদিনের সেই ভীতিকর দৃশ্য যারা দেখেছে, তারা আজও ভুলতে পারেনি রক্তমাখা জামা, নিথর হয়ে পড়ে থাকা শরীর, কান্না আর গুলির শব্দ।
হাসপাতালের বিছানায় এক অসমাপ্ত লড়াই
আবু সাঈদকে রক্তাক্ত অবস্থায় ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা তার পা থেকে বের করে ১২টি গুলি। কিন্তু সেখানকার সীমিত চিকিৎসার কারণে পরে তাকে পাঠানো হয় রংপুর মেডিকেল কলেজে। দীর্ঘদিন ধরে চলে চিকিৎসা, পা থেকে একে একে বের করা হয় আরও কয়েকটি গুলি। তবুও শেষরক্ষা হয়নি। অনেক গুলি এত গভীরে ঢুকে গিয়েছিল, যেগুলো আর অপারেশন করেও বের করা সম্ভব হয়নি। একসময় তাকে নেয়া হয় এক বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানেও চেষ্টা চলে। কিন্তু সব মিলিয়ে মাত্র ১৫-২০টি গুলি বের করা সম্ভব হয়।
বাকি গুলিগুলো আজও তার পায়ে রয়ে গেছে প্রতিটি গুলি যেন একেকটি যন্ত্রণা, একেকটি স্মৃতি। ভারী কিছু তুলতে পারে না সে, অনেক দূর হাঁটতেও পারে না। সে এখন একজন আহত যোদ্ধা, যার অস্ত্র ছিল প্রতিবাদ, আর ক্ষত হলো রাষ্ট্রের রক্তাক্ত উত্তর। আবু সাঈদের গল্প কেবল একজন শিক্ষার্থীর গল্প নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের তরুণদের উপর চালানো বর্বরতার নীরব দলিল। রামপুর গ্রামের সেই ছেলেটি আজও বাঁচে এক অসমাপ্ত স্বপ্ন নিয়ে যেখানে ন্যায়ের জন্য রক্ত ঝরানো হয়েছিল, অথচ বিচার আজও অনুপস্থিত।
আবু সাঈদের মতো অসংখ্য তরুণ আজ আহত, পঙ্গু আর অবহেলিত। আমাদের উচিত তাদের কথা মনে রাখা, এবং ইতিহাসে তাদের জন্য জায়গা তৈরি করা। তাদের রক্ত যেন না যায় বৃথা।
কর্মসংস্থানে প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে দেওয়া।


একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আবু সাঈদ
জন্ম তারিখ : ১১ জানুয়ারি ২০০০
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : শিক্ষার্থী (অনার্স ১ম বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান)
প্রতিষ্ঠান : দিনাজপুর সরকারি কলেজ
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম : রামপুর, ইউনিয়ন : জামালপুর, থানা : ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা : ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: জুলফিকার আলী
মায়ের নাম : বিলকিস বানু
পিতার পেশা ও বয়স : চিকিৎসক (হোমিও), ৫০
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
মাসিক আয় : ১৫ হাজার টাকা
আয়ের উৎস : চিকিৎসা থেকে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. জেসমিন নাহার, বয়স : ১৭, পেশা: বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : কোর্ট চত্ত্বর, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৩ টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍