হোম / আহতদের তালিকা / মাহিন খান
মাহিন খান

মাহিন খান

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মাহিন খান এক তরুণ যোদ্ধা, যিনি বইয়ের খাতা ফেলে রাজপথে দাঁড়িয়ে সত্যের পক্ষে নিজের পা ভেঙে ফেলেছিলেন, কিন্তু মনোভাব নয়। ঢাকার রক্তমাখা জুলাইয়ে হেলমেটধারীদের ইটে ক্ষতবিক্ষত হলেও তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন আরও দৃঢ়, আরও দায়বদ্ধ হয়ে। ব্যথার সেলাইয়ের নিচে লুকিয়ে আছে এক প্রজন্মের স্বপ্ন মানুষ হয়ে বাঁচার অধিকার। এখনও খুঁড়িয়ে হাঁটেন, তবুও চোখে আগুন, মনে ভবিষ্যৎ গড়ার অদম্য ইচ্ছে। নাম নয় মাহিন খান আজ এক প্রতীক, ভাঙা পায়ে যিনি দ্বিতীয় স্বাধীনতার পথচিহ্ন এঁকে গেছেন।

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

ভাঙা পায়ে দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন
মাহিন খান
ক্রমিক: ০৩৮
আইডি: ঢাকা সিটি ০৩৮
পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
নাম মাহিন খান। বয়স কম তবু সাহস পর্বতের মতো, চোখে আগুনের ভাষা, হৃদয়ে এক প্রজন্মের দায়। তিনি কোনো সময় পোস্টারে ছিলেন না, মিছিলের মাইক ধরেননি, ব্যানারের পেছনে দাঁড়িয়েও ছিলেন না। কিন্তু তবু ইতিহাস তাঁকে টেনে নিয়েছে। কারণ ২০২৪ সালের জুলাই, এটা শুধু সময় ছিল না, ছিল একটা আগুনে ডাকা মহাকাব্য, যেখানে প্রতিটি তরুণই ছিল একেকটি ছাইমাখা আয়না রাষ্ট্রকে দেখানোর জন্য।
তাঁর বড় ভাই মো: মারুফ খান ছিলেন সেই প্রথম দৃশ্য, যিনি গুলি ও ছুরিকাঘাত সয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বিদ্রোহের রাজপথে। আর মাহিন ছিলেন তাঁর পাশে ভাইয়ের ছায়া নয়, বরং তাঁরই এক নতুন রূপ। যখন রাজপথে নেমেছিল হাজারো বুক, তপ্ত শ্লোগান, রাষ্ট্রীয় গুলি। তখন মাহিন ছিলেন সেই যুবা, যে পড়াশোনার খাতা এক পাশে রেখে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল ন্যায়বিচারের পক্ষে। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি তখন অস্থির তবু তিনি জানতেন, একটি বই নয়, একটি জাতি আজ প্রশ্নের উত্তর চায়।
সে দিন মাহিন হাঁটছিলেন মোহাম্মদপুরের দিকে। চোখে ছিল সাহসের দীপ্তি, কাঁধে ছিল সমগ্র দেশ। আর তখনই, হেলমেটধারী ছাত্রলীগের গুণ্ডাবাহিনী হঠাৎ এসে আক্রমণ করে। কারা যেন বলেছিল, "ওর ভাই গুলিবিদ্ধ, ছোট ভাইকে মারলে আর দাঁড়াতে পারবে না।" তারপর লাঠির ঘা, বুটের আঘাত, আর ভেঙে যাওয়া একটি পা। তিনি পড়ে ছিলেন রাস্তার পাশে, কেউ তখন জিজ্ঞেস করেনি নাম, পরিচয়। স্বপ্ন জিজ্ঞেস করেছিল, "কোন দলের লোক?” মাহিন উত্তর দিয়েছিলেন না বলেই। হাসপাতালের বেডে কেটেছে তাঁর কয়েকটি রাত। সেলাইয়ের নিচে পায়ের হাড়, আর ব্যথার মধ্যে ছিল একটিই চিন্তা-ভাইকে বলব, আমি কাঁদিনি। চিকিৎসা পেয়েছেন সামান্য, ছুটেছেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে, আর বাড়িতে ফিরে পেয়েছেন শুধুই নীরবতা। মা শুধু বলেন, "তুই মরলে তো আর কিছু থাকত না"। তাঁর চোখে জল আসে না, কারণ সে সব চোখ রাষ্ট্র শুকিয়ে ফেলেছে।
আজ মাহিন হাঁটেন এক পা টেনে টেনে। ভর্তি পরীক্ষা এখনও দেননি, কিন্তু তাঁর মন বলে এই রাষ্ট্র যদি কোনোদিন সত্যিকারভাবে পরীক্ষা নেয়, তবে মাহিন পাস করবে প্রথম সারিতে। কারণ তাঁর খাতা রক্তে লেখা, তাঁর উত্তরপত্রে লেখা আছে, "মানুষ হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম।"
তাঁর জন্য নেই কোনো সংবর্ধনা, নেই কোনো সহানুভূতির জোয়ার। তবে আছে ইতিহাসের কাঁধে রাখা একটি হাত। একদিন, কোনো পাঠ্যবইয়ের পেছনে তাঁর নাম হয়তো লেখা হবে না, কিন্তু রাজপথের রক্তমাখা ইটগুলো জানে এই তরুণদের। বুকেই লেখা হয়েছিল নতুন এক স্বাধীনতার ভূমিকা। মাহিন খান নাম নয়, একটি অধ্যায়।
হামলার বিবরণ ও চিকিৎসা
অন্তরে যে আগুন জ্বলছে, তার নাম মাহিন খান। বয়সে তরুণ, চোখে বিদ্রোহের দীপ্তি, হৃদয়ে সত্যের জয়গান। ২০২৪ সালের সেই অভিশপ্ত জুলাইয়ের ঢাকায়, রাজপথ যখন মানুষের সাহস দিয়ে পাথর ফাটাচ্ছিল, তখন মাহিন ছিলেন এক মিছিলের নীরব অথচ অদম্য চিহ্ন। তিনি মিছিলে দাঁড়িয়েছিলেন, তবে হাতে ব্যানার ছিল না, মুখে মাইক ছিল না। তাঁর অস্ত্র ছিল বুকের ভেতরে জমে থাকা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, এক দীর্ঘ সময়ের অপমানের প্রতিশোধ। শান্ত, শুদ্ধ, সম্মানজনক।
ঢাকা সিটি কলেজের সামনে ২০২৪ সালের এক সকালে, যখন ছাত্ররা এক কন্ঠে বলছিল, "সংস্কার চাই, অবসান চাই বৈষম্যের," তখনো তারা ভেবেছিল, এই শহরের হৃদয়ে এখনো ন্যায়ের একটি স্পন্দন বেঁচে আছে। কিন্তু রাষ্ট্র জানে, শ্লোগান নয়, চোখে চোখ রাখা বিপজ্জনক। তাই নামিয়ে আনে তার বেসরকারি লাঠিয়াল বাহিনী ছাত্রলীগ নামের হেলমেটধারী হায়েনাদের।
কেউ পেছন থেকে ছুঁড়ে দেয় একটি ইট। সেটি এসে আঘাত করে মাহিনের পায়ে, এমনভাবে যে পায়ের হাড়ে বেজে ওঠে বিদ্রোহের শব্দ। মাহিন পড়ে যান না, তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন, ব্যথার চেয়ে বড় ছিল তাঁর দায়িত্ব। কিন্তু শরীর তো রক্তমাংসের, গায়ে লাগে ব্যথা। তাঁকে নেয়া হয় পপুলার হাসপাতালে। পাঁচটি সেলাই করা হয় পায়ে, আর চোখে পড়ে যন্ত্রণার ছায়া।
সেখানে দু'দিন চিকিৎসা চললেও ব্যথা কমে না। ব্যথা কমাতে ওষুধ লাগে, কিন্তু অপমান সারাতে লাগে সাহস। দুই সপ্তাহ পর সেই ক্ষত আবার ফুলে ওঠে। প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি, তারপর বিশ্রাম, অ্যান্টিবায়োটিক। কিন্তু যে আঘাত শুধু শরীরে নয়, সমাজে পড়ে, তার তো কোনো চিকিৎসা নেই। ওষুধ সারাতে পারে পায়ের রক্ত, কিন্তু ইতিহাসে লেখা লাঞ্ছনার কালি মুছে দিতে পারে না।
আজ মাহিন সোজা হেঁটে চলতে পারেন না। হাঁটার সময় পায়ের নিচে যেন রাষ্ট্রের পচা কাঠামো কেঁপে ওঠে। তাঁর পরিবার, তাঁর ছোট ভাই, তাঁর মা সবাই জানে, সে আর আগের মতো স্বাভাবিক না, কিন্তু চোখে জ্বলন্ত আগুন এখনও দমেনি। তার চোখে আজও স্বপ্ন- শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার না, বরং একটি এমন রাষ্ট্র গড়ার যেখানে কেউ শুধু "ছাত্র" হবার অপরাধে পায়ে ইট খাবে না।
আমরা যাঁরা এ লেখা পড়ছি, আমরা হয়তো বুঝতে পারছি না, একটি ইট কীভাবে বদলে দেয় একটি তরুণের পায়ের গঠন, আর একটি প্রজন্মের চিন্তার রক্তপ্রবাহ। কিন্তু সময় বুঝবে, ইতিহাস বোঝে, এবং একদিন এই মাহিনদের নাম লেখা থাকবে জাতির বিবেকের দেয়ালে। সেদিন আর কেউ বলবে না, "শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করে কী হয়" কারণ এই ইটের নিচেই চাপা পড়ে ছিল স্বাধীনতার অঙ্গীকার। মাহিন খান, একজন আহত সৈনিক, যার সেলাই করা পায়ে লেখা আছে স্বাধীনতার নতুন ঠিকানা।
বর্তমান অবস্থা
আহত হলেও মাহিন আজ অক্ষম নন বরং তাঁর পায়ে লাগা ইটের আঘাতটাই যেন তাঁকে আরও জাগিয়ে দিয়েছে, আরও পরিপক্ক করেছে, আরও দায়বদ্ধ করে তুলেছে এই সমাজের প্রতি। তাঁর ব্যথা এখন কেবল শারীরিক নয়, এক আত্মিক দায়। সে জানে, গুলি কিংবা ইটের আঘাতে বিপ্লব থেমে যায় না। তা শুধু পথ বদলায়, রূপ নেয় স্বপ্নে, কারখানায়, কর্মক্ষেত্রে। তাই মাহিন আজ স্বপ্ন দেখে একটি পাঞ্জাবি তৈরির কারখানার। একটি এমন জায়গা যেখানে শুধু সে নিজেই নয়, তার মতো আরও আহত স্বপ্নবানদের কাজ মিলবে, সম্মান মিলবে, বাঁচার একটা হালকা রোদ্দুর মিলবে।
তাঁর ভাবনায় শুধু আয় নয়, তাঁর ভাবনায় আছে মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার সাহস। রাষ্ট্র যদি চায়, সে সরকারি চাকরিও করতে প্রস্তুত কিন্তু সে হাত পাতছে না, সে জোর করে বলছে। "আমি রক্ত দিয়েছি, ব্যথা সহ্য করেছি এখন আমাকে সুযোগ দাও, আমাকে আমার ভবিষ্যত নির্মাণে সহায়তা করো।"
রাষ্ট্র একদিন ইট ছুঁড়েছিল মাহিনের পায়ে। এখন তার উচিত সেই পায়ে দাঁড়ানোর জন্য মঞ্চ বানানো। কারণ মাহিন একা নয় সে একটি প্রতীক, যে বলে, ক্ষতিগ্রস্তরাও নির্মাতা হতে পারে, যদি রাষ্ট্র হাত ধরতে শেখে, হেলমেট নয়, হৃদয় নিয়ে এগোতে পারে। এটাই হোক আমাদের প্রতিশ্রুতি।
প্রস্তাবনা
১. মাহিন খানের জন্য বিশেষ বিবেচনায় সরকারি চাকরির সুযোগ প্রদান,
২. অন্যথায় ঋণ/অনুদান সহায়তায় একটি পাঞ্জাবি তৈরির কারখানা ও শোরুম শুরু করার পুঁজি দেয়া,
৩. চিকিৎসার জন্য একটি স্থায়ী ফান্ড, যাতে ইনফেকশন ও ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী না হয়।

এক নজরে মাহিন খান
নাম: মাহিন খান
জন্ম তারিখ: ১০-০৯-২০০৬
পেশা: ছাত্র (বিশ্ববিদ্যালয় এডমিশন প্রার্থী)
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: বাড়ি-৭৫/১, ডিএসসিসি, ওয়ার্ড ৫৫, কামরাঙ্গীচর, ঢাকা
পারিবারিক তথ্য
বাবার নাম: মো: মজিবুর রহমান খান
বাবার বয়স ও পেশা: ৫৪, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং বর্তমানে ২টি সিএনজির মালিক যা দিয়ে সংসার চলে
মায়ের নাম: মাহামুদা আফরোজ
মায়ের পেশা: গৃহিণী
ভাই: মোট ৩ ভাই
মো: মারুফ খান: ছাত্র, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি (B.Sc. in SWE)
মুহতাসিম খান : মোহাম্মদপুর সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করছেন
আহত হওয়ার স্থান: ঢাকা সিটি কলেজের সামনে
আহত হওয়ার তারিখ: ১৬ জুলাই ২০২৪
আক্রমণকারী: ছাত্রলীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍