হোম / আহতদের তালিকা / মো: লালন আলী
মো: লালন আলী

মো: লালন আলী

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী (গনিত, অনার্স ৪র্থ বর্ষ)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা


ব্রক্ষ্মপুরের ছোট ঘরে স্বপ্ন বোনার শুরু
ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকাইল থানার ৪নং লেহেম্বা ইউনিয়নের ব্রক্ষ্মপুর গ্রাম। চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত, মাঝে মাঝে বাঁশঝাড়, আর মেঠোপথে সন্ধ্যার পর কুয়াশা জমে। সেই গ্রামের এক অতি সাধারণ কৃষক পরিবারের ঘরে ২০০১ সালের ১ মার্চ জন্ম নেয় মো: লালন আলী। বাবা মো: মমতাজ আলী একজন কৃষক, বয়স ৫২। মা মোছা: লিলি বেগম, ৪৫ বছর বয়সী গৃহিণী।

পরিবারে তিন ভাইবোন। দুই বড় বোন, দুলালী আক্তার ও মৌসুমি আক্তার, দুজনই বিবাহিত। লালনের বড় ভাই মো: লিমন আলী, অনার্স ৪র্থ বর্ষে পড়ে। আর লালন নিজেও একই বর্ষে গণিত বিভাগে পড়ছে। দুই ভাই মিলে শহরে থেকে পড়াশোনা করে, আর পেছনে তাদের বাবা প্রতিদিন মাঠে ঘাম ঝরান মাস শেষে আয়ে আসে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। মা লিলি বেগম সন্তানদের জন্য রান্না করতে গিয়ে চোখ মুছেন। ছেলেরা শহরে খায় কিনা, কেমন আছে, পড়া হচ্ছে কিনা সব ভাবনা তার চোখে জল হয়ে ঝরে পড়ে।
শহরে জীবনের কষাঘাতে গড়া অধ্যায়
দিনাজপুর সরকারি কলেজে গণিতে অনার্স পড়া মানেই প্রতিদিন অঙ্ক কষা নয়, বরং জীবনের অঙ্ক মিলিয়ে চলা। কলেজ মোড়ে একটি মেসে দুই ভাই থাকত, লিমন ও লালন। তাদের একটাই লক্ষ্য এই কষ্ট একদিন বদলাবে। বাবা মমতাজ আলী নিজের শেষ জমিটুকু বন্ধক রাখার কথা ভাবেন, শুধু যেন ছেলেদের পড়াশোনায় ছেদ না পড়ে। মা ফোন করে কাঁদেন, তোমরা কেউ না খেয়ে থাকো না তো। লালন অন্যায় দেখতে পারতো না। সে ভাবত সমাজ নিয়ে, দেশ নিয়ে, সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছিল তার সহজাত স্বভাব।
উত্তাল দেশ পিছনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সাল। চাকরির বাজারে এক গভীর হতাশা ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। মেধাবী শিক্ষার্থীরা দেখছে, বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধ কোটাসহ অন্যন্য সংরক্ষিত কোটা অনেক ক্ষেত্রেই রূপ নিচ্ছে দুর্নীতির পন্থায়, হয়ে উঠছে অবিচারের সুযোগ। লালন আলী এসব বৈষম্য নিজ চোখে দেখেছে। বড় ভাই লিমনের বন্ধু একজন মাস্টার্স শেষ করেও কয়েক বছর ধরে বেকার। অন্যদিকে, কিছু লোক মাত্র পরীক্ষার নিয়ম না মেনে চাকরিতে ঢুকে পড়ছে। এসব তার ভেতরেই আগুন ধরিয়ে দেয়। সে বুঝতে পারে, শুধু পড়ালেখা করলেই হবে না, বরং এই সমাজের ভাঙা কাঠামোর বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি দিন। ঢাকায়, রংপুরে, খুলনায়, চট্টগ্রামে একের পর এক ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নামতে শুরু করে। আবারও কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঢেউ বয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, এমনকি গ্রাম পর্যন্ত। দিনাজপুরেও এই জোয়ার এসে লাগে। ৬ জুলাই তারা ৬-৭ জন মিলে পরিকল্পনা করে কোটা পুনর্বহাল চায় না এই স্লোগানকে সামনে রেখে ২০-২৫ জন ছাত্র মিলে কলেজ মোড়, দিনাজপুরে প্রথম মিছিল করে। এরপর ধারাবাহিক ভাবে নিয়মিত মিছিল বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের ঢল নামে। এরপর দিনাজপুর সরকারি কলেজ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি), ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের এক ছোট্ট সংগঠন গড়ে উঠে। সেখানেই নিয়মিত আন্দোলনের আপডেট দেওয়া হতো। দিনাজপুরের বাঁশের হাট এলাকায় এক কর্মসূচির জন্য সবাই মিলে বৈঠক করে। হাবিপ্রবির ছাত্র, কলেজের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় শিক্ষার্থী এবং আশেপাশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা একত্র হয়। সিদ্ধান্ত নেয়, ৪ আগস্ট তারা মানববন্ধন করবে। ব্যানার তৈরি হয়, পোস্টার লেখা হয়, স্লোগান চর্চা হয়। একদিকে মিছিলের প্রস্তুতি, অন্যদিকে বাড়ি থেকে মা বারবার ফোন করে বলতেন, বাবা, তুই ঝামেলায় যাবি না তো। লালন শান্ত গলায় জবাব দিত, মা, আমি তো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছি। আমার মাথা উঁচু, মন পরিষ্কার। কিন্তু সে জানত না, যে ন্যায়ের পথে সে হাঁটছে, সে পথ এত রক্তাক্ত হতে পারে।
বাঁশের হাটের রক্তাক্ত দুপুর
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, দিনটি ছিল রবিবার, এক শান্ত দুপুর। রোদ ঝলমলে, বাতাসে আন্দোলনের উত্তেজনা। সকাল থেকেই লালন, তার ভাই লিমন এবং আরও ৩০-৩৫ জন ছাত্র মিলে বাঁশের হাট মোড়ে জমায়েত হচ্ছিল। ধীরে ধীরে ছাত্র-জনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই হাজার হাজার ছাত্র জনতা জড়ো হয়। তারা ছাত্র হত্যাসহ খুন, গুম এবং ১ দফা দাবি স্বৈরাচারী সরকারের পতনের দাবিতে আন্দোলন করছিল। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের একপর্যায়ে দিনাজপুর সদর হাসপাতালের সামনে দায়িত্বরত এসপি ইফতেখার জামানকে ছাত্র-জনতা আটক করে রাখে। এটাকে পুজি করেই সেখানকার পুলিশ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ এবং যুবলীগের সন্ত্রাসী বাহিনীরা আক্রমণ করে ছাত্রদের উপর। এক পর্যায়ে পুলিশ ছাত্রদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস ছেড়ে। টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় ছাত্রদের অনেকেরই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। একটা টিয়ারগ্যাস এসে পরে ঠিক লালনের সামনেই। তার চোখ, মুখ এবং সারা শরীরে ধোঁয়ায় ভরে যায়। টিয়ার গ্যাসের প্রভাবে তার শ্বাসকষ্ট দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম। এরপর শুরু হয় পুলিশের ছোররাগুলি, রাবার বুলেট। স্বৈরাচারী পুলিশের সাথে যোগ দেয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে দৌড়ে পালাতে থাকে। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে নিরীহ ছাত্র জনতা এবং স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনীর সাথে। একপর্যায়ে লালনের পা ফেঁটে যায় এবং টিয়ার গ্যাসে তার চোখমুখে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। নিশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে তাকে ছাত্র-জনতা ধরে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
চিকিৎসা
ছাত্র-জনতা তাকে দিনাজপুর ইসলামি ব্যাংক কমিউনিটি হসপাতালে নিয়ে যায়। তার পা আগে থেকেই ফাঁটা ছিলো। আন্দোলনে থাকার কারণে তার পা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতস্থানে চিকিৎসা শুরু হয়। টিয়ার গ্যাসের কারণে তার যে শ্বাসকষ্টের সমস্যা হচ্ছিল তার চিকিৎসাও দেয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি দিনাজপুর সরকারি মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে বেশ কিছুদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর বর্তমান তিনি সুস্থ

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: লালন আলী
জন্ম তারিখ : ১ মার্চ ২০০১
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : শিক্ষার্থী (গনিত, অনার্স ৪র্থ বর্ষ)
প্রতিষ্ঠান : দিনাজপুর সরকারি কলেজ
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ঠিকানা : কলেজ মোড়, দিনাজপুর
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: ব্রক্ষ্মপুর, ইউনিয়ন: ৪নং লেহেম্বা, থানা: রানীশংকাইল, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: মমতাজ আলী
মায়ের নাম : মোছা: লিলি বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫২
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪৫
মাসিক আয় : ১৫ হাজার
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৪ জন
ভাই-বোনের বিবরণ
১. মো: লিমন আলী, বয়স: ২৪, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: অনার্স ৪র্থ বর্ষ, সম্পর্ক: ভাই
২. দুলালী আক্তার, বয়স: ৩২, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
৩. মৌসুমি আক্তার, বয়স: ২৮, বিবাহিত, সম্পর্ক: বোন
ঘটনার স্থান : বাশেঁর হাট, হাবিপ্রবি, দিনাজপুর
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টা
আক্রমণকারী : ছাত্রলীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍