সাবিত হোসেন ইমন
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পেশা : শিক্ষার্থী (পদার্থবিজ্ঞান, অনার্স ৩য় বর্ষ)
🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা
চাঁদপুর গ্রামের ইমন
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার এক নিভৃত গ্রাম চাঁদপুর। এখানেই ১৫ নভেম্বর ২০০২ সালে জন্ম নেয় এক খুদে প্রাণ মোঃ সাবিত হোসেন ইমন। বাবা মোঃ আব্দুল আজিজ পেশায় কৃষক, বয়স ছাপিয়ে ৫৬ পেরিয়ে গেছে, আর মা আনছুরা বেগম এক মায়াবতী গৃহিণী, বয়স ৪৩। পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচ ইমন, তার মা-বাবা এবং দুই ভাইবোন। ছোটবেলা থেকেই ইমন ছিল নিঃশব্দ স্বভাবের, গভীর দৃষ্টি ও স্বপ্ন নিয়ে গড়ে উঠছিল এক সংগ্রামী মন। ইমনের ছোট বোন ফারিয়া কানিজ রাফা এখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। আর ছোট ভাই আদনান হোসাইন মাহিন নবম শ্রেণির ছাত্র। ইমনের পড়াশোনা শুরু গ্রামের পাঠশালায়।
অল্প বয়সেই গ্রামের মাঠ, খেত আর মেঠোপথে ছুটোছুটি করতে করতে বুঝে গিয়েছিল জীবন মানেই সংগ্রাম। বাবা-মায়ের মুখে নিয়মিত অভাব-অনটনের গল্প শোনার মধ্যে দিয়ে বড় হওয়া ছেলেটি তখন থেকেই একটা জিনিস বুঝে গিয়েছিল এই জীবন বদলাতে হলে শিক্ষা ছাড়া উপায় নেই। এই চেতনায় দিন-রাত এক করে সে পড়াশোনায় মন দিল। এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল করে সে সুযোগ পেল দিনাজপুর সরকারি কলেজে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে অনার্সে ভর্তি হওয়ার। বাড়ি থেকে দূরে কলেজ মোড় এলাকায় ছোট্ট একটি মেসে থেকে শুরু হলো তার নতুন জীবন সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪, গর্জে উঠা তরুণরা
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশজুড়ে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের দ্বিতীয় তরঙ্গ। ঢাকা থেকে রাজশাহী, খুলনা থেকে বরিশাল সবখানে শিক্ষার্থীরা ফুঁসে উঠলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তার তরুণ মনেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দিনের পর দিন চলছিল অন্যায়ভাবে চাকরির নিয়োগ বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁস এবং দুর্নীতি। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও গুলি, লাঠি, গ্রেফতার, নির্যাতন চালাতো লাগামহীনভাবে।
ইমন, তখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, দিনাজপুর সরকারি কলেজের সামনে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। গলায় বাঁধা সাদা কাপড়, হাতে প্ল্যাকার্ড সে ছিল প্রতিবাদের এক জীবন্ত প্রতীক। সে জানত তার ভবিষ্যৎ আজ অস্ত্রের নিচে পিষ্ট হতে বসেছে। তাই সে আর চুপ থাকতে পারেনি। যে মেসে সে থাকতো, তা তখন অনেকের আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তার সংগ্রামের পথ একদিন হয়ে উঠবে রক্তাক্ত, তা কি সে জানত?
দিনাজপুর থেকে ঠাকুরগাঁও রক্তের রাস্তা
১৬ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২টা পার হয়েছে। দিনাজপুর সরকারি কলেজ মোড় তখন উত্তাল। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঢেউ একে একে গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে জেলা শহরে এসে আছড়ে পড়েছে। সাবিত হোসেন ইমন তখন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে। দেশের ভবিষ্যৎ, তরুণ প্রজন্মের ন্যায্য দাবি আর তার নিজের স্বপ্ন এক হয়ে গেছে। বাঁ হাতে একটি সাদা ব্যানার, চোখে তীব্র প্রতিজ্ঞা, কোটার যৌক্তিক সংস্কার চাই।
এই সময়, হঠাৎই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রোহানের নেতৃত্বে (যিনি দিনাজপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি), হঠাৎ লাঠি, বাঁশ, ইট, রড নিয়ে হামলা শুরু করে। পুলিশও যোগ দেয় সেই নিপীড়নে। জনতার মাঝখানে এক নারী কর্মীকে ছাত্রলীগের এক সদস্য টেনে নিচ্ছিল, ইমন আর সহ্য করতে পারেনি। সেই আপুকে রক্ষা করতে ছুটে যায় সে। তখনই তার বাঁ হাতে আসে প্রচণ্ড এক আঘাত মারাত্মক ব্যথা নিয়ে সে পালিয়ে যায় ঘটনাস্থল থেকে। সেদিন সে মেসে ফিরতে পারেনি। রাত নামার পর, চুপিচুপি, গলির ভেতর দিয়ে ঘুরপথে মেসে প্রবেশ করে। ১৭ জুলাই দিনের আলোয় আর বের হওয়া হয়নি। চারদিক ছিল আতঙ্কে মোড়া। কিন্তু রাতে সে আবার আন্দোলনে নামে, পিছু হটেনি। ১৮ জুলাইয়ের সকাল। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্ররা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আন্দোলনকে দমন করতে ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ বাহিনী আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে। লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, এবং রড-হাতুড়ির আঘাতে রক্তাক্ত হয় রাজপথ। ইমন সেই দিনও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। সংবাদমাধ্যমের ভিডিও ফুটেজে তাকে দেখা যায়।
এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইমন সেই রাতে চলে যায় বাড়িতে। কিন্তু তাতেও আন্দোলনের আগুন নিভে যায় না। বরং ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রাম থেকে সে ফের সংগঠিত হয়। ২ ও ৩ আগস্ট সেখানকার প্রতিবাদে অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত ৪ আগস্ট ২০২৪। এই দিনের কথা ইমন কোনোদিন ভুলতে পারবে না। মা-বাবা অনেক অনুরোধের পর তাকে যাওয়ার অনুমতি দেয়। মা বলেছিলেন, “তোকে আল্লাহর হাতে দিলাম।” ইমন দোয়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তার সঙ্গে ছিল এলাকার ১৪-১৫ জন সাহসী তরুণ।
তারা যাচ্ছিল ঠাকুরগাঁও জর্জ কোর্ট এলাকা। শুরু হয় প্রতিবাদ। কিন্তু পুলিশ পূর্ব পরিকল্পিতভাবে অবস্থান নেয়। সামনে থেকে ছাত্ররা স্লোগান তুলছে, হঠাৎ পুলিশ শুরু করে টিয়ার শেল, বুলেট আর ছোররা গুলি। ইমন সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে। পেছন ফিরতেই, এক পয়েন্ট থেকে পুলিশ ‘ছররা গুলি’ ছুড়ে দেয় তার দিকে। তবুও রক্তাক্ত শরীর নিয়ে নিরাপদ জায়গায় যায়। তার পা, পিঠ, হাত সব ভেদ করে ২৩-২৪টি ছররা গুলি বিঁধে যায়। ব্যথায় ছটফট করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। তখন কয়েকজন বন্ধু দ্রুত এগিয়ে আসে।
কাছের একটি ফার্মেসির সহকারীকে ডেকে আনে। প্রথমে ছয়টি ছররা গুলি বের করা হয় পা থেকে। কিন্তু তার শরীরে তখনও ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ধাতব চূর্ণ।
চিকিৎসা সম্পর্কিত বর্ণনা
১৬ জুলাই তারিখ এ আহত হওয়ার ফার্মেসী থেকে লোকাল ব্যাথার ঔষুধ নেই। এরপর ১৮ জুলাইয়ে টিয়ার গ্যাস ও হাত কেটে যায়। স্থানীয় এক ‘বাসা থেকে ব্যান্ডেজ ‘করে নেই ও ফার্মেসী থেকে ঔষধ নেই। প্রায় এ দুদিনে ও ৪৫০ টাকার ঔষধ কিনতে হয়েছিল। এরপর চার আগস্ট তারিখে জর্জ কোর্টের সামনে পুলিশেরে ছোররা গুলিতে আহত হই। সে সময় স্থানীয় এক ফার্মেসীর সহকারী এসে ছয়টা ছোররা গুলি পায়ের ক্ষতস্থান কোটে বের করে। সেদিনই বাসায় এসে নিজে নিজে ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে ব্লেড দিয়ে কেটে আরো ছয়টা ছোররা গুলি বের করি।
পরে ফ্যাসিস্ট সরকার পালিয়ে যাওয়ার পরদিন ৬ আগস্ট রংপুর ইসলামী হাসপাতাল থেকে ডাক্তার রাবেয়া খাতুন ও ডাক্তার আজহার আলী’র নিকট হতে চিকিৎসা নেই। তারা পরীক্ষা করে দেখেন যে এখনো ২টা ছোররা গুলি ভেতরে আছে এবং আশ্বস্ত করেন যে কোনরূপ ব্যথা হলে তারা গুলি বের করে দিবে। এ পর্যন্ত ঔষধ কিনতে প্রায় ৪ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া যেতে পারে।মায়ের দোয়া, আন্দোলনের
মিছিলে ছায়া হয়ে রইলো
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: সাবিত হোসেন ইমন
জন্ম তারিখ : ১৫ নভেম্বর ২০০২
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : শিক্ষার্থী (পদার্থবিজ্ঞান, অনার্স ৩য় বর্ষ)
প্রতিষ্ঠান : দিনাজপুর সরকারি কলেজ
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ঠিকানা : কলেজ মোড়, দিনাজপুর
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চাঁদপুর, ইউনিয়ন: ৩নং খালগাঁও, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো:আব্দুল আজিজ
মায়ের নাম : মোছা: আনছুরা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৬
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিনী, ৪৩
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. ফারিয়া কানিজ রাফা, বয়স: ১৮, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: দ্বাদশ, সম্পর্ক: বোন
২. আদনান হোসাইন মাহিন, বয়স: ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: নবম, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : কলেজ মোড়, দিনাজপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৬ জুলাই ২০২৪ এবং ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টা
আক্রমণকারী : আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ (রোহান, সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি, সরকারি কলেজ), পুলিশ
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার এক নিভৃত গ্রাম চাঁদপুর। এখানেই ১৫ নভেম্বর ২০০২ সালে জন্ম নেয় এক খুদে প্রাণ মোঃ সাবিত হোসেন ইমন। বাবা মোঃ আব্দুল আজিজ পেশায় কৃষক, বয়স ছাপিয়ে ৫৬ পেরিয়ে গেছে, আর মা আনছুরা বেগম এক মায়াবতী গৃহিণী, বয়স ৪৩। পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচ ইমন, তার মা-বাবা এবং দুই ভাইবোন। ছোটবেলা থেকেই ইমন ছিল নিঃশব্দ স্বভাবের, গভীর দৃষ্টি ও স্বপ্ন নিয়ে গড়ে উঠছিল এক সংগ্রামী মন। ইমনের ছোট বোন ফারিয়া কানিজ রাফা এখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। আর ছোট ভাই আদনান হোসাইন মাহিন নবম শ্রেণির ছাত্র। ইমনের পড়াশোনা শুরু গ্রামের পাঠশালায়।
অল্প বয়সেই গ্রামের মাঠ, খেত আর মেঠোপথে ছুটোছুটি করতে করতে বুঝে গিয়েছিল জীবন মানেই সংগ্রাম। বাবা-মায়ের মুখে নিয়মিত অভাব-অনটনের গল্প শোনার মধ্যে দিয়ে বড় হওয়া ছেলেটি তখন থেকেই একটা জিনিস বুঝে গিয়েছিল এই জীবন বদলাতে হলে শিক্ষা ছাড়া উপায় নেই। এই চেতনায় দিন-রাত এক করে সে পড়াশোনায় মন দিল। এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল করে সে সুযোগ পেল দিনাজপুর সরকারি কলেজে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে অনার্সে ভর্তি হওয়ার। বাড়ি থেকে দূরে কলেজ মোড় এলাকায় ছোট্ট একটি মেসে থেকে শুরু হলো তার নতুন জীবন সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪, গর্জে উঠা তরুণরা
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশজুড়ে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের দ্বিতীয় তরঙ্গ। ঢাকা থেকে রাজশাহী, খুলনা থেকে বরিশাল সবখানে শিক্ষার্থীরা ফুঁসে উঠলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তার তরুণ মনেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দিনের পর দিন চলছিল অন্যায়ভাবে চাকরির নিয়োগ বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁস এবং দুর্নীতি। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও গুলি, লাঠি, গ্রেফতার, নির্যাতন চালাতো লাগামহীনভাবে।
ইমন, তখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, দিনাজপুর সরকারি কলেজের সামনে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। গলায় বাঁধা সাদা কাপড়, হাতে প্ল্যাকার্ড সে ছিল প্রতিবাদের এক জীবন্ত প্রতীক। সে জানত তার ভবিষ্যৎ আজ অস্ত্রের নিচে পিষ্ট হতে বসেছে। তাই সে আর চুপ থাকতে পারেনি। যে মেসে সে থাকতো, তা তখন অনেকের আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তার সংগ্রামের পথ একদিন হয়ে উঠবে রক্তাক্ত, তা কি সে জানত?
দিনাজপুর থেকে ঠাকুরগাঁও রক্তের রাস্তা
১৬ জুলাই ২০২৪, দুপুর ১২টা পার হয়েছে। দিনাজপুর সরকারি কলেজ মোড় তখন উত্তাল। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঢেউ একে একে গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে জেলা শহরে এসে আছড়ে পড়েছে। সাবিত হোসেন ইমন তখন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে। দেশের ভবিষ্যৎ, তরুণ প্রজন্মের ন্যায্য দাবি আর তার নিজের স্বপ্ন এক হয়ে গেছে। বাঁ হাতে একটি সাদা ব্যানার, চোখে তীব্র প্রতিজ্ঞা, কোটার যৌক্তিক সংস্কার চাই।
এই সময়, হঠাৎই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রোহানের নেতৃত্বে (যিনি দিনাজপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি), হঠাৎ লাঠি, বাঁশ, ইট, রড নিয়ে হামলা শুরু করে। পুলিশও যোগ দেয় সেই নিপীড়নে। জনতার মাঝখানে এক নারী কর্মীকে ছাত্রলীগের এক সদস্য টেনে নিচ্ছিল, ইমন আর সহ্য করতে পারেনি। সেই আপুকে রক্ষা করতে ছুটে যায় সে। তখনই তার বাঁ হাতে আসে প্রচণ্ড এক আঘাত মারাত্মক ব্যথা নিয়ে সে পালিয়ে যায় ঘটনাস্থল থেকে। সেদিন সে মেসে ফিরতে পারেনি। রাত নামার পর, চুপিচুপি, গলির ভেতর দিয়ে ঘুরপথে মেসে প্রবেশ করে। ১৭ জুলাই দিনের আলোয় আর বের হওয়া হয়নি। চারদিক ছিল আতঙ্কে মোড়া। কিন্তু রাতে সে আবার আন্দোলনে নামে, পিছু হটেনি। ১৮ জুলাইয়ের সকাল। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্ররা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আন্দোলনকে দমন করতে ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ বাহিনী আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে। লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, এবং রড-হাতুড়ির আঘাতে রক্তাক্ত হয় রাজপথ। ইমন সেই দিনও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। সংবাদমাধ্যমের ভিডিও ফুটেজে তাকে দেখা যায়।
এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইমন সেই রাতে চলে যায় বাড়িতে। কিন্তু তাতেও আন্দোলনের আগুন নিভে যায় না। বরং ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রাম থেকে সে ফের সংগঠিত হয়। ২ ও ৩ আগস্ট সেখানকার প্রতিবাদে অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত ৪ আগস্ট ২০২৪। এই দিনের কথা ইমন কোনোদিন ভুলতে পারবে না। মা-বাবা অনেক অনুরোধের পর তাকে যাওয়ার অনুমতি দেয়। মা বলেছিলেন, “তোকে আল্লাহর হাতে দিলাম।” ইমন দোয়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তার সঙ্গে ছিল এলাকার ১৪-১৫ জন সাহসী তরুণ।
তারা যাচ্ছিল ঠাকুরগাঁও জর্জ কোর্ট এলাকা। শুরু হয় প্রতিবাদ। কিন্তু পুলিশ পূর্ব পরিকল্পিতভাবে অবস্থান নেয়। সামনে থেকে ছাত্ররা স্লোগান তুলছে, হঠাৎ পুলিশ শুরু করে টিয়ার শেল, বুলেট আর ছোররা গুলি। ইমন সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে। পেছন ফিরতেই, এক পয়েন্ট থেকে পুলিশ ‘ছররা গুলি’ ছুড়ে দেয় তার দিকে। তবুও রক্তাক্ত শরীর নিয়ে নিরাপদ জায়গায় যায়। তার পা, পিঠ, হাত সব ভেদ করে ২৩-২৪টি ছররা গুলি বিঁধে যায়। ব্যথায় ছটফট করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। তখন কয়েকজন বন্ধু দ্রুত এগিয়ে আসে।
কাছের একটি ফার্মেসির সহকারীকে ডেকে আনে। প্রথমে ছয়টি ছররা গুলি বের করা হয় পা থেকে। কিন্তু তার শরীরে তখনও ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ধাতব চূর্ণ।
চিকিৎসা সম্পর্কিত বর্ণনা
১৬ জুলাই তারিখ এ আহত হওয়ার ফার্মেসী থেকে লোকাল ব্যাথার ঔষুধ নেই। এরপর ১৮ জুলাইয়ে টিয়ার গ্যাস ও হাত কেটে যায়। স্থানীয় এক ‘বাসা থেকে ব্যান্ডেজ ‘করে নেই ও ফার্মেসী থেকে ঔষধ নেই। প্রায় এ দুদিনে ও ৪৫০ টাকার ঔষধ কিনতে হয়েছিল। এরপর চার আগস্ট তারিখে জর্জ কোর্টের সামনে পুলিশেরে ছোররা গুলিতে আহত হই। সে সময় স্থানীয় এক ফার্মেসীর সহকারী এসে ছয়টা ছোররা গুলি পায়ের ক্ষতস্থান কোটে বের করে। সেদিনই বাসায় এসে নিজে নিজে ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে ব্লেড দিয়ে কেটে আরো ছয়টা ছোররা গুলি বের করি।
পরে ফ্যাসিস্ট সরকার পালিয়ে যাওয়ার পরদিন ৬ আগস্ট রংপুর ইসলামী হাসপাতাল থেকে ডাক্তার রাবেয়া খাতুন ও ডাক্তার আজহার আলী’র নিকট হতে চিকিৎসা নেই। তারা পরীক্ষা করে দেখেন যে এখনো ২টা ছোররা গুলি ভেতরে আছে এবং আশ্বস্ত করেন যে কোনরূপ ব্যথা হলে তারা গুলি বের করে দিবে। এ পর্যন্ত ঔষধ কিনতে প্রায় ৪ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া যেতে পারে।মায়ের দোয়া, আন্দোলনের
মিছিলে ছায়া হয়ে রইলো
একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: সাবিত হোসেন ইমন
জন্ম তারিখ : ১৫ নভেম্বর ২০০২
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : শিক্ষার্থী (পদার্থবিজ্ঞান, অনার্স ৩য় বর্ষ)
প্রতিষ্ঠান : দিনাজপুর সরকারি কলেজ
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
বর্তমান ঠিকানা : কলেজ মোড়, দিনাজপুর
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: চাঁদপুর, ইউনিয়ন: ৩নং খালগাঁও, থানা: পীরগঞ্জ, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো:আব্দুল আজিজ
মায়ের নাম : মোছা: আনছুরা বেগম
পিতার পেশা ও বয়স : কৃষক, ৫৬
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিনী, ৪৩
আয়ের উৎস : কৃষি
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৫ জন
ভাইবোনের বিবরণ
১. ফারিয়া কানিজ রাফা, বয়স: ১৮, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: দ্বাদশ, সম্পর্ক: বোন
২. আদনান হোসাইন মাহিন, বয়স: ১৫, পেশা: শিক্ষার্থী, শ্রেণি: নবম, সম্পর্ক: ভাই
ঘটনার স্থান : কলেজ মোড়, দিনাজপুর
আহত হওয়ার সময় : ১৬ জুলাই ২০২৪ এবং ৪ আগস্ট ২০২৪, দুপুর ১২টা
আক্রমণকারী : আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ (রোহান, সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি, সরকারি কলেজ), পুলিশ
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍