হোম / আহতদের তালিকা / মো: আরিফ ইসলাম
মো: আরিফ ইসলাম

মো: আরিফ ইসলাম

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পেশা : শিক্ষার্থী (এসএসসি ফলপ্রার্থী)

🩸 আহত হওয়ার ঘটনা ও বিস্তারিত বর্ণনা

শ্যামল গাঁয়ে জন্ম আরিফের
পূর্বজামুরী পাড়া ঠাকুরগাঁও জেলার সালন্দর ইউনিয়নের এক প্রান্তিক গ্রাম। চারপাশে ধানক্ষেত আর কাঁচা রাস্তার মাঝখানে একটুখানি টিনের ঘর। এখানেই ২০০৮ সালের ১২ই জুন জন্ম নেয় মো: আরিফ ইসলাম। বাবা মো: সাইফুল ইসলাম একজন কুলি, মায়ের নাম মোছা: সুমি আক্তার, গৃহিণী। সংসার ছোট তিনজনের, তবু রোজগারের স্বল্পতায় জীবনটা কঠিন।


শৈশব থেকেই আরিফ ছিল শান্ত ও ভাবুক প্রকৃতির। স্কুলে যেতে খুব ভালোবাসত। গ্রামের সরকারি স্কুলেই পড়াশোনা শুরু হয় তার। বাবার কাঁধে ভারি মাল তোলা দেখে আরিফের মনে প্রশ্ন জাগত, আমার বাবা কেন কষ্ট করে, আর কারো বাবা কেন গাড়িতে চড়ে অফিসে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর সে বইয়ের পাতায় খুঁজে বেড়াত। মা সুমি আক্তার তাকে পাশে বসিয়ে বলতেন, তুই যদি মানুষ না হস, তাহলে এই কষ্ট শেষ হবে না, আরিফ! মা-বাবার সেই কথাগুলোই আরিফের হৃদয়ে বীজ হয়ে গেঁথে গিয়েছিল। এসএসসি পরীক্ষার্থী আরিফ, কষ্ট করেও নিজেকে তৈরি করছিল। নিজের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে দেশের জন্য সেবা করা।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের আগুন
২০২৪ সালের জুলাই মাস। সারাদেশে ছাত্র-যুব সমাজ একত্রিত হয়ে রাস্তায় নামল। তারা কোটা সংস্কারের দাবি জানাচ্ছিল, চেয়েছিল মেধার মূল্যায়ন। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার ন্যায্য দাবি না মেনে বরং পুলিশ বাহিনী এবং আওয়ামী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা ছাত্রদের আক্রমণ করে। ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ মিছিল করলে সেখানে পুলিশ কোন সংকেত ছাড়াই সরাসরি গুলি ছোরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক পেতে দিলে সেই বুকে পুলিশ গুলি করে ঝাঝরা করে দেয়। নিরস্ত্র আবু সাঈদকে এভাবে হত্যা করতে দেখে সারা বাংলাদেশে আন্দোলনের ঢেউ দানা বেধে ওঠে।
ঢাকাসহ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলনের ঢেউ। ঠাকুরগাঁওয়ের ছোট শহরেও নেমে আসে সেই আগুন। আরিফ তখন রুটিন করে পড়াশোনা করছিল, সামনে এসএসসি ফল প্রকাশ। কিন্তু খবরের কাগজ আর ফেসবুক লাইভে যখন সে দেখে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সর্বত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ, রক্তাক্ত ছেলেরা, তার হৃদয় কেঁপে ওঠে। একদিন সন্ধ্যায় সে মাকে বলে, মা, আমরা সবাই যদি চুপ থাকি, তাহলে যারা প্রতিবাদ করে তারা একা পড়ে যাবে। আমি যাই আন্দোলনে! মা অবাক হন, ভয় পান। বলেন, তুই তো একটা ছোট ছেলে, আর সামনে তো ফলাফল দেবে। এখন যদি কিছু হয়ে যায়?
আরিফ চোখ তুলে বলে, মা, তুমি তো বলছিলে মানুষ হইতে, এখন মানুষ হবার পথেই নামছি।
ঠাকুরগাঁও শহরে প্রতিদিন জড়ো হচ্ছিল সাধারণ মানুষ, স্কুল-কলেজের ছাত্ররা, পাড়ার যুবকেরা। তারা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে ঘুরছিল, মিছিল করছিলো, বিক্ষোভ করছিলো রাস্তায়। আরিফ এই দলের মাঝেই ছিল চোখে দীপ্তি, মুখে সাহস।
বিকেলের সেই রক্তাক্ত মুহূর্ত
তারিখটা ৪ আগস্ট, ২০২৪। দিনটা ছিল রোববার। ঠাকুরগাঁও শহরের বিভিন্ন মোড়ে তখনো আন্দোলনকারীদের জড়ো হতে দেখা যাচ্ছিল। আরিফ সকাল থেকেই বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরছিল।কখনো হাসপাতাল গেটের সামনে, কখনো আদালত মোড়ে। তখনও সবার চোখে ছিল আশা হয়তো সরকার দাবি মেনে নেবে। কিন্তু বিকাল ৩টা বাজতেই সব কিছু বদলে যায়। হঠাৎ করেই পুলিশ এসে সরে যেতে বলে, ছাত্ররা স্থান ত্যাগ না করলে পুলিশের লাঠিচার্জ শুরু হয়। আরিফ ভেবেছিল পুলিশ শুধু ভয় দেখাবে, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছররা গুলি ছোড়া শুরু হয়। সবাই দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। একটি গুলির শেল্ট এসে লাগে আরিফের মুখে, আরও কয়েকটি লাগে মাথায় ও ঘাড়ে। তার শরীর থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। রক্তে ভিজে যায় জামা-প্যান্ট, মানুষের চিৎকারে আকাশ ভারি হয়ে ওঠে। সেই দৃশ্য টা ছিলো খুবই ভয়ানক। দেশের মানুষ হয়ে দেশের মানুষকে তাও আবার ছাত্রদের এভাবে হত্যা করা যায় তা ইতিহাসে প্রথমবার দেখেছে বাংলাদেশ। মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গেছে সরকার বাহিনীর এমন নির্মমতা দেখে। তাই সেদিন আর শুধু ছাত্র নয় অভিভাবক, শ্রমজীবী, পেশাজীবী, কৃষিজীবী অটো চালক রিক্সা চালকসহ নারী পুরুষ সবাই রাস্তায় নামেন অন্যায়ের প্রতিবাদে। সেদিন অনেকেই হতাহত হন। আরিফুল ইসলাম ছিলেন তাদের অন্যতম। তার শরীর ও বাদ যায়নি। ছোররা গুলি লাগার পর তাকে নিকটস্থ ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি রংপুর সিএমএইচে ভর্তি হন। কয়েকদিন চিকিৎসা নেন এবং তার শরীর থেকে কিছু ছড়াগুলো বের করা হয়। এখনো কিছু ছোররা গুলি তার শরীরে রয়ে গেছে। যে গুলোর জন্য মাঝে মাঝে ব্যথা করে।
কর্মসংস্থানের প্রস্তাবনা
এসএসসি ফল প্রার্থী। তাই শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে দেওয়া।

একনজরে ব্যক্তিগত তথ্যাদি
নাম : মো: আরিফ ইসলাম
জন্ম তারিখ : ১২ জুন ২০০৮
জন্মস্থান : ঠাকুরগাঁও
পেশা : শিক্ষার্থী (এসএসসি ফলপ্রার্থী)
নিজ জেলা : ঠাকুরগাঁও
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা : গ্রাম: পূর্বজামুরী পাড়া, ইউনিয়ন: সালন্দর, থানা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য
পিতার নাম : মো: সাইফুল ইসলাম
মায়ের নাম : মোছা: সুমি আকতার
পিতার পেশা ও বয়স : শ্রমিক (কুলি), ৫২
মায়ের পেশা ও বয়স : গৃহিণী, ৪২
মাসিক আয় : ১৫ হাজার
আয়ের উৎস : কুলি থেকে
পরিবারের সদস্য সংখ্যা : ৩ জন
ঘটনার স্থান : হাসপাতালের সামনে, ঠাকুরগাঁও
আহত হওয়ার সময় : ৪ আগস্ট ২০২৪, বিকাল ৩টা
আক্রমণকারী : পুলিশ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍